দুনিয়ার বাজারে সাধারণ মানুষ আর ফিজিক্সের পণ্ডিতদের ভাষার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা এই কাজ, ক্ষমতা ও শক্তি চ্যাপ্টারে না ঢুকলে মালুম পাওয়া যায় না। আমরা বলি, খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে সারাদিন কাবুলের আঙুরের ব্যবসা কিংবা কান্দাহারের পেস্তার হিসাব কষাও মস্ত বড় কাজ। কিন্তু ফিজিক্সের জল্লাদ শিক্ষকেরা এসে বলবেন, ‘উঁহু বাবু! তুমি একচুলও নড়োনি, অতএব তোমার কাজের খতিয়ান একদম লবডঙ্কা, অর্থাৎ শূন্য!’
ফিজিক্সের বাজারে কাজ (Work) হতে গেলে নাকি দুখানা শর্ত মানতেই হবে—প্রথমত, বস্তুর ওপর বল (Force) প্রয়োগ করতে হবে; আর দ্বিতীয়ত, বলের দিকে বস্তুর একটুখানি সরণ (Displacement) বা সড়া চাই। সোজা বাংলায়, আপনি যদি মহা উৎসাহে ডালহৌসি স্কয়ারের রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধাক্কা মারেন, তবে ঘামে নেয়ে একাকার হলেও ফিজিক্সের খাতায় আপনার কাজ (W = Fscos (theta) এর মান হবে এক্কেবারে জিরো! কারণ, দেওয়ালটি একচুলও নড়েনি। আর যদি বলের বিপরীত দিকে সরণ ঘটে, তবে সে তো আরও খতরনাক চিজ—‘বলের বিরুদ্ধে কাজ’, যা দেখতে হুবহু মাইনাস চিহ্নের মতো খাতার পাতায় এসে আমাদের নম্বর কেটে নেয়।
এর ঠিক পরেই আসেন শক্তির দেওয়ান—শক্তি (Energy)। সহজ কথায়, কাজ করার সামর্থ্যই হলো শক্তি। এই শক্তি আবার দুই কিসিমের রূপ ধরে আমাদের মগজ ধোলাই করতে আসে। একটি হলো গতিশক্তি (Kinetic Energy), যা কোনো বস্তুর দৌড়াদৌড়ির ওপর নির্ভর করে। কান্দাহারের খ্যাপাটে পাঠান যখন তরবারি উঁচিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসে, তখন তার ভেতর যে শক্তি গিজগিজ করে, ওটাই হলো গতিশক্তি। আর অন্যটি হলো বড়ই অলস ও ধূর্ত—তার নাম বিভবশক্তি (Potential Energy)। কোনো বস্তুকে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে টেনেহিঁচড়ে অন্য কোথাও ধরে রাখলে তার ভেতর এই শক্তি লুকিয়ে বসে থাকে। এ যেন ঘরের সেই রাগী গিন্নি—বাইরে একদম শান্ত, কিন্তু ভেতরে রাগ চেপে বসে আছেন, সুযোগ পেলেই একদম গতিশক্তিতে রূপান্তর হয়ে থালা-বাসন ছুড়ে মারবেন!
আর এই ত্রয়ীর শেষ ইয়ার হলেন ক্ষমতা (Power)। ইনি হলেন সময়ের জহুরি। আপনি কতখানি শক্তি খরচ করলেন, ফিজিক্সের কাছে তার কোনো খাতির নেই; খাতির হলো কত কম সময়ে করতে পারলেন! অর্থাৎ, কাজকে সময় দিয়ে ভাগ করলেই ক্ষমতা বাবু প্রকাশ পান। এর একক আবার ভারী খাসা—ওয়াট (Watt) কিংবা হর্সপাওয়ার (Horsepower)! ভাবুন একবার, মানুষের ক্ষমতা মাপতে গিয়ে শেষে কিনা বনের ঘোড়াকে ল্যাবরেটরিতে ধরে আনা হলো! এক হর্সপাওয়ার নাকি ৭৪৬ ওয়াটের সমান! এই ঘোড়ার দৌড় মেলাতে গিয়ে পরীক্ষার হলে আমাদের নিজেদের ক্ষমতার বাতিই এক্কেবারে গুল হয়ে যায়।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই তিন ইয়ারের মণ্ডগোল মেলাতে যাই—কাজের উপপাদ্য ডানে যায় না শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি বাঁয়ে ঘোরে—তখন মগজের ঘিলু একদম কলকাতার ট্রাম গাড়ির চাকার নিচে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। মহাবিশ্বের মোট শক্তি নাকি ধ্রুবক, তা বাপু, মহাবিশ্বের শক্তি ধ্রুবক থাকুক আর নাই থাকুক, পরীক্ষার খাতায় আমাদের মার্কসের শক্তি যে ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে শূন্যের কোঠায় নামছে, সেই খবর নিউটন সাহেব রেখেছিলেন কি?
হে ফিজিক্সের কারিগরগণ, তোমরা তো কাজ আর ক্ষমতার হিসাব কষে বৈকুণ্ঠে গিয়ে অমৃত সুধা খাচ্ছ, আর আমরা এখানে পরীক্ষার হলে শক্তির অপচয় ঘটিয়ে ডালহৌসি স্কয়ারের কেরানির মতো চোখের জল ফেলছি! এই চ্যাপ্টারের গোলকধাঁধা থেকে পাস মার্কের ইজ্জতটুকু রক্ষা পেলে, আমি সোজা পুণ্ড্রবর্ধনের মাটিতে গিয়ে আখের গুড় দিয়ে ক্ষীর চড়াব আর ফিজিক্সের বইখানা বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন দেব!
১
২ মন্তব্য