Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

০৫ জুলাই, ২০২২ ১২:২৯ অপরাহ্ণ

হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর ফজিলত

#একাদশত: আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মধ্যে ছিলো অসাধারণ  খোদাভীতি, নবীপ্রেম এবং আহলে বায়তের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ। ইতোপূর্বে  উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমীর মু‘আভিয়া তাঁর ওফাতের সময় বারংবার বলছিলেন, ‘‘আহা! আমি যদি কোন অজ পাড়াগাঁয়ে নির্জন যিন্দেগী যাপন করতাম, তাহলে  এতসব ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তামনা।’’ দ্বিতীয়ত, তিনি ওসীয়ৎ করছিলেন যেন  তাঁর কাফনে হুযূর-ই আক্রামের নখ মুবারক, চুল মুবারক, জামা মুবারক ও তহবন্দ শরীফ, যেগুলো তাঁর নিকট সংরক্ষিত ছিলো, রেখে দেওয়া হয়। এগুলো তাঁর  খোদাভীতি ও নবী করীমের প্রতি অগাধ ভক্তি ও ভালবাসার প্রমাণ। তাছাড়া, তিনি  হযরত হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে অত্যন্ত সম্মান ও ক্বদর করতেন। নিম্নে আহ্‌লে বায়তের প্রতি হযরত আমীর মু‘আভিয়ার ভক্তি ও ভালবাসার কতিপয়  উদাহরণ পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি-


এক. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর ‘মুসনাদ’-এ আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু  তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি  ওয়াসাল্লাম ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মুখে ও ঠোঁটে চুমু  দিতেন।’’ আমীর মু‘আভিয়া আরো বলেন, ‘‘এমন মুখ ও ঠোঁটকে, যাতে হুযূর  মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম চুমু দিয়েছেন, আগুন স্পর্শ  করতে পারে না। [কিতাবুন্ না-হিয়াহ্]


দুই. ওই ‘মুস্‌নাদ-ই ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল’-এ আরো বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি হযরত আমীর মু‘আভিয়াকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করেছিলো। তিনি  বলেন, ‘‘এ মাস্আলা তুমি আলী মুরতাদ্বাকে জিজ্ঞাসা করো। আমার চেয়ে বড় জ্ঞানী।’’ লোকটি বললো, ‘‘আপনি বলুন। আমার নিকট আপনার জবাব  অধিকতর পছন্দনীয়।’’ আমীর মু‘আভিয়া বললেন, ‘‘তুমি এটা খুব অন্যায় কথা  বলেছো। তুমি কি তাঁকে ঘৃণা করো, যাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা  আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞানের জন্য সম্মান দিয়েছেন? নবী করীম  এরশাদ করেছেন, ‘হে আলী! তুমি আমার জন্য তেমনি, যেমন হযরত মূসার  জন্য হযরত হারূন; কিন্তু আমার পরে কোন নবী নেই।’’ হযরত আলীর জ্ঞানের  এমন ক্বদর যে, হযরত ওমর ফারূক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কোন সমস্যার  সম্মুখীন হলে তাঁর (হযরত আলী) সাহায্য নিতেন।’’ এতটুকু বলার পর হযরত আমীর মু‘আভিয়া ওই লোককে বললেন, ‘‘তুমি আমার  সামনে থেকে উঠে যাও।’’ এমনকি তার তিনি নাম ভাতা-গ্রহীতাদের দপ্তর থেকে  বাদ দিয়ে দিলেন। [কিতাবুন্না-হিয়াহ্]


তিন. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মাহমূদ আমলী ‘নাফা-ইসে ফুনূন’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন, একদা হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর দরবারে সাইয়্যেদুনা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কথা আলোচনায় আসলো। তখন আমীর মু‘আভিয়া বললেন, ‘‘আলী বাঘ ছিলেন, আলী পূর্ণিমার চাঁদ দিলেন, আলী আল্লাহ্‌র রহমতের বারিধারা ছিলেন।’’ উপস্থিত লোকদের থেকে একজন বললো, ‘‘আপনি উত্তম, না আলী?’’ তিনি বললেন, ‘‘আলীর কদমও আবূ সুফিয়ানের বংশ থেকে উত্তম।’’ তখন তাঁকে পুনরায় বলা হলো, ‘‘আপনি হযরত আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন কেন?’’ তিনি বললেন, ‘‘সেটা রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ ছিলো।” [সূত্র. কিতাবুন্ না-হিয়াহ]


চার. হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু একদা যারার ইবনে  হামযাকে হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু)’র  গুণাবলী আলোচনা করে শুনানোর জন্য বললেন। তিনি প্রথমে নিজের অপরাগতার কথা জানালেন। তখন হযরত আমীর মু‘আভিয়া বললেন, ‘‘তোমাকে আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় শুনাও!’’ তখন যারার ইবনে হামযা অতি প্রাঞ্জল ভাষায় হযরত আলী মুরতাদ্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর গুণাবলী শুনালেন। তাঁর ওই বর্ণনার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:


‘‘সাইয়্যেদুনা আলী মুর্তাদ্বা বড় দানশীল ছিলেন। তিনি প্রচন্ড শক্তিশালী ছিলেন। তিনি সিদ্ধান্তমূলক (চূড়ান্ত সঠিক কথাই) বলতেন। ন্যায়বিচার করতেন। তাঁর চর্তুপার্শ্ব থেকে জ্ঞানের নদী প্রবাহিত হতো। তাঁর মুখ থেকে জ্ঞানই বের হতো। দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে তিনি আলাদা থাকতেন। রাতের নিরবতায় তিনি আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। সারারাত আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতেন। প্রায়শ: আখিরাতের চিন্তায় বিভোর থাকতেন। মোটা কাপড় ও মা’মূলী খাবার পছন্দ করতেন। সাধারণ লোকদের মতো চলাফেরা করতেন যখনই তাঁকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হতো, তাৎক্ষণিকভাবে তার জবাব দিতেন। আমরা তাঁকে আহ্বান করতেই তিনি এসে যেতেন। তিনি এত সাদাসিধে হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খোদাপ্রদত্ত অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সামনে কথা বলতে আমাদের সাহস হতোনা। তিনি দ্বীনদারদের সম্মান করতেন, গরীব- মিসকীনদেরকে নিজের কাছে রাখতেন। তাঁর দরবারে দুর্বল লোকেরা নিরাশ- হতাশ হতোনা এবং প্রভাবশালীগণ বে-পরোয়া ছিলোনা। আল্লাহরই শপথ, আমি  হযরত আলীকে অনেক সময় এমনই দেখতাম যে, রাতের নক্ষত্র ডুবে যেতো,  আর হযরত আলী তেমনভাবে ক্রন্দন করতেন, যেমন কাউকে বিষাক্ত বিচ্ছু  কামড় দিলে ক্রন্দন করে। কেঁদে কেঁদে তিনি বলতেন, ‘‘আফসোস, আফসোস! আয়ুষ্কাল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সফর দীর্ঘ। আসবাবপত্র (পাথেয়) কম, কিন্তু রাস্তা  বিপদসঙ্কুল।’’ তাঁর দাড়ি শরীফ থেকে অশ্রু টপকে পড়তো। আর তিনি  বলতেন, ‘‘আফসসোস! আফসোস!’’


হযরত আমীর মু‘আভিয়াও এ বক্তব্য শুনে অঝোর নয়নে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘‘আল্লাহরই শপথ! আবুল হাসান (আলী) তেমনি ছিলেন; তিনি তেমনি ছিলেন, তিনি তেমনি ছিলেন।’’ [সূত্র. সাওয়া-ইক্বে মুহরিক্বাহ্]


পাঁচ. এক কবি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর প্রশংসা এভাবে করলেন-


هُوَ الْبَكَّاءُ فِی الْمِحْرَابِ لَيْلَا - هُوَ الضَّحَّاكُ فِي يَوْمِ الضِّرَابِ -


অর্থ: তিনি মসজিদের মিহরাবে ক্রন্দনকারী। তিনি যুদ্ধের ময়দানে হাস্যকারী। জিহাদের ময়দানে যখন তিনি নামতেন, তখন বলতেন-


وَاَنَا الَّذِيْ سَمَّتْنِي اُمِّي حَيْدَرَ -


অর্থ: আমি হলাম ওই বাহাদুর (বীরপুরুষ) যে, আমার আম্মা আমার নাম ‘হায়দার’ (বারংবার ফিরে এসে হামলাকারী বাঘ) রেখেছেন।


তাহাজ্জুদের সময় তিনি যখন মসজিদের মেহরাবে আসতেন, তখন আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে এ বলে আরয করতেন-

তাহাজ্জুদের সময় তিনি যখন মসজিদের মেহরাবে আসতেন, তখন আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে এ বলে আরয করতেন-


اَلٰهِی عِبْدُكَ الْعَاصِيْ اَتَاكَ - مُقِرًّا بِالدُّوْبِ وَقَدْ دَعَاكَ.


অর্থ: হে আল্লাহ্! তোমার গুনাহ্গার বান্দা তোমার দরবারে এসে উপস্থিত হয়েছে। সে তার পাপরাশির কথা স্বীকার করছে। আর তোমার দরবারে দো‘আ প্রার্থনা করছে।


মোটকথা, তিনি মাখলূক্বের সামনে হাস্যকারী আর আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে ক্রন্দনকারী।

মন্তব্য করুন