শিক্ষার্থীকেন্দ্রীক শিখন শেখানো কার্যক্রমে প্রায়ই একক কাজ, জোড়ায় কাজ এবং দলীয় কাজ লক্ষ্য করা যায়। যেমন- মাইন্ড ম্যাপিং পদ্ধতিতে মূলতঃ একক কাজ করা হয়; আবার ব্রেইন স্টর্মিং বা মাথা খাটানো পদ্ধতি একক, জোড়ায় আবার দলীয় হতে পারে; আলোচনা পদ্ধতি কিংবা সমস্যা সমাধান পদ্ধতিও জোড়ায় কাজ ও দলীয় কাজের আওতাভুক্ত।
একক কাজ (Individual Work)
শিখন শেখানো কার্যক্রমের যে প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন কিংবা অভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আলাদা চর্চা করানো হয় তাকে শ্রেণিকক্ষে একক কাজ বলে। ‘একক কাজ’-এর ইংরেজি হলো ‘ইনডিভিজুয়াল ওয়ার্ক’ (Individual Work)।
একক কাজ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য
- একক কাজ মূলত সুপ্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত ব্যাপক-অনুসৃত একটি পদ্ধতি। শিশুকালের হাতেখড়ি থেকে শুরু করে মাতা-পিতা, গৃহশিক্ষক, ব্যক্তিগত শিক্ষক, অত্যল্প সময়ে কাউকে কিছু যদি কেউ শিক্ষাদান করে- সবাই শিক্ষার্থীকে একক কাজেই প্রবৃত্ত করান।
- একক কাজ এক অর্থে স্বশিক্ষার সোপান বিশেষ (আর স্বশিক্ষাই হয় সুশিক্ষা)।
- একক কাজে বিভিন্ন মেধা ও পারঙ্গমতার শিক্ষার্থীর শিখন কার্যকর হয়।
- একক কাজ শিক্ষার্থী ভেদে বিভিন্ন মাত্রায় ফলপ্রসূ হয়।
- সকল শিক্ষাদান পদ্ধতিতেই কোনো না কোনো পর্যায়েই অপরিহার্য হলো একক শিক্ষাদান
একক কাজ পদ্ধতির সুবিধা
- প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজস্ব চিন্তা শক্তি বিকাশের সুযোগ পায়।
- শিক্ষার্থীর আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়।
- আমিও কিছু করতে পারি, শিক্ষার্থীর মধ্যে এ চেতনাবোধ জাগ্রত হয়।
- বিভিন্ন মেধা ও পারঙ্গমতা-সম্পন্ন শিক্ষার্থীর শিখনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাদান করার সুযোগ এতে থাকে।
- একক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে স্বশিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, তাই এই পদ্ধতির বিশেষ সুবিধা থাকে।
একক কাজ পদ্ধতির অসুবিধা বা সমস্যা
বিভিন্ন মেধা, বিচিত্র পারিবারিক-সামাজিক, শ্রেণির ও মানসিক পটভূমি বা পারিপার্শ্ব থেকে শিক্ষার্থীরা আসতে পারে বলে প্রত্যেকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন হওয়া অবধারিত। এদের সকলের এক সঙ্গে সমন্বিত শিক্ষাদান শিক্ষকের জন্য এই পদ্ধতিতে শিক্ষাদান চ্যালেঞ্জ বিশেষ।
- এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষককে একক ভাবে নজর রাখতে হয় ও যত্ন নিতে হয়; এর জন্য শিক্ষককে যুগপৎ শিশু-মনস্তত্ত্ব ও শিক্ষাদান কৌশলের সম্পৃক্তি ঘটিয়ে পুরো শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণে সদা-জাগ্রত ও অতি-যত্নশীল থাকতে হয়; ফলে শিক্ষকের মানসিক চাপ পড়তে পারে।
- অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর ক্লাসস এই পদ্ধতি সর্বদা কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা প্রায়শঃ দুরূহ হতে পারে। এতে শিক্ষকের এবং শিক্ষার্থীরও অলসতা আসতে পারে। মূল বিষয় হতে শিক্ষক বিচ্যুতও হতে পারেন।
- শিক্ষার্থীদের মেধা, শিখন-ক্ষমতা (ধঢ়ঃরঃঁফব) ও নিবিষ্ট পাঠে মনোনিবেশের ভিন্্নতা হেতু সামগ্রিক শ্রেণিকক্ষের পঠন ও শিখন অগ্রগতি সুনির্দিষ্ট স্তর অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
- একক কাজ পদ্ধতিতে প্রায়শঃ শিক্ষার্থী আপন ভুবনে ডুবে যায়, ফলে সে আলোচনা ও শিক্ষণীয় বিষয়ের বাইরে চলে যায়।
একক কাজ পদ্ধতি প্রয়োগের সম্ভাব্য কৌশল
- শুরুতে শিক্ষার্থীকে একটা সুপরিচিত ও সর্বজন বিদিত বিষয় দেয়া যেতে পারে যা হতে হবে সুনির্দিষ্ট, সহজবোধ্য এবং আগ্রহ-উদ্দীপক। তা হতে পারে: শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন জীবন থেকে লক্ষ্য করা যায়- এমন কিছু।
- বিষয়বস্তু এমন হলে ভাল হয় যা হবে শিক্ষণীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- একই শ্রেণিকক্ষের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি অভিন্ন বিষয় ও সেই সাথে ভিন্ন-ভিন্ন বিষয় দেয়া যেতে পারে প্রত্যেকের মেধা ও শিখন-প্রকৃতি নির্ধরিণের জন্য।
- অনুশীলনের জন্য গদ্যের বা পদ্যের পাঠ্যাংশের উপর ভিত্তি করে এক-এক জনের ভিন্ন-ভিন্ন চিত্রনের কাজ দেয়া যেতে পারে; যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে….’ অবলম্বনে প্রত্যেককে এক-একটি বর্ণনার চিত্র আঁকতে দেয়া যায়, কাউকে একটা ম্যাপ আঁকতে দেয়া যায় — ইত্যাদি।
- কোনো কোনো শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত মৌখিক অনুশীলন
যথা: পঠন, আবৃত্তি, গল্প ও বর্ণনা ইত্যাদি।
শিক্ষককে পর্যবেক্ষণ, বিবেচনা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসব তাৎক্ষণিক কৌশলাদি নির্ধারণ করে নিতে হবে।
জোড়ায় কাজ বা পেয়ার ওয়ার্ক পদ্ধতি (Pair Work)
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রমে সমস্ত শিক্ষার্থীকে একেকটি জোড়ায় অর্থাৎ দুই জন করে ভাগ করে পাঠচর্চার ব্যবস্থা করার নাম হলো জোড়ায় কাজ পদ্ধতি। ইংরেজিতে একে পেয়ার ওয়ার্ক (Pair Work) বলে।
জোড়ায় কাজ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য