Loading..

প্রেজেন্টেশন

রিসেট

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৭:২৯ অপরাহ্ণ

নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, ইসলাম শিক্ষা, প্রথমপত্র, পাঠ ৫

নৈতিক শিক্ষা বা ইসলাম শিক্ষা পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

Importance and Necessity of Islamic Education

নৈতিক শিক্ষা (Moral Education)

মানুষকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করার জন্য ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কতক কাজ করতে হয় আবার কতক কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়এ করা ও না করার চেতনা তৈরি হয় নৈতিকতাবোধ থেকে। নৈতিকতা মানুষকে। উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায়, উপকারি-অপকারি, নীতি-দুর্নীতি, ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ, শিষ্ঠাচার, ইত্যাদি মানদণ্ড শিক্ষা দেয়

ধর্ম ও সামাজিক রীতি-নীতি থেকে মানুষ নৈতিক ধারণা লাভ করে থাকে। তবে ধর্মকেই নৈতিকতার মূল উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়কেননা মানুষের জন্মলগ্ন থেকেই ধর্ম তাদের পথ প্রদর্শন করে আসছে। প্রচলিত সমাজ থেকে প্রাপ্ত নৈতিকতার চেয়ে ধর্ম নির্দেশিত নৈতিকতা অধিক উন্নত ও পরিপূর্ণ। কেননা এটা প্রদত নীতিমালাই সৃষ্টের একমাত্র ও পরিপূর্ণ কল্যাণকামী ।

নৈতিক শিক্ষা বা নৈতিকতা

নৈতিক শিক্ষার ইংরেজি হলো Moral Educationনৈতিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Morality যা Moral থেকে এসেছে, আর তা হলো- standard of behaviour, principles of right and wrong | Morality বলতে বুঝায় principles concerning right and wrong or good and bad behaviour নৈতিকতার আরেকটি ইংরেজি প্রতিশব্দ Ethics আর তা হলো- moral principles that govern or influence a person's behaviour নৈতিকতার আরবি প্রতিশব্দ হলো বহুবচনে অর্থ- স্বভাব, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, চরিত্র

 

ইত্যাদি।

 

পরিভাষায়যে শিক্ষা মানুষকে উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায়, নীতি-দুর্নীতি, উপকারী-অপকারী ইত্যাদি সম্পর্কে চেতনা জাগায় তাকে নৈতিক শিক্ষা বলে। অথবা যে শিক্ষা মানুষের স্বভাব, আচরণ, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, কাজ করার নীতি ও পদ্ধতি অর্থাৎ মানুষের দৈহিক ও মানসিক তৎপরতার পরিশীলিত মানদণ্ড শিক্ষা দেয় তাকে নৈতিক শিক্ষা বলা হয়

 

নৈতিকতার উৎস

এ ব্যাপারে প্রধানত দুটি মত পাওয়া যায়

এক. সামাজিক নীতিবোধ থেকে নৈতিকতার উৎপত্তি।

দুই, ধর্ম থেকে।

 

এ মতামতটিকে অধিক গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী গণ্য করা হয়কেননা পৃথিবীর প্রতিটি সমাজই কোনো না কোনো ধর্মের চর্চা করে থাকে। আর সে সমাজে ঐ ধর্মের নিয়ম-কানুনই মানুষের আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মুসলিম সমাজে নৈতিকতার উৎস হচ্ছে তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান। এর প্রধান দুটি উৎস হলো আল-কুরআন ও আল হাদিস। ধর্ম নির্দেশিত নৈতিকতা চিরন্তন ও শাখত। মানুষের জন্য চিরকল্যাণকর। মানবীয় জীবনদর্শন ও সামাজিক প্রথা থেকে গৃহীত নৈতিকতা অপূর্ণাঙ্গ। মানুষের সীমিত জ্ঞান ও চিন্তা থেকে সার্বিক কল্যাণকর ও চিরস্থায়ী নৈতিকতা অসম্ভব। তা সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় পূণাঙ্গ ও যথেষ্ট নয়

 

ইসলাম হলো মানুষের জীবন পরিচালনার সংবিধান। মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এতে রয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ব এসকল দিকনির্দেশনা মানুষের সামগ্রিক জীবনে বাস্তবায়িত হয়। শরিয়তের নির্দেশনা অনুসারে কাজ করলে প্রতিটি কর্মই ইবাদতে পরিণত হয়। ইসলামি বিধান মতে জীবন পরিচালনা করার জন্য বা তা বাস্তব জীবনে আমল করার জন্য সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। তাই ইসলাম শিক্ষা পাঠ করা ও বাস্তব জীবনে তা চর্চা করা প্রতিটি মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য।

 

নিম্নে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কতিপয় দিক উপস্থাপন করা হলো।

১. আল্লাহ্র নির্দেশ। পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত পাঁচটি আয়াতের প্রথম শব্দটিই 'পড়ো' আয়াতটি হলো-

اقرأ باسم ربك الذي خلق

"পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" ("আলাক-০১)

সুতরাং পড়া তথা জ্ঞান অর্জন করার প্রতি কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। মহানবি (স.) জ্ঞান অর্জন করাকে সরাসরি ফরজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন।

طلب العلم فريضة على كُلِّ مُسلم.

"জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের (নর-নারী) উপর ফরজ।” (সুনান ইবন মাযাহ, হাদিস- ২২৪) তিনি ইলম শিক্ষা করার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে আরো বলেন:

افضل الصدقة أن يتعلم المرء المسلم علما لم يُعلمه أحياة المسلم "সর্বোত্তম সদকা বা দান হলো একজন মুসলমান নিজে ইলম শিক্ষা করে এবং তা তার মুসলমান ভাইকে শিক্ষা দেয়।

ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত তাহিদ, শিরক, বিদআত, হালাল, হারাম ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা ফরজে আইন। শরিয়তের মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান লাভের পর এ বিষয়ে আরো জানা বা পাণ্ডিত্য অর্জন করা ফরজে কেফায়া। তাছাড়া কিছু কিছু জ্ঞান শিক্ষা করা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন: যাদুবিদ্যা, চুরি-ছিনতাইয়ের কৌশল, ধোকাবাজি ইত্যাদি।

 

২. উত্তম ইবাদত: জ্ঞান অর্জন করাকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নবি (স.) এটিকে নফল ইবাদতের

চাইতে বহুগুণে উত্তম বলেছেন। তিনি বলেছেন: الدارس العِلم ساعة من الليل غير من أحبابها.

"রাতের বেলা এক ঘন্টা জ্ঞান চর্চা করা সারা রাত নফল ইবাদতের চাইতে উত্তম ” (সুনান দারিমি, হাদিস- ২৬৪)

 

৩. মর্যাদার মাপকাঠি জ্ঞান: জ্ঞান হলো ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। জ্ঞানী এবং মুর্খ কখনোই সমান হতে পারে না। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

هل يستوي الذين يَعْلَمُون واللين لا يَعْلَمُونَ

"জ্ঞানী আর মূর্খরা কি কখনো সমান হতে পারে।" (সূরা যুমার-৩৯)

আর এ জ্ঞানের কারণেই আল্লাহ তা'আলা আদম (আ.)-কে ফেরেশতাদের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। কেননা আল্লাহ আদম (আ.)-কে যা শিখিয়েছেন তা ফেরেশতাগণ জানতনা। তাই ফেরেশতাগণ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়েছিলেন।

 

৪. প্রভূত কল্যাণকর: ইসলাম শিক্ষা মানুষের জন্য চির কল্যাণ বয়ে আনে। এ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ ইহ ও পরকালের সার্বিক কল্যাণ লাভে সক্ষম হয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,

يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا.

"আল্লাহ যাকে চান তাকে (ধানের/বিশেষ) জ্ঞান দান করেন, আর যাকে এ (ধানের/বিশেষ) জ্ঞান দেয়া হলো তাকে প্রচুর একইভাবে মহানবি (স.) বলেছেন, কল্যাণ দান করা হলো।” (সূরা বাকারা-২৬৯)

আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে তিনি শরিয়তের জ্ঞান দান করেন। ” (বুখারি, হাদিস-৭১, মুসলিম, হাদিস-

২৪৩৬, তিরমিযি, হাদিস- ২৬৪৫)

 

৫. জ্ঞানীগন নবি-রাসুলের উত্তরাধিকারী: ইসলাম শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ফরজ করা হয়েছে। ইসলাম শিক্ষা অর্জন ব্যতীত এ কাজ সম্ভব নয়। যেহেতু মুহাম্মদ (স.)-এর পর আর কোনো নবি আসবেন না, তাই ইলমে দ্বীনের জান অর্জনকারীকে নবি (স.)-এর ওয়ারিস ঘোষণা করা হয়েছে।

وإن العلماء وركة الأنبياء

নিশ্চয়ই আলিমগণ বা জ্ঞানীগণ নবিদের উত্তরাধিকারী।” (আবূ দাউস, হাদিস-৩৬৪৩, ইবন হিব্বান, হাদিস-৮‍)

৬. জ্ঞান অন্বেষণকারী মুজাহিদ তুল্য: কোনো ব্যক্তি যখন জ্ঞান অন্বেষণে ব্যস্ত থাকে তখন সে আল্লাহর রাস্তায় অবস্থান করে। এ অবস্থায় সে মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে নবি (স.) বলেন,

مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ كَانَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يَرْجِع. “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বের হয়, সে আল্লাহর রাস্তায় থাকে যতক্ষণ না ফিরে আসে।" (তিরমিযি, হাদিস-২৬৪৭)

, জ্ঞানী ব্যক্তির বিশেষ মর্যাদা: সাধারণ মানুষের তুলনায় জ্ঞানী ব্যক্তির একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (স.) বলেন,

وان فضل العالم على العابد كفضل القمر على سائر الكواكب. "নিশ্চয়ই আলিমের (জ্ঞানীর) মর্যাদা আবিদের (ইবাদত ওয়ার) উপর, যেমন চাঁদের মর্যাদা সমস্ত তারকারাজির উপর। (ইবন মাযাহ্, হাদিস-২২৩, তিরমিযি, হাদিস-২৬৮২)

জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা বর্ণনায় রাসূল (স.)-এর এ বাণীটি আরো গুরুত্বপূর্ণ: فضل العالم على العابد كفضلي على أَدْنَاكُمْ

"আলিম বা জ্ঞানীর মর্যাদা আবিদের (ইবাদত ওয়ার) উপর, যেমন আমার মর্যাদা তোমাদের সাধারণ একজনের উপর।”

(তিরমিযি, হাদিস-২৬৮৫)

৮. জান্নাত লাভ: সহিহ নিয়্যাতে জ্ঞান অন্বেষণকারীর পুরস্কার হিসেবে রয়েছে জান্নাত। মহানবি (স.) বলেন, من سلك طريقا يلتمس فيه علما سهل الله له به طريقا إلى الجنة الْجَنَّةِ. يَلْتَمِسُ

"যে ব্যক্তি ইলমের অনুসন্ধানে কোনো রাস্তায় চলে মহান আল্লাহ্ তার জন্যে বেহেশতের রাস্তা সহজ করে দেন।” (মুসলিম, হাদিস-৭০২৮, সুনান ইবন মাযাহ, হাদিস- ২২৩, জামে' মুসনাদ আহমদ, হাদিস- ৭৪29)

৯. তাক্বওয়া অর্জন: ইসলাম শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহকে উত্তমরূপে জানতে ও চিনতে পারে। ফলে

 

আল্লাহর প্রতি তার প্রেম, ভালোবাসা জাগ্রত হয়। ব্যাক্তির মাঝে আল্লাহভীতি সদা জাগ্রত থাকে। আল্লাহ বলেন,

إنَّما يخشى الله من عِبَادِهِ الْعُلَماء.

নিশ্চয়ই আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মাঝে সেসব লোকেরাই বেশি ভয় করে যারা জ্ঞানী।" (সূরা ফাতির-২৮)

১০. ইলম অর্জনকারীর জন্য দু'আ: ইসলাম শিক্ষা অর্জনকারীর জন্য আসমান-জমিনের সকল কিছু এমনকি পানির মাছও তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করতে থাকে। মহানবি (স.) বলেছেন, وإن العالم ليستغْفِرُ لَهُ مَن فِي السَّمواتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ والجينان في جوف الْمَاءِ.

প্রজ্ঞান অন্বেষণকারীর জন্য আসমান জমিনের সকল কিছু এমনকি পানির মাছ পর্যন্ত মাগফেরাত কামনা করে থাকে। "

(আবূ দাউদ, হাদিস-৩৬৪৩, তিরমিযি, হাদিস-২৬৮২)

 

.

মন্তব্য করুন