সহকারী শিক্ষক
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৮:৫৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ চতুর্থ
বিষয়ঃ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
অধ্যায়ঃ তৃতীয় অধ্যায়
চাকমা বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তারা নিজেদেরকে চাঙমা বলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলেই তাদের প্রধান বসতি। এখানে তারা আরও কয়েকটি আলাদা আদিবাসী সঙ্গে মিশ্রিত। চাকমাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সঠিক উপাত্ত পাওয়া যায় না। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেব অনুযায়ী তাদের সংখ্যা ১৯৫৬-তে ১,৪০,০০০ ও ১৯৮১-তে ২,৩০,০০০ ছিল বলে জানা যায়। ১৯৯১-এর আদমশুমারি অনুযায়ী, চাকমা জনসংখ্যা প্রায় ২,৫৩,০০০। চাকমাদের শতকরা ৯০ জনেরও বেশি রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় কেন্দ্রীভূত। অনুমান করা হয় ভারতের অরুণাচল, মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে চাকমাদের কিছু বসতি রয়েছে। ছোট ছোট দলে বেশকিছু চাকমা অন্যান্য দেশেও বসতি স্থাপন করেছে।আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণফুলি নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল। চাকমাদের আরও আগের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত। উভয় অভিমতে মনে করা হয়, চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার অধিবাসী। এ ছাড়াও তারা চট্টগ্রাম ও আরাকানের পাহাড়ি অঞ্চলে এককালে বসবাসকারী সাক (চাক, ঠেক) নামে এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। অপর তাত্ত্বিক অভিমতটির সমর্থনে কোনো ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। এ অভিমতে বলা হয়, চাকমারা উত্তর ভারতের চম্পকনগর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে আসে। আঠারো শতকের শেষের দিকে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলই নয় বরং আজকের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও তাদের বিক্ষিপ্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
১৮৬০ সালে সরকার পার্বত্য অঞ্চলের নিম্ন এলাকায় জুমচাষ নিষিদ্ধ করলে চাকমা চাষিরা (আরও অন্যান্য পাহাড়ি চাষি যেমন, মারমা সম্প্রদায়ের লোকেরাও) পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্বাঞ্চলে সরে যায়। ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো রাষ্ট্রের অংশ ছিল না, যদিও উত্তরে ত্রিপুরা, দক্ষিণে আরাকান ও পশ্চিমে বাংলার বিভিন্ন রাজশক্তির শাসনের কেন্দ্রগুলিতে ক্ষমতার টানাপোড়েনে অঞ্চলটি নানাভাবে প্রভাবিত হয়। সতেরো ও আঠারো শতকে মুগল রাজশক্তি এদের কাছ থেকে স্থানীয় মধ্যস্থদের হাত দিয়ে নজরানা হিসেবে তুলা আদায় করত। আর এসব আদিবাসী মধ্যস্থদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন চাকমা প্রধান, যার নিবাস ছিল কর্ণফুলি নদীর তীরে। চট্টগ্রামের সমতলভূমিতেও এ চাকমা প্রধানের বেশ বড় আকারের পারিবারিক ভূ-সম্পত্তি ছিল। এ সম্পত্তি ছিল মুগল এলাকার অভ্যন্তরে। তিনি সেখানেই তথা আজকের চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়ায় বাস করতে থাকেন।
চাকমারা মুগল সরকারের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন ছিল কারণ কেবল সুতার ওপর কিছু শুল্ক ছাড়া তাদের ওপর আর কোনো রাজস্ব ধার্য করা হতো না এবং তাদের সম্পুর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ নিজস্ব জীবন-পদ্ধতি অনুসরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৭৩৩ সালে চাকমা প্রধান শেরমাস্ত খান চাকলা রাঙ্গুনিয়া এলাকার জন্য জমিদারি সনদ লাভ করেন। এই এলাকাটি পাহাড়ি এলাকা হলেও চাষাবাদযোগ্য ছিল। জমিদার হওয়ার কারণে চাকমা প্রধান সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে আসেন। পুরাতন স্বায়ত্তশাসন নীতি পরিবর্তন করে উপনিবেশিক সরকার চাকমাদের সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তাদেরকে নগদ অর্থে রাজস্ব প্রদান করতে বলা হয়। রাঙ্গুনিয়া জমিদারি এলাকায় খাজনা-হার বৃদ্ধি করা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে চাকমা জীবনধারা জুম বা জায়গা বদল চাষের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থায়ীভাবে গ্রামের অধিবাসী চাকমারা তাদের আশপাশের পাহাড়ে কয়েক বছরের জন্য জমি চাষ করে, তারপর ওই জমি তারা ফেলে রাখে পুনরায় উর্বর ও আবাদযোগ্য হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। সমতলবাসীদের সঙ্গে চাকমাদের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন পর্যবেক্ষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাষিদের জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে উন্নত ছিল। সেখানে তখন ধান, তুলা ও সবজি উৎপন্ন হতো। বাঁশ ছিল অত্যন্ত জরুরি নির্মাণসামগ্রী। অন্যান্য কাজেও বাঁশের ব্যবহার এত বেশি ও বিচিত্র যে চাকমাদের জীবনধারাকে বাঁশের সভ্যতা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। উপনিবেশিক আমলে শিক্ষা লাভ করে ও সরকারি রাজস্বের একটা অংশবিশেষে পুষ্ট হয়ে সেখানকার সমাজ ক্রমেই বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হয়ে ওঠে ও তাদের মধ্যে একটি অভিজাত শ্রেণির সৃষ্টি হয়। বিশ শতকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাহাড়ি চাষাবাদ সমস্যাগ্রস্ত হয়। এর প্রধান কারণ, তখন থেকে জুমচাষে মধ্যবর্তী যে মেয়াদটিতে জমি স্বাভাবিক কারণে পতিত রাখতে হয় সেটা কমিয়ে আনতে হয়। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে চাকমাদেরকে আরও বেশি করে কৃষি-বহির্ভূত কাজ খুঁজে নিতে হয়। এ সমস্যা সরকারের জনসমষ্টি স্থানান্তরের নীতির কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে নিম্নভূমিতে আবাদে অভ্যস্ত হাজার হাজার গরিব বাঙালিকে সামরিক নিরাপত্তায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আনা হয়।