সহকারী শিক্ষক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৩৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
কবি ও শিক্ষক
গঙ্গার তীরে নামে আঁধার কালো,
যমুনার বুকে নেভে দিনের আলো;
যে মাটিতে মিশেছিল সাধকের গান,
সে মাটিতেই জাগে বিভেদের অবসানহীন টান।
আঠারোশো তিরানব্বই—ধূসর এক ক্ষণ,
বিষাক্ত বিভাজনে ভারী মানুষের মন।
ধর্মের পরিচয় যখন হয়ে ওঠে দেয়াল,
প্রতিবেশীর হৃদয়ে জাগে অচেনা জঞ্জাল।
গো-রক্ষার নামে উত্তপ্ত জনপদ,
সন্দেহের আগুনে পুড়ে মানবিক হৃদয়।
বোম্বাই থেকে আজমগড়—অশান্তির ঢেউ,
একই মাটির মানুষ কেন পর হয়ে যায় কেউ?
কার্জনের কলমে বঙ্গভূমির বুকে
বিভেদের রেখা নামে স্বার্থেরই সুখে।
উনিশশো পাঁচে আসে বঙ্গভঙ্গের কাল,
বাংলার আঙিনায় ওঠে বিভেদের জাল।
এক পক্ষের মুখে উল্লাসের গান,
অন্য পক্ষ বয়ে চলে অপমানের ক্ষতচিহ্ন।
সোনার বাংলা কাঁদে—দুই ভাগে যায় দেশ,
সম্প্রীতির আকাশে জমে বিষণ্ন রেশ।
যে মাটি ছিল সবার, সবারই ঠিকানা,
সেই মাটিতে কেন উঠল বিভেদের সীমানা?
একটি বীজ রোপিত হলে ঘৃণার উর্বর ক্ষেতে,
প্রজন্ম পেরিয়ে তার ছায়া নামে মানুষের চিতে।
ঢাকায় জমে সভা উনিশশো ছয়ে,
নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় সংশয় বয়ে।
মুসলিম লীগের জন্মে ওঠে স্বতন্ত্র স্বর,
অধিকারের প্রশ্নে কেউ আপন, কেউ পর।
অধিকার চাওয়া ছিল মানুষেরই দাবি,
কিন্তু রাজনীতির খেলায় বাড়ল ব্যবধান ভারী।
মর্লে-মিন্টোর সংস্কারে এল নতুন কাল,
পৃথক নির্বাচনের পথে বাড়ল বিভেদের জাল।
ভোটের খাতায় যখন পরিচয় হলো দেয়াল,
রাজনীতির মাটিতে গভীর হলো খেয়াল।
“তুমি হিন্দু, আমি মুসলমান”—শব্দের আড়ালে
ঔপনিবেশিক স্বার্থ হাসে গোপন জালে।
শুদ্ধি আন্দোলন, তাবলিগ-তানজিমের ধারা,
নিজ নিজ পরিচয়ে জাগে প্রতিরোধের সাড়া।
অধিকার ও আত্মপরিচয়ের ছিল নিজস্ব ভাষা,
কিন্তু উগ্রতার ছায়ায় হারায় সহমর্মিতা-আশা।
মালাবারের অশান্তি, খিলাফতের ঢেউ,
রাজনীতির উত্তাপে বদলে যায় বহু স্রোত বয়ে।
মোফলাদের বিদ্রোহে জাগে অস্থির সময়,
মুক্তির আকাঙ্ক্ষার পাশে সহিংসতার ক্ষয়।
শ্রদ্ধানন্দের রক্তে রঞ্জিত হয় পথ,
ছাব্বিশের ভারত দেখে বিভেদের ক্ষত।
ঢাকা আর কলকাতায় অশান্তির কাল,
মানুষের পরিচয়ের ওপর ওঠে হিংসার জাল।
তবু ইতিহাস প্রশ্ন করে—কার লাভ, কার ক্ষয়?
বিভেদের আগুনে কখনো মানুষের জয় হয়?
সাইত্রিশে আসে নির্বাচন-পর্ব,
আস্থার ভিতরে জাগে সংশয়ের গর্ভ।
কংগ্রেস পায় ক্ষমতা, লীগে বাড়ে ক্ষোভ,
রাজনীতির আকাশে জমে অভিমানের মেঘ।
অহং আর অবিশ্বাসে বাড়ে ব্যবধান,
হারিয়ে যেতে থাকে যৌথ সম্মান।
কে কাকে বুঝবে, কে বাড়াবে হাত—
রাজনীতির দাবায় দীর্ঘ হয় রাত।
জিন্নাহর কণ্ঠে ওঠে দ্বিজাতির ধ্বনি,
লাহোরের মঞ্চে বাজে নতুন বাণী।
উনিশশো চল্লিশের মার্চের সেই ক্ষণ,
ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বদলে যায় মন।
আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে জাগে নতুন সুর,
মানচিত্রের ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে দূর।
ক্যাবিনেট মিশন এলো সমাধানের আশায়,
কিন্তু ঐকমত্য হারাল রাজনীতির ভাষায়।
যে নদী বইত আগে দুই তীর ছুঁয়ে,
সে নদীও যেন তাকায় বিভেদের দিকে চেয়ে।
মাঠ, ঘাট, হাট—সবই ছিল সবার,
তবু মানুষের মনে উঠল অদৃশ্য প্রাচীর ভার।
রাজনীতির রেখা যখন হৃদয়ে এসে যায়,
সহস্র বছরের সম্পর্কও তখন কেঁপে যায়।
ছেচল্লিশের আগস্ট—কালো এক প্রহর,
কলকাতার বুকে নামে অশান্তির ঝড়।
ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র রাজনৈতিক ডাক,
উন্মত্ততার ঢেউয়ে হারায় বিবেকের পাক।
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং—ইতিহাসের ক্ষত,
মানুষের হাতে মানুষ হলো বিপন্নতর।
ধর্মের পরিচয় যখন হয়ে ওঠে অস্ত্র,
মানবতার আকাশে নামে অন্ধকার ঘন।
প্রতিশোধের আগুন ছড়ায় চারিধার,
নোয়াখালীর বুকে নামে কান্নার ভার।
অক্টোবরের অশান্তি পুড়িয়ে দেয় গ্রাম,
ভয় আর বিভীষিকায় ক্ষতবিক্ষত নাম।
বৃদ্ধ গান্ধী হাঁটেন নির্জন পথ ধরে,
শান্তির বাণী নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে।
তিনি বলেন—ঘৃণার আগুনে কারও জয় নেই,
মানুষ হারালে শেষে মানুষই আর নেই।
তবু নেভে না সহজে বিভেদের অনল,
চোখের জলে ভাসে বাংলার মাটি ও জল।
ইতিহাসের পাতা যেন কাঁদে নীরব স্বরে—
“মানুষকে মানুষ রেখো, ধর্মকে ঘৃণার তরে
কখনো করো না ব্যবহার।”
নোয়াখালীর ক্ষত তখনো শুকায়নি,
প্রতিশোধের আগুনও কোথাও থামেনি।
বিহারের জনপদে নামে অশান্তির ঢেউ,
প্রতিহিংসার আগুনে হারায় আপন কেউ।
নভেম্বরের দিনগুলো বহন করে ক্ষত,
মানুষের বিবেক যেন হয় অবনত।
হাজারো পরিবারের ঘরে নামে শোক,
নিরপরাধের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে লোক।
তারপর এলো সাতচল্লিশ—ভাগ্যের কাল,
পাঞ্জাব জুড়ে নামে বিভেদের জাল।
রাওয়ালপিন্ডি, অমৃতসর, লাহোরের পথ,
মানুষের হৃদয়ে রেখে যায় গভীর ক্ষত।
শিখ, হিন্দু, মুসলমান—এক মাটির সন্তান,
তবু পরিচয়ের নামে কেন এত অবসান?
যে রেলগাড়ি যেত মানুষে ভরা,
তার পথেও নামে বিচ্ছেদের ছায়া ঘনকরা।
ঘর ছেড়ে পথে নামে অসংখ্য পরিবার,
কাঁধে স্মৃতি, চোখে জল, সামনে অনিশ্চয়তার ভার।
মাটির মমতা ফেলে, পূর্বপুরুষের ঘর,
সীমান্তের ওপারে খোঁজে নতুন ভোর।
কেউ পূর্বে, কেউ পশ্চিমে—কাফেলা চলে যায়,
একটি রেখা কত আপনজনকে পর করে দেয়!
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সময়ে বদলে যায় মানচিত্র,
র্যাডক্লিফের রেখায় কাঁপে জনপদের চিত্র।
যে ঘরে জন্মেছিল পূর্বপুরুষের দল,
সে ঘরে রেখে যেতে হয় স্মৃতির অশ্রুজল।
এক রাতেই কত মানুষ হলো পরবাসী,
কোথায় রইল শৈশব? কোথায় আপন বাতাসি?
চৌদ্দই আগস্টে নতুন রাষ্ট্রের গান,
পনেরোই আগস্টে অন্য স্বাধীনতার উল্লাস-জ্ঞান।
স্বাধীনতা এলো—তবু বুকের মাঝে ক্ষত,
অসংখ্য মানুষের জীবন হলো বিপর্যস্ত।
মানচিত্র পেল স্বাধীনতার নতুন পরিচয়,
কিন্তু মানুষের মনে রয়ে গেল বিচ্ছেদের ক্ষয়।
কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়ায় আপনজন,
একটি রেখা হয়ে ওঠে অদৃশ্য কারাগারসম।
রাজদণ্ড ভেঙে শ্বেতাঙ্গ শাসন গেল সরে,
কিন্তু বিভেদের উত্তরাধিকার রইল ঘরে ঘরে।
ধর্মের নামে যারা ঘৃণার আগুন জ্বালে,
মানবতা প্রতিবারই পুড়ে যায় তার জ্বালে।
ইতিহাস তাই শুধু অতীতের কথা নয়,
ভুল থেকে না শিখলে ভবিষ্যৎও নিরাপদ নয়।
আজও কাঁদে ইতিহাস, কাঁদে নদীর জল,
মানুষের স্মৃতিতে জেগে থাকে সেই কাল।
মুছে যাক সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত অনল,
সম্প্রীতির সেতু হোক নদীর দুই কূল।
হিন্দু-মুসলিম-শিখ-বৌদ্ধ—মানুষ সবার আগে,
ঘৃণার দেয়াল ভাঙুক ভালোবাসার অনুরাগে।
ভিন্ন বিশ্বাস থাকুক, থাকুক নিজস্ব মত,
মানবমর্যাদার চেয়ে বড় নয় কোনো পরিচয়-রত্ন।
রক্তাক্ত মানচিত্র যেন আর রক্ত না চায়,
ইতিহাসের অশ্রু এবার শান্তির বীজ বুনে যায়।
যে বিভেদ একদিন ছিন্ন করেছিল ঘর,
সেই স্মৃতি হোক আজ সম্প্রীতিরই প্রহর।
সীমানা থাকুক মানচিত্রে—হৃদয়ে নয় দেয়াল,
মানুষের বন্ধনে হোক পৃথিবী উদার ও বিশাল।
অতীতের রক্তঋণ শোধ হোক একটি শপথে—
মানুষের পাশে মানুষ থাকুক সত্যেরই পথে।
রক্তের ইতিহাস হোক শেষ অধ্যায়,
সহমর্মিতার সূর্য উঠুক নতুন প্রভাতের প্রান্তায়।
মানচিত্রে যত রেখা থাকুক, থাকুক যত দেশ—
মানবতার আকাশ যেন বিভক্ত না হয় শেষ।
রক্তাক্ত মানচিত্রের উপাখ্যান তাই এই গান—
ঘৃণায় নয়, মানবতায় হোক ইতিহাসের অবসান।
১৪
২৪ মন্তব্য