Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

দোয়া করছি, কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না কেন?

                দোয়া করছি, কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না কেন?

 

কখনো কি এমন হয়েছে?

অনেক রাত জেগে দোয়া করেছেন।
সিজদায় গিয়ে কেঁদেছেন।
হাত তুলে বারবার একই কথা বলেছেন।

তারপরও মনে হয়েছে, “আমার দোয়া কি আল্লাহ শুনছেন?”

দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে।
কখনো কখনো বছরও চলে যাচ্ছে।

কিন্তু আপনি যে জিনিসটি চেয়েছিলেন, সেটি এখনো আপনার জীবনে আসেনি।

তখন মনে প্রশ্ন জাগে,

“আমি এত দোয়া করছি, তবুও উত্তর পাচ্ছি না কেন?”

প্রথমেই একটি কথা মনে রাখুন:

দোয়ার উত্তর না পাওয়া আর দোয়া না শোনা এক জিনিস নয়।

আল্লাহ আপনার দোয়া শুনছেন।

আপনার বলা কথাও তিনি জানেন, আর আপনার হৃদয়ের সেই কথাও জানেন যা আপনি মুখে বলতে পারেননি।

আল্লাহ কি সত্যিই আমার দোয়া শুনছেন?

হ্যাঁ।

আল্লাহ বলেন:

“আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬

খেয়াল করুন, আল্লাহ বলেননি যে শুধু নিখুঁত মানুষ ডাকলেই তিনি শুনবেন।

তিনি বলেছেন, “আমি নিকটবর্তী।”

আপনি যখন তাঁকে ডাকেন, তিনি আপনার ডাক জানেন।

আপনি যখন কাঁদেন, তিনি আপনার কান্না জানেন।

আপনি যখন মনে মনে বলেন, “হে আল্লাহ, আমি আর পারছি না,” তিনিও তা জানেন।

তাহলে দেরি হচ্ছে কেন?

এখানেই আমাদের বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আমরা অনেক সময় মনে করি,

“আমি যা চেয়েছি, সেটাই যদি এখনই পাই, তাহলেই আমার দোয়া কবুল হয়েছে।”

কিন্তু আল্লাহ আমাদের চেয়ে ভালো জানেন।

আপনি আজ যে জিনিসটি খুব প্রয়োজন মনে করছেন, সেটি হয়তো আপনার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

আবার আপনি যে জিনিসটির জন্য অপেক্ষা করছেন, সেটি হয়তো সঠিক সময়ে আপনার জীবনে আসবে।

একজন শিশু যখন কোনো ধারালো জিনিস চাইতে থাকে, বাবা-মা তাকে সেটা দেন না।

শিশু হয়তো ভাবে, “আমাকে কেন দেওয়া হচ্ছে না?”

কিন্তু বাবা জানেন, কেন দেওয়া যাচ্ছে না।

আমাদের জ্ঞান সীমিত।

আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন।

কখনো “না”ও একটি উত্তর

আমরা চাই একটি নির্দিষ্ট মানুষকে।

আল্লাহ হয়তো তাকে আমাদের জীবন থেকে দূরে রাখেন।

আমরা চাই একটি নির্দিষ্ট চাকরি।

আল্লাহ হয়তো সেটি দেন না।

আমরা চাই একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক, একটি নির্দিষ্ট জায়গা, একটি নির্দিষ্ট সুযোগ।

কিন্তু সবকিছু আমাদের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে।

কখনো আল্লাহ আমাদের দোয়ার মাধ্যমে সেই জিনিস দেন না, বরং সেই জিনিস থেকে আমাদের রক্ষা করেন।

তখন আমরা ভাবি,

“আমার দোয়া কবুল হলো না।”

কিন্তু হয়তো অনেক বছর পর আমরা বুঝব,

“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সেদিন আমার চাওয়া জিনিসটি দেননি।”

দোয়ার ফল সবসময় আমাদের চোখে দেখা যায় না

রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে এবং তাতে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকলে আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন:

১. তার দোয়া কবুল করেন,
২. অথবা তার জন্য তা আখিরাতে জমা রাখেন,
৩. অথবা অনুরূপ কোনো বিপদ তার থেকে দূরে সরিয়ে দেন।

সাহাবিগণ যখন এর কথা শুনলেন, তারা আরও বেশি দোয়া করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
— মুসনাদ আহমাদ

অর্থাৎ আপনি দোয়া করে হয়তো এমন কোনো বিপদ থেকে বেঁচে গেছেন, যার কথা আপনি কখনো জানতেও পারবেন না।

আপনি হয়তো শুধু দেখছেন,

“আমি যা চেয়েছিলাম, তা পাইনি।”

কিন্তু আল্লাহ হয়তো আপনার অদৃশ্য কোনো বিপদ সরিয়ে দিয়েছেন।

দেরি মানেই প্রত্যাখ্যান নয়

একটি বীজ মাটিতে লাগানোর পর পরদিন ফল পাওয়া যায় না।

সময় লাগে।

একটি শিশুর জন্মের জন্যও নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন।

তেমনি কিছু দোয়ার ফল পাওয়ার জন্যও আল্লাহ নির্ধারিত সময় রেখেছেন।

আপনার কাজ হলো দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।

আপনার সময়সূচি আর আল্লাহর সময়সূচি এক হবে, এমন নয়।

আপনি চান আজ।

আল্লাহ জানেন কখন।

আপনি চান একটি নির্দিষ্টভাবে।

আল্লাহ জানেন কোনভাবে।

আপনি চান একটি নির্দিষ্ট জিনিস।

আল্লাহ জানেন, আসলে আপনার কী প্রয়োজন।

দোয়ার পাশাপাশি নিজের অবস্থাও দেখুন

দোয়া শুধু চাওয়ার নাম নয়।

দোয়ার সঙ্গে নিজের জীবনকেও আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নিতে হয়।

আপনি যদি রিজিক চান, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করুন।

আপনি যদি ক্ষমা চান, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন।

আপনি যদি ভালো জীবনসঙ্গী চান, নিজেকেও ভালো জীবনসঙ্গী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করুন।

আপনি যদি জান্নাত চান, জান্নাতের পথে চলার চেষ্টা করুন।

দোয়া করুন, আবার চেষ্টা করুন।

কারণ তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়।

দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে এবং বলে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’”
— সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আপনি আজ দোয়া করলেন।

কালও দোয়া করলেন।

এক সপ্তাহ গেল।

এক মাস গেল।

তারপর যদি আপনি বলেন,

“কিছুই তো হচ্ছে না!”

তাহলে ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন না।

আপনার দোয়া চালিয়ে যান।

দোয়ার সময় শুধু নিজের চাওয়া নয়, আল্লাহকেও চাইুন

আমরা অনেক সময় দোয়াকে একটি তালিকায় পরিণত করি:

“হে আল্লাহ, এটা দিন।”

“ওটা দিন।”

“আমার এই সমস্যাটা দূর করুন।”

এগুলো অবশ্যই চাইবেন।

কিন্তু এর পাশাপাশি বলুন:

“হে আল্লাহ, আমি যা চাই তা যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, আমাকে তা দান করুন। আর যদি এতে আমার ক্ষতি থাকে, তাহলে তা আমার কাছ থেকে দূরে রাখুন এবং তার পরিবর্তে উত্তম কিছু দান করুন।”

এমন দোয়ার মধ্যে একটি সুন্দর আত্মসমর্পণ আছে।

কারণ তখন আপনি শুধু নিজের ইচ্ছাকে নয়, আল্লাহর হিকমাহকেও বিশ্বাস করছেন।

আপনার দোয়া আপনাকেও বদলে দিতে পারে

কখনো কখনো আমরা দোয়া করি একটি সমস্যার সমাধানের জন্য।

কিন্তু সেই দোয়ার সময় আমরা আল্লাহর আরও কাছে চলে যাই।

আগে হয়তো নামাজে মন বসত না।

এখন নিয়মিত নামাজ পড়ছি।

আগে কুরআন পড়তাম না।

এখন প্রতিদিন কুরআন খুলছি।

আগে সিজদায় বেশি সময় থাকতাম না।

এখন সিজদা থেকে উঠতেই ইচ্ছে করে না।

তখন বুঝতে হবে, আপনার দোয়ার পথে শুধু ফলাফল নয়, আপনার নিজের পরিবর্তনও ঘটছে।

হয়তো আপনি যে জিনিসটি চেয়েছিলেন, তার চেয়েও বড় একটি জিনিস আল্লাহ আপনাকে দিচ্ছেন:

তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক।

যখন মনে হবে, “আল্লাহ আমাকে ভুলে গেছেন”

সেই মুহূর্তে সূরা আদ-দুহার এই আয়াতগুলো মনে করুন:

“তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি অসন্তুষ্টও নন।”
— সূরা আদ-দুহা, ৯৩:৩

কষ্টের সময় মানুষের মন অনেক কিছু বলে।

“আমি একা।”

“আমার কেউ নেই।”

“আমার দোয়া কবুল হয় না।”

“আল্লাহ হয়তো আমাকে চান না।”

কিন্তু অনুভূতি সবসময় সত্যের প্রমাণ নয়।

তাই হৃদয়ের ভয়কে নয়, আল্লাহর ওয়াদাকে বিশ্বাস করুন।

আজকের দোয়াটি হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

হয়তো আপনি যে দোয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করছেন, তার উত্তর এখনো আসেনি।

তবুও হাত নামাবেন না।

সিজদা ছাড়বেন না।

আল্লাহকে ডাকা বন্ধ করবেন না।

কারণ আপনি জানেন না, আপনার জীবনের কোন মুহূর্তে দরজা খুলবে।

আপনি জানেন না, কোন সকাল আপনার দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ হবে।

আপনি জানেন না, কোন দোয়া আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

তাই আজও বলুন:

“হে আল্লাহ, আমি জানি না আমার জন্য কী ভালো। আপনি জানেন। আমি আমার বিষয় আপনার ওপর ছেড়ে দিলাম। আমাকে যা দেবেন, তাতে বরকত দিন। যা থেকে দূরে রাখবেন, তাতেও কল্যাণ রাখুন। আর আমাকে আপনার ওপর সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দিন।”

 

শেষ কথা

দোয়া করে যদি এখনো উত্তর না পান, হতাশ হবেন না।

হয়তো উত্তর আসছে।

হয়তো সময় আসেনি।

হয়তো আপনার জন্য আরও উত্তম কিছু নির্ধারিত আছে।

হয়তো কোনো বিপদ আপনার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আর হয়তো আল্লাহ আপনার দোয়ার বিনিময় আখিরাতের জন্য জমা রেখেছেন।

আপনি শুধু একটি বিষয় মনে রাখুন:

দোয়া করার সময় আপনি একা নন।

আপনি এমন একজন রবকে ডাকছেন, যিনি আপনার চেয়েও আপনাকে ভালো জানেন।

তাই অপেক্ষা করুন।

সবর করুন।

চেষ্টা করুন।

তাওবা করুন।

আর দোয়া করতে থাকুন।

কারণ যে হৃদয় আল্লাহর দরজায় বারবার ফিরে আসে, সেই হৃদয় কখনো সত্যিকারের একা নয়।

আল্লাহ আমাদের সব হালাল ও কল্যাণকর দোয়া কবুল করুন, আমাদের অন্তরে সবর ও তাওয়াক্কুল দান করুন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ