সহকারী অধ্যাপক
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
বাবা: দায়িত্বের পাহাড়, ত্যাগের নীরবতা ও অব্যক্ত বেদনা -মোঃ মুজিবুর রহমান
বাবা: দায়িত্বের পাহাড়, ত্যাগের নীরবতা ও অব্যক্ত বেদনা
(পরিবারের সবার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন, সময় ও সামর্থ্য হারিয়ে ফেলা এক বাবার জীবনসংগ্রাম)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বাবা মানে শুধু একটি পরিচয় নয়; বাবা মানে দায়িত্বের বিশাল ভার, অসংখ্য প্রত্যাশার চাপ, সীমাহীন ত্যাগ আর বুকের গভীরে জমে থাকা হাজারো অব্যক্ত বেদনা। বাবা মানে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর নিরন্তর চেষ্টা, অথচ নিজের চোখের জল আড়াল করে রাখার নীরব অভ্যাস। তিনি কখনো জীবনসঙ্গীর অভিমান ও প্রত্যাশা পূরণে ব্যস্ত, কখনো মা-বাবার আবদার ও অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট, কখনো ভাই-বোনের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে তৎপর, আবার কখনো সন্তানের লালন-পালন, পড়ালেখা, চিকিৎসা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্বে অবিরাম ছুটে চলেন। এর পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখা, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় বহন করাও যেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এত সব দায়িত্বের ভিড়ে একসময় প্রশ্ন জাগে—সবার জন্য এত কিছু করার পর একজন বাবার নিজের জন্য কী অবশিষ্ট থাকে?
একজন বাবা সংসারের হাল ধরেন, অভাবের সঙ্গে লড়াই করেন, সীমিত আয় দিয়ে অসংখ্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। মাসের শুরুতে যে অর্থ হাতে আসে, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা নানা খাতে ব্যয় হয়ে যায়। সন্তানের শিক্ষার খরচ, পরিবারের খাবার, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল—একটির পর একটি প্রয়োজন এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে। কোনো কোনো সময় নিজের প্রয়োজনকে পিছনে ফেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হয় তাঁকে।
জীবনসঙ্গীরও থাকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও সুন্দর জীবনযাপনের প্রত্যাশা। মা-বাবার থাকে সন্তানের প্রতি অধিকার ও স্বাভাবিক আবদার। ভাই-বোনের থাকে পারিবারিক সম্পর্কের টান ও কিছু চাওয়া-পাওয়া। সন্তানদের থাকে বয়সোপযোগী স্বপ্ন, আনন্দ, শিক্ষা ও উন্নত ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। প্রত্যেকের চাহিদার পেছনে থাকতে পারে যৌক্তিক কারণ; কিন্তু সব চাহিদা পূরণ করার মতো অর্থ, সময় ও শক্তি কি একজন মানুষের থাকে?
প্রত্যাশা অনেক হতে পারে, কিন্তু মানুষের সামর্থ্য সীমিত। এই সহজ সত্যটি যখন পরিবার ভুলে যায়, তখন ভালোবাসার সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়, সহযোগিতার জায়গায় অভিযোগ জন্ম নেয় এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন বাবা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
মা-বাবার হক আদায়: ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্বের বন্ধন
ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। মহান আল্লাহ বলেন—
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:২৩)
এই নির্দেশনা আমাদের শেখায়, মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, কোমল আচরণ, সেবা ও যথাসাধ্য সহযোগিতা সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাঁদের বার্ধক্যে পাশে থাকা, প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা এবং তাঁদের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা ঈমানদার জীবনের মহৎ বৈশিষ্ট্য।
তবে মা-বাবার হক আদায়ের অর্থ এই নয় যে, একজন সন্তান নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সব চাহিদা পূরণ করতেই বাধ্য। ইসলামে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সামর্থ্য ও ন্যায়সংগত বিবেচনারও গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সুরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)
অতএব, একজন বাবার উচিত সাধ্য অনুযায়ী মা-বাবার সেবা করা, তাঁদের সম্মান বজায় রাখা এবং নিজের পরিবার ও অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে মা-বাবারও উচিত সন্তানের বাস্তব অবস্থা, আয় ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা বিবেচনা করা। ভালোবাসা তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে অধিকার আদায়ের পাশাপাশি অপরের সীমাবদ্ধতার প্রতিও সহমর্মিতা থাকে।
জীবনসঙ্গীর প্রত্যাশা ও স্বামীর নীরব সংগ্রাম
দাম্পত্য জীবন শুধু এক ছাদের নিচে বসবাসের নাম নয়; এটি পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্বাস, সহযোগিতা ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বন্ধন। স্বামী যেমন স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল, তেমনি স্ত্রীরও উচিত স্বামীর শ্রম, সীমাবদ্ধতা ও মানসিক অবস্থাকে উপলব্ধি করা। একজন স্বামী সংসারের ব্যয় বহন করতে গিয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন তাঁর প্রয়োজন শুধু অর্থনৈতিক হিসাবের স্বীকৃতি নয়; প্রয়োজন আন্তরিকতা, মানসিক প্রশান্তি এবং জীবনসঙ্গীর সহযোগিতা।
মহান আল্লাহ দাম্পত্য সম্পর্কের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, তিনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আর-রুম, ৩০:২১)
এই ভালোবাসা ও দয়ার দাবি হলো—কোনো চাহিদা পূরণ না হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ না করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা; কোনো সীমাবদ্ধতা দেখা দিলে অপমান না করে সমাধানের পথ খোঁজা। সংসারে অর্থের প্রয়োজন আছে, সুন্দর জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাও স্বাভাবিক। কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা প্রতিটি অপূর্ণতাকে ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরা দাম্পত্যের প্রশান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একজন বাবারও উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা রাগ বা নীরব অভিমানের মাধ্যমে নয়, বরং শান্ত ও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা। আর জীবনসঙ্গীর উচিত তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা। কারণ সংসার কোনো এক ব্যক্তির একক সংগ্রাম নয়; সংসার দুজন মানুষের সম্মিলিত পথচলা।
ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি দায়িত্ব: সামর্থ্য, সৌজন্য ও ভারসাম্য
পারিবারিক সম্পর্কের সৌন্দর্য রক্ষা করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। ভাই-বোনের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করা, অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং বিপদে যথাসাধ্য সহযোগিতা করা মহৎ গুণ। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সৌজন্য রক্ষার অর্থ নিজের সামর্থ্যের সীমা অস্বীকার করা নয়। কারও চিকিৎসার প্রয়োজন হলে যথাসাধ্য সাহায্য করা প্রশংসনীয়; কোনো আত্মীয় বিপদে পড়লে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয়। তবে প্রতিটি সামাজিক আয়োজন, প্রত্যেকের প্রত্যাশা কিংবা সব আর্থিক সংকটের সমাধান একজন মানুষকেই করতে হবে—এমন ধারণা ন্যায়সংগত নয়।
একজন বাবার আয় যদি সীমিত হয়, তাহলে তাঁকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। নিজের স্ত্রী-সন্তানের মৌলিক প্রয়োজন, মা-বাবার প্রাপ্য অধিকার এবং অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী ভারসাম্য রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে অন্যদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে নিজের অবস্থার কথা বলতে হবে।
সহযোগিতা ভালোবাসার পরিচয়, কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া ভালোবাসার সঠিক প্রকাশ নয়। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যেমন ত্যাগ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বাস্তবতা বোঝার মানসিকতা।
সন্তানের লালন-পালন: দায়িত্ব, ত্যাগ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ
সন্তান একজন বাবার জীবনের অন্যতম বড় আমানত। তার খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য বাবা-মা উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে একজন বাবা নিজের বর্তমানের অনেক আনন্দ বিসর্জন দেন। নিজের পোশাক পুরোনো হলেও সন্তানের নতুন পোশাক কেনেন; নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিলেও সন্তানের চিকিৎসায় ব্যস্ত হন; নিজের স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেও সন্তানের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন।
কিন্তু সন্তান যখন বড় হতে থাকে, তখন তারও বোঝা প্রয়োজন—বাবার আয় সীমাহীন নয়, তাঁর শরীর ক্লান্ত হয়, তাঁর মনেও কষ্ট জমে এবং তাঁরও বিশ্রাম ও যত্নের প্রয়োজন রয়েছে।
সন্তানের প্রতিটি আবদার পূরণ করাই প্রকৃত ভালোবাসা নয়। বরং তাকে প্রয়োজন ও বিলাসিতার পার্থক্য শেখানো, অর্থের মূল্য বোঝানো, পরিশ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি করানো এবং অন্যের কষ্টের প্রতি সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলাই উত্তম অভিভাবকত্বের অংশ।
একটি পরিবার তখনই সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে, যখন সন্তান শুধু বাবার কাছ থেকে পাওয়ার হিসাব শেখে না; বরং বাবার শ্রমের মূল্য বুঝতে শেখে। সে যখন উপলব্ধি করে যে তার প্রতিটি সুযোগের পেছনে কারও ঘাম, সময় ও ত্যাগ রয়েছে, তখন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা বিকশিত হয়।
এত ত্যাগের পরও অভিযোগ কেন?
একজন বাবা অনেক দায়িত্ব পালন করেন, তবু কখনো কখনো তাঁকে শুনতে হয়—এটা কেন হলো না, ওটা কেন কিনে দিলে না, অন্যের মতো আমাদের জীবন হলো না কেন, এই কাজটি এখনো শেষ করোনি কেন?
এ ধরনের অভিযোগের পেছনে কখনো বাস্তব প্রয়োজন থাকে, কখনো ভুল বোঝাবুঝি, কখনো তুলনা, আবার কখনো অন্যের ত্যাগ উপলব্ধি করতে না পারার প্রবণতা কাজ করে। প্রত্যেক অভিযোগকে অকৃতজ্ঞতা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একজন মানুষের সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে বারবার দোষারোপ করাও ন্যায়সংগত নয়।
মানুষ অনেক সময় প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে পরিবারের জন্য একজন বাবা কী কী করেছেন, তা আড়ালে পড়ে যায়; চোখে পড়ে শুধু যে কাজটি এখনো হয়নি, যে প্রয়োজনটি অপূর্ণ রয়েছে কিংবা যে আবদারটি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন মানুষকে কি শুধু তাঁর অপূর্ণতার হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করা যায়? তাঁর নির্ঘুম রাত, নীরব দুশ্চিন্তা, ধারদেনার চাপ, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন এবং পরিবারের জন্য অবিরাম পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না?
একটি পরিবারে কৃতজ্ঞতার চর্চা থাকলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ হয়ে যায়। সেখানে কেউ শুধু বলে না, “এটা কেন হলো না?” বরং এটাও বলে, “তুমি এত কিছু করছ, তোমার কষ্ট আমরা বুঝি; আর কীভাবে তোমার পাশে দাঁড়াতে পারি?”
এই একটি বাক্যও ক্লান্ত মানুষের মনে নতুন শক্তি জোগাতে পারে।
বাবাও মানুষ, যন্ত্র নন
সমাজে বাবার কাছ থেকে প্রায়ই প্রত্যাশা করা হয়—তিনি সব সামলাবেন, সব সমস্যার সমাধান করবেন, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের প্রয়োজন বুঝবেন, অর্থের জোগান দেবেন এবং কখনো ভেঙে পড়বেন না। অথচ বাবারও শরীর আছে, মন আছে, সীমাবদ্ধতা আছে, বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। তাঁরও অসুস্থতা হয়, দুশ্চিন্তা হয়, স্বপ্ন থাকে, কখনো একাকিত্ব গ্রাস করে।
বাবার মুখের নীরবতা সব সময় তাঁর স্বস্তির প্রমাণ নয়। অনেক সময় তিনি কথা বলেন না, কারণ তাঁর মনে হয়—নিজের কষ্টের কথা বললে পরিবারের মানুষ আরও চিন্তিত হবে। কখনো তিনি নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করেন না, কারণ সংসারের প্রয়োজনই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। কখনো হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করেন, অথচ অন্তরে হিসাব কষেন—কোন খরচটি কমালে এই মাসটি পার করা যাবে?
তাঁরও প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তিনি নির্ভয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বলতে পারবেন; যেখানে তাঁর ব্যর্থতাকে বিদ্রূপ করা হবে না; যেখানে তাঁর সামর্থ্যের বাইরে দাবি না তুলে বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা হবে।
বাবারও যত্ন প্রয়োজন, বাবারও সম্মান প্রয়োজন, বাবারও একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা যদি এই সত্যটি উপলব্ধি করেন, তাহলে দায়িত্বের ভারও কিছুটা হালকা হয়ে আসে। কারণ ভালোবাসার অর্থ শুধু কারও কাছ থেকে পাওয়া নয়; ভালোবাসার অর্থ তাঁর ক্লান্তির সময় পাশে দাঁড়ানোও।
নিজের জন্য সময় রাখা কি স্বার্থপরতা?
পরিবারের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক বাবা নিজের প্রয়োজনকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না। তাঁরা মনে করেন, নিজের জন্য কিছু করা বুঝি স্বার্থপরতা। অথচ নিজের শরীর, মন, সময় ও সামর্থ্যের যথাযথ যত্ন নেওয়া দায়িত্ব পালনেরই একটি অংশ।
একজন বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর নিজের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একই সঙ্গে পরিবারের দায়িত্ব পালনের ক্ষমতাও কমে যায়। দীর্ঘদিন বিশ্রামের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও আর্থিক দুশ্চিন্তা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই নিজের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত সময়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
নিজের জন্য কিছু সময় রাখা মানে পরিবারকে অবহেলা করা নয়। বরং নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার মাধ্যমে পরিবারের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা।
একজন বাবা চাইলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে পারেন, জরুরি ও অনাবশ্যক খরচ আলাদা করতে পারেন এবং কার কোন দায়িত্ব কতটুকু ভাগ করে নেওয়া সম্ভব, তা আলোচনা করতে পারেন। বড়দের সহযোগিতা নেওয়া, সন্তানদের বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব শেখানো এবং জীবনসঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলাও সংসারের চাপ কমাতে পারে।
সব সমস্যার সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়। কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়া, পরিকল্পনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক কঠিন পরিস্থিতিও সহজ করা যায়।
ইসলামের শিক্ষা: দায়িত্বের সঙ্গে ন্যায়, দয়ার সঙ্গে সহযোগিতা
ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়, কিন্তু অন্যের প্রতি অবিচার করতে শেখায় না। ইসলাম মা-বাবার প্রতি সদাচরণ, স্ত্রী-সন্তানের হক আদায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করার শিক্ষা দেয়।
মহান আল্লাহ বলেন—
“সচ্ছল ব্যক্তি যেন তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করে, আর যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে।” (সুরা আত-তালাক, ৬৫:৭)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে মানুষের সামর্থ্য ও বাস্তব অবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। প্রত্যেকের আয় এক নয়, প্রত্যেকের পারিবারিক পরিস্থিতিও এক নয়। তাই একজনের জীবনযাত্রার সঙ্গে অন্যজনের জীবন তুলনা করে প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
একইভাবে, পরিবার পরিচালনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরও উচিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা অবলম্বন করা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং কারও ন্যায্য অধিকার অবহেলা না করা। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানানো মানে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং দায়িত্বকে বাস্তবতার আলোকে পরিচালনা করা।
ইসলামি মূল্যবোধের সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও সীমাবদ্ধতার প্রতিও যত্নশীল হয়। সেখানে বাবা শুধু উপার্জনকারী নন; তিনি সম্মান, ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাওয়ারও যোগ্য একজন মানুষ।
পরিবার হোক অভিযোগের নয়, সহযোগিতার আশ্রয়
একটি সুখী পরিবার মানে এমন পরিবার নয়, যেখানে কারও কোনো চাহিদা নেই কিংবা কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। বরং সুখী পরিবার হলো সেই পরিবার, যেখানে সমস্যা দেখা দিলে সবাই মিলে সমাধান খোঁজে; অর্থের সংকট দেখা দিলে ব্যয়ের পরিকল্পনা করে; কোনো আবদার পূরণ না হলে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে; কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে দোষারোপ না করে বিশ্রাম ও সহযোগিতার সুযোগ দেয়।
জীবনসঙ্গী যদি স্বামীর সীমাবদ্ধতা বোঝেন, স্বামী যদি স্ত্রীর প্রয়োজন ও অনুভূতির মূল্য দেন, মা-বাবা যদি সন্তানের বাস্তবতা বিবেচনা করেন, সন্তান যদি বাবার ত্যাগ উপলব্ধি করে এবং ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন যদি পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব ধারণ করেন, তাহলে একটি পরিবারে দায়িত্বের ভার অনেকটাই ভাগ হয়ে যায়।
সব দায়িত্ব একজনের কাঁধে তুলে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে অবিরাম সাফল্য প্রত্যাশা করার পরিবর্তে প্রত্যেকে যদি নিজের জায়গা থেকে সহযোগিতা করেন, তাহলে সংসার শুধু ব্যয়ের হিসাবেই নয়, ভালোবাসার বন্ধনেও সমৃদ্ধ হবে।
পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মনে রাখা উচিত—মানুষের প্রয়োজনের শেষ নেই, কিন্তু সময়, অর্থ ও শক্তির সীমা আছে। তাই চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রয়োজন সংযম, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
উপসংহার: বাবার ত্যাগ বুঝুক পরিবার, তাঁর মনেও ফুটুক প্রশান্তির ফুল
বাবা পরিবারের জন্য ছায়া হয়ে দাঁড়ান, ঝড়ের মুখে আশ্রয় হয়ে থাকেন, অভাবের দিনে সাহস জোগান এবং ভবিষ্যতের আশায় বর্তমানের অনেক সুখ বিসর্জন দেন। কিন্তু সেই বাবার জীবনও যেন কেবল দায়িত্বের ভার, অভিযোগের চাপ ও অপূর্ণতার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
তাঁর ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, তাঁর সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করা হোক, তাঁর কষ্ট মন দিয়ে শোনা হোক। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে শুধু দায়িত্ব পালনের মানুষ হিসেবে নয়, ভালোবাসা ও যত্নের অধিকারী একজন মানুষ হিসেবেও দেখুন।
একজন বাবা সব চাহিদা পূরণ করতে পারবেন না—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু তিনি যদি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন, তবে তাঁর সেই প্রচেষ্টার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একইভাবে, বাবারও উচিত পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে স্পষ্ট থাকা এবং দায়িত্ব পালনে ন্যায়সংগত ভারসাম্য বজায় রাখা।
মনে রাখতে হবে, সংসার শুধু একজনের ত্যাগে টিকে থাকে না; সংসার সুন্দর হয় সবার সহযোগিতায়। ভালোবাসা শুধু দাবি করার মধ্যে নয়, অন্যের কষ্ট বোঝার মধ্যেও; দায়িত্ব শুধু বহন করার মধ্যে নয়, ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও।
যে পরিবার বাবার ঘামকে সম্মান করে, তাঁর ক্লান্তিকে বোঝে, তাঁর সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয় এবং তাঁর পাশে দাঁড়ায়, সেই পরিবারেই দায়িত্বের মধ্যে ভালোবাসা, অভাবের মধ্যে সংযম এবং জীবনের সংগ্রামের মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের পরিবারগুলোকে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়সংগত দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করুন। যাঁরা পরিবারের জন্য নীরবে সংগ্রাম করেন, তাঁদের কষ্ট লাঘব করুন, হালাল রিজিকে বরকত দিন, তাঁদের শরীর ও মনে প্রশান্তি দান করুন। আমাদের প্রত্যেককে অন্যের ত্যাগের মর্যাদা বুঝতে, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে এবং সামর্থ্যের সীমার মধ্যে সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে তাওফিক দিন। আমিন।
১৮
২৯ মন্তব্য