সহকারী অধ্যাপক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪২ পূর্বাহ্ণ
কিয়ামতের মহাদৃশ্য ও মানুষের জবাবদিহি
কিয়ামতের মহাদৃশ্য ও মানুষের জবাবদিহি
(সূরা আল-ইনফিতারের আলোকে মানবজীবনের দায়িত্ব, আমল ও চিরস্থায়ী পরিণতি)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ এই পৃথিবীতে সীমিত সময়ের জন্য এসেছে। জন্মের মাধ্যমে তার দুনিয়াবি জীবনের সূচনা হয় এবং মৃত্যুর মাধ্যমে সেই জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু মৃত্যু মানুষের অস্তিত্বের শেষ নয়; বরং এটি অনন্ত আখিরাতের পথে যাত্রার সূচনা। দুনিয়ার জীবন হলো পরীক্ষা ও দায়িত্ব পালনের সময়, আর আখিরাত হলো সেই পরীক্ষার ফল লাভের স্থান। তাই একজন সচেতন মুমিনের কাছে জীবন কেবল ভোগ-বিলাস, সম্পদ অর্জন কিংবা পার্থিব সাফল্যের নাম নয়; বরং জীবন হলো আল্লাহর দেওয়া আমানত, যার প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন দিতে হবে।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইনফিতার মানুষের অন্তরকে নাড়া দেওয়ার মতো এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই সূরায় কিয়ামতের ভয়াবহ পরিবর্তনের কথা, মানুষের পুনরুত্থান, আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতাদের দায়িত্ব, সৎকর্মশীল ও পাপিষ্ঠ মানুষের পরিণতি এবং প্রতিদান দিবসে আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সূরাটি মানুষকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—যে মহান রব মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, সুন্দর আকৃতি দিয়েছেন এবং অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, তাঁর ব্যাপারে মানুষ কেন উদাসীন হবে?
এই সূরার শিক্ষা মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে আহ্বান করে—আমি কোথায় যাচ্ছি? কী নিয়ে যাচ্ছি? আমার আমলনামায় কী লেখা হচ্ছে?
কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী
ইসলামী আকিদার অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো কিয়ামতের প্রতি ঈমান। পৃথিবীর বর্তমান ব্যবস্থা চিরস্থায়ী নয়। একদিন আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে এই বিশ্বজগতের বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তন ঘটবে এবং মানুষ পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে সমবেত হবে।
সূরা আল-ইনফিতারের শুরুতেই কিয়ামতের কয়েকটি মহাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে—আকাশ বিদীর্ণ হবে, নক্ষত্রসমূহ ঝরে পড়বে, সমুদ্রসমূহ একাকার করা হবে এবং কবরসমূহ উন্মোচিত হবে। এসব বর্ণনা মানুষের মনে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করে যে, দুনিয়ার দৃশ্যমান স্থিতিশীলতা আসলে চিরস্থায়ী নয়।
আজ যে আকাশ আমাদের মাথার ওপর বিস্তৃত, যে নক্ষত্রমালা রাতের আকাশকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, যে সমুদ্র তার বিশালতা নিয়ে আমাদের বিস্মিত করে—একদিন এসবের বর্তমান অবস্থা থাকবে না। আল্লাহর নির্দেশে মহাবিশ্বের পরিচিত ব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে।
অতএব, যে পৃথিবী একদিন শেষ হয়ে যাবে, তাকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রকৃত গন্তব্য হলো আখিরাত।
কবর থেকে পুনরুত্থান
মানুষ মৃত্যুর পর মাটির নিচে চলে যায়। বাহ্যিকভাবে মনে হয় তার জীবন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো—মৃত্যুর পর পুনরুত্থান অবশ্যই ঘটবে। কিয়ামতের দিনে কবরসমূহ উন্মোচিত হবে এবং মানুষ তার রবের সামনে উপস্থিত হবে।
দুনিয়ায় মানুষ নিজের পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে গর্ব করতে পারে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব বাহ্যিক পরিচয় মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি হবে না। সেদিন মানুষের মূল্যায়ন হবে তার ঈমান, আমল এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে।
তাই কবরের কথা স্মরণ করা হতাশার বিষয় নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। যে ব্যক্তি মৃত্যুকে স্মরণ করে, সে নিজের কাজের ব্যাপারে বেশি সতর্ক হয়, মানুষের হক নষ্ট করতে ভয় পায় এবং অন্যায় থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করে।
মানুষের সামনে আসবে তার কর্মের হিসাব
সূরা আল-ইনফিতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মানুষ জানতে পারবে সে কী সামনে পাঠিয়েছে এবং কী পেছনে রেখে গেছে।
মানুষ পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করে। কিছু কাজ প্রকাশ্য, কিছু গোপন। কিছু কাজ মানুষ মনে রাখে, কিছু কাজ ভুলে যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কাজই অজ্ঞাত নয়।
মানুষের একটি কথা, একটি আচরণ, একটি দান, একটি অন্যায়, একটি ক্ষমা, একটি জুলুম—সবকিছুরই মূল্য রয়েছে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অনেক সময় ভাবি, “এত ছোট একটি কাজের কী-ই বা মূল্য?” কিন্তু আল্লাহর কাছে ছোট-বড় সব কাজই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে সূরা যিলযালের শেষ আয়াতগুলোতেও ক্ষুদ্রতম সৎ ও অসৎ কাজের হিসাবের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
অতএব, কোনো নেক কাজকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয় এবং কোনো গুনাহকেও ছোট মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়।
হে মানুষ! তোমাকে তোমার রব সম্পর্কে কীসে প্রতারিত করল?
সূরা আল-ইনফিতারের সবচেয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসামূলক বক্তব্যগুলোর একটি হলো—মানুষকে তার মহান রব সম্পর্কে প্রতারিত হওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন করা।
মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অসংখ্য। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ আকৃতি দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, পরিবার দিয়েছেন, জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন এবং পৃথিবীতে চলার সুযোগ দিয়েছেন।
মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য নিয়ামত ভোগ করেও অনেক সময় নিয়ামতদাতাকে ভুলে যায়। চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু স্রষ্টাকে স্মরণ করে না; কান দিয়ে শোনে, কিন্তু সত্যের আহ্বানে সাড়া দেয় না; বিবেক দিয়ে সত্য-মিথ্যা বুঝতে পারে, তবু প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।
এটাই মানুষের বড় দুর্বলতা।
আল্লাহর রহমত মানুষকে গুনাহের প্রতি উৎসাহিত করার কারণ নয়; বরং তাঁর রহমত মানুষকে তাওবা ও আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ। তাই আল্লাহর দয়া পেয়ে তাঁর অবাধ্য হওয়া মুমিনের চরিত্র নয়।
মানুষের সুন্দর সৃষ্টি ও স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা
মানুষ নিজের দেহের দিকে তাকালেই আল্লাহর অসীম কুদরত উপলব্ধি করতে পারে। চোখ, কান, জিহ্বা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, হাত-পা—প্রতিটি অঙ্গ মানুষের জন্য অমূল্য নিয়ামত।
মানুষের শরীরের গঠন কত সূক্ষ্ম, কত ভারসাম্যপূর্ণ! কিন্তু মানুষ এসব নিয়ে খুব কমই চিন্তা করে। বরং সামান্য কোনো বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ বা ক্ষমতা নিয়ে অহংকারে ডুবে যায়।
সূরা আল-ইনফিতার মানুষকে তার সৃষ্টির দিকে তাকাতে শেখায়। যে মহান সত্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া, তাঁর ইবাদত করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলাই মানুষের দায়িত্ব।
কৃতজ্ঞতার প্রকৃত অর্থ শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নয়; বরং নিয়ামতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।
চোখ পেয়েছি—হারাম থেকে চোখকে সংযত রাখব।
জিহ্বা পেয়েছি—মিথ্যা, গিবত ও অপবাদ থেকে তা রক্ষা করব।
সম্পদ পেয়েছি—হালাল পথে উপার্জন করব এবং প্রাপ্য হক আদায় করব।
জ্ঞান পেয়েছি—সত্য ও কল্যাণের কাজে তা ব্যবহার করব।
এভাবেই নিয়ামত কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করার ভয়াবহতা
মানুষের বড় একটি সমস্যা হলো—দুনিয়ার দৃশ্যমান বিষয়কে বাস্তব এবং আখিরাতের অদৃশ্য বিষয়কে দূরের মনে করা। অথচ মুমিনের ঈমানের অন্যতম ভিত্তি হলো অদৃশ্যের প্রতি ঈমান।
সূরা আল-ইনফিতার সতর্ক করে জানায় যে, মানুষ প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করে। এর অর্থ হলো—মানুষ যদি মনে করে যে তার কোনো চূড়ান্ত হিসাব নেই, তাহলে সে অন্যায় করতে সহজেই সাহসী হয়ে উঠতে পারে।
যদি কেউ বিশ্বাস করে যে অন্যায় করার পর কোনো জবাবদিহি নেই, তাহলে তার বিবেক দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু একজন মুমিন জানে—মানুষের আদালত থেকে কোনো অপরাধ লুকানো গেলেও আল্লাহর বিচার থেকে কিছুই গোপন করা সম্ভব নয়।
এই বিশ্বাসই মানুষকে আত্মসংযমী করে।
আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতাগণ
সূরা আল-ইনফিতারে মানুষের ওপর নিয়োজিত সম্মানিত লেখক ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে। তাঁরা মানুষের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত এবং তা লিপিবদ্ধ করেন।
এই বিশ্বাস একজন মুমিনের জীবনে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। মানুষ যখন একা থাকে, তখনও সে একা নয়। আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং তাঁর নিযুক্ত ফেরেশতারা মানুষের আমল লিপিবদ্ধ করেন।
তাই গোপনে গুনাহ করার আগে মুমিনের মনে সতর্কতা জাগে। আবার এমন কোনো নেক কাজও সে অবহেলা করে না, যা অন্য কেউ দেখছে না।
মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাই ইখলাসের দাবি।
সৎকর্মশীলদের পরিণতি
সূরা আল-ইনফিতার সুসংবাদও দিয়েছে। যারা ঈমান ও সৎকর্মের পথে থাকে, তাদের জন্য রয়েছে নিয়ামত ও কল্যাণ।
ইসলামে শুধু বাহ্যিক ভালো কাজই যথেষ্ট নয়; ঈমান ও সঠিক আকিদার ভিত্তির ওপর সৎ আমল প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। একজন মুমিন আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করে, তাঁর রাসুলদের সত্য বলে মানে, আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে এবং সেই ঈমান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে।
সৎকর্মের মধ্যে রয়েছে নামাজ প্রতিষ্ঠা, রোজা পালন, যাকাত আদায়, হজের সামর্থ্য থাকলে হজ করা, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, অসহায়কে সাহায্য করা, সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, ন্যায়বিচার করা এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করা।
সৎকর্মশীল ব্যক্তি শুধু মসজিদে ভালো থাকে না; সে পরিবারে ভালো, কর্মক্ষেত্রে ভালো, সমাজে ভালো এবং মানুষের অধিকারের ব্যাপারেও সচেতন থাকে।
পাপাচারীদের পরিণতি
এর বিপরীতে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা, পাপাচার ও অন্যায়ের পথে চলে এবং তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতি।
গুনাহ মানুষের অন্তরকে দুর্বল করে। প্রথমে একটি গুনাহ ছোট মনে হয়, পরে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। একসময় মানুষ গুনাহকে গুনাহই মনে করে না। এই অবস্থাই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তাই পাপ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে দ্রুত তাওবা করতে হবে। গুনাহের ওপর অটল থাকা নয়, বরং গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের পথ।
তাওবা মানে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়; বরং গুনাহ পরিত্যাগ করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় গুনাহে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করা। কারও হক নষ্ট হলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি।
তাওবার দরজা খোলা
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে ভুল করতে পারে। কিন্তু উত্তম হলো—ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসা।
আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন। তাই কোনো মানুষ যত গুনাহই করে থাকুক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। তবে রহমতের আশা কখনো গুনাহ করার অনুমতিপত্র নয়।
একজন বুদ্ধিমান মানুষ আজই নিজের হিসাব নেয়। সে ভাবে—
আমি কারও হক নষ্ট করেছি কি?
কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি?
নামাজে অবহেলা করেছি কি?
হারাম উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়েছি কি?
মিথ্যা, গিবত বা অপবাদে জড়িয়ে পড়েছি কি?
অহংকার বা হিংসা আমার অন্তরে জায়গা নিয়েছে কি?
এরপর সে তাওবা করে নিজেকে সংশোধন করে।
দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের প্রস্তুতি
দুনিয়ার জীবন প্রয়োজনীয়, কিন্তু চূড়ান্ত নয়। ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলে না; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখায়।
মানুষ ব্যবসা করবে, চাকরি করবে, শিক্ষা অর্জন করবে, পরিবার গড়বে, সম্পদ উপার্জন করবে—সবই বৈধ। কিন্তু এসব যেন আল্লাহর স্মরণ, ফরজ ইবাদত এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণ না হয়।
সম্পদ মানুষের হাতে থাকবে, কিন্তু হৃদয়ের মালিক যেন সম্পদ না হয়। ক্ষমতা মানুষের দায়িত্ব বাড়াবে, অহংকার নয়। জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করবে, আত্মম্ভরী নয়।
সফল মানুষ সে নয়, যার কাছে সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে; বরং প্রকৃত সফল সে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সম্পদ, জ্ঞান, সময় ও শক্তিকে সঠিক পথে ব্যবহার করে।
মানুষের অধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব
আখিরাতের জবাবদিহির বিশ্বাস মানুষের সামাজিক জীবনকেও সুন্দর করে। কারণ একজন মুমিন জানে—শুধু আল্লাহর ইবাদত করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; মানুষের হকও আদায় করতে হবে।
পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, সন্তানদের যথাযথ যত্ন, আত্মীয়ের হক, প্রতিবেশীর অধিকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দায়িত্ব, কর্মী ও মালিকের ন্যায়সংগত আচরণ—সবকিছুই মানুষের জবাবদিহির অংশ।
অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা, প্রতারণা করা, ওজনে কম দেওয়া, আমানতের খেয়ানত করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, অপবাদ দেওয়া কিংবা জুলুম করা—এসব থেকে একজন মুমিনকে দূরে থাকতে হবে।
কারণ মানুষকে ঠকানো গেলেও আল্লাহকে ঠকানো যায় না।
প্রতিদান দিবসে কারও ক্ষমতা থাকবে না
সূরা আল-ইনফিতারের শেষ আয়াত অত্যন্ত গভীর শিক্ষা বহন করে। সেদিন কেউ কারও জন্য কোনো ক্ষমতা রাখবে না এবং সমস্ত কর্তৃত্ব থাকবে আল্লাহর।
দুনিয়ায় মানুষ ক্ষমতা, অর্থ, পদমর্যাদা ও সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব পার্থিব নির্ভরতা ভেঙে যাবে।
সেদিন মানুষ বুঝবে—আসল মালিক কে, প্রকৃত ক্ষমতা কার, চূড়ান্ত বিচার কার।
এ শিক্ষা আমাদের বর্তমান জীবনেও বিনয়ী হতে শেখায়। পদ পেলে অহংকার নয়, দায়িত্বশীলতা; সম্পদ পেলে দম্ভ নয়, কৃতজ্ঞতা; জ্ঞান পেলে আত্মম্ভরিতা নয়, বিনয়—এটাই মুমিনের চরিত্র।
কিয়ামতের স্মরণ আমাদের কী শিক্ষা দেয়
সূরা আল-ইনফিতারের শিক্ষা থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গ্রহণ করতে পারি—
প্রথমত, কিয়ামত সত্য এবং অবশ্যম্ভাবী।
দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুত্থিত হবে।
তৃতীয়ত, প্রত্যেক মানুষের আমল সংরক্ষিত হচ্ছে।
চতুর্থত, সৎকর্মের জন্য পুরস্কার এবং পাপের জন্য শাস্তি রয়েছে।
পঞ্চমত, মানুষের সৃষ্টির কথা স্মরণ করে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
ষষ্ঠত, দুনিয়ার মোহে আখিরাতকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সপ্তমত, গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা উচিত।
অষ্টমত, মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে।
নবমত, আল্লাহর একত্ববাদ ও সঠিক আকিদার ওপর অটল থাকতে হবে।
দশমত, চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর।
আত্মশুদ্ধি ও আত্মজিজ্ঞাসা
প্রতিটি মানুষের উচিত প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া। অন্যের ভুল খুঁজে বের করার আগে নিজের ভুল দেখা প্রয়োজন।
দিন শেষে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—
আজ আমি কী ভালো কাজ করেছি?
কাকে উপকার করেছি?
কাউকে কষ্ট দিয়েছি কি?
আমার কোনো কথায় কারও হৃদয় ভেঙেছে কি?
আমি কি কোনো ফরজ ইবাদতে অবহেলা করেছি?
আমার উপার্জন কি হালাল?
আমার লেনদেনে কি স্বচ্ছতা আছে?
আমার পরিবার কি আমার আচরণে নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করে?
আমি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জীবন পরিচালনা করছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
উপসংহার
সূরা আল-ইনফিতার একটি গভীর আত্মশুদ্ধিমূলক বার্তা বহন করে। এর শুরুতে কিয়ামতের মহাদৃশ্য, মাঝখানে মানুষের সৃষ্টি, আমল সংরক্ষণকারী ফেরেশতা, সৎ ও পাপিষ্ঠ মানুষের পরিণতি এবং শেষে আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এভাবে পুরো সূরাটি মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে জাগিয়ে আখিরাতের বাস্তবতার দিকে ফিরিয়ে নেয়।
মানুষ যেন ভুলে না যায়—সে একদিন মৃত্যুবরণ করবে; কবর থেকে পুনরুত্থিত হবে; আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে; তার আমল প্রকাশিত হবে এবং তাকে তার কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে।
তাই আমাদের জীবন হওয়া উচিত ঈমান, তাওহিদ, তাকওয়া, ইখলাস, সৎকর্ম, ন্যায়, মানবিকতা ও তাওবার জীবন। দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু আখিরাতকে বিসর্জন দিয়ে নয়। সম্পদ অর্জন করতে হবে, কিন্তু হারাম পথে নয়। জ্ঞান অর্জন করতে হবে, কিন্তু অহংকারের জন্য নয়। ক্ষমতা পেলে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে, জুলুমে নয়।
আজ আমাদের হাতে সময় আছে; আগামীকাল থাকবে কি না, আমরা জানি না। আজ আমরা তাওবা করতে পারি; মৃত্যুর পর তাওবার সুযোগ থাকবে না। আজ আমরা মানুষের হক ফিরিয়ে দিতে পারি; কিয়ামতের দিন তা সহজ হবে না। আজ আমরা নামাজ কায়েম করতে পারি; একদিন আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যাবে।
অতএব, আসুন আমরা নিজেদের জীবনকে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে সাজাই। তাওহিদকে দৃঢ় করি, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করি, হারাম ও অন্যায় বর্জন করি, মানুষের অধিকার রক্ষা করি, গুনাহ থেকে তাওবা করি এবং প্রতিটি কাজের আগে মনে রাখি—আমার রব আমাকে দেখছেন এবং একদিন আমাকে তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে।
কিয়ামতের সেই মহাদিনে যেন আমাদের আমলনামা নেক আমলে সমৃদ্ধ হয়, ঈমান অটুট থাকে এবং আল্লাহর রহমত আমাদের সঙ্গী হয়—এটাই হোক আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, তাওহিদের ওপর অটল রাখুন, গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক দিন, তাওবা কবুল করুন, মানুষের হক আদায়ের শক্তি দিন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে আপনার রহমত ও ক্ষমতা লাভের তাওফিক দান করুন।
আমিন।
১৪
২৪ মন্তব্য