Loading..

০৩ মার্চ, ২০২২ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

গারো জাতির জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গারো জাতির জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসঃ

নৃ-বিজ্ঞানীর মতে, গারো মঙ্গোলীয় জাতির তিববতী-বার্মিজ শাখার বোড়ো উপশাখার অন্তর্ভুক্ত। গারোদের আদি বাসভূমি ছিল চীনের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সিন-কিয়াং প্রদেশে। সেখান থেকে দেশত্যাগ করে পরবর্তীকালে চলে যান তিব্বতে। 

পরবর্তী, তারা ভারতের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে এবং বাংলাদেশের বসবাস শুরু করে। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে গারো পাহাড়ে তাদের বসবাস শুরু হয়। এছাড়াও গারো পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, নাগাল্যান্ডে এবং দিনাজপুরে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করে। গারোদের নিজস্ব উপভাষা রয়েছে। 

গারোরা সবসময় নিজেদের "আছিক" বা পার্বত্য পুরুষ হিসাবে আখ্যা দেয়। গারো নামটি তাদের দেয়া নাম না। এই নামটি  তাদের কাছে আপত্তিকর ও অবমাননাকর হিসেবে বিবেচিত। গারো জনগোষ্ঠী নয়টি গোত্রে বিভক্ত। গোত্র গুলো হল অ্যাও, ছিসাক, ম্যাচি-ডুয়াল, মাতাবেং, আম্বেং, রুগা-চিবক্স, গারা-গাঞ্চিং, আতং এবং মেগাম অন্যতম।

বাংলাদেশে মূলত আবেং, রূগা, আত্তং, মেগাম, চিবক প্রভৃতি দলভুক্ত গারো বাস করে। গারো সম্প্রদায় "সংসারেক " (যারা প্রাচীন বিশ্বাস এবং প্রথা অনুসরণ করেন) এবং খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী । 

গারো ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় ও বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায়। ভারতে মেঘালয় ছাড়াও আসামের কামরূপ, গোয়ালপাড়া ও কারবি আংলং জেলায় এবং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ছাড়াও টাঙ্গাইল, সিলেট, শেরপুর, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও গাজীপুর জেলায় গারোরা বাস করে।

গারোরা ভাষা অনুযায়ী বোডো মঙ্গোলীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জাতিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে অনেক গারোই নিজেদেরকে মান্দি বলে পরিচয় দেন। গারোদের ভাষায় 'মান্দি' শব্দের অর্থ হল 'মানুষ'।গারোদের সমাজে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথা প্রচলিত। তাদের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের নাম 'ওয়ানগালা'; যাতে দেবতা মিসি আর সালজং এর উদ্দেশ্যে উৎপাদিত ফসল উৎসর্গ করা হয়। উল্লেখ্য ওয়ানগালা না হওয়া পর্যন্ত মান্দিরা নতুন উৎপাদিত ফসলাদি খেত না। আশ্বিন মাসে একেক গ্রামের মানুষদের সামর্থ্যানুযায়ী সাত দিন কিংবা তিনদিন ধরে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। অতীতে গারোরা সবাই তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করত। তাদের আদি ধর্মের নাম ‌'সাংসারেক'। ১৮৬২ সালে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণের পর থেকে বর্তমানে ৯৮ ভাগ গারোরাই খ্রীষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী। খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের পর থেকে তাদের সামাজিক নিয়ম-কানুন, আচার-অনুষ্ঠানে বেশ পরিবর্তন এসেছে।

গারোদের প্রধান দেবতার নাম তাতারা রাবুগা। এছাড়াও অন্যান্য দেবতারা হলেন- মিসি সালজং, সুসমি, গয়ড়া প্রমুখ। বিভিন্ন গবেষকগণ বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গারো বর্ণমালা আবিষ্কার করেছেন। সেগুলো উচ্চ গবেষণার জন্য বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি-তে সংরক্ষণ করা আছে।গারোদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। তাদের সমাজে মাতা হলো পরিবারের প্রধান। গারোদের সমাজে বেশ কয়েকটি দল রয়েছে। সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা ও আরেং হচ্ছে প্রধান পাঁচটি দল।


দৈহিক বৈশিষ্ট্যঃ

গারোদের দৈহিক আকৃতি মাঝারি ধরনের, চ্যাপ্টা নাক, চোখ ছোট, ফর্সা থেকে শ্যামলা রং। দৈহিক গঠনে বেশ শক্তিশালী। তাদের চুল সাধারণত কালো, সোজা এবং বেশ ঘন হয়ে থাকে। আবার অনেক কোকড়া চুলের অধিকারীও লক্ষ্য করা যায়।


ভাষাঃ

গারোদের ভাষার নাম আচিক ভাষা। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, গারোরা যে ভাষায় কথা বলে তা মূলত সিনো-টিবেটান (Sino Tibetan) ভাষার অন্তর্গত টিবেটো বার্মান (Tibeto Burman) উপ-পরিবারের আসাম-বার্মা শাখার অন্তর্গত বোডো বা বরা (Bodo/Bora) ভাষা উপ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। গারোদের কোনো লিপি বা অক্ষর নেই।


গারো বর্ণমালাঃ

গারো বর্ণমালা মূলত লাতিন বর্ণমালার ভিত্তিতে তৈরি করা। তাদের বর্ণমালার অক্ষর সংখ্যা ২১ টি। এই বর্ণমালা বাংলাদেশের গারো সহ মেঘালয় এবং আসামের গারোদের লিখিত ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গারো ভাষার অনেকগুলো উপভাষা রয়েছে, যেমন আউই, আমবেং, আতং, ম্যাচি, রুগা, চিবোক, চিসাক, গারা-গাঞ্চিং ইত্যাদি। A B C H D E G H I J K L M N O P R S T U W হচ্ছে গারোদের ২১ টি বর্ণমালা। এই বর্ণগুলোর উচ্চারণে ইংরেজির সাথে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।


ধর্মঃ

গারোদের প্রধান ধর্মে র হলো খ্রিষ্টধর্ম । ঐতিহ্যবাহী ধর্মের নাম সংসারেক। এর অর্থ কেউ জানে না। তবে গবেষকদের মতে সম্ভবত বাংলা সংসার থেকে সংসারেক শব্দটি এসেছে। গারোরা হিন্দু ধর্মালম্বীদের মত পূজা করে থাকে। এদের প্রধান দেবতার নাম তাতারা বারুগা। গাড়োরা পুরোহিতকে কামাল বলে। সালজং(Saljong) তাদের উর্বরতার দেবতা এবং সূর্য সালজং এর প্রতিনিধি। ফসলের ভালোমন্দ এই দেবতার উপর নির্ভর করে বলে তাদের বিশ্বাস। সুসাইম(Susime) ধন দৌলতের দেবী এবং চন্দ্র এই দেবীর প্রতিনিধি। গোয়েরা(Goera) গারোদের শক্তি দেবতার নাম। কালকেম(Kal Kame) জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বলে গারোদের বিশ্বাস।


খাদ্যাভাসঃ

গারোদের প্রধান খাবার হল ভাত। ভুট্টাও তাদের অন্যতম খাবার। গারোরা তাদের খাদ্যাভাসে খুব স্বাধীন এবং সখিন। এরা গরু, ছাগল, শূকর, পাখি, হাঁস ইত্যাদির মাংসের স্বাদ নিতে অভ্যস্ত। তারা হরিণ, বুনো ষাড়, বুনো শূকর ইত্যাদি বন্য প্রাণী খায়। মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, বানমাছ এবং শুটকি মাছ তাদের খাবারের একটি অংশ। বন থেকে প্রয়োজনীয় শাকসবজী এবং মূল সরবরাহ করে। 


গারোরা বাঁশের অঙ্কুরকে একটি সুস্বাদ খাবার হিসেবে বিবেচনা করে। তারা একটি বিশেষ ধরণের ভাত দিয়ে মদ তৈরি করে এবং তৈরিকৃত  মদকে ‘মিনিল বিচি’ বলে। অন্যান্য পানীয় ছাড়াও দেশীয় অ্যালকোহল গারোদের জীবনে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।


বাংলাদেশি গারোরা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল,শূকর প্রভৃতি খায়। মদ তাদের অন্যতম পানীয়। বর্তমানে গারোরা লেখাপড়া ও চাকুরিতে বেশ এগিয়ে আসছে। নিজস্ব সংস্কৃতির পাশাপাশি তারা বাঙালী খাবার খেতেও ভালোবাসে। গারোদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হচ্ছে-নাখাম কারি। যা পুটি মাছের শুটকি দিয়ে তৈরি হয়। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুকুরের মাংস গারোদের অতি প্রিয়। গারোদের বিশেষ খাদ্য হচ্ছে কচি বাঁশের গুঁড়ি । এর জনপ্রিয় নাম মেওয়া।


উৎসবঃ

গারোদের প্রধান উৎসব ওয়াঙ্গালা। গারো উপজাতির প্রচলিত উৎসব মূলত কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত। গারো উৎসবগুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে ‘‘ওয়াঙ্গালা‘‘ অনুষ্ঠান।  ফসল কাটার পরে ইশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য উৎসবটি উদযাপন করা হয়। এটির পালনের জন্য কোনও নির্দিষ্ট তারিখ থাকে না। তবে প্রচলিতভাবে, ওয়াঙ্গালা অনুষ্ঠান অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে পালিত হয়।

তারা উদযাপনে জন্য প্রচুর পরিমাণে খাবার এবং বিয়ার প্রস্তুত রাখে। উদযাপনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় বিষয় হলো চমকপ্রদ ওয়াঙ্গালা নৃত্য, যাতে পুরুষ এবং মহিলারা জাঁকজমক পোশাকে অংশ নেয়। গারোরা অলঙ্কার পরনের জন্য বিখ্যাত। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই অলংঙ্কার পরিধান করে এবং এতে কনুই রিং, কানের দুল, পুতিঁমালা, হাতির দাঁত এবং চুড়ি অন্তর্ভুক্ত।

পৃথিবীর কয়েকটি মাতৃতান্ত্রিক সমাজের মধ্যে গারো অন্যতম। গারো সমাজ প্রধানত মাতৃতান্ত্রিক।পরিবারে সদস্যরা মায়ের পরিচয় বহন করে।ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব এবং পশ্চিমে এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় গারো উপজাতি বাস করে। 


গারো বিয়েঃ

গারো উপজাতি বিয়ের পর, পাত্র স্ত্রীর বাড়িতে থাকে। প্রথানুযায়ী, পরিবারের সবচেয়ে ছোট কন্যা সম্পত্তির একমাত্র অধিকারী হয়। ছেলেরা যৌবনে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এবং গ্রামের ব্যাচেলর ডরমেটরিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে । পরিবারে প্রধান কর্তা থাকে মা। গারোরা বাইরের লোকদের কাছে "গারোস" হিসাবে পরিচিত। 


ঘরবাড়িঃ

গারোদের ঘরগুলি সাধারণত বাঁশের দেয়াল এবং খড়ের ছাদ দিয়ে তৈরি। কিছু বাড়িতে খড়ের ছাদ সহ কাদামাটির দেয়াল রয়েছে। গারোদের  ঘরগুলি সাধারণত ৬ ফুট প্রস্থ এবং ১২ ফুট দীর্ঘ হয়। তাদের বাড়ির সামনের স্থান ফাঁকা থাকে।


গারো উপজাতি অত্যন্ত পরিশ্রমী। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই ক্ষেত এবং ঘরের সাধারণ কাজে অংশ নেয়। কিছু কাজ স্বাভাবিকভাবেই পুরুষরা করে, যেমন জঙ্গল-পরিষ্কার, ঘর নির্মাণ এবং কঠিন শারীরিক শ্রমের কাজ। মহিলারা সাধারণত ফসল রোপণ, তুলা করার পাশাপাশি কাপড় বুনন, রান্না ইত্যাদি করে।


সম্পাদনায়ঃ

মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহিদ 

সহকারী শিক্ষক 

মৈশাষী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

বালাগঞ্জ, সিলেট। 

২৮/০২/২০২২

মন্তব্য করুন