সহকারী শিক্ষক
৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রায় দুইশো বছর আগে যাকে বলা হতো ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’। রোমান সম্রাজ্ঞী থেকে মুঘল হারেম, বাংলার এই মেঘের মতো কাপড় ছাড়া রাজকীয়তা অসম্পূর্ণ ছিল। এই কাপড়ের নাম ছিল ঢাকাই মসলিন।
তারপর একদিন সব শেষ। ১৮৫০ সালে লন্ডনের এক প্রদর্শনীতে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল আদি মসলিন। তারপর ১৭০ বছরের নীরবতা। ইতিহাসের বইয়ে সে কেবল এক রূপকথা হয়ে রয়ে গেল।
সেই রূপকথাই এবার বাস্তব হয়ে ফিরছে। বিজ্ঞান, জিনোম গবেষণা আর গ্রামের ৩০০ নারীর আঙুলের জাদুতে শীতলক্ষ্যার পাড়ে আবার জন্ম নিয়েছে সেই হারানো মসলিন। আর এবার শুধু জাদুঘরের জন্য নয়, সরাসরি বিশ্ববাজারের জন্য।
ঢাকাই মসলিন কখনো শুধু কাপড় ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই রোমান, গ্রিক ও আরব বণিকদের কাছে এটি ছিল প্রথম সারির লাক্সারি ব্র্যান্ড। মুঘল আমলে এর শ্রেষ্ঠতম সংস্করণ ‘মলমল খাস’ শুধু সম্রাটদের জন্য সংরক্ষিত থাকত।
গুণ আর নকশা ভেদে এর ছিল কাব্যিক সব নাম - ‘আবে-রওয়ান’ মানে প্রবাহিত পানি, আর ‘শবনম’ মানে ভোরের শিশির।
এই শিল্প হারালো কেন? ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ম্যানচেস্টারের মিলে তৈরি সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, তাঁতিদের ওপর শাস্তিমূলক উচ্চ কর আর একটার পর একটা আঘাতে শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই সঙ্গে মেঘনা অববাহিকায় জন্মানো বিশেষ তুলা ‘ফুটি কার্পাস’ প্রকৃতি থেকে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কাঁচামাল ছাড়া মসলিনও হারিয়ে যায়।
হারানো মসলিনকে ফেরানোর গল্পটা কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘বাংলাদেশের সোনালী ঐতিহ্য মসলিন সুতা তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প।
নেতৃত্বে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন সহ দেশের শীর্ষ গবেষকরা। তাঁদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল দুটো - প্রথমত, সেই বিলুপ্ত ফুটি কার্পাস খুঁজে বের করা, দ্বিতীয়ত, সেই অতি-সূক্ষ্ম সুতা কাটার প্রযুক্তি ফেরানো।
গবেষক দল ১৭৮৮ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের উদ্ভিদতত্ত্বের বই, জেমস টেলরের ‘টপোগ্রাফি অফ ঢাকা’ সহ ঐতিহাসিক দলিল ঘেঁটে কাপাসিয়া, গাজীপুর, বাঘাবাড়ি, রাজশাহী থেকে ৩৯টি বন্য তুলার জাত সংগ্রহ করেন। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে অবশেষে শনাক্ত হয় আসল ফুটি কার্পাস। শুরু হয় নতুন করে চাষ।
শুধু তুলা নয়, মসলিন বোনার জন্য ৫০টিরও বেশি বিশেষায়িত হাতিয়ার নতুন করে বানাতে হয়েছে।
মসলিন বোনা শুধু শ্রম নয়, এক লোকজ বিজ্ঞান। ফুটি কার্পাসের সুতা এতটাই মিহি যে শুকনো বাতাসে ভেঙে যায়। তাই ভোরের সূর্য ওঠার আগে এবং সন্ধ্যার পরের আর্দ্র আবহাওয়াতেই সুতা কাটা হতো। শীতলক্ষ্যা নদীর প্রাকৃতিক আর্দ্রতাই ছিল এর জন্য আশীর্বাদ। তুলা সংগ্রহ থেকে শুরু করে বোয়াল মাছের চোয়ালের হাড় দিয়ে তুলা পরিষ্কার, তকলি-চরকায় সুতা কাটা, ধোয়া এবং বুনন পর্যন্ত ১৬টি কঠোর ধাপ পেরোতে হয়।
ফলাফল বিস্ময়কর। সাধারণ সুতির কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০, সেখানে পুনরুজ্জীবিত মসলিনের কাউন্ট ছাড়িয়ে গেছে ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক কাউন্টে। গবেষকদের ভাষায়, যা বর্তমানে তৈরি হওয়া মসলিনকে ভিক্টোরিয়া মিউজিয়ামে রাখা আদি মসলিনের ৯৯ শতাংশ কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি লেখা হয়েছে নারীদের হাতে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’। এখন এটি একই সঙ্গে উৎপাদন কেন্দ্র এবং জীবন্ত জাদুঘর।
প্রথম পর্যায়ে এখানে ৫৮ খন্ড মসলিন কাপড় তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি শাড়ি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় অর্জন মানবিক। কুমিল্লার চান্দিনা ও দেবিদ্বারে এখনো টিকে থাকা বয়স্ক কারিগরদের কাছ থেকে শিখে ৩২৭ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্পিনারে পরিণত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩০০ জনই আগে গৃহস্থালির কাজের বাইরে কোনো আয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এখন তাঁরা দিনে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন, কেউ কেউ প্রশিক্ষক হিসেবে মাসে ১৬ হাজার টাকার বেশি। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজের সময় হওয়ায় সংসার সামলেও তাঁরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
এতদিন মসলিন ছিল গবেষণাগারের বিষয়। এখন সময় বাণিজ্যের।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে এর একক মালিকানা নিশ্চিত করে।
সবচেয়ে আশার খবর, বিশ্ববাজার প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশের লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি অর্ডার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে, বাস্তবতা হলো, মসলিন কখনো সস্তা হবে না। একটি সুনিপুণ মসলিন শাড়ি বুনতে ২ থেকে ৪ জন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে। প্রাথমিক পর্যায়ে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ব্যাপক উৎপাদন শুরু হলে তা ১ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তাই শুরুতে এটি বিশ্ববাজারের উচ্চবিত্তদের জন্য প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন হিসেবেই জায়গা করে নেবে।
আর এখানেই বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা। তৈরি পোশাকের গন্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ এবার উচ্চ-মূল্যের লাক্সারি রপ্তানির বিশ্বমঞ্চে নিজের হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে। যে শাড়ি একদিন আংটির ভেতর দিয়ে গলে যেত, সেই শাড়িই আবার আমাদের অর্থনীতিকে নতুন পথ দেখাবে।
১৮
২৯ মন্তব্য