Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৪৮ অপরাহ্ণ

সরিষার তেল বেশি উপকারী নাকি সয়াবিন তেল

সরিষার তেল বেশি উপকারী নাকি সয়াবিন তেল


পুষ্টিগুণের দিক থেকে সরিষা ও সয়াবিন তেলের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? 


সকাল কিংবা সন্ধ্যায় রান্নাঘরে ঢুকলেই নাকে আসে পরিচিত এক গন্ধ। কড়াইয়ে তেল গরম হচ্ছে, তাতে পেঁয়াজ পড়তেই শুরু হয়েছে ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দ। একটু পর সেই তেলেই ভাজা হচ্ছে বেগুনি, আলুর চপ কিংবা মাছ। রান্নাঘরের এই ছোট্ট দৃশ্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। কিন্তু কড়াইয়ের সেই তেলটা কী সরিষা নাকি সয়াবিন?


বাংলাদেশের রান্নাঘরে দুই ধরনের তেলেরই ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। সরিষার তেলের ঝাঁজালো গন্ধ ও স্বাদ অনেকের পছন্দ। আবার সয়াবিন তেলের স্বাদ তুলনামূলক হালকা হওয়ায় দৈনন্দিন রান্নায় এর ব্যবহারও অনেক। কিন্তু পুষ্টিগুণের দিক থেকে এই দুই তেলের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে, তেল আসলে কী?


সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি থাকে, আর সয়াবিন তেলে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি থাকে। সরিষার তেলে স্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণও তুলনামূলক কম।

তেল মানেই চর্বি

সরিষার তেল হোক কিংবা সয়াবিন তেল, দুটিই মূলত চর্বি। তাই এগুলো ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার। ১০০ গ্রাম তেলে প্রায় ৮৮৪ কিলোক্যালরি শক্তি থাকে। ১ গ্রাম চর্বি থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৯ কিলোক্যালরি শক্তি। অর্থাৎ কোন তেল ব্যবহার করছি, তার পাশাপাশি কতটা তেল ব্যবহার করছি, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।


তেলের পুষ্টিগুণ বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এতে থাকা চর্বির ধরন। খাদ্যের চর্বিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। স্যাচুরেটেড১ বা সম্পৃক্ত চর্বি, মনো-আনস্যাচুরেটেড২ বা একক অসম্পৃক্ত চর্বি এবং পলি-আনস্যাচুরেটেড৩ বা বহু অসম্পৃক্ত চর্বি।


১০০ গ্রাম সরিষার তেলে প্রায় ১১.৬ গ্রাম স্যাচুরেটেড, ৫৯.২ গ্রাম মনো-আনস্যাচুরেটেড এবং ২১.২ গ্রাম পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি থাকে। অন্যদিকে ১০০ গ্রাম সয়াবিন তেলে প্রায় ১৪.৯ গ্রাম স্যাচুরেটেড, ৪৩ গ্রাম মনো-আনস্যাচুরেটেড এবং ৩৭.৬ গ্রাম থাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি। অর্থাৎ সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি থাকে, আর সয়াবিন তেলে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি থাকে। সরিষার তেলে স্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণও তুলনামূলক কম।


কিন্তু এই পার্থক্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ বেশি পরিমাণ স্যাচুরেটেড চর্বি রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরলের৪ মাত্রা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে স্যাচুরেটেড চর্বির পরিবর্তে মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি গ্রহণ করলে তা হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে।


তেলের অপকারিতা কোথায়

দুই তেলেরই সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এগুলো অত্যন্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ। রান্নায় তেল বেশি ব্যবহার করলে খাবারের ক্যালরি দ্রুত বেড়ে যায়। তাই স্বাস্থ্যকর তেল হলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। আরেকটি বিষয় হলো, তেল বারবার গরম করা। একই তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তেলের অক্সিডেশন বাড়তে পারে এবং তেলের গুণগত পরিবর্তন ঘটতে পারে।


আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ব্যবহৃত রান্নার তেল পুনরায় গরম বা ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়। তেল ধোঁয়া ওঠার পর্যায়ে পৌঁছালে সেটি নষ্ট হতে শুরু করতে পারে। তাই একবার রান্নায় ব্যবহার করা তেল বারবার গরম করে ব্যবহার না করাই ভালো। বিশেষ করে একই তেলে বারবার ভাজাপোড়া করার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।


সয়াবিন তেলের বিশেষত্ব কোথায়

সয়াবিন তেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে রয়েছে লিনোলিক অ্যাসিড। এটি একধরনের ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড। লিনোলিক অ্যাসিড শরীরের জন্য বেশ প্রয়োজনীয়। শরীর নিজে এটি তৈরি করতে পারে না, তাই খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। সয়াবিন তেলে ভিটামিন ই থাকে। এই ভিটামিন শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।


আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলকে এমন তরল উদ্ভিজ্জ তেলের মধ্যে রেখেছে, যেগুলোতে অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি এবং স্যাচুরেটেড চর্বি তুলনামূলক কম। স্যাচুরেটেড চর্বির বদলে এ ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করলে রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সয়াবিন তেলকে স্বাস্থ্যকর বলেই ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এটিও তেল, অর্থাৎ মূলত চর্বি এবং ক্যালরির উৎস। বেশি তেল ব্যবহার করলে খাবারের মোট ক্যালরিও বেড়ে যায়।


সরিষা নাকি সয়াবিন, কোনটি এগিয়ে

এখন আগের প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। সরিষার তেল নাকি সয়াবিন তেল, কোনটি বেশি উপকারী? এককথায় বলতে গেলে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, দুই তেলের চর্বির গঠন আলাদা। সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি, সয়াবিন তেলে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেশি। সরিষার তেলে কিছু এএলএ থাকে, সয়াবিন তেলে লিনোলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন ই পাওয়া যায়। আবার সরিষার তেলের ক্ষেত্রে এরুসিক অ্যাসিডের পরিমাণ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।


তাই শুধু ‘কোন তেল ভালো’—এই প্রশ্নের চেয়ে বরং ‘কোন তেলে কী আছে এবং কতটা ব্যবহার করছি’—এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শও মূলত একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়। স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিবর্তে মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বেছে নেওয়া ভালো।


তেলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পুরো খাবার

ধরা যাক, একজন সরিষার তেল ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই তেলে প্রতিদিন অনেক বেশি পরিমাণে পরোটা, আলুর চপ কিংবা ডুবোতেলে ভাজা খাবার তৈরি করেন। অন্যদিকে আরেকজন সয়াবিন তেল ব্যবহার করেন, কিন্তু রান্নায় অল্প তেল দেন এবং খাবারে শাকসবজি, ডাল, মাছসহ নানা ধরনের খাবার রাখেন। শুধু তেলের নাম দেখে এই দুই খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কোনটি ভালো, তা বলা যাবে না।


আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে আমাদের পুরো খাদ্যাভ্যাস। যেমন কত ক্যালরি খাচ্ছি, কী ধরনের খাবার খাচ্ছি, কতটা তেল ব্যবহার করছি এবং শারীরিকভাবে কতটা সক্রিয় থাকছি। তাই কোনো একটি তেলকে সুপারফুড ভাবারও কারণ নেই, আবার কোনো একটি তেলকে সব পরিস্থিতিতে খারাপ বলারও সুযোগ নেই।


লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: প্রথম আলো, বিজ্ঞানচিন্তা ও ফুড স্ট্রাক্ট

টীকা

১. স্যাচুরেটেড চর্বি: যে চর্বির ফ্যাটি অ্যাসিডের কার্বন পরমাণুগুলোর মধ্যে কোনো দ্বিবন্ধন থাকে না (অর্থাৎ কার্বনগুলো যতটা সম্ভব হাইড্রোজেন দিয়ে পূর্ণ থাকে), তাকে সম্পৃক্ত চর্বি বলে। যেমন- মাখন, ঘি, চর্বিযুক্ত মাংস, নারকেল তেল ও পাম তেলে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

২. মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বি: এটি এমন একধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি, যার ফ্যাটি অ্যাসিডে একটি কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন থাকে। অলিভ অয়েল, বাদাম, চিনাবাদাম ও অ্যাভোকাডোতে এই ধরনের চর্বি পাওয়া যায়।

৩. পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি: যে অসম্পৃক্ত চর্বির ফ্যাটি অ্যাসিডের কার্বন শৃঙ্খলে দুই বা তার বেশি কার্বন-কার্বন দ্বিবন্ধন থাকে, তাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি বলে। সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল, ভুট্টার তেল, তৈলাক্ত মাছ ইত্যাদিতে এই চর্বি পাওয়া যায়।

৪. খারাপ কোলেস্টেরল: এটি এমন একধরনের লিপোপ্রোটিন, যা রক্তের মাধ্যমে কোলেস্টেরলকে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয়। রক্তে এর মাত্রা বেশি হলে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ধমনির দেয়ালে জমে প্লাক বা আঠালো স্তর তৈরি করতে পারে, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

৫. লিনোলেনিক অ্যাসিড: এটি মূলত আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড নামে পরিচিত একটি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, তিসির তেল ও আখরোটে পাওয়া যায়।

৬. এরুসিক অ্যাসিড: এটি একধরনের মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। সরিষার তেলে প্রাকৃতিকভাবেই এটি থাকতে পারে, যা বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে হৃৎপেশির ক্ষতি হতে পারে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ