Loading..

১৭ জুলাই, ২০২২ ১২:২০ অপরাহ্ণ

বহু উপকারী কালমেঘ

★  কালমেঘ  ★


      পাতাগুলো  কালচে সবুজ রঙের, আর খুব চকচকে! 

 পাতার ধার থেকে একটুখানি অংশ ছিঁড়ে নিয়ে, জিভে ঠেকালেই ভুল ভেঙ্গে যাবে।

 উহঃ, কী তেতো !

  ঠিক না চিনলেও, গাছটার নাম কিন্তু  শুনেছেন – কালমেঘ। সময়ে, বিশেষ প্রয়োজনে, কালমেঘ বহু-বহুগুণ উপকারে লাগতে পারে।  দুই বাংলা ও এতদসংলগ্ন অঞ্চলসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়  ছায়াচ্ছন্ন সরস মাটিতে বর্ষজীবী এই গাছটি জন্মায়। আসুন, কালমেঘ ও তার গুণাগুণ সম্পর্কে কিছুটা অবহিত হ‌ই।

     কালমেঘ, আলুই, কিরাত, যবতিক্তা, বিসর্পিণী, কল্পনাথ, মেঘরাজ, মহাতিয়া (হিন্দি) ভুঁই-নিম্ব (আদিবাসী) ইত্যাদি নামে এর পরিচিতি। ইংরাজি নাম  Creat/ Green Chirata, বৈজ্ঞানিক নাম Andrographis paniculata (Burn.F.), Family Acanthaceae.

     গাছের উচ্চতা সাধারণত দু-তিন ফুট হয়। পাতার আকৃতি অনেকটা লঙ্কাপাতার মত। কাণ্ড ঠিক গোলাকার নয়, কিছুটা চৌকানো।  ফুল ছোটো, সাদা বা ঈষৎ লালচে বেগুনী রঙের। বীজাধার দেখতে অনেকটা যবের  মতো, একটু লম্বাটে এবং বাদামী ছোপযুক্ত। যব-সদৃশ কিন্তু বেশ তেতো বলে এর এক নাম যবতিক্তা। বর্ষার শুরু থেকে শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফুল ও ফল ধরে।

    শীতের শেষভাগে সমগ্ৰ গাছ, ছোটো ছোটো করে কেটে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে, সংরক্ষণ করা উচিত। পাতার লৌকিক ব্যবহার‌ই বেশি, তাই শুধু পাতাও শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারেন। তবে পাতার রস ব্যবহারের ক্ষেত্রে, টাটকা পাতাই বাঞ্ছণীয়। কালমেঘ সাধারণভাবে ক্রিমি ও জ্বরনাশক, ক্ষুধাবর্দ্ধক, অম্ল ও অজীর্ণরোধক, ক্ষত‌ ও চর্মরোগনিরাময়ক। বলদায়ক এবং বায়ু- পিত্ত-কফ নাশক।

    উপযোগিতা ও ব্যবহারবিধিঃ   লোকায়তভাবে, তিরিশ-চল্লিশবছর আগেও 'কালমেঘ-বড়ি' প্রায় প্রতি ঘরেই তৈরি করা হতো। কালমেঘ পাতার সঙ্গে সামান্য পরিমানে দারুচিনি ছোটোএলাচ লবঙ্গ ও গোলমরিচ একত্রে মিশিয়ে মিহি করে শিলে বেটে, দুটো মটরদানার পরিমানে গোল গোল বড়ি করে, রোদে শুকিয়ে  রাখা হতো। ক্রিমি পেটখারাপ ক্ষুধামান্দ্য বদহজম, পেটের যে কোনো সমস্যায় এটি সকালে খালি পেটে জলসহ খাওয়ানো হতো। বড়রা প্রয়োজনে এ বড়ি খেত, ছোটোদের নানারকম রোগ-প্রতিরোধের জন্য নিয়ম করে সপ্তাহ বা দু-সপ্তাহ অন্তর একবার করে খাওয়ানো হতো।

     অম্ল ও অজীর্ণরোগেঃ – যথেচ্ছ গুরুপাক আহার, প্যাকেটবন্দী মসলাদার চটজলদি আহার, অসময়ে অপরিমিত আহার এবং তামাক ও বিভিন্ন মাদকের নেশা থেকে শরীরে অজীর্ণরোগ বাসা বাঁধতে পারে। এর অনুসঙ্গে আসে অরিক্ত অম্ল।  টাটকা কালমেঘ পাতার রস ২-৩ মিঃ লিঃ, এর সঙ্গে একটি বড়‌এলাচের দানা গুঁড়ো করে মিশিয়ে সকালে-বিকালে খালিপেটে দিন দশেক খেতে হবে, সঙ্গে অবশ্যই পরিমিত লঘুপাক আহার। অম্ল অজীর্ণ ভালো হয়ে যাবে।

    পাতলা পায়খানায়ঃ – কালমেঘ পাতার রস ৫-৭ মিঃ লিঃ, ২-৩টি  লবঙ্গের গুঁড়োর সঙ্গে মিশিয়ে সকালে বিকালে খালিপেটে খেতে হবে অন্তত ৪-৬ দিন। এতেই পেটফাঁপা ও পাতলা পায়খানা সেরে  যাবে, অগ্নিবল বেড়ে, খিদেভাব‌ও আসবে।

     রক্ত-আমাশায়ঃ – দীর্ঘদিন ধ'রে পেটখারাপের পর, যখন মলের সঙ্গে রক্ত আসতে আরম্ভ করে, তখন ২৫-৩০ ফোঁটা কালমেঘ পাতার রসের সাথে এক চিমটি মুথা-চূর্ণ মিশিয়ে সকালে বিকালে খালিপেটে খেতে হবে। তিন - চারদিনেই রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে। অনুসঙ্গে, পথ্য হিসাবে খানিকটা আঁঠাবেল-সিদ্ধ, আখেরগুড় সহ খেলে উপকার দ্রুত হবে।

     ক্রিমিরোগেঃ – কালমেঘ পাতার রস ৩০-৪০ ফোঁটা ও  কাঁচা হলুদের রস সমপরিমাণ, একত্রে মিশিয়ে সামান্য আখেরগুড় বা চিনিসহ সাকালে-বিকালে খালিপেটে খেতে হবে, পরপর ৩-৪ দিন। মাসখানেক ছাড়া ছাড়া আর‌ও দু-তিনবার এরকমভাবে খেলে, ক্রিমির উপশম হবেই। এটি পূর্ণবয়স্কের মাত্রা, শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স ও ওজন অনুযায়ী মাত্রা ঠিক করতে হবে।

     দূষিতজ্বরেঃ – কালমেঘ পাতার রস ১৫-২০ ফোঁটা আধকাপ জলে মিশিয়ে সাকাল বিকাল খালিপেটে খেলে ম্যালেরিয়ার জ্বর‌ও প্রশমিত হয়। ইংল্যান্ডে শুকনো কালমেঘপাতা এক ভাগ ও গোলমরিচ দুই ভাগ একত্রে চূর্ণ করে ছোটো ছোটো বড়ি তৈরি করে ম‌্যালেরিয়ার চিকিৎসায় কুইনাইনের বিকল্প ওষুধ হিসাবে একসময় বিক্রয় করা হতো।

     দূষিত ঘায়েঃ – দীর্ঘস্থায়ী দূষিত  ঘায়ে পচন ধরলে কাঁচা অথবা শুকনো পাতা, জলে ফুটিয়ে নিয়ে, সেই জল দিয়ে ক্ষতস্থান দিনে ২-৩ বার ধোয়াতে হবে। অল্পদিনের মধ্যেই ঘায়ের পচন রোধ হয়ে যাবে।

     আদিবাসী চিকিৎসাপদ্ধতিতে সমগ্ৰ কালমেঘ গাছ‌ই নানাবিধ রোগসমাস্যায় ব্যবহৃত হয়। লোধা সম্প্রদায়, রুগির দূর্বলতা কাটাতে, টাটকা শিকড় ১০ গ্ৰাম, আমানি (পান্তাভাতের জল) দিয়ে পিষে, সকালে খালিপেটে নিয়মিত কয়েকদিন খেতে দেন। জ্বরে সমগ্ৰ গাছ ফোটানো জল (decoction) খেতে দেন। সাঁওতাল সম্প্রদায় পেটের আক্ষেপিক (কলিক) যন্ত্রনায়, আহারের পর টাটকা পাতার রস ৫ মিঃ লিঃ পরিমাণে পরপর ৩-৪দিন খেতে দেন। ওঁরাও সম্প্রদায় পাতার টাটকা রস চুলকানিতে সরাসরি মাখান। সমগ্ৰ গাছ ফোটানো জল দিয়‌ও খোস চুলকানি ধোয়ানো হয়। এছাড়াও আদিবাসী সম্প্রদায়ে ভূঁইআমলা (Phyllanthus fraternus Web./P. niruri Hook.) এর সমগ্ৰ গাছ ও কালমেঘ পাতা‌ একত্রে গোলমরিচসহ বেটে, ছোটো ছোটো বড়ি তৈরি করে শুকিয়ে রাখা হয়। যকৃত ও প্লীহাবৃদ্ধিতে এই বড়ি নিয়মিত খেতে দেওয়া হয়।

     আসুন, বাগানে, এক চিলতে জায়গাতে, নিদেনপক্ষে টবেও কালমেঘ গাছ রাখি। প্রয়োজনে এটি বহু উপকারে লাগবে।

                


     .

মন্তব্য করুন