Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

সৈয়দ মুজতবা আলী শুধু রম্যলেখক নন


সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মশতবর্ষে প্রথম আলোর ছিল বড় আয়োজন। বিভিন্ন লেখার মাঝে ছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এ লেখাটি। ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধা—শুধু রম্যলেখক নন’ শিরোনামে এ লেখাটি এত দিন ছিল শুধু ছাপা কাগজের পাতায়, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রথমত, তাঁর পড়াশোনাটা ছিল বিশাল, এই পড়াশোনার ঐতিহ্য অবশ্য তাঁর পরিবারেই ছিল—তাঁর দুই অগ্রজ, সৈয়দ মুস্তাফা আলী ও সৈয়দ মুর্তজা আলী, পড়াশোনাকে একটা অভ্যাসেই পরিণত করেছিলেন। তাঁর বোনরা? সবাই ছিলেন পাঠক। শান্তিনিকেতনে তাঁর পড়াশোনার স্পৃহাটা বিকাশের একটা অনুকূল পরিবেশ পায়। তাঁর লেখালেখির তালিকা দেখলে বোঝা যায়, এই পড়াশোনার ব্যাপ্তি কী ছিল: নন্দলাল বসুর দেয়াল-ছবি থেকে নিয়ে আঁদ্রে জিদ, পুলিন বিহারী থেকে নিয়ে সক্রেটিস, কবি আবদুর রাজ্জাক থেকে নিয়ে মপাসাঁ—অসংখ্য বিষয় ছিল তাঁর পঠন ও পর্যবেক্ষণের। ভাষাও জানতেন অনেকগুলো। তবে তাঁর প্রিয় ভাষা ছিল—না ফরাসি নয়, ল্যাটিন নয়, জার্মান নয়, ছিল সিলেটি। বলতেন, শান্তিনিকেতন গেলে সিলেটি ভাষাটি তিনি তোরঙ্গে ভরে রাখতেন। সে জন্য ন্যাপথলিনের একটা গন্ধ লেগে থাকত তাঁর সিলেটি ভাষায়। যদি ক্ল্যাসিক্যাল সিলেটি বলে কোনো ভাষা থাকে, তিনি তাই বলতেন। আমাদের সঙ্গে যখন সিলেটিতে কথা বলতেন এবং আমরাও বলতাম, তাতে অকারণ ‘শুদ্ধ বাংলা’ শব্দ ঢোকালে বিরক্ত হতেন, যেমন হতেন বাংলা ভাষায় আবার ইংরেজি শব্দ ঢোকালে। সে জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা বেশ বিপজ্জনক ছিল। ভাষার শুদ্ধতা তাঁর কাছে ছিল মনের শুদ্ধতার শামিল।

তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্যকে তিনি কাঁধে বা আস্তিনে বয়ে নিয়ে বেড়াতেন না, বস্তুত তিনি যে বহুভাষাবিদ একজন মৌলিক চিন্তাবিদ ও লেখক, এ রকম উল্লেখও তাঁকে বিব্রত করত। তাঁকে আমার আপনভোলা মানুষ মনে হতো এবং খুব হাসিখুশি বাইরেটার আড়ালে আত্মমগ্ন একজন মানুষ। আমার এ রকম একটি ধারণা হয়েছিল, তিনি নিজের মনে অনেক ধ্যান করতেন এবং তাঁর ধ্যানের বিষয়বস্তু ছিল জগৎ, ক্ল্যাসিক সাহিত্য আর জগতের সঙ্গে এই সাহিত্য এবং জগৎ ও সাহিত্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। কথা বলতে বলতে তিনি অনেক সময় হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলাতেন এবং বদলে এ রকম একটা-দুটো বিষয়ের অবতারণা করতেন। একদিন শ্রীনিকেতনের কৃষিবিপ্লব নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলেন এক দর্শনার্থী। সেই সময়ে বিখ্যাত ব্যাংকার ছিলেন ওই দর্শনার্থী, কৃষি ব্যাংকিং বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শ্রীনিকেতন সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন, যদিও তত দিনে রবীন্দ্রনাথের আদর্শের অনেকটাই প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োগ করতে পারেনি। কথার মাঝখানে শ্রীনিকেতন নিয়ে উচ্ছ্বাসটা বজায় রেখেই হঠাৎ হেনরিখ হাইনের ডুয়োনো এলিজিটি আমার কাছে আছে কি না, তা জানতে চাইলেন। আমি সবেমাত্র গিয়েছি, চলে যে আসব তা–ও নয়। নেই শুনে হতাশ হলেন; জোগাড় করে দিতে পারব শুনে আনন্দিত হলেন। আমার মনে হলো, শ্রীনিকেতন নয়, সারা সকাল তাঁকে হাইনেই অধিকার করে রেখেছিলেন।

বিনয়ী মানুষ ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, যেমন বিনয়ী ছিলেন তাঁর আরেক কৃতী ভাগনে এস এম আলী, সাংবাদিক, শেষ জীবনে যিনি ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজেদের কৃতী নিয়ে কোনো কথা, কোনো মন্তব্য কোনো দিন তাঁদের করতে শুনিনি। অন্যের কৃতীর প্রশংসা করেছেন উচ্চকণ্ঠে। কলকাতার কবি-সাহিত্যিক বন্ধুদের সম্পর্কে অনেক বলতেন মুজতবা আলী। আবু সয়ীদ আইয়ুবের পাণ্ডিত্যের এবং লেখার তারিফ করতেন; সমরেশ বসু বা শঙ্কর অথবা সাগরময় ঘোষ, দেশ পত্রিকার বিখ্যাত সেই সম্পাদকের উল্লেখ করতেন দু-এক ছত্র প্রশংসাসহ। তিনি বলতেন, শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর প্রিয় রম্যলেখক। অন্যের প্রশংসায় উদারতা দেখাতে তিনি কার্পণ্য করতেন না, অন্তত আমাদের কাছে। সমবয়সীদের কাছে এঁদের নিয়ে তিনি কী মন্তব্য করতেন, তা অবশ্য আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। সমবয়সীদের কেউ তেমন এসব নিয়ে লিখেছেন, তেমনটি চোখে পড়ে না। কলকাতায় সৈয়দ মুজতবা আলীকে বরং বেশ অবহেলিতই মনে হয়েছে। দু-এক জায়গায় কিছু উন্নাসিক মন্তব্যও পড়েছি। আলী ভালো রম্যলেখক—এ রকম বর্ণনায় একটা উন্নাসিকতাই ফুটে ওঠে। যেন রম্যলেখাটা একটা অ-প্রথম শ্রেণির কাজ। তা ছাড়া আরও বিরক্তিকর যা, শুধু রম্যলেখায় সৈয়দ মুজতবা আলীকে বেঁধে ফেললে তাঁর অসাধারণ কিছু ছোটগল্প এবং অন্তত দুটি উপন্যাসকে অস্বীকার করা হয়। যেগুলো ছোটগল্প এবং উপন্যাস হিসেবে বাংলা সাহিত্যে চিরদিনের জন্য ঠাঁই পেয়ে যাবে। সে কথায় পরে আসছি। তা ছাড়া এই জনরা-ভাঙ্গার দিনে, এই ক্রস-ওভার অভিজ্ঞতার দিনে ভ্রমণকাহিনি বা রম্যরচনাকে কম নম্বর দিতে বসাটাও কোনো কাজের কথা নয়।

সৈয়দ মুজতবা আলী যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, তা ছিল প্রকৃত অর্থেই সর্বভারতীয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ কবিতাটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। আমি দু বার তাঁর অটোগ্রাফ পেয়েছিলাম। ১৯৬৭ সালের সেই বিখ্যাত ভ্রমণের সময় আমার খাতায় তিনি চার লাইন লিখে দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ থেকে, ‘সেই ভালো, সেই ভালো/আমারে না হয় না জানো...’ ইত্যাদি এবং সেই ’৭২-৭৩-এ, হাইনের ডুয়েনো এলিজি জোগাড় করে দেওয়ায় খুশি হয়ে তাঁর শবনম উপন্যাসটির প্রথম পাতায় ‘ভারততীর্থ’ থেকে দু লাইন; ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে...’ ইত্যাদি। প্রথম অটোগ্রাফটি আমি চেয়ে নিয়েছিলাম, দ্বিতীয়টি অযাচিতভাবে পেয়েছিলাম। আমার মামাতো-খালাতো ভাইবোনদের কারো কারো সংগ্রহে তাঁর এরকম অটোগ্রাফ রয়েছে, তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা। (তাঁর হাতের লেখাও ছিল রাবীন্দ্রিক ছাঁচের, এতই প্রভাব ছিল ঠাকুরের, তাঁর ওপর।) এসব অটোগ্রাফে তিনি যেসব কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, সেগুলো নিয়ে একটু ভাবলে তাঁর চিন্তার দু-একটা সূত্র হয়তো পাওয়া যায়, অন্তত আমাকে যে দুই কবিতার কয়েক পঙিক্ত লিখে দিয়েছিলেন সেগুলো থেকে। বলা বাহুল্য, শবনম বইটি উধাও হয়ে গেছে এবং ১৯৬৭ সালের সেই অটোগ্রাফযুক্ত খাতাটাও। আফসোস! কিন্তু চিন্তার সূত্রগুলো আছে এবং সেগুলো এই : তাঁর সর্বভারতীয় ভাবাদর্শে এই ‘মিলাবার’ ও ‘মিলিবার’ আহ্বানটি গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, সামাজিক হানাহানি, সামঙ্রদায়িক হিংসা-প্রতিহিংসাকে শুধু মানবতার শত্রু নয়, এই উপমহাদেশের দেশগুলোর অস্তিত্বের জন্য সংকট হিসেবেও চিহ্নিত করেছিলেন। দুঃখের বিষয়, এগুলো এখন যেরকম তাঁর সময়েও ছিল, এই ভারত ভূখণ্ডের নিত্যদিনের সমস্যা। এখন অবশ্যই এদের তীব্রতা এবং ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে। মাত্রাটা হয়েছে ভয়াবহ। কিন্তু ছেচলি–শ-সাতচলি–শের অথবা ১৯৬৪-এর সামঙ্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাগুলো খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। তবে আপনভোলা হলেও, জ্ঞানতত্ত্বে দৃঢ়বিশ্বাস থাকলেও (যার ফলে উমবার্তো একোর মতো তাঁর একটা বিশ্বাস জন্মেছিল, জ্ঞানই মুক্তি দেবে মানুষকে), তিনি জানতেন, অন্তত তাঁর সামাজিক সত্তাটি জানত, পরিস্থিতির অচিরেই কোনো উন্নতি হবে, তেমন সম্ভাবনা নেই। সেই ১৯৪৮ সালে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে ভবিষ্য-ভাষী একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, এবং এই লেখা ও অন্যান্য লেখালেখি (সেই সঙ্গে তাঁর সেক্যুলার জীবনদর্শন)-এর জন্য পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়ে দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন। এই নির্বাচন তাঁকে বাস্তবের ইট-বালি-সুরকির সঙ্গে একটা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তারপরও তিনি মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন না। যারা বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর প্রচুর লেখার কয়েকটিও পড়েছেন, তারা জানেন, এই দেশটা নিয়ে তাঁর আশাবাদ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে হতাশ করেছে। তারপরও তিনি এ দেশের শিল্প-সাহিত্য ও দেশের সাধারণ মানুষের সংগ্রামী প্রত্যয় (প্রতিদিনের জীবনযাপনে যে সংগ্রাম; বৃহত্তর অর্থে মুক্তির জন্য সংগ্রাম না হলেও) তাঁকে আশাবাদী করত। ভূগোলের, বিশেষ করে কুটিল রাজনৈতিক ভূগোলের আঙিনায় মানুষ মিলতে এবং মেলাতে না পারলেও জ্ঞানের, শিক্ষার, সাহিত্যের পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের আঙিনায় তা যে সম্ভব, সেই বিশ্বাস তাঁর ছিল।

১৯৬৭ সালে তিনি যে ‘আমারে না হয় না জানো’ লিখে দিয়েছিলেন আমার খাতায়, তা কিন্তু ‘অটোগ্রাফ দিতে হবে, তাই দু ছত্র লেখা’।-এরকম প্রতিক্রিয়া থেকে দেননি। ভেবেচিন্তে, সময় নিয়ে লিখেছিলেন। এর চার পঙিক্ত তিনি আমাকে মনে রেখেও লেখেননি। তাঁকে তো পারিবারিকভাবে সবাই জানত। লেখক হিসেবেও। কিন্তু না জানার বিষয়টি নিয়ে ভাবলে পরিষ্কার হবে তিনি এসব পরিচয়কে বড় করে দেখেননি, দেখেছেন তাঁর নিজের একান্ত সত্তাটিকে। একজন আরেকজনকে কীভাবে জানে? তার বাইরের পরিচয়গুলো ডিঙিয়ে যদি তার অন্তঃপুরে প্রবেশ না করে? এই জানাটা যদি অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তাহলে পরসঙ্র যে মিলবে আর মেলাবে, সেটা হবে কীভাবে? রবীন্দ্রনাথের যে চার পঙক্তি নিয়ে এত কথা, তার নিশ্চয় একটা প্রেক্ষাপট আছে, অর্থ আছে। হয়তো যে ব্যাখ্যা আমি দিচ্ছি, সৈয়দ মুজতবা আলীর চিন্তার সূত্র ধরে, তাতে অতিপঠন থাকতে পারে। কিন্তু এই বিপদ মেনেও বলা যায়, পঙিক্তগুলো তাঁর চিন্তার সূত্রটি সত্যিই প্রকাশ করে। মুজতবা আলীর কত লেখায় জানা এবং অজানার ব্যাপারটা শিরোনাম হয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হয়ে এসেছে, ভেবে দেখুন। আমার মনে হয়েছে, দীর্ঘ একাকী বাস তাঁকে নিজের কাছে বারবার হাজির করেছে, তিনি নিজের সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন। বস্তুত তিনি এক মনা পাগলার গল্প বলতেন, ছোটবেলায়, তার মৌলভীবাজারে দেখা। মনা পাগলা হাঁটত, আর বিড়বিড় করে কথা বলত নিজের সঙ্গে। এটিও একটি ইঙ্গিত তাঁর আত্ম-অবলোকন, আত্ম-পঠনের।

সৈয়দ মুজতবা আলী লঘু এবং গুরুর ফাঁকটা ভরাট করতে চেয়েছিলেন। এ কাজটি উত্তরাধুনিক সাহিত্য করছে। কিন্তু আলী করেছেন তাঁর ক্লাসিক চিন্তা থেকেই। লঘুত্ব সবসময় পরিহাস নয়, সবসময় ঠাট্টা বা কৌতুক নয়, অথবা হালকাচাল নয়। লঘুত্ব একটি জীবনদর্শন হতে পারে, একটি সাহিত্যভাবনা হতে পারে। এই লঘুত্ব অস্তিত্বের হাঁফ ছাড়ার মতো। যখন জীবনের দুঃসহ ভার জীবনকেই মিটিয়ে ফেলতে চায়, একটা সংকটে ফেলে দেয় অপ্রস্তুত সত্তাটিকে এবং প্রচলিত পথে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথটা পাওয়া যায় না, তখন লঘুত্ব একটা খোলা জানলা দিয়ে আসা হাওয়ার মতো হতে পারে। হয়তো আরো দু-এক যে তুলনা দেব, সেগুলো মিলবে না, কিন্তু আমার জ্ঞানের মধ্যে দুটি মাত্র তুলনা থাকায় তা দেওয়াটা, অন্তত এ মুহূর্তে, সম্মতি পেতে পারে : তার একটি মিলান কুন্ডেরার সেই অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুত্বের বিষয়টি। ‘অসহনীয় লঘুত্ব’-ইংরেজিতে একে বলে অক্সিমরোন। দুই বিপরীতের একাসন গ্রহণ। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প যখন হাসতে হাসতে কাঁদায় পাঠককে, তখন কী হয়? এই কথাটি, মুজতবা আলীর এই হাসতে হাসতে কাঁদানোর ব্যাপারটি আরেক সৈয়দের, যিনি নিজেও বড় গল্পকার-আবদুল মান্নান সৈয়দ। দ্বিতীয় তুলনাটি চিলির লেখক, সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রায় সমবয়সী এবং সমান-জীবনযাপনকারী, মানুয়েল রোহাস (১৮৯৬-১৯৭৩)-এর একটি গল্প। রোহাসের প্রিয় একটি চরিত্র ছিল পথের মানুষ, পিকারো। এই পিকারো ছিল নিসঙ্গ এবং তার পরিভ্রমণ ছিল মুক্তি এবং পরিপূর্ণতার উদ্দেশ্যে। একটি গল্পে এরকম এক পিকারো পুলিশের হাতে পড়েছে, পুলিশ তাকে বসিয়ে রেখেছে থানায়, কী চার্জ দেওয়া যায়, ভাবছে পুলিশ। লোকটি থানায় বসে বসে দেখে, বাইরে একটি লোক কথা বলছে এক মহিলার সঙ্গে। একটি কুকুর এসে হঠাত্ তাড়া করল লোকটাকে। কামড়ে ধরল তার ট্রাউজার। সেটি খুলে গেল, এমনি সেই কামড়। লোকটা ট্রাউজার হারিয়ে কোনোরকমে লজ্জা ঢেকে দিল দৌড়। এই দৃশ্য দেখে পিকারোর সে কী হাসি, তার হাসি আর থামে না। পুলিশ প্রথমে বিরক্ত। তারপর তারাও হাসে, হাসি যেহেতু সংক্রামক। সারা থানা হাসতে থাকল, হাসতে শুরু করল বাইরের মানুষজনও, যারা উঠানে জড়ো হয়েছে নানা কাজে।

রোহাস গল্পটা এখানেই শেষ করেছেন, কাজেই আমাদের জানা হলো না পিকারোর কী হলো। কুকুরটাইবা কার ছিল। পুলিশ কী করবে এরপর। কিন্তু আমাদের জানার প্রয়োজনও নেই। কারণ পিকারোর হাসি একটা বিরাট সিস্টেমের ভিতরে ঢুকে যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, একটা গুরুভার পাথরকে টলিয়ে দিল, তাই তো যথেষ্ট। সৈয়দ মুজতবা আলী এই কাজটি করেন। তাঁর উইট এবং হাস্যকৌতুকের কাজ আসলে অনেক। এক তো পাঠককে বিমলানন্দ দেওয়া। শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পগুলো যে আনন্দ দিত/দেয় আমাদের। দ্বিতীয় কাজ, সেই ওস্কার ওয়াইল্ড বা বার্নার্ড শ’র মতো জীবনের, চিন্তার, মানুষের সামাজিক আদান-প্রদানের ভেতরের একশ রকমের অসঙ্গতিকে তুলে ধরা। তবে এখানে পাঠক শুধু হেসেই ক্ষান্ত হবে না, সে ভাববে। অসঙ্গতিগুলোর মূলে পৌঁছে যাবে। আর তৃতীয়, অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুত্বের সন্ধান দেওয়া। এ কাজটি অবশ্য তিনি করেন একটা উেপ্রক্ষীয় নিম্নতলে, দর্শনের একটা আড়ালে থাকা অঞ্চলে। তবে একটু সচেতনভাবে পড়লে তার ‘রম্যরচনার’ ভেতর তার সন্ধান পাওয়া যাবে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পগুলো, তাঁর উপন্যাসগুলো পড়লে বোঝা যাবে, তিনি ‘হাস্যরস’ এবং ‘হাস্যকৌতুক’ যদি একান্ত না-ই ব্যবহার করতেন, তাতে তাঁর স্টাইলটা পাল্টাতো নিশ্চয়, গল্প-উপন্যাসের চরিত্রটাও বদলে যেত, কিন্তু তিনি একজন বড় লেখক হিসেবেই থেকে যেতেন। তার গল্প-উপন্যাসের কাঠামো, তাদের গল্প-রেখা, তাদের হয়ে ওঠা, তাদের ভেতরের জীবন, তাদের ভাষা-সবই সেই সাক্ষ্য দেয়।

মন্তব্য করুন