সহকারী শিক্ষক
১৫ মে, ২০২২ ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রায় ১৪০০ বছর আগের কথা। আরব উপদ্বীপে তখন চরম উচ্ছৃঙ্খলতা ও পাপাচার বিরাজমান। গোত্রে গোত্রে চলত আভিজাত্য ও বংশমর্যাদার বড়াই। সামান্য কারণে শুরু হত যুদ্ধ, হত্যা আর লুন্ঠন। সেই সময় আরবদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বোঝাতে ঐতিহাসিকরা এই যুগের নামকরণ করেন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞানতার যুগ।
আরব সমাজ যখন অন্যায়-অপরাধ আর দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত, ঠিক সেই সময় এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয় যিনি পরবর্তীতে শুধু আরবেই নয়, সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। একক ব্যক্তি হিসেবে যার অসামান্য জীবনী নিয়ে লেখা হয়েছে সবচেয়ে বেশি জীবনীগ্রন্থ।
অনুমান করতে পারেন কি, কে সেই মহান ব্যক্তিত্ব?
বলছিলাম ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমনই অসাধারণ ছিল যে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও তাঁর প্রশংসা না করে পারেন না। মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সফল ও প্রশংসনীয়।
বলতে পারেন কোন মানবীয় গুণাবলির জন্য তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলাম গ্রহণ না করেও অনেকেই তাঁকে মহামানবের স্বীকৃতি দিয়েছেন? আপনার মতে বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তাঁর মত নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
এবার চলুন জেনে নেয়া যাক কেমন ছিলেন ইসলাম ধর্মের শেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ(সা)।
৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল। মক্কা নগরীর বিখ্যাত কুরাইশ গোত্রের বনু হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মা আমিনা নবজাতকের নাম রাখেন আহমাদ। দাদা আব্দুল মুত্তালিব ভালোবেসে তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মাদ।আরবদের রীতি অনুযায়ী মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সুস্থ দেহ ও সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য শিশু মুহাম্মদ কে রাখা হয় ধাত্রী হালিমার কাছে। নির্দিষ্ট সময় পর তাঁকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তাঁর মায়ের কোলে। ৬ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর মায়ের সাথে কাটান।
জন্মের পূর্বে পিতা আব্দুল্লাহ আর ৬ বছর বয়সে মা আমেনাকে হারিয়ে শিশু মুহাম্মদ বড় হতে থাকেন দাদার তত্ত্বাবধানে। তাঁর বয়স যখন ৮ বছর, তখন তাঁর দাদাও ইন্তেকাল করেন। দাদার পর চাচা আবু তালিব দায়িত্ব নেন ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ এর।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কোমল স্বভাবের। তাঁর উত্তম চরিত্র, সদাচরণ ও সত্যাবাদিতার কারণে তাঁকে ডাকা হত ‘আল-আমীন’ বা ‘বিশ্বাসী’। আরবদের মধ্যে বিদ্যমান অন্যায়-অনাচার, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দিত। তাই মক্কায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘হিলফুল ফুজুল’ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হলে তিনিও তাতে যোগ দেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
পেশাগত জীবনের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন রাখাল। পরবর্তীতে তিনি ব্যবসা শুরু করলে অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ২৫ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ৪০ বছর বয়সী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ কে।
খাদিজা(রা) এর জীবদ্দশায় তিনি আর কোনো বিয়ে করেন নি। তবে পরবর্তীতে আদর্শিক প্রয়োজনে, নারী সমাজের বিভিন্ন উপকারের জন্য এবং আরবদের বিভিন্ন কুসংস্কার ও অযৌক্তিক প্রথা দূর করার জন্য তিনি মোট ১১টি বিয়ে করেন।
খাদিজা(রা) এর গর্ভে মুহাম্মদ(সা) এর ৬ জন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসিম, জয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ। একমাত্র ফাতিমা ব্যতীত সকলেই তাঁর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
৩৫ বছর বয়সের পর তিনি নির্জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। তাঁর উপর অবতীর্ণ হয় মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। যা মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তাকে মক্কার কুরাইশদের নিদারুণ অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। ইসলামি পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। মদীনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যা ইতিহাসে বিখ্যাত বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ, খন্দকের যুদ্ধ প্রভৃতি নামে।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে বা ৮ম হিজরিতে মুহাম্মাদ(সা) বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া প্রায় বিনা প্রতিরোধে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং বিজয় লাভ করেন। সেদিন তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করেন। তাঁর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
১০ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হজ্জ পালনকালে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দেন। যা মুহাম্মাদ(সা) এর জীবিতকালে শেষ ভাষণ হিসেবে ‘বিদায় খুৎবা’ বা ‘বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ’ নামে পরিচিত।
বিদায় হজ্জ্ব থেকে ফেরার পর তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ১২ই রবিউল আউয়াল ৬৩ বছর বয়সে মুহাম্মাদ(সা) ইন্তেকাল করেন। আর মানবজাতির জন্য রেখে যান এক উত্তম আদর্শ।
হযরত মুহাম্মদ সা এর জানাজা সুনির্দিষ্ট কোনো ইমামতিতে হয়নি। সর্বপ্রথম তার চাচা আব্বাস ইবনে মুত্তালিব (রা.) রাসুল (সা.)-এর জানাজার নামাজ পড়েছিলেন। এরপর একে একে অন্যরা মহানবী (সা.)-এর জানাজার আদায় করেছিলেন। তার জানাজার বিষয়টি সাহাবা কেরামদের কাছে কঠিন বিষয় ছিল। কারণ, সাহাবা কেরাম নবী (সা.)-কে তাঁদের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসত। সাহাবা কেরাম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়ে, তাঁরা দলে দলে নবী (সা.)-এর জানাজার সালাত আদায় করেছিলেন। নবী (সা.) ইন্তেকাল করেছিলেন সোমবারে এবং বুধবারের শেষের দিকে নবী (সা.)-কে দাফন করা হয়েছিল।
তথ্যসূত্রঃ ntvbd
তিনি ছিলেন অধিক দানশীল, সর্বাপেক্ষা সত্যভাষী এবং কোমল স্বভাবের। অভিজাত বংশের হয়েও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তিনি সবচেয়ে গরীব বা দাস শ্রেণির সঙ্গে বসতে বা খেতে লজ্জাবোধ করতেন না। তিনি ছিলেন বিনম্র ও নিরহংকার। একই সাথে যুদ্ধবিদ্যা ও সাহসিকতায় তিনি ছিলেন বীর।
শিশুদের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল অমায়িক। তিনি ছিলেন অসহায়, ইয়াতিম, দরিদ্র ও মাজলুমের বন্ধু এবং জালিমদের ঘোর শত্রু। আরব সমাজে তখন নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রের সাথে যোগদান অসম্ভব রূপে দেখা হত। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেন বন্ধন শুধু গোত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের এক মুসলমানের সঙ্গে অন্য মুসলমানের ভাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপন করেন।
শুধু ইবাদত বন্দেগী নয়, বরং ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন মানবজাতির জন্য আদর্শ। একজন ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রনেতা হিসেবে তিনি যেমন সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখিয়েছেন। তেমনি সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে জীবনের সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সফল। এক কথায়, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তিনি ছিলেন বিশ্ব মানবতার জন্য একজন আদর্শ শিক্ষক। হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর কৃতিত্ব অল্প কথায় তুলে ধরার যোগ্য নয়।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু বিখ্যাত উক্তি যা মানব জীবনে সবার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়-
১. অজ্ঞতার প্রতিকারই প্রশ্ন করা
২. ভাগ্যবান সেই মহিলা, যার প্রথম সন্তান কন্যা
৩. তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলেন তিনিই, যিনি তাঁর ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করেন
৪. আপনার পাপের বেশিরভাগই আপনার জিহ্বার কারণে
৫. যে জ্ঞানের সন্ধানে বের হয়, সে আল্লাহর পথে বের হয়
৬. শিক্ষাদান করো এবং সহজ করে শিখাও
৭. সত্য দেয় মনের শান্তি আর মিথ্যা দেয় সংশয়
৮. উত্তম লোক সে, যার বয়স হয় দীর্ঘ আর কর্ম হয় সুন্দর
৯. রোগীর সেবা করো এবং ক্ষুধার্তকে খেতে দাও
১০. প্রচেষ্টার চেয়ে বড় কোনো যুক্তি নাই
তার জন্ম হয় ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর বা ১২ই রবিউল আওয়াল বা আরবি রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখে।
আমেনা বিনতে ওহ্হাব
০১. খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ
০২. সাওদা বিনতে জামআ
০৩. আয়েশা বিনতে আবু বকর
০৪. হাফসা বিনতে উমর
০৫. জয়নব বিনতে খুযায়মা
০৬. উম্মে সালমা হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া
০৭. রায়হানা বিনতে জায়েদ
০৮. জয়নব বিনতে জাহশ
০৯. জুওয়াইরিয়া বিনতে আল হারিস
১০. রামহাল ( উম্মে হাবীবা) বিনতে আবু সুফিয়ান
১১. সাফিয়া বিনতে হুইয়াই
১২. মাইমুনা বিনতে আল হারিস
১৩. মারিয়া আল কিবতিয়া
সংগৃহীত