Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

মোলারিটির পেয়ালা.......

রসায়নের বাজারে দ্রবণ জিনিসটি বড়ই অদ্ভুত। ল্যাবরেটরিতে গিয়ে যখন চিনি-পানির শরবত কিংবা কড়া অ্যাসিডের মিক্সচার বানানো হয়, তখন সাধারণ মানুষ জিজ্ঞেস করে—‘বাবু, শরবতটা মিষ্টি হলো কেমন?’ কিন্তু রসায়নের খ্যাপাটে পণ্ডিতেরা রে রে করে তেড়ে আসবেন। তাঁরা মিষ্টি বা তিতকুটে বোঝেন না, তাঁরা বোঝেন ঘনমাত্রা! আর এই ঘনমাত্রা মাপার সবচেয়ে বনেদি ও কেতাবি তরিকা হলো এই ‘মোলারিটি’।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মোলারিটি হলো এক লিটার দ্রবণের ভেতর লুকিয়ে থাকা মোল বাবুদের সংখ্যার খতিয়ান। পণ্ডিতেরা ফতোয়া দিলেন—নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় প্রতি এক লিটার দ্রবণে যত মোল দ্রাব দ্রবীভূত থাকবে, সেটাই তার মোলারিটি। এ যেন লখনৌয়ের নবাবের সেই খাস বাবুর্চিখানার মতো হিসাব! এক ডেগ বিরিয়ানিতে কয়টা আলুবোখারা পড়বে, তার পরিমাপ যেমন বাবুর্চির নখদর্পণে থাকে; মোলারিটির ওস্তাদরাও তেমনি এক লিটার পানিতে কয় মোল সোডিয়াম ক্লোরাইড বা সালফিউরিক অ্যাসিড সাঁতার কাটছে, তা তুড়ি মেরে বলে দিতে পারেন।
দ্রবণ যদি এক লিটার হয় আর তাতে ঠিক এক মোল চিজ গুলিয়ে দেওয়া যায়, তবে তাকে বলা হয় ‘মোলার দ্রবণ’ (1 M)। রসায়নের বাজারে এর ইজ্জত আবার রাজকীয়! আর যদি মোল বাবু অর্ধেক হয়ে যান, তবে তার নাম হয় ‘সেমি-মোলার’ (0.5 M)। আর যদি দশ ভাগের এক ভাগ হন, তবে তো আরও করুণ দশা—‘ডেসিমোলার’ (0.1 M)। একে তো পরিমাণে কম, তার ওপর পোশাকি নামখানা শুনলে মনে হয় যেন কাবুলের কোনো দেউলিয়া ফরিয়াতির করুণ আরজি!
আসল প্যাঁচটা লাগে যখন এই মোলারিটির ওপর তাপমাত্রা (Temperature) এসে হানা দেয়। মোলারিটি বাবু তাপমাত্রার সামান্য ওঠা-নামাতেই একদম জেলিফিশের মতো গলে যান। কারণ কী? তাপমাত্রা বাড়লে দ্রবণের আয়তন বেড়ে যায়, আর আয়তন বাড়লেই মোলারিটির মান সোজা নিচের দিকে দৌড় মারে! এ যেন সেই কলকাতার ট্রাম গাড়ির ভাড়া—যাত্রী বাড়লে যেমন বসার জায়গা কমে, তাপমাত্রা বাড়লে মোলারিটিও তেমনি সংকুচিত হয়। সেই কারণেই বিজ্ঞানী মহলে মোলারিটির চেয়ে ‘মোলালিটি’ (Molarity vs Molality) নিয়ে মাতামাতি বেশি, কারণ সেখানে ওজনের কারবার, তাপমাত্রার কোনো জারিজুরি খাটে না।
পরীক্ষার হলে বসে যখন স্যাররা S=1000w/MV সমীকরণ দিয়ে মোলারিটির অংক কষতে দেন—শতকরা হার থেকে মোলারিটি বের করো, কিংবা পিপিএম (ppm) এ নিয়ে যাও—তখন মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ঐকিক নিয়মের মিলি লিটারকে লিটারে রূপান্তর করতে করতে আমাদের পরীক্ষার সময়টাই সবার আগে ফুরিয়ে যায়!

হে মোলারিটির কারিগরগণ, দ্রবণের ভেতর কত মোল জিনিস সাঁতার কাটছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যদি তোমরা শান্তিতে পেন্সিলভানিয়ার কফি হাউজে বসে চুরুট ফুঁকতে, তবে পরীক্ষার হলে আমাদের জীবনের এই নম্বরের ঘনমাত্রা অন্তত এভাবে পাতলা হয়ে দেউলিয়া হয়ে যেত না!
মন্তব্য করুন

ব্লগ