Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৫০ পূর্বাহ্ণ

জিপিএ ৫-এর মহাকাব্যিক গোলকধাঁধা

বাঙালির জীবনে মোক্ষলাভের চেয়েও বড় একখানা প্রাপ্তি আছে, তার পোশাকি নাম ‘জিপিএ ৫’ বা ‘এ প্লাস’। আগেকার দিনে ম্যাট্রিক আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় লোকে ফার্স্ট ডিভিশন পেত, কেউ বা স্টার মার্কস পেয়ে পাড়ায় রসগোল্লা বিলাত। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন এক হাকিম সাহেব কোন শুভক্ষণে গ্রেডিং পদ্ধতির এই আজব ভেলকি দুনিয়ায় আমদানি করলেন, তার পর থেকে বাঙালির ঘরকন্নার পরম শান্তি একদম কর্পূরের মতো উবে গেল!
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই জিপিএ ৫ হলো শিক্ষার বাজারের এক সোনার হরিণ। বাংলা, ইংরেজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি—সব কটা বিষয়ের খাঁচায় আশি নম্বরের বেশি দানা না ফেললে এই হরিণ কিছুতেই ধরা দেয় না। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সকালে যখন চারদিকে এই জিপিএ ৫-এর সুনামি আসে, তখন আমাদের মায়েরা কান্দাহারের খ্যাপাটে পাঠানের মতো ল্যাপটপ আর মোবাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। রোল নম্বরটা চাপতেই স্ক্রিনে যখন ‘৫.০০’ ভেসে ওঠে, তখন মনে হয় যেন খোদ আলাদিনের চেরাগ হাতে চলে এসেছে! পাড়ার ময়রা দোকান থেকে তখন মণকে মণ মিষ্টি এসে হাজির হয়, যেন লখনৌয়ের নবাবের দরবারে রাজপুত্রের জন্ম হয়েছে।
কিন্তু এই হরিণ শিকারের ট্র্যাজেডিখানা বড়ই খতরনাক! যদি কোনো অভাগা ছাত্র সব বিষয়ে আশি পেয়েও কোনো এক খামখেয়ালি বিষয়ের চক্করে পড়ে ৭৯ পেয়ে বসে, তবেই তার কপাল পুড়ল! তার জিপিএ এক ধাক্কায় ৪.৯৪ হয়ে সোজা মাটির ধুলোয় আছাড় খায়। অমনি পাড়ার সেই আমীরি আমেজ এক নিমেষে মীরজাফরের দরবারের মতো অন্ধকার হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন নামক একদল কোতোয়ালি পুলিশ তখন লঙ্গরখানা খুলে বসে—‘আহা, ছেলেটার মোটে একটুখানির জন্য হলো না!’ যেন জিপিএ ৫ না পেয়ে ছেলেটি মস্ত বড় এক ডাকাতি করে জেলে ঢুকেছে!
সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো, এই জিপিএ ৫ নামক সোনার হরিণটি শিকার করার পরও ছাত্রদের মুক্তি মেলে না। এর পর আসে বিশ্ববিদ্যালয় নামক আরেক খতরনাক চিড়িয়াখানা। সেখানে যখন ভর্তি পরীক্ষার লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়, তখন দেখা যায়—হাজার হাজার জিপিএ ৫ পাওয়া চান্দমারি শিকারী একখানা সিটের জন্য বুড়িগঙ্গার তীরের ভিড়ের মতো একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তখন সেই ৫.০০ মানটি ওই রসায়নের লিমিটিং বিক্রিয়কের মতোই মাঝপথে ফুরিয়ে ফৌত হয়ে যায়!
হে জিপিএ ৫-এর কারিগরগণ, তোমরা তো খাতার পাতায় জিরো আর ফাইভের ভেলকি সাজিয়ে দিয়ে বৈকুণ্ঠে গিয়ে অমৃত সুধা খাচ্ছ, আর আমরা এখানে ছাত্রকুল ডালহৌসি স্কয়ারের কেরানির মতো পরীক্ষার খাতায় আশি নম্বর মেলানোর জন্য চোখের জল ফেলছি! এই পরীক্ষায় পাস মার্কের সাথে যদি একটু ভাগ্যের শিকেটা ছেঁড়ে। 
মন্তব্য করুন