প্রভাষক
১১ জুলাই, ২০২২ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
জন্মদিনে স্মরণ করি পাটিগণিতের দিকপালকে।
*******************************************
চৌবাচ্চা দিয়ে জল বেরোচ্ছে আর ঢুকছে ৷ তেলমাখা বাঁশে বাঁদর উঠছে আর নামছে ৷ সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে ৷ প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে গতিময় ট্রেন। চলন্ত ট্রেনের দৈর্ঘ্য মাপার কৌশল। মনে আসছে কি!! হ্যা , কে সি নাগের সেই সব বিখ্যাত পাটিগণিতের অঙ্ক , যা রাত্রে শুয়ে পড়ার পরও মাথায় ঘুরপাক খেতো।
স্কুল ও কলেজ পেরোনো মধ্যবয়সীদের দুঃস্বপ্নে বার বার ফিরে আসে কেশব চন্দ্রের নাম ৷ কারণ স্কুলস্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সাদা পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরে পাটীগণিত। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো তাঁর নামও শোনেনি।
হুগলির গুড়াপের নাগপাড়ায় ১৮৯৩-এর ১০ জুলাই রথযাত্রার দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ের
গুড়াপের একমাত্র স্কুল নীলমণিতে প্রথমে ভর্তি হলেও
পরে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন যোগেশ্বর হাইস্কুলে ৷ এরপর ভর্তি হলেন কিষেনগঞ্জ হাইস্কুলে। ১৯১২ সালে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে কেশব নাগ এরপর কলকাতার রিপন কলেজে বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্র হিসেবে পড়াশোনার শেষে ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন আই.এ.স.সি. ৷
শিক্ষা জীবনের শেষে এরপর কিছুদিন যোগেশ্বর স্কুলে মাস্টারির সাথে সাথে চললো প্রাইভেট টিউশনি ও উচ্চশিক্ষার প্রচেষ্টা এবং স্নাতক হলেন অঙ্ক সংস্কৃত এবং কলাবিদ্যায়। অর্জন করলেন বি.এ. ডিগ্রি ৷ এরপর আবার কিষেণগঞ্জ স্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পড়িয়েছিলেন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলেও। ক্রমে তাঁর পড়ানোর খ্যাতি কলকাতায় পৌঁছোলো। ফলস্বরূপ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে এলেন কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই প্রধান শিক্ষক রূপে অবসর নেন ৷
কলকাতায় প্রথমে থাকতেন রসা রোডের মেসে ৷ পরে দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনে নিজস্ব বাড়ি বানিয়েছিলেন
শিক্ষকতা নিয়েই মগ্ন ছিলেন কেশবচন্দ্র ৷ স্কুলে অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন কবি কালিদাস রায় ৷ তাঁর বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা ৷ মধ্যমণি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ৷ একদিন বৈঠকী মেজাজেই কথা সাহিত্যিক প্রস্তাব দিলেন বরং বই লিখুন কেশবচন্দ্র ৷ কিছুদিন পরে জোর করে বললেন কালিদাস রায় | যে কেশবচন্দ্রের অঙ্কের ক্লাস ছিল সাহিত্যের মতোই প্রাঞ্জল ৷ যাঁর ক্লাস করতে মুখিয়ে থাকত ছাত্ররা‚ তিনি বই লিখলে আখেরে লাভ পড়ুয়াদেরই ৷
তিনের দশকে প্রকাশিত হল ‘ নব পাটীগণিত ‘ ৷ ইউ. এন. ধর অ্যান্ড সন্স থেকে ৷ কেশবচন্দ্র নাগ থেকে তিনি হলেন কে. সি. নাগ ৷ শরৎচন্দ্র তাঁর নাম দিলেন গণিত শিল্পী৷ দ্রুত জনপ্রিয় হল কে. সি. নাগের পাঠ্যপুস্তক ৷ ১৯৪২ সালে বেরোলো ম্যাট্রিক ম্যাথেমেটিক্স ৷ এত চাহিদা হল‚ যে ছাপিয়ে কূল করা যেত না ৷ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে কে. সি. নাগের গণিত বই ৷ পাকিস্তান বোর্ডের জন্যও লিখেছেন বই ৷ আছে তাঁর বইয়ের ব্রেল সংস্করণ। সামিল হয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামেও ৷ গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন ৷ জেল খেটেছিলেন ম্যালেরিয়ায় ভুগতে ভুগতে ৷ পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব দেন ভোটে দাঁড়ানোর ৷ সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন।
ক্রিকেট ভালোবাসতেন।সেই খেলার ধারাবিবরণী শুনতে শুনতেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেমে এল গণিতশাস্ত্রজ্ঞর জীবনের শেষ অঙ্ক ৷
তাঁর ছাত্রদের তালিকায় আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়‚ সুভাষ মুখোপাধ্যায়‚ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়‚ বিকাশ রায়‚ রঞ্জিত মল্লিকের মতো দিকপালরা ৷ তাঁর বই বিক্রির রয়ালটির টাকা চলে যায় চ্যারিটি ফান্ডে ৷ তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণি দেবীর নামে ফান্ড ৷ গুড়াপে লোকচক্ষুর আড়ালেই পালিত হয় তাঁর জন্মবার্ষিকী ৷
ছবি ও তথ্যসূত্র নেট থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত।