সিনিয়র শিক্ষক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:২৯ অপরাহ্ণ
সুখের শিল্পকলা ও ইসলামি দর্শন
এরিস্টটলের মতে, সুখী সে, যে ইউডাইমোনিয়া অর্জন করেছে। অর্থাৎ যে তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে সৎ ও গুণী জীবনযাপন করে।
স্টোইকদের মতে সুখী সে, যে বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর না করে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বৌদ্ধ দর্শনে সুখী সে, যে তৃষ্ণা ও আসক্তি থেকে মুক্ত।
এরিস্টটল সুখের সমালোচনা করে বলেছিলেন, শুধু আনন্দ খোঁজা পশুর স্বভাব, মানুষের সুখ আরও গভীর, সেটি হলো অর্থপূর্ণ জীবনযাপন।
ইসলামে সুখকে বলা হয় সাআদাহ তবে এটি শুধু পার্থিব আনন্দ নয় এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের কল্যাণ।
‘যে সৎকাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী, এবং সে মুমিন হয়, তাকে আমি অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব।’
সূরা আন-নাহল, আয়াত ৯৭। আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ সূরা আর-রাদ, আয়াত ২৮এটি ইসলামের সুখ দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। এবং যে মানুষ আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ, সে সুখী। অভিযোগ নয়, কৃতজ্ঞতাই সুখের পথ।
একবিংশ শতাব্দীর মানুষ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল যোগাযোগ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং ভোগের অসীম সুযোগ মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে। তবুও বৈশ্বিক গবেষণায় উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকিত্ব, পারিবারিক বিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। বস্তুগত উন্নতি হয়েছে; কিন্তু মানসিক শান্তি সমান তালে বাড়েনি। কারণ মানুষ সুখকে বস্তুতে খুঁজেছে, অথচ সুখের উৎস মানুষের অন্তরে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘হেডোনিক ট্রেডমিল’ এই তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ নতুন সম্পদ, পদ, প্রযুক্তি বা ভোগ্যবস্তু পেলে সাময়িক আনন্দ অনুভব করে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং সে আরও নতুন কিছু চায়। ফলে সুখের পেছনে এক অন্তহীন দৌড় শুরু হয়, যার শেষ নেই। ইসলাম বহু আগেই এই মানবিক দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের যদি স্বর্ণে ভরা একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে দ্বিতীয়টির আকাঙ্ক্ষা করবে।’ (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণহীন লোভ কখনো সুখ দেয় না; বরং অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
ইসলাম মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শেখায় না; বরং দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখায়। কুরআন ঘোষণা করে, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অন্বেষণ করো এবং দুনিয়াতে তোমার অংশও ভুলে যেও না।’ (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭)। এই আয়াত ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের অনন্য উদাহরণ। ইসলাম ভোগকে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু ভোগের দাসত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্পদ থাকবে মানুষের হাতে, হৃদয়ে নয়- এটাই ইসলামের শিক্ষা।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে অনেক মানুষ নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন। অন্যের সাফল্য, বাড়ি, গাড়ি, ভ্রমণ বা বিলাসিতা দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা বেড়েছে। অথচ মানুষ জানে না, ছবির হাসি সবসময় হৃদয়ের হাসি নয়। ইসলাম তাই তুলনার পরিবর্তে কানাআত অর্থাৎ আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। এই সন্তুষ্টিই মানুষকে হিংসা, হতাশা ও অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেয়।
প্রকৃত সুখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ক্ষমাশীলতা। যে ব্যক্তি প্রতিশোধের আগুন বুকে লালন করে, সে কখনো শান্তিতে থাকতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)। ক্ষমা কেবল অন্যকে মুক্তি দেয় না; ক্ষমাশীল মানুষ নিজেও মানসিক ভারমুক্ত হয়।
ইসলাম সুখকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি হিসেবে দেখে না; এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। ক্ষুধার্ত প্রতিবেশী রেখে নিজে তৃপ্ত থাকা, আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, এতিমের অধিকার নষ্ট করা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলা এসবের মধ্যে কখনো প্রকৃত সুখ থাকতে পারে না। তাই ইসলামে জাকাত, সদকা, ওয়াক্ফ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে সমাজে ন্যায়বিচার, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সমাজেই প্রকৃত সুখের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪ অত্যন্ত সুন্দরভাবে আল্লাহ বলেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।’
আজ আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সুখের অন্যতম বড় বাধা হলো সীমাহীন ভোগবাদ, দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতা। শিক্ষা বাড়ছে, কিন্তু চরিত্র গঠনের শিক্ষা কমছে। আয় বাড়ছে, কিন্তু সন্তুষ্টি কমছে। ঘর বড় হচ্ছে, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ের দূরত্বও বাড়ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইসলাম যে পথ দেখায়, তা হলো ইমানকে শক্তিশালী করা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করা, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা, হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলা, পরিবারে ভালোবাসা ও সংলাপ বৃদ্ধি করা এবং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করেছেন, তারা দুঃসময়েও ভেঙে পড়েননি। নবী-রাসূলদের জীবন, সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ, ইসলামী মনীষীদের ধৈর্য এবং সাধারণ মুমিনদের ঈমান আমাদের শেখায়—সুখ কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি সঠিক বিশ্বাস, সৎকর্ম, আত্মসংযম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ধারাবাহিক সাধনার ফল।
সবশেষে বলা যায়, সুখ কোনো পণ্য নয়, যা বাজার থেকে কেনা যায়; কোনো পদ নয়, যা ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা যায়; কিংবা কোনো প্রযুক্তি নয়, যা যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করা যায়। সুখ একটি শিল্প, আর সেই শিল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ইসলাম। যে মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে, মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকে, কৃতজ্ঞতাকে জীবনের অলংকার বানায় এবং প্রতিটি অবস্থায় রবের ওপর ভরসা রাখে, তার হৃদয়ে এমন এক প্রশান্তি জন্ম নেয়, যা পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন,
‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা আর-রা'দ, ১৩:২৮)
আজ যখন মানবসভ্যতা সুখের নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে, তখন কুরআনের আহ্বান আবারও আমাদের সামনে প্রতিধ্বনিত হয় প্রকৃত সফলতা বস্তুগত প্রাচুর্যে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। তাই আসুন, আমরা সুখের পেছনে নয়, সুখের স্রষ্টার দিকে ফিরে যাই। কারণ মানুষ যখন তার রবকে খুঁজে পায়, তখন সে নিজের হৃদয়কেও খুঁজে পায়; আর যে হৃদয় আল্লাহর নূরে আলোকিত হয়, সেই হৃদয়ই পৃথিবীতে প্রকৃত সুখের স্বাদ আস্বাদন করে এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী শান্তির অধিকারী হয়। পরিশেষে, মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি,
‘হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরকে হিদায়াত দেওয়ার পর তা বক্র করে দিও না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমিই সর্বাধিক দানশীল।’(সূরা আলে ইমরান, ৩:৮)
লেখক: মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার,
সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ।
Collect by: Md Habibullah
১৪
২৪ মন্তব্য