সহকারী প্রধান শিক্ষক
১২ জানুয়ারি, ২০২২ ০৭:০১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
বর্তমান বিশ্বে যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি, কোনো বিষয় জানা এবং বোঝা। আসলে মানুষ জন্মের পর থেকেই চারপাশের পরিবেশ থেকে নানান কিছু শিখতে থাকে। এ জন্যই কবি বলেছেন, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’। তবে যাই হোক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই আমরা শিক্ষা হিসেবে বুঝি। শিক্ষাই মানুষকে তার মনুষ্যত্ব অর্জনে সাহায্যে করে। তাই বলা হয় শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দিয়ে সম্প্রীতি বাড়ায়, কুসংস্কার দূর করে সমাজকে আলোকিত করে। আধুনা শিক্ষাকে দুটো শ্রেণীতে ভাগ করা হচ্ছেÑ সাধারণ শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক বা কারিগরি শিক্ষা। বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার অগ্রযাত্রার ফলেই পৃথিবী দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে চলছে। তাই কর্মমুখী শিক্ষা উন্নতি ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
মানবসম্পদ হচ্ছে মানুষের শক্তি, দক্ষতা, মেধা ও জ্ঞান যা পণ্য উৎপাদন ও সেবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। সমাজের সব মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াই হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পল জে মায়ার বলেছেন, ঞযব মৎবধঃবংঃ হধঃঁৎধষ ৎবংড়ঁৎপব ড়ভ ড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু রং রঃং ঢ়বড়ঢ়ষব. বিশিষ্ট চিন্তাবিদ কার্ল মার্ক্স মানুষকে মানবীয় মূলধারা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ মানবীয় মূলধারাকে আধুনিক পরিভাষায় মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানবসম্পদ উন্নয়ন হচ্ছেÑ প্রয়োজনীয় সব উপায়ের মাধ্যমে মানুষের উন্নয়ন। মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলোÑ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য তার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের পাশাপাশি তার সহজাত ও সুপ্ত ক্ষমতা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করেদেয়া। এই দৃষ্টিতে মানবসম্পদ বলতে একটি দেশের সব জনসংখ্যাকে বোঝায়, শুধু যোগ্য ও প্রশিক্ষিত জনশক্তিকে বোঝায় না, বরং অদক্ষ শ্রমিকদেরও বোঝায়। অর্থাৎ যারা উৎপাদন খাতে অবদান রাখে তাদের সবাইকেই মানবসম্পদ বলে।
মানব সন্তান সুনির্দিষ্ট কিছু সুপ্ত প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্দেশ্য হলোÑ এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে সবাই তাদের যোগ্যতার প্রসার ঘটাতে পারে এবং বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য সুযোগের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্মগত অধিকার আছে। এই সুযোগ সুবিধা লাভের সার্বজনীন স্বীকৃতি হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের মূলভিত্তি। মানবসম্পদ বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
আমাদের দেশে বর্তমানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা প্রচলিত। তার সাথে কারিগরি, প্রকৌশলী, ডাক্তারি, ভোকেশনাল ইত্যাদি কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাবে আমাদের দেশে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেনি। ফলে প্রচলিত পন্থায় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও লাখ লাখ যুবক বেকারত্বের অভিশাপে দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্ত। অথচ উন্নত দেশগুলোর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও পেশাভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত। এমনকি এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে কর্মমুখী শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পাঁচ শতাংশ কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত। যেখানে বাংলাদেশে তার পরিমাণ মাত্র এক শতাংশেরও কম। এর কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি অনভিপ্রেত উপেক্ষা। এমনকি সাম্প্রতিককালে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অনেক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণের যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবংইতোমধ্যে উন্নীত করা হয়েছে, তার মধ্যে কর্মমুখী শিক্ষার দিকটি যথেষ্ট উপেক্ষিত হয়েছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষা একেবারে সম্প্রসারিত হয়নি তা নয়। স্বাধীনতা অর্থবহ করে তুলতে হলে কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে আশাব্যঞ্জক এই যে, বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিপর্যায়ে কারিগরি, বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশে প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল, লেদার, সিরামিক, পাট, টেকনিক্যাল কলেজ, গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউট রয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। বস্ত্র শিল্প, জাহাজ শিল্প, চিনিকল, ইস্পাত ইত্যাদি শিল্পের দক্ষ কারিগর সৃষ্টির জন্য সহায়ক কর্মমুখী শিক্ষার দরকার রয়েছে। নতুন যুগোপযোগী জীবনসম্পর্কিত শিক্ষা পাঠ্যসূচি করতে হবে পর্যায়ক্রমে।
বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে আমাদের দেশে আছে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও কর্মসংস্থানের অভাব। তাই আর বিলম্ব না করে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও বিশ্বের জাতিগুলোর উন্নয়ন ও প্রগতির ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য শিক্ষাকে জীবনমুখী করে তোলার সময় এসেছে। জাতীয় প্রতিভার অপচয় আর অর্থনৈতিক প্রশ্ন বিবেচনায় এনে আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত অপরিহার্য।