প্রভাষক
১৭ জুলাই, ২০২২ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
মুহাব্বত’ শব্দের বিশ্লেষণ
==================
আল্লাহ তাআলা তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টির মাঝে এক ধরণের ‘চুম্বক’ তৈরি করে রেখেছেন। নি:স্প্রাণ বস্তু তথা জড়পদার্থের ক্ষেত্রে এই চুম্বককে বলা হয় ‘আকর্ষণ’ আর প্রাণীর ক্ষেত্রে বলা হয়, ঝোঁক টান বা অনুরাগ। প্রসিদ্ধ প্রবাদ রয়েছে– الجنس يميل إلى الجنس ‘প্রত্যেক শ্রেণি তার সমশ্রেণির দিকে ঝোঁকে।’ এই ঝোঁক বা অনুরাগের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তাকে বলা হয় ‘মুহাব্বাত’। মুহাব্বাত শব্দটি ‘হাব্বাতুন’ শব্দ থেকে নির্গত। যার শাব্দিক অর্থ দানা, বীজ। আর বাস্তবতা হল, এই বীজ জমিতে বপন করলে তা মাটির নিচে লুকিয়ে যায় এবং আলো-বাতাস ও পানির পরশ পেলে চারা হয়ে গজিয়ে ওঠে। পর্যায়ক্রমে তা ফুল-ফলে ছেয়ে যায়। অনুরূপভাবে মহব্বতের বীজ হৃদয়-ভূমিতে উদগত হলে ধীরে ধীরে তা ফলে-ফুলে সুশোভিত হয়ে উঠে। মনোবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো প্রিয় ও কাংখিত বস্তুর দিকে হৃদয়ের আকষর্ণ সৃষ্টি হওয়াকেই মহব্বত বলে।
— ইমাম গাজালী রহ. মহব্বতের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘মহব্বত হচ্ছে, এমন বস্তুর দিকে হৃদয়ের ঝোঁক বা অনুরাগ তৈরি হওয়া যা দ্বারা মজা বা স্বাদ অর্জন হয়।’
— মোল্লা মাহমূদ কাশানীর ভাষায়, ‘মহব্বত হচ্ছে, সুন্দর কিছু লাভের জন্য ভেতরের টান অনুভূত হওয়া।’
— সাইয়্যেদ মহাম্মাদ যওকী রহ. মহব্বতর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘মহব্বত হচ্ছে একটি চুম্বকীয় আকর্ষণ, যা একে অপরকে নিজের দিকে টানে। কারও মাঝে রূপ-সৌন্দর্যের সামান্য ঝলক দেখেই তার প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়া। হৃদয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া। তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠা। অস্থির হয়ে যাওয়া। দিন রাত তার ধ্যানে মগ্ন থাকা। তার প্রেম সাগরে হাবুডুবু খাওয়া। সামন্য বিচ্ছেদে অস্থির হয়ে যাওয়া। বারবার দর্শণ ও মিলনেও পরিতৃপ্ত না হওয়া। তার খেয়ালে নিজের খেয়াল, তার সন্তুষ্টিতে নিজের সন্তুষ্টি এবং তার অস্তিত্বের মাঝে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া। এই সব কিছুই হচ্ছে মহব্বতের কারিশমা। মহব্বতের রাজত্ব বিশ্ব ব্যাপি। গোটা বিশ্বে প্রতিটি বস্তুই মহব্বতের শেকলে আবদ্ধ। মহব্বতই সৃষ্টিজগতের শুরু। মহব্বতই সৃষ্টি জগতের শেষ। প্রতিটি অনুপরমানুতে মহব্বতের নিদর্শন বিদ্যমান। খনিজসম্পদ, জড়পদার্থসহ যাবতীয় কিছু ‘মহব্বতের’ খাঁচায় আবদ্ধ।
–কাজী মুহাম্মাদ সুলাইমান মনসুরপুরী ‘রহমাতুল লিল আলামীন’ নামক গ্রন্থে হাদিস শরীফ والحب أ ساسي-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, মহববত হচ্ছে হৃদয়ের শক্তি। আত্মার খোরাক। চোখের শীতলতা। শরীরের প্রাণ। অন্তরের জান। জীবনের সফলতা …। মোট কথা, মহব্বতই হচ্ছে জগতের সব কিছুু।’
এই মহব্বত থেকেই সম্পর্ক তৈরি হয়। অর্থাৎ কারও দিকে মন ঝুঁকে পড়ে। ইচ্ছাশক্তি সেই সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে দেয়ার ফলে হৃদয়ে টান ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। এর পর তৈরি হয় জ্বলন। সর্বদা জ্বলন। স্থায়ী জ্বলন। হৃদয়ব্যাথায় বিরহ বেদনায় জর্জরিত হয়ে যায় এবং তা বৃদ্ধি পেতে পেতে চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সর্বত্র মহাব্বতের (প্রেমের) প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হতে থাকে। দুঃখ কষ্ট সহনীয় হয়ে ওঠে। প্রতিবন্ধকতা ক্ষীন দৃষ্টিগোচর হয়। মিলনের লগ্ন ঘনিয়ে আসে। প্রিয়তমের কল্পনা ছাড়া সব কিছু খতম হয়ে যায়। এবং শুধুই প্রিয়তমের প্রেম তখন তার ওপর রাজত্ব করতে থাকে।
বিখ্যাত দার্শনিক আবু আলি ইবনু সীনা দাবী করেছেন যে, মহব্বত পৃথিবী, মহাকাশ, মহাশূণ্য, খনিজদ্রব্য, জ্বালানি, জীবজন্তু ও জড়বস্তু তথা সব কিছুর মাঝেই ছড়িয়ে আছে। এমনকি গণিতবিজ্ঞানীরা বলেন, সংখ্যাগুলোর মধ্যে ‘প্রেমিকসংখ্যা’ হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কিছু সংখ্যা এমন আছে যেগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।
মহব্বত কী?
কোন কোনো গবেষক বলেন, মহব্বতের সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয়। তার অনুভব কেবল হৃদয় দ্বারাই করা সম্ভব। তাই মহব্বতের বিদ্যমানতাই তার সংজ্ঞা। তাই বলা যায় মহব্বত হচ্ছে এক ধরণের আকর্ষণ বা আবেগ যা কেবল হৃদয় দিয়েই উপলব্ধি করা যায়। জ্ঞান-বিবেক দিয়ে নয়। এজন্যই খাজা ইয়াহইয়া মুয়াজ রাজী রহ. বলেছেন,
المحبة حالةلايعبرعنها مقالة
‘মহব্বত হচ্ছে এমন এক অবস্থা যা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না।’
محبت حال است و حال هرگز قال نباشد
‘মহব্বত একপ্রকার হালতের নাম; যা কখনও শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা যায় না।’
তারপরও কোনো কোনো শায়েখ সালেকিনদের ফায়দার প্রতি লক্ষ রেখে মহব্বতের নানারূপ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। যেমন–
১. জনৈক ব্যক্তি শায়েখ আবু বকর শিবলী রহ.-কে জিজ্ঞেস করে, ‘হযরত! মহাব্বত কী জিনিস?’
জবাবে তিনি বলেন,
كأس لها وهج إذا استقر في الحواس وسكن في النفوس تلاشت
‘মহব্বত এমন একটি আগুনের পেয়ালা যা ক্রমশ তীব্রতর হতে থাকে। যখন তা অনুভবে জেঁকে বসে, নফসকে পেয়ে বসে তখন সে একেবারে নি:শেষ করে ছাড়ে।’ অর্থাৎ তার সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে তার প্রেমাস্পদের রঙে রাঙিয়ে তোলে।
২. হযরত বায়জিদ বোস্তামী রহ. বলেন,
اَلْمَحَبَّةُ إِسْتِقْلَالُ الْكَثِيْرِ مِنْ نَفْسِكَ وَ إِسْتِكْثَارُ الْقَلِيْلِ مِنْ حَبِيْبِكَ
‘মহব্বত বলা হয় নিজের পক্ষ থেকে বেশি দিয়েও কম দিয়েছি মনে করা এবং প্রিয়তমের পক্ষ থেকে কম পেয়েও বেশি পেয়েছি মনে করা।’
এজন্যই প্রবাদে বলে, طل من الحبيب وابل প্রেমাস্পদের দিক থেকে বর্ষিত সামান্য শিশিরপাতও মুষলধার-বৃষ্টিতুল্য।
যেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে মহব্বত করেন। যার প্রমাণ এই যে, তিনি বান্দাকে সীমাহীন নাজ-নেয়ামত দেয়ার পরও বলেছেন,
قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ‘
‘দুনিয়ার ধনম্পদ অতি সামান্য।’
পপক্ষান্তরে বান্দা যখন তাঁর যিকির করে তখন যদিও এই যিকির তাঁর শানের তুলনায় অতি তুচ্ছ, কিন্তু তিনি একে বলে দিচ্ছেন, এটা বেশি! যেমন তিনি বলেন,
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا
‘যারা আল্লাহর বেশি যিকির করে।’
জনৈক কবি বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যে,
گرچه اندک انعام توباشد بسیار
ورچه بسیارکنم شکر توباشد اندک
‘আপনি কম নেয়ামত দিলেও মনে হয় প্রচুর পেয়েছি; আর আপনার শোকর প্রচুর আদায় করলেও মনে হয় কম করেছি।’
৩. সাইয়েদুত তায়েফা হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. বলেছেন,
دخول صفات المحبوب على البدل من صفات المحب
‘মহব্বত হচ্ছে প্রেমিকের সকল গুণ বিলীন হয়ে প্রেমাস্পদের সকল গুণ তার মাঝে চলে আসা।’
এই কথাটাই অন্য একজন একটু এভাবে বলেছেন,
اَلْمَحَبَّةُ مَحْوُ الْمُحِبِّ لِصِفَاتِهِ وَإثْبَاتُ الْمَحْبُوْبِ بِذَاتِهِ
‘মহব্বত হল প্রেমিকের সবকিছু বিলীন হওয়ার পর তার মাঝে প্রেমাস্পদের সত্ত্বা বিরাজ করা।’
যেমন, বাল্ব জলানোর পর দূর থেকে সেটিকে একটি আগুনের পিন্ড বলে মনে হয়, তার কাঁচ বা অন্য কিছু দৃষ্টিগোচর হয় না। তেমনি মহব্বতের কারণে প্রেমিকের সব কিছু বিলীন হয়ে কেবল তার প্রেমাস্পদের গুণাবলী নজরে আসে।
বর্ণিত আছে, একবার কেউ একজন মজনুকে বলেছিল, ‘ঐ দেখ, লায়লা আসছে…।’
সঙ্গে সঙ্গে মজনু আচমকা বলে ওঠে, ‘আমিই তো লায়লা।’
কবির ভাষায়–
لیلی و من یکےبودیم دونمودیم
نہ بودشد آں نمود ایک شدیم
عشق وعا شق محوگردد ایں مقام
خود ہماں معشوق ماند والسلام
‘আমি আর লায়লা তো একজনই ছিলাম। কেবল দু’জন দেখা যাচ্ছিল। এই দুই দেখা যাওয়াটা বিলুপ্তির পর আমরা এক হয়ে গেছি। কেননা এমন অবস্থানে এসে ইশক ও আশেক খতম হয়ে যায়। শুধু প্রেমাস্পদ রয়ে যায়।’
৪. হযরত শায়খ আব্দুল কাদেও জিলানী রহ. বলেন,
المحبة حجابٌ بين المحب والمحبوب، فإذا فني المحبُّ عن المحبة ، وُصل بالمحبوب
‘প্রেমিক- প্রেমাস্পদের মাঝে বিদ্যমান পর্দাটাই হল ‘মহব্বত’। প্রেমিক তার প্রেমের মাঝে বিলীন হয়ে গেলে উভয়ে এক হয়ে যায়।’
জনৈক খোদা প্রেমিক বলেন- حب (প্রেম) শব্দটি দু’টি বর্ণ দ্বারা গঠিত। (ح) হা এবং (ب) বা। হা দ্বারা রুহের প্রতি আর বা দ্বারা বদনের (শরীর) প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই যারা মহব্বতের (প্রেমের) পথে পা বাড়ায় তাদের তন-মন সব কিছু বিসর্জন দিয়ে দিতে হয়।
৫. হযরত হুসাইন বিন মনসুর হাল্লাজ বলেন,
حقيقة المحبة قيامك مع محبوبك بخلع أوصافك
‘মহব্বতের হাকিকত (মূলতত্ব) হচ্ছে, তুমি নিজের গুণাবলী ছেড়ে প্রেমাস্পদের সত্ত্বায় বিলীন হয়ে যাবে।’
৬. হযরত সিররি সাকতি রহ.-এর ভাষায়,
‘মহববত হল প্রেমিক তার প্রেমাস্পদকে বলবে তুমিই আমি, অর্থাৎ একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়ার নামই হচ্ছে প্রেম। বা মহব্বত।
৭. হযরত আবু আব্দুল্লাহ করশী রহ.-এর ভাষায় মহব্বত হচ্ছে,
حقيقة المحبة أن تهب لمن أحببت كُلّك ولا يبقى لك منك شي
‘নিজের কাছে কিছুই না রেখে সবকিছু প্রেমিকার কাছে সমর্পন করা। এমনকি ‘তোমার’ বলতে কোনো কিছুু থাকবে না।’
যার প্রকৃষ্ট উপমা স্বয়ং হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. তিনি তাঁর সমুদয় সম্পদ স্বীয় প্রেমাস্পদ হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর খেদমতে পেশ করেছিলেন।
৮. হযরত আবু আলী রোদবারী রহ. মহব্বত সম্পর্কে বলেন,
ما لم تخرج من كليتك لم يدخل في حد المحبة
‘তুমি যে নাগাদ নিজের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে না পড়বে। সে নাগাদ তুমি মহব্বতের গন্ডির মাঝে প্রবেশই করতে পারবে না।’
৯. হযরত রুওয়ায়েম রহ. বলেন,
الموافقة في جميع الأحوال يعني موافقة الحبيب في المشهد والمغيب
‘সর্বাবস্থায় প্রেমাস্পদের অনুকরণ-অনুসরণ করার নামই হচ্ছে মহব্বত বা প্রেম।’
জনৈক কবি বলেন,
وَلَوْ قُلْتَ لِي مُتْ مُتُّ سَمْعًا وَطَاعَةً
وَقُلْتُ لِدَاعِي الْمَوْتِ أَهْلًا وَمَرْحَبَا
‘তুমি যদি বল, মরে যাও, তাহলে তোমার নির্দেশ পালনে মরে যেতে পারি। আর যমদূতকে বলতে পারি ‘খোশ আমদেদ’ স্বাগতম।’
১০. হযরত আবু বকর কাসানী রহ. বলেন,
إيثار المحبوب على جميع المصحوب
‘মহব্বত (প্রেম) হল, সবকিছুর ওপর প্রেমিকাকে প্রাধান্য দেয়া।’
১১. খাজা ইয়াহইয়া মুয়াজ রহ.-এর ভাষায়,
حقيقة المحبة أنها لا تزيد بالبر ولا ينقص بالجفاء
‘মহব্বতের হাকিকত হচ্ছে, প্রেমিকার পক্ষ থেকে জুলুম-অন্যায়ের কারণে তা একটুও কমবে না এবং ভাল ব্যবহার আর উপঢৌকনের কারণে বিন্দুমাত্রও বৃদ্ধি পাবে না। অর্থাৎ সর্বাবস্থায় তা একই রকম থাকবে।’
১২. হযরত শিবলী রহ.-কে পাগল মনে করে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েকজন ব্যক্তি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কারা?’ জবাবে তারা বলে, ‘আমরা আপনার বন্ধু।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদের লক্ষ করে পাথর ছুঁড়ে মারতে লাগলে তারা ছুটে পালাতে শুরু করে। তখন তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘হে আমার বন্ধুত্বের দাবীদারগণ! তোমরা যদি প্রকৃত বন্ধুই হতে তাহলে বন্ধুর পক্ষ থেকে সামান্য আঘাতে ভয়ে পলায়ন করতে না।’
এই বিষয়কেই জনৈক কবি তার ভাষায় এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন,
بلا از دوست عطاست و از بلا نالیدن خطاست
‘বন্ধুর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত কষ্টটাও এক অমূল্য উপঢৌকন। আর বন্ধুর উপঢৌকন-অনুদান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া চরম ধৃষ্টতা। মহা অন্যায়।’
تو از جفا وستم برمن آنچه خواهی کن بکن
که من نه کنم دامنت رها اے دو ست
‘হে বন্ধু! তুমি যত ইচ্ছা আমার প্রতি দুঃখ-যাতনা চালিয়ে যাও, আমি কোনোক্রমেই তোমার আচঁল ছেড়ে দিব না। কারণ তোমার কাছ থেকে পাওয়া সবকিছুই আমার জন্য অমূল্য উপহার।’
১৩. জনৈক আল্লাহপ্রেমিক বলেছেন,
من سكر بكأس المحبة لا يصحو إلا بمشاهدة محبوبه
‘প্রেমের সুধাপানে যে ব্যক্তি মাতোয়ারা সে কেবল প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য লাভেই চৈতন্য ফিরে পেতে পারে।’
১৪. উল্লেখিত যাবতীয় সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যার সারাংশ হযরত শিবলী রহ.-এর উক্তির মাঝে বিদ্যমান। তিনি বলেন,
المحبة إيثا رما يحب المحبوب وإن كرهت
وكراهة ما يكره المحبوب وإن أحببت
‘মহব্বতের আসল অর্থ হচ্ছে প্রেমাম্পদ যা কিছু পছন্দ করে তার সবকিছুই তোমারও পছন্দ করা যদিও তা তোমার অপ্রিয় হয়। আর প্রেমাম্পদ যা কিছু অপছন্দ করে সেগুলোকে তোমারও অপছন্দ করা যদিও সেগুলো তোমার অতি প্রিয় হয়।’
১৫. এই পর্যায়ে এসে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে,
اَلْمَحَبَّةُ مَحْوُ الْمُحِبِّ لِصِفَاتِهِ وَإثْبَاتُ الْمَحْبُوْبِ بِذَاتِهِ
‘মহব্বত হচ্ছে ,প্রেমিক তার নিজস্ব সব কিছু বিসর্জন দিয়ে প্রিয়তমের সব কিছু সাদরে বরণ করে নিবে।’
১৬. এই ফকিরের নিকট মহব্বত তথা প্রেম হচ্ছে, এমন এক অস্থিরতা যা প্রেমাস্পদের সান্নিধ্যলাভ ছাড়া প্রশমিত হয় না। এটি এমন এক আগুন যা প্রেমাস্পদের দর্শন ছাড়া শীতল হয় না। জনৈক প্রেমিক সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে- সে একদিন নির্জনে অতি উচ্চস্বরে কাঁদছিল আর চিৎকার করে করে বলছিল, ‘আগুন! আগুন!! আগুন!!!’ লোকজন ছুটে এসে দেখে সেখানে আগুনের কোনো নাম-নিশানাও নেই। তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কই, কোথায় আগুন লেগেছে?’ তখন সে তার দু’হাত স্বীয় বুকে রেখে বলে ওঠে, ‘এই যে এই এখানে আগুন লেগেছে …।’
نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ
‘এটা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে।’
তাই বলা যায় প্রেমিকের যে অসুস্থতা প্রিয়তমের পরশে বিদূরীত হয়ে যায় সেটাই মহব্বত। তাকেই বলে প্রেম। এটি এমন পিপাসা, যা কখনও নিবারণ হবার নয়। কবির ভাষায়,
شَرِبْتُ الْحُبَّ كَأْسًا بَعْدَ كَأْسٍ
فَمَا نَفِدَ الشَّرَابُ وَمَا رَوِيتُ
‘আমি একের পর এক প্রেমের পেয়ালা পান করে চলেছি। কিন্তু না কখনও সেই প্রেমের সুধা শেষ হয়েছে না আমার তৃষ্ণা নিবারণ হয়েছে …।