Loading..

১৫ জুন, ২০২২ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস (World Elder Abuse Awareness Day-WEAAD)

১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস (World Elder Abuse Awareness Day-WEAAD)

১৫ জুন, ‘বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস (World Elder Abuse Awareness Day-WEAAD)’। ২০০২ সালে World Health Organization (WHO) প্রথম প্রবীণ নির্যাতন বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে এটিকে বৈশ্বিক সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ২০০৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং International Network for the Prevention of Elder Abuse (INPEA) নামক সংগঠন জাতিসংঘের কাছে ১৫ জুনকে বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের অনুরোধ জানায়। এরই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে জাতিসংঘ দিবসটি পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি পালনের লক্ষ্য হচ্ছে, বয়স্কদের উপরে নির্যাতন এবং তাদের যন্ত্রণা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। প্রবীণদের উপর অত্যাচার অবহেলা সম্পর্কে সব বয়সী মানুষকে সচেতন করা ও সবার মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা ও জনমত সৃষ্টি করে তোলাই এই দিবসের প্রধান লক্ষ্য।

প্রবীণ নির্যাতন কোনো দেশের একক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নয়নশীল এবং উন্নত সব দেশেই কম-বেশি প্রবীণদের নির্যাতন করা হয়ে থাকে। যদিও প্রবীণ নির্যাতনের বিষয়গুলো সবার সামনে খুব কমই আসে। তাদের উপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন হয়ে থাকে। সেটা হতে পারে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি ৬ জন বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে ১ জন প্রবীণ নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন। সেই অনুসারে প্রায় ১৪ কোটিরও বেশি প্রবীণ সারাবিশ্বে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন। কোন কোন হিসেবে এর পরিমান আরো অনেক বেশি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবীণ নির্যাতন পুলিশী অপরাধ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয় না। তবে প্রকৃত সংখ্যা যে এর চেয়েও অনেক বেশি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ  অনেক পরিবার বা এমনকি সমাজে প্রবীণ নির্যাতনের বিষয়টি আড়াল করার প্রবণতা রয়েছ। অনেকক্ষেত্রে প্রবীণেরা নিজেরাও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মান-মর্যাদা এবং নিজেদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এ নিয়ে মুখ খুলতে চান না। তাই এর প্রকৃত সত্য কোনো সমাজেই জানা যায় না বা জানানোও হয় না।

 প্রতিনিয়ত প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সাথে নির্যাতন ও বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৫ ভাগের ১ ভাগ থাকবে প্রবীণ। তাই সব বয়সী মানুষদের সচেতন করা না গেলে প্রবীণ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। ২০১৯ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৮% বৃদ্ধি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বর্তমানে যুবকের সংখ্যা ১০০ কোটি থেকে ১৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যারা আগামীতে বয়স্কের কাতারে যাবে। এই বৃদ্ধি উন্নয়নশীল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ও দ্রুত হবে। তাই মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রভাবিত করে এমন নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রবীণ নির্যাতনের সকল দিক মোকাবেলা করার জন্য আরও কার্যকর প্রতিরোধ কৌশল ও শক্তিশালী আইন-কানুন প্রণয়ন এবং পরিচালনা করার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানায়। সংস্থা এই বিষয়ে সবাইকে একসাথে কাজ করা, বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য জীবনযাত্রার অবস্থাকে উন্নীত করা ও তাদেরকে অন্যদের সাথে জাতি গঠনে সর্বাধিক অবদান রাখতে সহযোগিতার আহ্বান জানান।  

বিশ্বের অনেক অংশে বয়স্কদের সাথে ছোটখাটো পারিবারিক বিষয় কিংবা অসম্মান বা মর্যাদার প্রত্যাশা পূরণের ঘাটতি থেকে সংঘটিত হয়ে থাকে। কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত এই গুরুতর সামাজিক সমস্যাটি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গির আড়ালে ছিল এবং বেশিরভাগই ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। আজও বয়স্কদের সাথে খারাপ আচরণ একটি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে অব্যাহত রয়েছে, যা বেশিরভাগই ক্ষেত্রেই অবহেলিত হয় বা সমাজে একটা অংশ দ্বারা উপেক্ষিত হয়। আশার কথা, ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবীণ মা-বাবাকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়ার রীতি চালু থাকায় বাংলাদেশসহ অনেক দেশে প্রবীণ নির্যাতন নিয়ে সমাজে তেমন কোনো উদ্বেগ বা আলোচনা নেই, এমনকি এসব নির্যাতনের অস্তিত্বের কথাও অনেকে স্বীকার করতে চান না। তবে সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে এ ভুল কিছুটা হলেও ভাঙতে শুরু করেছে। কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বয়স্ক নির্যাতনের কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। করোনাকালে এ নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার কিছু  ন্যাক্কারজনক ঘটনা আমরা দেখতে পেয়েছি। আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও অনেকে বয়স্ক বাবা-মাকে পরিবারের সাথে না রেখে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা, বাড়ি থেকে নির্যাতন করে বের করে দেয়া কিংবা নির্যাতন ও অপমান সইতে না পেরে অনেক বাবা-মায়ের আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার মতো ঘটনা সামনে এসেছে।

 প্রবীণ নির্যাতন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক সমস্যা বর্তমানে প্রামাণিক দলিলসহ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই সমস্যা যা উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় দেশেই বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী এটি কম ক্ষেত্রেই অভিযোগ বা অপরাধ হিসেবে রিপোর্ট করা হয়। শুধুমাত্র নির্বাচিত উন্নত দেশেই এই হার শতকরা ১ থেকে ১০ ভাগ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়।। যদিও বয়স্কদের দুর্ব্যবহারের পরিমাণ অস্পষ্ট হলে এর সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট। যেমন এটি একটি বৈশ্বিক বহুমুখী প্রতিক্রিয়া হিসেবে বয়স্ক ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার উপর দৃষ্টি দেয়ার দাবী রাখে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিষেবা উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা চিহ্নিত ও মোকাবেলা করা না হলে স্বাস্থ্য ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বয়স্কদের অপব্যবহারকে অবমূল্যায়ন বা উপেক্ষা করা অব্যাহত থাকবে।

  [লেখক: মনির আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা]

  •   ছবি ও তথ্যসূত্র:
  • ·         https://www.un.org

  • ·         https://nationaltoday.com

  • ·         https://depositphotos.com

 

 

মন্তব্য করুন