উৎকর্ষের জন্য শিক্ষা। ইংরেজি `Education’ কথাটির মূল ল্যাটিন অর্থ হলো,‘ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে অগ্রসর করে নেয়া।’ শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘যা কিছু শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ করা হয়, তাই শিক্ষা। আর শিক্ষা বলতে সুশিক্ষা বোঝায়।’
মহাজন বাণী হচ্ছে, ‘তুমি যদি কাউকে এক কেজি মাছ দাও, তাহলে তার একদিনের আহারের ব্যবস্থা করলে। আর যদি তাকে মাছ ধরতে শিখিয়ে দাও, তাহলে তুমি তার সারা জীবনের খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে।’
এই প্রসঙ্গে একটি ছোট গল্প মনে পড়ে, চীনের একটি প্রদেশে সব সময় শুধু খরা আর দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত। আর তাদের এমন সময়ে বিশ্বের নানা দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ সাহায্য আসত এবং তারা আবার খেয়ে পরে বাঁচার চেষ্টা করত। এদের একজন বললেন, এভাবে দুর্ভিক্ষ আর খরায় আমরা বাব বার পড়ব আর সাহায্য নিয়ে বাঁচব তা হয় না। এবার আমাদের দুর্ভিক্ষের কারণ ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে। তাহলে আর এমন অবস্থা আমাদের হবে না। একদিন সত্যিকার অর্থে তা করা হল এবং সেই অঞ্চলে আর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।’
কৌশল যদি কোনো মানুষের জানা থাকে, তাহলে তাকে মাছ দেয়ার প্রয়োজন হবে না। আমি বলতে চাই, মানুষকে প্রতিষ্ঠা করার নামই উৎকর্ষ আর সেই প্রতিষ্ঠা সম্ভব শিক্ষার মাধ্যমে। আপনার জীবনে অলৌকিক ঘটনা প্রতিদিন অনেক ঘটে, ঘটনা গুলোর সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে হবে। যতক্ষণ জীবিত থাকবেন, ততক্ষণ এসব ঘটনা ঘটতে থাকবে। পরিবর্তন না করে যদি আমরাও ভিক্ষা দেয়ার কৌশল অবলম্বন করি, তাহলে সমাজের কোনো উপকার প্রকৃত পক্ষে আমরা করতে পারলাম না। তাই ব্যক্তি জীবনে উৎকর্ষ যেমন দরকার, তেমনি অন্যের জীবনে উৎকর্ষের জন্য চাই শিক্ষা। এই উপলব্ধির কারণে শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা অতীতের অনেক গুলো দুঃখ-কষ্টের ঘটনা নিয়ে জীবন যুদ্ধে হতাশায় থাকেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট হতাশা-বেদনা থাকবে। আর এসবের সমষ্টিই হলো জীবন। এভাবে বেড়ে চলতে হবে, বিজয়ী হতে হবে। স্থিতিস্থাপকতা মানব জীবনের একটি বিশেষরূপ। এসবের প্রভাবেই মানুষ অতীতকে ভুলতে পারে, চেতনায় দুঃখ-কষ্টকে রেখে নতুন উদ্যমে কাজ করতে পারে। স্থিতিস্থাপকতা আনয়নে ব্যক্তি মনের প্রভাব এবং মানসিক চেতনা অনেক বেশি প্রয়োজন হয়। কারণ মনের জোর না থাকলে অতি দ্রুত ব্যক্তি স্বাভাবিক অবস্থা বা স্থিতিস্থাপকতায় আসতে পারে না। প্রতিটি জীবনে দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, হতাশা ও বিপদ আসে। এতে নানা মানসিক চাপ মানুষকে সইতে হয়। কিন্তু তাই বলে হতাশ হওয়া চলবে না। এই ধরণের মানসিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য দরকার নিজেকে প্রস্তত করা।
এসব গুণ মানুষকে মানুষে পরিণত করতে সাহায্য করে। একজন প্রকৃত সমাজসেবীর কাছে শুধু এসব আমরা পেতে পারি। একজন আধুনিক যুগের নাগরিক হিসাবে আপনার জীবনকে অর্থবহ করতে চাই দৃঢ়তার সাথে সুন্দর কাজগুলোতে নিজেকে জড়িত রাখা। কোনো সমস্যায়, সংকটকালে বা কষ্টজনিত কারণে আপনাকে অবশ্যই একাগ্রচিত্তে এগিয়ে যেতে হবে।
সম্পদ এসেও না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু শিক্ষা যেটুকু নেবে, সেটুকুই থাকবে। শিক্ষার কোনো ধ্বংস নাই। ভাল শিক্ষা গ্রহণের দাবি চিরকাল থেকে যাবে। নিজেকে তার চারপাশ থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয়ে তাগাদা দিতে হবে, বন্দীশালার মত শুধু পাঠ্যবইয়ের ওপর তাকে ধরিয়ে রাখলে চলবে না। নিজেদের পড়তে হবে অজানা কিছু। পঠিত বিষয়ের ওপর বলতে হবে। দেখবেন, সেটা অসাধারণ কিছু হয়ে গেছে। এখান থেকে দৃষ্টিভঙ্গি বাড়তে থাকবে। আমার ধারণা, দেশ নেতৃত্ব দিতে পারে না, নেতৃত্ব দেয় মানুষ। নেতা সৃষ্টি করেও মানুষ। কোনো ধরনের নেতা হবে তা ঠিক করবে নিজে নিজেকে। চিন্তাশক্তির আধুনিকতা, বড় চিন্তা মানুষকে অগ্রগামী করে তোলে। তিনটি বড় ধরনের গুণ কেবল মানুষকে শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আর সে গুণগুলো থাকা দরকার সেবার জগতের নেতাদের মধ্যে।
সাহসীরাই কেবল সৌভাগ্যের দেখা পায় : নিজের ভেতর লুকিয়ে থকা সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সবার আগে চাই সাহস। আমাদের দেশের মুসা কিংবা মুহিত যদি হিমালয় জয় করতে পাওে, আপনি কেন জীবনকে সুন্দর জায়গায় নেয়ার জন্য কাজ করতে পারবেন না? ফেসবুক আজ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর এটি টিকে আছে মার্ক জাকারবার্গের একটা বিশ্বাসের জোরেই। সে বিশ্বাসের কারণে সে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ড্রপ আউটের তালিকায় নাম লেখায়। মার্ক আসলে যা করেছে তা ভাগ্যের জোরে নয়, সাহস তাকে পথ দেখিয়েছে।
অন্যের মতামতকে সম্মান দেখানো : আমাদের প্রথম জীবনে যারা নেতৃত্ব দিতেন, তাদের দেখে ভাবতাম আসলে পৃথিবীর কত কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে তারা আসলেই সৌভাগ্যবান। জীবনে অন্যের মতামতকে মন দিয়ে শোনা ও নিজে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়েই কেবল একটি সুন্দর অবস্থান তৈরি করা যায়। অন্যের মতকে সম্মান না দেখালে জয়ী হওয়া যায় না।
গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করা : হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ফ্রান্সিস ফ্রেইয়ের একটি বাণী, ‘নেতৃত্ব আসলে অনন্য সে গুণ, যা তোমার উপস্থিতিতে শুধু অন্যদের উৎসাহ দেয় না, অনুপস্থিতিতেও তোমার প্রভাব অন্যদের ওপর ফেলে।’ তাই গুরুত্ব দিয়েই কাজ সম্পাদনের চিন্তা সকলকেই করতে হবে। ফরাসি সম্রাট একাদশ লুইয়ের শাসনামলে সম্রাটের এক প্রিয়তমার মৃত্যুবিষয়ক এক জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেলে সম্রাট ক্রোধে অন্ধ হয়ে জ্যোতিষীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ডেকে পাঠান। জ্যোতিষী উপস্থিত হলে সম্রাট তাকে বললেন, ‘তুমি তো অন্যের ভাগ্য গণনা করো। এবার বলো দেখি, তোমার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে? জ্যোতিষী সম্রাটের পরিকল্পনার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বিচক্ষণতার সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আমি দিব্যি চোখে দেখতে পাচ্ছি, আপনার মৃত্যুর তিনদিন আগে আমি মারা যাব।’
এবার সম্রাট জ্যোতিষীকে বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। কারণ সে মারা যাওয়ার তিনদিন পর তো আর সম্রাটও বেঁচে থাকতে পারবেন না। দেখুন, আমাদের সব আছে আমাদের আছে বিশ্বের এক নম্বর সমুদ্র সৈকত, আছে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য সুন্দর বন, বিশ্বের ১১তম সেতু আছে, আছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভাষার জন্য যুদ্ধ করার একমাত্র গৌরব। শান্তির জন্য নোবেল পাওয়ার গৌরব, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার গর্বিত ইতিহাস, আমাদের আছে সাকিব আল হাসান, মাশরাফির মত বিশ্বসেরা মানুষ। আমাদের রয়েছে হিমালয় বিজয়ের ইতিহাস। আমাদের মেয়েরা আজ বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের এমপি, মন্ত্রী হচ্ছেন। বিশ্বের অনেকগুলো দেশের কাছাকাছি আমরা। আমাদের বেঁচে থাকতে হবে পথহারাদের পথ দেখানোর জন্য, একমাত্র শিক্ষার আলো দিয়েই সেই পথ আবিস্কার করা যাবে।
এই জাতীয় অগণিত সম্পদ আমাদের হাতেই আছে। কেবল আমাদের নেই দেশপ্রেমে, নেই মানবপ্রেমে উৎকর্ষ সাধনের জন্য একঝাঁক তরুণ প্রজন্ম। যারা আগামী দিনে এই জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। যে যার অবস্থান থেকে নিজেকে তৈরী করার কাজটি শুরু করলে আর দেশের মধ্যে কোন সমস্যা থাকবে না। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের অবস্থার উন্নতির মধ্য দিয়ে সমাজকে বদলে দিতে পারে। আপনাদের অনেক মানুষ দৃষ্টান্ত হিসাবে গ্রহণ করবে। তাই দরকার আজ থেকে নিজেদের শিক্ষা শূন্যতার জায়গাটা পরির্বতনের মধ্য দিয়ে সমাজকে আলোকিত করা, উৎকর্ষ সাধন করা। এখানেই উৎকর্ষের জন্য শিক্ষার পরিপক্বতা নির্ভর করবে। আমার বিশ্বাস. প্রতিজ্ঞা নিলে আমরা পারব। শিক্ষক সে আলোকিত উৎকর্ষ সাধন করতে পারে। দরকার মেধা ও মননে বিকশিত একঝাঁক শিক্ষাপাগল, যাদের হাত ধরে উৎকর্ষ সাধন সম্ভব।
লেখক: ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন, শিক্ষাবিদ, নজরুল গবেষক