সহকারী প্রধান শিক্ষক
২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৮:০৪ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
চারজন সহায়সম্বলহীন পরিবারের ছেলেমেয়ে। একজন মায়ের সঙ্গে ঝিয়ের কাজ করেছে। আরেকজন দিনমজুরি করেছে। দোকানে কাজ করতে হয়েছে আরেকজনকে। আর কাঠমিস্ত্রির সহকারীর মেয়েটি কত দিন না খেয়ে বিদ্যালয়ে গেছে। শিশু শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছে। এত অভাব, তবু এরা মনোবল হারায়নি। এরা এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছিল তারা।
কত দিন না খেয়ে স্কুলে গেছে দীপা
দীপা রানী রায়ের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার মিয়াপাড়া গ্রামে। বাবা কাঠমিস্ত্রির সহকারী নিরঞ্জন রায়। মা লক্ষ্মী রানী রায় গৃহিণী। পাঁচ শতক জমিতে ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। পড়ার খরচ জোগাতে দীপা আশপাশের বাড়ির শিশুদের প্রাইভেট পড়াত। অধিকাংশ সময় না খেয়ে স্কুল করেছে। ফিরে এসে পানি পান করে প্রাইভেট পড়াতে গেছে। রাতে তৈরি করেছে স্কুলের পড়া। দীপা এবার উপজেলার উত্তর শিমুলবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল।
দীপার মা লক্ষ্মী রানী রায় বলেন, ‘দীপা প্যাটে পাথর বান্দি নেকাপড়া করছে। ভালো খাওয়া ও জামাকাপড়
দিতে পারি না। তবু কিছু বলেনি।’
বাবা নিরঞ্জন রায় বলেন, ‘বাচ্চাদের খাবার জোগাড় করতে পারি না, পড়াম কেমন করি!’
ঝিয়ের কাজ করেছে রূপা
নাম তার রূপা আক্তার। বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার মধ্য শিহিপাশা গ্রামে। অভাবের জ্বালায় বাবা শফিকুল মিয়া পাঁচ-ছয় বছর আগে নিরুদ্দেশ হন। দুই মেয়েকে নিয়ে মা শিমু বেগম পড়েন ঘোর সংকটে। তিনজনের অন্ন জোগাতে শুরু করেন ঝিয়ের কাজ। তাদের দিন চলে যায় অর্ধাহারে-অনাহারে। উপজেলার গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য শাখায় পরীক্ষা দিয়েছিল সে।
মা শিমু বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর বড় মেয়ের দারুণ ঝোঁক। সব সময় তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলত, ‘মা আমি লেখাপড়া করতে চাই। তুমি আমার পড়ালেখার ব্যবস্থা করো। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা থেকেও না থাকার কষ্ট ঘুচিয়ে দেব। কী করব, মাইনষের বাড়িতে কাজ করে আর কত আয় হয়?’
দিনমজুরি করত মিজানুরশেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ধুপাকুড়া গ্রামের মিজানুর রহমান। বাবা মো. হযরত আলী রিকশাচালক। মা মরিয়ম বেগম গৃহিণী। ২৫ শতক ভিটেমাটি আছে। সেখানে মাটির ঘরে মা-বাবা ও তিন ভাইবোনের বসবাস। মিজানুর সবার বড়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি দিনমজুরি করতে হতো।
মা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘মিজান সারা বছর সংসারে সাহায্যের লাইগা দিনমজুরির কাম করে। পুলাডার লেখাপড়া করার বিরাট ইচ্ছা। কিন্তু আমরা তো গরিব মানুষ। ছেলেরে কেমনে লেহাপড়া করাই?’
মিজানুর এবার উপজেলার পোড়াগাঁও আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিল। সে বলে, দিনমজুরি করতে প্রথম প্রথম তার লজ্জা লাগত। পরে লোকলজ্জার ভয় কেটে যায়। না খেয়ে থাকলে কেউ তাদের খাবার দেবে না। তাদেরই জোটাতে হবে। সে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে মিশর
সাত বছর আগের একদিন মিশর আহমেদের বাবা শহিদুল ইসলাম উধাও হন। তখন তারা রাজধানীর গুলশান নতুন বাজার এলাকায় থাকত। তাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মিরপুর গ্রামে। কিন্তু সেখানে কোনো জায়গাজমি নেই। এ কারণে মিশরের মা মোসাম্মৎ মিনু নতুন বাজার এলাকায় ঝিয়ের কাজ করেই তিন ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছেন। মিশর এত দিন মিরপুর গ্রামের মামা বাছির উদ্দিনের আশ্রয়ে ছিলেন। কিন্তু টংদোকানের আয়ে তাঁদের সংসার কোনো রকমে চলে। মিশরও মাঝে মাঝে ওই দোকানে কাজ করত।কোনো রকমে চলে। মিশরও মাঝে মাঝে ওই দোকানে কাজ করত।
মিশর এবার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল। তার মা মোসাম্মৎ মিনু বলেন, ‘আমি বাসাবাড়িতে কাজ কইরা দুই ছেলে আর এক মেয়েকে পড়ালেখা করাইতাছি। আমার সব সন্তানই মেধাবী, কিন্তু আমার টাকাপয়সা নাই। মানুষের সহযোগিতায় লেহাপড়া চলতাছে।’
মিশর বলে, সে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখে।