সহকারী প্রধান শিক্ষক
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০১:২১ পূর্বাহ্ণ
নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
#### শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষা হবে সর্বজনীন। শিক্ষা হবে মানবিক, আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিনির্ভর। সেদিক থেকে বিজয়ের ৫২ বছর পরও এখনো পর্যন্ত আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম তৈরি করতে পারিনি। যেখানে শিক্ষা হবে দেশপ্রেমভিত্তিক সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক একই ধারার এবং শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। আমাদের দেশের মতো শিক্ষার এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আছে বলে আমাদের জানা নেই।
আধুনিক এবং সৃজনশীল মেধা বিকাশ সহায়ক শিক্ষাক্রমের মধ্য দিয়ে আমরা শিক্ষার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত দেশ জাপান আজকে উন্নত এবং সভ্য দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটা শুধু সম্ভব হয়েছে জাপানের দেশপ্রেমভিত্তিক সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক একই ধারার এবং মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে। একটি আধুনিক শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের মধ্য দিয়ে তারা আজকের সফল অবস্থানে।
অবশেষে ২০২৩ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ধাপ শুরু করা হচ্ছে। আশা করি এর মধ্য দিয়ে আমাদের ঘুণে ধরা সমাজের পরিবর্তন করে নিখাদ সংস্কৃতির বৈষম্যহীন সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে পারব। কারিকুলামের মূল অংশটুকু পাঠকদের উদ্দেশে উপস্থাপনের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করছি। নতুন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য পড়াশোনা হবে আনন্দময়। বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা এবং চাপ কমানো হবে। গভীর শিখনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বলা হচ্ছে মুখস্থ-নির্ভরতার বদলে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ক্লাস শেষে যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটি যেন না হয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ২০২৪ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণি এ শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে। ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণি যুক্ত হবে। ২০২৬ সালে একাদশ ও ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি যুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চলমান শিক্ষাক্রমের ভুলত্রুটি সংশোধন, আন্তর্জাতিক মান ও সময়ের চাহিদা বিবেচনা করে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা প্রশংসার দাবিদার।
দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে এই শিক্ষা কারিকুলামকে আরও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়নের ফলে মাধ্যমিক পর্যন্ত কোনো বিভাগ বিভাজন থাকছে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির সবাইকে পড়তে হবে ১০টি বিষয়। এতে নিজেদের মধ্যে বিভাজনের পরিবর্তে সৃষ্টি হবে ঐক্য। দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপরই অনুষ্ঠিত হবে এসএসসি পরীক্ষা। একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভাগ পছন্দ করতে হবে। একাদশ শ্রেণি শেষে পরীক্ষা এবং দ্বাদশ শ্রেণি শেষে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে তৈরি হবে এইচএসসির ফল। এ ছাড়া প্রাথমিকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকছে না। চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে হবে আটটি বই। তবে সব শ্রেণিতেই শিখনকালীন মূল্যায়নেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পদ্ধতিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা থাকছে না। নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে সহায়ক কিছু মৌলিক জ্ঞানের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পাবে। এর ফলে শিশুরা সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করবে। জন্ম থেকেই আমাদের সবাইকে (ছেলে ও মেয়ে) প্রজননের অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এ বিষয়ে যেন শিক্ষার্থীরা সুস্পষ্ট ধারণা পায়, এজন্য ‘শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা’ বিষয়ে প্রজনন স্বাস্থ্য নামে অধ্যায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘জীবন ও জীবিকা’ বিষয়টি হবে পেশাভিত্তিক। নবম ও দশম শ্রেণিতে এ বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কৃষি, সেবা বা শিল্প খাতে দক্ষতা অর্জন করবে। এতে দশম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থী যেকোনো একটি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কারিকুলামে সব শ্রেণিতে জোর দেওয়া হবে শিখন পদ্ধতির ওপর। বর্তমান পাঠ্যক্রমে আমাদের একটি বিষয় আছে, যার নাম ‘চারুকলা’। নতুন শিক্ষাক্রমে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’। আগে এ বিষয়ে শুধু চারুকলাকে ফোকাস করা হতো, এখন চারুকলার পাশাপাশি নৃত্যকলা, নাট্যকলা, সংগীত ইত্যাদি বিষয় থেকে শিক্ষার্থী জানতে পারবে। বিষয়টি প্রাথমিকে থাকবে শিল্পকলা নামে এবং মাধ্যমিকে শিল্প ও সংস্কৃতি নামে। অন্যদিকে ‘শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা’ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে।
বর্তমান শিক্ষাক্রমে আমাদের আইসিটি নামে একটি বিষয় আছে। এ বিষয়টির ব্যাপ্তি বাড়িয়ে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি’। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আইসিটির প্রাথমিক জ্ঞান আহরণ করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সতর্কতা, অনলাইন ক্রাইম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিয়মকানুন ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারবে। দেশে বর্তমানে কো-কারিকুলাম খুবই অবহেলিত। ফলে, বর্তমান শিক্ষায় শিক্ষিতরা এক ধরনের স্বার্থপর হয়ে বেড়ে উঠছে। শিক্ষা যেখানে মানুষের মধ্যে দায়বোধ শেখায়, সেখানে বর্তমান শিক্ষা আমাদের উল্টো পথে হাঁটতে শেখাচ্ছে। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সমসাময়িক প্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে ২০২৩ সালের শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যার ওপর ভর করে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। তবে তা নির্ভর করবে ইতিবাচক মানসিকতা, নৈতিকতা এবং সততার ওপর। পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি শিক্ষক ছাড়াও শিক্ষার্থী আলোকিত হতে পারে না। শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতাসহ সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে পারলেই কারিকুলাম সফল করা সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা ও অভিভাবকদের শতভাগ আন্তরিক হতে হবে।
Thanks by-
Md. Khalilur Rahman
Senior Teacher
ICT4E District Ambassador Teacher
Chandipur Model High School
Pirgachha_ Rangpur.
01717590967