Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

২১ এপ্রিল, ২০২২ ০১:৫৩ অপরাহ্ণ

একজন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী

" সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী " 

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বৃটিশ রাজকোষে তাঁর প্রদেয় অর্থেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি মেলে, এমনকি পরবর্তীতে তাঁর জমিদারি বন্ধকের আর্থিক অনুদানেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়, এই বিখ্যাত লোকটির প্রয়াণ দিবস ছিল ১৭ এপ্রিল ।

জানাচ্ছি ভালবাসা , শ্রদ্ধা , এবং কৃতজ্ঞতা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে।

এছাড়া তাঁর এস্টেটের অর্ধেক বন্ধক রেখে সমস্ত অর্থ যোগাড় করেছিলেন তিনি এই প্রতিষ্ঠানটি ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ) গড়ার জন্য। এরচেয়ে বড় অবদান, সেক্রিফাইস আর কি হতে পারে একজন ব্যক্তির একটি জাতিকে উচ্চশিক্ষিত করার জন্য ।

অন্যদের কথা বাদই দিলাম বর্তমান প্রজন্ম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের কয়জন স্টুডেন্টই বা জানে উনার এই অকল্পনীয় অবদানের কথা ।

তিনি হলেন টাঙ্গাইলস্থ ধনবাড়ীর নবাব, নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ।

সংক্ষেপে বলছি উনার সম্বন্ধে এই প্রজন্ম এবং যারা ভালভাবে জানেন না তাদের সম্মানে  ;

নওয়াব সাহেব ১৮৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীর বিখ্যাত ধনবাড়ি জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।

তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

১৯২১ সালের ১লা জুলাই ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

পূর্ব বাংলার মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের লক্ষ্যেই বিশেষত এই উদ্যোগ নেয়া হয় ।

বঙ্গভঙ্গ রদের পরিপ্রেক্ষিতে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ , নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শের- এ- বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১২ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে প্রস্তাব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকার রমনা সিভিল স্টেশন এলাকায় ৬০০ একর জমি দান করেন ।

অর্থাৎ উনার দান করা ৬০০ একর জমির উপর আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল, বুয়েটের মতো দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়িয়ে আছে।

নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী যিনি স্যার সলিমুল্লাহর প্রয়াণের পর ( ১৬ই জানুয়ারি ১৯১৫ ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে সফলতায় উপনীত হয়েছিলেন।

শুধু তাই নয় বৃটিশদের কাছে তাঁর এস্টেটের অর্ধেক বন্ধক রেখে সমস্ত অর্থ যোগাড় করেছিলেন এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ার এবং কার্যক্রম শুরু করার জন্য ।

প্রথমে কলা , বিজ্ঞান ও আইন অনুষদ নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ।

বলাবাহুল্য যে, নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী। শিক্ষাবিস্তারে তাঁর আন্তরিকতার জন্য সে সময় তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তার দৌহিত্র মোহাম্মদ আলী বগুড়া নামে পরিচিত  সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী পাকিস্তানের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া তার এক পুত্র সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।

মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অবদানের কথা আমরা মনে হয় অনেকেই  জানি না ;

নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ সালের রংপুর অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে প্রথম সোচ্চার হয়ে বলেছিলেন,

"বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, মাতৃস্তনের ন্যায়, জন্মভূমির শান্তি নিকেতনের ন্যায় বাংলা ভাষা। বাংলাভাষা আমাদের নিকট প্রিয়, কিন্তু হতভাগ্য আমরা, প্রিয় মাতৃভাষার উন্নতিকল্পে আমরা উদাসীন। অধঃপতন আমাদের হবে না - তো কার হবে?"

তৎকালীন প্রতিকূল পরিবেশে একজন জমিদার হয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বাক্ষর রাখেন।

১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা করার জন্য লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন।

এই গুনি মানুষটি ভাষা ও সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

১৮৯৫ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত নওয়াব সাহেবের কর্মতৎপরতা ছিল প্রধানত সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্রিক।

১৮৯৫ সালে মিহিরও সুধাকর পত্রিকা একত্রিত হয়ে সাপ্তাহিক মিহির-সুধাকর নামে আত্মপ্রকাশ করে। নওয়াব আলী চৌধুরী এর মালিক ছিলেন।

এজন্য একটি প্রেস ক্রয় করে তিনি কলকাতায় তার নিজ বাসভবনে স্থাপন করেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পন্ডিত রেয়াজউদ্দিন আহমদ আল মাশহাদী, কবি মোজাম্মেল হকের সাহিত্য প্রকাশনায় নওয়াব আলী চৌধুরীর দান ছিল অপরিসীম।

ফলে উল্লেখিত লেখকগন তাদের বিভিন্ন প্রকাশনায় নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে উৎসর্গ করেন।

শিক্ষানুরাগী অনন্য জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত গ্রন্থ সমূহ---

ঈদুল আযহা (১৮৯০)

মৌলুদ শরীফ (১৯০৩)

ভারনাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল (১৯০০)

প্রাইমারি এডুকেশন ইন রুরাল এরিয়াস্‌ (১৯০৬)

এছাড়া সুদীর্ঘ ২৩ বছর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদ, বঙ্গীয় প্রেসিডেন্সি আইন পরিষদ এবং ভারতের ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।

তিনি দেশের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পক্ষ হয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অভিযোগের কথা সরকারের নিকট তুলে ধরেন।

ব্রিটিশ সরকার নওয়াব আলী চৌধুরীকে ১৯০৬ সালে ‘খান বাহাদুর’, ১৯১১ সালে ‘নওয়াব’, ১৯১৮ সালে ‘সি.আই.ই’ এবং ১৯২৪ সালে ‘নওয়াব বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে।

উল্লেখ্য যে, ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন জনাব চৌধুরী ।

এবং এদেশে নওয়াব আলী চৌধুরী ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে জমি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন নিঃস্বার্থভাবে ।

সংগৃহীত 


মন্তব্য করুন