সহকারী অধ্যাপক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪০ অপরাহ্ণ
রাত্রির তারকা—সত্যের আলোকধারা (সূরা আত-তারিকের আলোকে ) মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
রাত্রির তারকা—সত্যের আলোকধারা
(সূরা আত-তারিকের আলোকে )
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
রাত্রির নীরব আকাশ জুড়ে তারার মেলা,
স্রষ্টার কুদরত দেখে মন হয় যে অবাক-বেলা।
অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে নক্ষত্র-আলো,
স্মরণ করায়—আল্লাহ মহান, তাঁর সৃষ্টি কত ভালো।
শপথ আকাশ, শপথ সেই রাতের আগন্তুক,
উজ্জ্বল তারকা জ্বলে—আলো তার অপরূপ।
“তারিক” নামে পরিচিত রাত্রির সেই তারা,
স্রষ্টার মহিমা জানায়, জাগায় ভাবনা সারা।
রাতের কালো পর্দা ভেদে জ্বলে যে আলোকরেখা,
সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার নিদর্শন দেয় দেখা।
তারার আলো বলে যেন—“হে মানব, জাগো,
স্রষ্টাকে চিনে সত্য পথে জীবনটাকে সাজাও।”
আকাশের বিশালতা দেখে থমকে যায় প্রাণ,
কে বানাল এই মহাবিশ্ব, কে দিল এমন জ্ঞান?
নক্ষত্রগুলো নিয়ম মেনে চলে আপন পথে,
আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায় সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে।
মানুষ ভাবে—“আমি একা, কেউ তো দেখে না,”
নির্জন রাতে পাপ করলেও কেউ জানে না!
কিন্তু মুমিন জানে—এ ধারণা ভীষণ ভুল,
আল্লাহর জ্ঞান সর্বত্র, তাঁর জ্ঞান অখণ্ড পূর্ণ।
মানুষের সাথে দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা রয়,
আল্লাহর আদেশে মানুষের আমল লিখে যায়।
কথা, কাজ ও কর্মের হিসাব থাকে লেখা,
কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে থাকে না যে ঢাকা।
তাই গোপনে পাপ করো না, মনে রেখো সদা,
আল্লাহ দেখেন অন্তরটাও—জানেন মনের কথা।
মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও কী লাভ বলো?
আল্লাহর জ্ঞান থেকে কি লুকাতে পারবে কোনো ছল?
মানুষ! নিজের সৃষ্টির কথা একবার ভাবো,
কোথা থেকে এলে তুমি, নিজের ইতিহাস জানো।
আজ তুমি জ্ঞানী, আজ তোমার কত সম্মান,
কিন্তু তোমার শুরু ছিল ক্ষুদ্র, ছিল অজ্ঞান।
আল্লাহ তোমায় সৃষ্টি করেছেন নিজ কুদরতে,
জীবন দিলেন, প্রাণ দিলেন আপন রহমতে।
চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য, কান দিয়েছেন শুনতে,
বিবেক দিয়েছেন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে।
তবু কেন অহংকার করো, কেন এত গর্ব?
যে জীবন আল্লাহর দান, তাতে কিসের দম্ভ?
যে মানুষ নিজের শুরু জানে, সে বিনয়ী হয়,
স্রষ্টার সামনে মাথা নত করে, সত্যের পথে রয়।
জীবনের সূচনায় মানুষ ছিল অতি ক্ষুদ্র,
আল্লাহর কুদরতে আজ সে হয়েছে সমৃদ্ধ।
শরীর, মেধা, জ্ঞান ও শক্তি—সবই তাঁর দান,
তাঁর দয়াতেই মানুষের আজ পরিচয় ও মান।
নিজের দেহের দিকে তাকাও, কত নিখুঁত গঠন,
হৃদয় চলে, শ্বাস চলে, চলে রক্তসঞ্চালন।
চোখের পাতা ওঠে-নামে, হৃদয় স্পন্দিত হয়,
কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে মানবদেহময়।
কে দিল এই জীবনধারা? কে দিল প্রাণের স্পন্দন?
কে দিল মেধা, অনুভূতি, ভালোবাসার বন্ধন?
সকল প্রশ্নের উত্তর এক—মহান আল্লাহ রব,
তাঁরই কুদরত প্রকাশিত—তিনি সর্বশক্তিমান সব।
মানুষ ভাবে—মৃত্যু এলে সবকিছু শেষ,
কবরের মাটির নিচে শেষ হবে জীবন-শেষ।
কুরআন বলে—না, এ জীবন শেষ নয় ভাই,
মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান অবশ্যই সত্য তাই।
যিনি প্রথমবার মানুষকে করেছেন সৃষ্টি,
তাঁর জন্য পুনরায় সৃষ্টি কী করে হয় অসম্ভবটি?
শুকনো মাটি, বীজ ও বৃষ্টির দিকে তাকাও,
আল্লাহর পুনরুজ্জীবনের নিদর্শন চিনে নাও।
মৃত জমিন বৃষ্টির জলে আবার ওঠে জেগে,
সবুজ ঘাসের হাসি ফুটে শুষ্ক মাটির বুকে।
যিনি মৃত জমিনকে আবার করেন জীবন্ত,
তাঁরই আদেশে মানুষ হবে পুনরুজ্জীবিত।
আসবে একদিন—সব গোপন কথা হবে প্রকাশ,
কেউ লুকাতে পারবে না সেদিন কোনো অবকাশ।
মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা কথা, কাজ ও মানস,
সবকিছুরই হিসাব হবে, থাকবে না কোনো আড়াল।
সেদিন থাকবে না ধন-সম্পদের অহংকার,
থাকবে না পদ, ক্ষমতা কিংবা মিথ্যা বাহাদুরির ভার।
সেদিন মানুষ বুঝবে—দুনিয়া ছিল ক্ষণিকের,
আসল জীবন সামনে আছে, জীবন অনন্তকালের।
আজ যে শক্তি নিয়ে মানুষ অন্যায় করে যায়,
সেদিন সেই শক্তি কোথায় থাকবে, ভেবে দেখো ভাই।
আজ যে অন্যের হক মেরে হাসে আপন মনে,
সেদিন তাকে দাঁড়াতে হবে আল্লাহর দরবারে।
মানুষের কাজ শুধু বাইরে নয়, অন্তরেও হয়,
নিয়তের ওপর আমলের মূল্য নির্ধারিত হয়।
তাই অন্তর শুদ্ধ করো, নিয়ত করো খাঁটি,
রিয়ার আগুন নিভিয়ে দাও, রাখো ঈমান জাগ্রত।
মানুষের প্রশংসা পেতে নেক কাজ করো না,
মানুষ না দেখলে ভালো কাজ থামিয়ে দিও না।
আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক জীবনের লক্ষ্য,
তবেই নেক আমল হবে সত্যিই অর্থবহ।
আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে আল্লাহরই হুকুমে,
মৃত মাটি প্রাণ ফিরে পায় বৃষ্টির কোমল চুম্বনে।
শুষ্ক জমিন সবুজ হয়ে হাসে নতুন সাজে,
আল্লাহর দয়া ছড়িয়ে পড়ে ফসলের মাঠের মাঝে।
বৃষ্টিধারা বলে যেন—“রবের দয়া দেখো,”
মৃত পৃথিবী জেগে ওঠে, নিদর্শনটি শেখো।
যে মাটিতে ছিল না প্রাণ, নেই কোনো সবুজ,
সেই মাটিতেই ফসল ফলে—কী অপার রহস্য!
পৃথিবীর বুক বিদীর্ণ করে অঙ্কুর যখন ওঠে,
মুমিন তখন স্রষ্টার কুদরত দেখে মুগ্ধ চিত্তে।
একটি ছোট্ট বীজের মাঝে কত বড় সম্ভাবনা,
আল্লাহ ছাড়া কে পারে দিতে এমন জীবনধারা?
বীজ ফেটে চারা হয়, চারা হয়ে বৃক্ষ,
বৃক্ষজুড়ে ফল-ফুল আসে—সৃষ্টির কত দৃশ্য!
এই সবকিছু শেখায় মানুষ—স্রষ্টাকে চিনতে,
তাঁরই বিধান মেনে চলতে, তাঁরই পথে থাকতে।
কুরআন কোনো কৌতুক নয়, নয় কোনো খেলা,
এটি সত্যের পথ দেখায়, দূর করে মিথ্যার মেলা।
হক ও বাতিল পৃথক করে দেয় সুস্পষ্ট ভাষায়,
মানুষকে সে ডাকে ন্যায়ের পথে, আলোর আশায়।
কুরআন হলো হিদায়াত, অন্তরের আলো,
তার শিক্ষা মেনে চললে জীবন হবে ভালো।
নামাজ, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, ন্যায় ও আমল,
কুরআনের শিক্ষা জীবন করে সুন্দর ও নির্মল।
যে কুরআনকে আঁকড়ে ধরে, সে হারাবে না পথ,
অন্ধকারের মাঝেও পাবে সত্যের আলোকরথ।
কুরআন-সুন্নাহর পথে যে রাখে দৃঢ় পা,
দুনিয়া ও আখিরাতে তার সফলতা মন্দ নয় তা।
সত্যের পথে চললে বাধা আসতে পারে ভাই,
অন্যায়ের শক্তি কখনো সহজে হার মানে নাই।
মিথ্যার দল চক্রান্ত করে, বাধা দেয় পথে,
মুমিন তখন ধৈর্য ধরে আল্লাহরই ভরসাতে।
মানুষ যত চক্রান্ত করুক, আল্লাহ সবই জানেন,
গোপন যত পরিকল্পনা—তাঁর জ্ঞানের মাঝে টানেন।
আল্লাহর পরিকল্পনার কাছে মানুষের ষড়যন্ত্র ক্ষীণ,
সত্যের শেষ বিজয় হবে—এ বিশ্বাস রাখো দিনরাত।
তাই বিপদ এলে ভেঙে পড়ো না, হারিয়ে ফেলো আশা,
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো, হৃদয়ে রাখো ভালোবাসা।
অন্যায় কোরো না কখনো, অন্যায় সহ্যও নয়,
ন্যায়ের পথে অবিচল থাকো—সেখানেই সত্য জয়।
অন্যায়কারী কিছুদিন যদি পায় অবকাশ,
ভাবো না সে জিতে গেছে, শেষ হয়েছে সর্বনাশ।
আল্লাহ কখনো অবকাশ দেন প্রজ্ঞাময় কারণে,
কিন্তু হিসাবের দিন আসবেই—রেখো তা মনে।
আজ যে অন্যের হক নষ্ট করে হাসে,
কাল তাকে দাঁড়াতে হবে আল্লাহরই আদালতে।
আজ যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে করে বড়,
সত্যের দিনে প্রকাশ পাবে তার সবকিছুই খোলস ভেদ করে।
তাই সময় থাকতে তাওবা করো, ফিরে এসো রবের পানে,
পাপের পথ ছেড়ে দাও, সত্যকে রাখো প্রাণে।
জীবন যতদিন আছে হাতে, সুযোগ ততদিন,
মৃত্যু এলে বন্ধ হবে তাওবার দুয়ার তখন।
সফলতা শুধু ধন নয়, শুধু নয় সম্মান,
সফলতা হলো ঈমান, তাকওয়া, নেক আমল ও ঈমানি প্রাণ।
সম্পদ থাকুক, কিন্তু যেন হারাম পথে নয়,
জ্ঞান থাকুক, কিন্তু তাতে অহংকার যেন না হয়।
ক্ষমতা থাকুক, তবু যেন ন্যায় থেকে না সরি,
কথা বলি সত্য, কারও হক যেন নষ্ট না করি।
পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়—সবার হক দিই,
আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় নেক জীবন গড়ি।
হে মানুষ, কোথায় চলেছ? একবার ফিরে দেখো,
জীবনের এই ক্ষণিক পথের শেষটা মনে রেখো।
আজ তুমি পথিক, কাল হবে তোমার বিদায়,
কেউ জানে না কখন এসে মৃত্যুর ডাক শোনায়।
যৌবন যাবে, শক্তি যাবে, যাবে ধন-মান,
একদিন থেমে যাবে জীবনের সব গান।
থেকে যাবে তোমার আমল, থেকে যাবে নাম,
মানুষের হক ও নেক কাজ—সাক্ষী হবে তারই দাম।
তাই আজই ফিরে এসো আল্লাহর পথে,
আজই নিজেকে গড়ো ঈমানের শক্তিতে।
নামাজ কায়েম করো, কুরআন পড়ো মন দিয়ে,
সুন্নাহর আদর্শ ধরো ভালোবাসা দিয়ে।
রাত্রির তারকা জ্বলে, বলে—“আলো চিনে নাও,”
নিজের সৃষ্টি স্মরণ করে অহংকার সব ছাড়াও।
ফেরেশতার নজর আছে—সতর্ক হয়ে চলো,
হিসাবের দিন আসবে—আজই প্রস্তুত হও।
কুরআন হলো সত্যবাণী, আঁকড়ে ধরো প্রাণে,
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো বিপদ-আপদে টানে।
অন্যায়ের কাছে মাথা নত কোরো না কোনোদিন,
সত্যের পথে অবিচল থেকো সকাল-সাঁঝ-রাতদিন।
দুনিয়া ক্ষণিক, আখিরাত চিরস্থায়ী ধাম,
নেক আমলই সঙ্গী হবে, থাকবে না ধন-দাম।
তাওহিদ, তাকওয়া, ইখলাস নিয়ে জীবন করো গড়া,
কুরআন-সুন্নাহর সরল পথে থাকো সদা দৃঢ় দাঁড়া।
রাত্রির আকাশ সাক্ষী থাক, তারার আলো জাগুক,
মানুষের ঘুমন্ত অন্তর ঈমানের আলোয় জাগুক।
অহংকার মুছে যাক, মুছে যাক পাপের আঁধার,
আল্লাহর আনুগত্যে ভরে উঠুক জীবন-সংসার।
শেষে শুধু এই প্রার্থনা হৃদয়ের অন্তর হতে—
হে আল্লাহ, রাখো আমাদের তোমারই আনুগত্যে।
গোপন-প্রকাশ্য সব পাপ থেকে আমাদের বাঁচাও,
সত্যের পথে অটল রেখে ঈমানের আলো দাও।
কিয়ামতের কঠিন দিনে দয়া করে ক্ষমা করো,
হিসাবের সেই মহাদিনে রহমতের ছায়া ধরো।
কুরআন-সুন্নাহর পথে চলার তাওফিক দাও,
দুনিয়া ও আখিরাতে তোমার সন্তুষ্টি পাওয়ার তাওফিক দাও।
হে আল্লাহ—ঈমান দাও, তাকওয়া দাও, নেক আমলের শক্তি দাও,
কুরআন-সুন্নাহর সরল পথে অবিচল থাকার তাওফিক দাও।
দুনিয়ার পরীক্ষায় ধৈর্য দাও, আখিরাতে নাজাত দাও—
তোমার রহমতের ছায়ায় আমাদের স্থান দাও।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
১৪
২৪ মন্তব্য