সিনিয়র শিক্ষক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৬ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
শিক্ষা মন্ত্রণালয়
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ক্ষমতা ও দায়িত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন প্রবিধানমালা কার্যকর হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা আর ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকবে না। তবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক সুপারিশকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বহাল রাখা হচ্ছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাপক্ষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের পর প্রস্তাবিত প্রবিধানমালাটি চূড়ান্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির নিয়োগসংক্রান্ত ক্ষমতার বিষয়টি নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি বিধি অনুযায়ী এবং সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত বা প্রত্যয়নকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকবে।
অর্থাৎ, আগের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সহকারী প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ ম্যানেজিং কমিটির হাতে রাখা হচ্ছে না। এর পরিবর্তে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর সুপারিশ বা প্রত্যয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রবিধানমালায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান, সহকারী প্রধান ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ছিল। নতুন প্রস্তাবনায় সেই ক্ষমতার পরিধিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আবারও সভাপতি হতে পারবেন রাজনৈতিক দলের নেতারা
এদিকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিকে সভাপতি হওয়ার জন্য বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও আবার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুযোগ রাখার যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সংশোধিত প্রবিধানমালার মাধ্যমে তা বাতিল করেছিল। নতুন প্রস্তাবনায় সেই পুরোনো ব্যবস্থারই একটি অংশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
নতুন প্রস্তাবনায় সভাপতি মনোনয়নের বিষয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি কিংবা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত শিক্ষা বোর্ডের কাছে পাঠাতে হবে।
অর্থাৎ, সভাপতি মনোনয়নের জন্য প্রস্তাবিত তালিকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষা বোর্ড ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সভাপতি মনোনয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিধিমালায় বাদ পড়েছিলেন জনপ্রতিনিধিরা
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালায় রাজনৈতিক নেতাদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। ওই সময় সভাপতি মনোনয়নের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারিত শ্রেণির ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম ও জীবনবৃত্তান্ত শিক্ষা বোর্ডের কাছে পাঠানোর বিধান করা হয়েছিল।
সেখানে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯ম গ্রেডের নিচে নন—এমন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিচে নন—এমন আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাকে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া এমবিবিএস, প্রকৌশল, কৃষিসহ যেকোনো কারিগরি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ৯ম গ্রেডের নিচে নন এমন কর্মকর্তা অথবা ৫ম গ্রেডের নিচে নন এমন আগ্রহী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও তালিকায় রাখার সুযোগ ছিল।
নতুন প্রস্তাবনায় এসব শ্রেণির ব্যক্তিদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি পদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবারও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করা।
তিনি বলেন, সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে অন্য শ্রেণির ব্যক্তিদেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু তালিকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম যুক্ত হলে বাস্তবে অন্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রভাব ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে থাকতে পারেন। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামোয় রাজনৈতিক প্রভাব পুনরায় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পর এর চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করা হবে। ফলে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা, সভাপতি মনোনয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিধানগুলো চূড়ান্ত প্রবিধানমালায় অপরিবর্তিত থাকবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
৭
৭ মন্তব্য