সহকারী শিক্ষক
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মাওলানা সব্বির আহমদ উসমানী—যিনি ছিলেন বহুমুখী জ্ঞানের এক জীবন্ত পাঠশালা
মাওলানা সব্বির আহমদ উসমানী—সবার কাছে যিনি ‘উসমানী সাহেব’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল মাদরাসার আরবি বিষয়ের এই সহকারী অধ্যাপক ছিলেন প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য, বিনয় ও নিরহংকারিতার এক বিরল সমন্বয়। তাঁর বহুমুখী জ্ঞান, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, দায়িত্বনিষ্ঠা এবং অনাড়ম্বর জীবনাচরণ তাঁকে আমাদের স্মৃতিতে এক স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
মাদরাসায় শিক্ষকদের বিশেষ নামে পরিচিত হওয়ার একটি স্বতন্ত্র রীতি ছিল। অধ্যক্ষ মহোদয় আবু বকর সাহেবকে ডাকতেন ‘বড় হুজুর’, উপাধ্যক্ষ মাওলানা ইউসুফ সাহেবকে ডাকতেন "কামেল সাহেব ; সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা ইদ্রিছ সাহেবকে ‘জাদিদ সাহেব’—আর মাওলানা সব্বির আহমদ ছিলেন সবার প্রিয় ‘উসমানী সাহেব’। নামগুলোই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্মারক।
তিনি ২০১২ সালে শিক্ষকতাকালীন ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্ম নেওয়া বিদগ্ধ মনীষী। তাঁর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন এবং কলাউজান দারুচ্ছুন্নাহ আলিম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা।
তিনি ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছন। পূর্ব কলাউজানের মিয়াজি পাড়ায় বাড়ির পাশের কবরস্থানে তিনি শায়িত আছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আরবি বিষয়ের শিক্ষক হয়েও তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল বিস্ময়কর। অঙ্ক, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সাবলীলভাবে পাঠদান করতে পারতেন। কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে অধ্যক্ষ মহোদয় তাঁকে যে শ্রেণিতেই পাঠাতেন, সেখানেই তাৎক্ষণিক প্রস্তুতিতে চমৎকার পাঠদান করে আসতেন। এমনকি নবম কিংবা দশম শ্রেণির অঙ্কের শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও তিনি সেই শ্রেণিতে গিয়ে অঙ্কের ক্লাস নিতে পারতেন। পারতেন ফাজিল শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি পড়াতে। ক্লাসে প্রবেশের পর কয়েক মিনিট চোখ বুলিয়েই পুরো পিরিয়ডজুড়ে সাবলীলভাবে পাঠদান করার অসাধারণ সক্ষমতা ছিল তাঁর। আমরা অনেকেই নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেই শিক্ষকতা করি; কিন্তু তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর জ্ঞানের ব্যাপ্তি, স্মৃতিশক্তি ও তাৎক্ষণিক পাঠদানের ক্ষমতা আমাদের বিস্মিত করত।
তিনি ছিলেন যেন জ্ঞানের এক মহাসমুদ্র—পাণ্ডিত্যে অনন্য, প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ, অথচ বিনয় ও নিরহংকারিতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা যেমন ছিল বিস্ময়কর, তেমনি তাঁর অনাড়ম্বর জীবন ছিল আমাদের জন্য এক জীবন্ত আদর্শ।
একজন বড় মাপের আলেম ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হয়েও তাঁর মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না। অধ্যক্ষ মহোদয়ের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা, নম্র আচরণ এবং বিনীত চলাফেরা আমাদের মুগ্ধ করত। অধ্যক্ষ মহোদয় যে শ্রেণিতে পাঠাতেন, কোনো অজুহাত ছাড়াই সেখানে চলে যেতেন। তাঁর জীবনাচরণ থেকেই আমরা শিখেছি—বিনয় কেবল মুখের কথা নয়; বরং আচরণে, দায়িত্ব পালনে এবং অন্যকে সম্মান করার মধ্যেই বিনয়ের প্রকৃত প্রকাশ।
পরীক্ষার আগে হুজুর অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্ল্যাকবোর্ডে সাজেশন লিখে দিতেন। আমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে সেগুলো খাতায় তুলে নিতাম, ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতাম এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতাম। তাঁর সাজেশন দেওয়ার ধরন, বিষয়বস্তুর বিন্যাস এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রতি আন্তরিকতা আজও স্মৃতিতে অমলিন।
ক্লাসে পড়ানোর সময় তিনি কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাঘাত পছন্দ করতেন না। তাঁর পাঠদানের স্বাভাবিক ছন্দে কেউ বিঘ্ন ঘটালে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন। তাই কেউ ক্লাসে ডিস্টার্ব করলে কখনো কখনো তাকে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন। পাঠে মনোযোগী করা এবং শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন কঠোর।
পরীক্ষার হলে তাঁর দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। দায়িত্ব পালনে তিনি কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দিতেন না। ছোট-বড় সবার ক্ষেত্রেই নিয়মকানুন সমানভাবে প্রয়োগ করতেন। এমনকি অনেক বড় ভাইকেও নকল করার সময় তাঁর হাতে ধরা পড়তে দেখেছি। অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে তিনি প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতেন।
দায়িত্ব পালনে তাঁর এই আপসহীনতা আমাদের শিখিয়েছে—শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের বিষয় নয়; সততা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চর্চাও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, নিজের দায়িত্বনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে ভূমিকা রাখেন।
মাদরাসার কল্যাণে তাঁর আত্মনিবেদন ছিল অতুলনীয়। সহকারী অধ্যাপক হয়েও হেমন্তে নতুন ধান ওঠার মৌসুমে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদরাসার জন্য ধান ও অনুদান সংগ্রহ করতেন। প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও সমৃদ্ধির চিন্তা তাঁকে সব সময় তাড়িত করত। মাদরাসার কল্যাণে তিনি নিজের পদমর্যাদা বা ব্যক্তিগত সম্মানকে কখনো বাধা হতে দেননি।
২০০০ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর কয়েক বছর বার্ষিক পরীক্ষার ছুটিতে তাঁর সঙ্গে বলিপাড়া ও মিয়াজি পাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে অনুদান সংগ্রহে গিয়েছি। আমাদের সঙ্গে থাকতেন সিনিয়র শিক্ষার্থী সাহাব উদ্দিন ও নাজিম উদ্দীন। সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
একদিন দুপুরে তিনি আমাদের জন্য নিজ হাতে বিনি চালের ভাত রান্না করেছিলেন। বিনি চাল রান্নার জন্য নারিকেল কিনতে তিনি হেঁটে কানুরাম বাজারে গিয়েছিলেন। স্মৃতির পাতায় জমে থাকা এই ছোট্ট ঘটনাটিও আজ বড় মমতাময় হয়ে ধরা দেয়। কারণ, এর মধ্যে ফুটে ওঠে একজন শিক্ষকের স্নেহ, আন্তরিকতা ও নিরহংকারী হৃদয়ের পরিচয়। তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে ছিল অভিভাবকসুলভ মমতা ও আন্তরিকতা।
মাদরাসার জন্য ধান ও অনুদান সংগ্রহে তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সেই দিনগুলো আজও মনে করিয়ে দেয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা কেবল কথায় প্রকাশ পায় না; তা প্রকাশ পায় শ্রমে, ত্যাগে, দায়িত্বে এবং নিঃস্বার্থ অবদানে।
মাওলানা সব্বির আহমদ উসমানী কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি; নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমেও আমাদের শিখিয়েছেন বিনয়, নিরহংকারিতা, শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধের পাঠ। তাঁর বহুমুখী পাণ্ডিত্য আমাদের মুগ্ধ করেছে, তাঁর কর্মনিষ্ঠা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, আর তাঁর অনাড়ম্বর জীবন আমাদের শিখিয়েছে—প্রকৃত মহত্ত্ব কখনো অহংকারের মুখাপেক্ষী নয়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর পাঠদান, ব্ল্যাকবোর্ডে সাজেশন লিখে দেওয়ার দৃশ্য, শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা, পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনের আপসহীনতা এবং মাদরাসার কল্যাণে ছুটে চলার স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ে জীবন্ত।
তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক মহাসমুদ্র, পাণ্ডিত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং বিনয় ও নিরহংকারিতার এক জীবন্ত আদর্শ। বহুমুখী জ্ঞান, অনাড়ম্বর জীবন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি আমাদের স্মৃতির আঙিনায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের সকল নেক আমল কবুল করুন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।
جَزَاهُ اللَّهُ خَيْرًا، وَجَعَلَ الْجَنَّةَ مَثْوَاهُ
অর্থ: আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং জান্নাতকে তাঁর আবাসস্থল বানিয়ে দিন।
سَقَى اللَّهُ ثَرَاهُ، وَجَعَلَ الْجَنَّةَ مَثْوَاهُ
অর্থ: আল্লাহ তাঁর কবরের মাটিকে সিক্ত করুন এবং জান্নাতকে তাঁর আবাসস্থল বানিয়ে দিন। আমিন।
লেখক: নাজিম উদ্দীন প্রাক্তন শিক্ষার্থী
#স্মরণ #প্রিয়_শিক্ষক #kalauzanshahrashidiafazilmadrasah #kalauzan #lohagara_satkania
#MadrasaEducation #MadrasahBoard #Chattogram
৮
৮ মন্তব্য