Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

ব্যাপন ও নিঃসরণের খোশগল্প
রসায়নের বাজারে গ্যাসীয় বাবুরা এক-একজন বড়দরের যাযাবর। এক জায়গায় থিতু হয়ে বসা তাঁদের কোষ্ঠীতে লেখেনি। পাত্রের ছিপিটি একটু আলগা করতে দেরি, কিন্তু তাঁদের দেশভ্রমণে বেরুতে এক পলকও সময় লাগে না। এই গ্যাসীয় বাবুদের ঘুরে বেড়ানোর আবার দুখানা কায়দা আছে—একটি হলো রাজার হালে ছড়িয়ে পড়া, যার নাম ‘ব্যাপন’; আর অন্যটি হলো চোরের মতো লুকিয়ে পালানো, যার পোশাকি নাম ‘নিঃসরণ’।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ব্যাপন হলো একদম শৌখিন আমীরি চাল। কোনো চাপাচাপির বালাই নেই, উচ্চ ঘনত্বের এলাকা থেকে বাবুরা আপন খেয়ালে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে চারপাশের কম ঘনত্বের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েন। এ যেন লখনৌয়ের নবাবের সুগন্ধি রুমালের আতরের গন্ধ! নবাব সাহেব বৈঠকখানায় পা দেওয়া মাত্রই সেই আতরের খুশবু যেমন কোনো হুকুম ছাড়াই সারা ঘরে গিজগিজ করতে থাকে, ব্যাপন চিজটিও ঠিক তাই।
আর এই ব্যাপন বাবুর ঠিক উল্টো পিঠের ইয়ার হলেন নিঃসরণ। ইনি বড়ই লাজুক, আবার একই সাথে বড়ই খ্যাপাটে! একে যদি কোনো পাত্রের ভেতর কড়া পাহারায় উচ্চ চাপে আটকে রাখা যায়, তবে সে ছটফট করতে থাকে। এবার পাত্রের গায়ে যদি কোনোক্রমে একটা সুচ ফোটানোর মতো সরু ছিদ্র (Pinhole) পাওয়া যায়, তবে ব্যস! সেই উচ্চ চাপের চোটে গ্যাস বাবু একদম সোঁ সোঁ করে, কুচকাওয়াজের সৈন্যের মতো এক লাইনে তীব্র বেগে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ যেন আমাদের কলকাতার ফুটবল ম্যাচের টিকিট কাউন্টারের ভিড়—পেছন থেকে হাজারটা লোক চাপ দিচ্ছে, আর সামনের সরু ফটকটা খুলতেই মানুষ যেমন ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসে! সাইকেলের চাকা কিংবা গাড়ির টায়ার যখন হঠাৎ করে পাংচার হয়, তখন যে ‘ফিসফিস’ শব্দে হাওয়া বেরোয়, ওটাই হলো খাঁটি নিঃসরণ।
তবে রসায়নের বাজারে এই দুই ভাইয়ের গতি মাপতে গিয়ে স্কটল্যান্ডের এক হাকিম—টমাস গ্রাহাম (Thomas Graham) সাহেব—একখানা খতরনাক আইন পাস করে বসলেন। তাঁর আইন বলে, ব্যাপন বা নিঃসরণের হার নাকি গ্যাসের আণবিক ভরের বর্গমূলের ব্যস্তানুপাতিক!
সোজা বাংলায় বলতে গেলে—বাবু যত হালকা হবেন, তাঁর দৌড়ানোর গতি তত বেশি। আর যিনি যত ভারী ও মোটাসোটা, তাঁর নড়াচড়ার গতি ততটাই মন্থর। হাইড্রোজেন বাবু এক্কেবারে চুনোপুঁটি, আণবিক ভর মাত্র দুই; তাই ছিদ্র পেলেই সে কান্দাহারের ঘোড়ার মতো দে ছুট! আর ওদিকে কার্বন ডাই-অক্সাইড কিংবা সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো ভারী মায়েরা ভুড়ি দুলিয়ে এমন কচ্ছপ গতিতে চলেন যে তাঁদের ব্যাপন শেষ হতে হতে বুড়িগঙ্গার জলও শুকিয়ে যাবে।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই গ্রাহামের সূত্রের অংক মেলাতে দেয়—কোন গ্যাসটি আগে বেরুবে, কার ব্যাপন সময় কত কম লাগবে—তখন মগজের ঘিলু ওই গ্যাসের মতোই উবে যায়। ঐকিক নিয়মের বর্গমূল করতে করতে আমাদের পরীক্ষার সময়টাই সবার আগে নিঃসরিত হয়ে যায়!

গহে গ্রাহাম সাহেব, গ্যাসের এই ওড়াউড়ি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যদি আপনি শান্তিতে ভিয়েনিজ কফি হাউজে বসে চুরুট ফুঁকতেন, তবে পরীক্ষার হলে আমাদের জীবনের এই নম্বরের খতিয়ান অন্তত এভাবে বাতাসে ভেসে উধাও হয়ে যেত না!
মন্তব্য করুন

ব্লগ