সহকারী শিক্ষক
০৪ জুলাই, ২০২৩ ১০:৪৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একটা শিশু জন্মের পর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত জীবনের অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে। এর মধ্যে সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বা সময় হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকাল। বয়ঃসন্ধিকাল এ একটা ছেলে কিংবা মেয়ের নানাবিধ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন: শারীরিক পরিবর্তন, মানসিক পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন ইত্যাদি।
শুরুতেই জানা প্রয়োজন, বয়ঃসন্ধিকাল কী? জীবনের যে পর্যায়ে একটা শিশু শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে সেই সময়টাকে আমরা বয়ঃসন্ধিকাল বা Puberty বলি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্যমতে, ১০-১৯ বছর বয়সের মাঝামাঝি সময়টাকে বলা হয় কৈশোর এবং কৌশোরের যেকোনো সময়ই ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধি ঘটতে পারে। সাধারণত ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বয়ঃসন্ধি আগে হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে ১১-১৫ বছর বয়স আর মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা ১০-১৩ বছর বয়সে হয়ে থাকে।
এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের উপরে নির্ভর করে বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়ে ভিন্নতা আসতে পারে। যেমন: দেশ, জলবায়ু, পরিবেশ, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি ভেদে ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধি আগে কিংবা পরে হতে পারে।
বয়ঃসন্ধিকালের সময়টাকে বলা হয় জৈবিক গঠনিক পর্যায়। এ সময় ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে এবং প্রাপ্তবয়ষ্ক হয়ে ওঠে।
বয়ঃসন্ধি পাড় করা ছেলে কিংবা মেয়ের প্রতি পরিবারের অন্য সদস্যদের সচেতন আচরণ করা উচিত। এজন্য কোন সময়টা বয়ঃসন্ধির এবং বয়ঃসন্ধিকালে কী কী পরিবর্তন হতে পারে সে সম্পর্কে কিশোর-কিশোরী ছাড়াও অবিভাবকদেরও ধারণা রাখতে হবে।
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের যেসব পরিবর্তনগুলো হতে পারে সেগুলো হচ্ছে শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
বয়ঃসন্ধিকালে একটা ছেলে কিংবা মেয়ের বেশ কিছু শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আর এ থেকে ধারণা করা যায় যে ছেলে কিংবা মেয়েটি বয়ঃসন্ধি চলছে।
এই সময়টাতে হর্মোনজনিত কারণে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বেশ কিছু মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ছেলেদের মানসিক পরিবর্তন ঘটে Testosterone এর কারণে আর মেয়েদের ক্ষেত্রে Oestrogen ও Progesterone হর্মোন।
এই মানসিক পরিবর্তনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে ভালো অথবা খারাপ পথে পরিচালিত করে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই পরিবর্তনগুলো প্রায় একই হয়।
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বেশ কিছু আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এসব পরিবর্তন দেখে অন্যকেউ ধারণা করতে পারে কোনো শিশুর বয়ঃসন্ধি শুরু হয়েছে কিনা।
সমাজের সাথে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে-মেয়েদের খুব দ্রুত কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
ইউনিসেফ (UNICEF) এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশের বেশি ছেলে-মেয়ে বয়ঃসন্ধিকাল পাড় করে। কিন্তু আমাদের দেশে বয়ঃসন্ধির বিষয়টি খুবই অবহেলার সাথে দেখা হয়, যা আসলেই কাম্য নয়। এই অবহেলার কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষার অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেহেতু এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তরকালীন সময়, তাই এই সময়টাতে ছেলে-মেয়ে, পরিবারের অন্য সদস্যসহ সমাজের সকল পক্ষের উচিত নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন দায়িত্ব পালন করা।
একটা শিশুর বয়ঃসন্ধিতে পরিবার ও সমাজের অন্য পক্ষসমূহ যেসব ভূমিকা পালন করতে পারে সেগুলো হলো-
অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষকরা এই সময়ে ছেলে-মেয়েদেরকে তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ দিতে পারেন এবং কীভাবে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয় সে বিষয়েও সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারেন।
অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করলে ভাই-বোন কিংবা ঘনিষ্ঠ কেউ তাদের সাথে কথা বলতে পারেন।
এই সময়ে ছেলে-মেয়েরা হরমোন জনিত পরিবর্তনের কারণে নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে থাকে। এতে অনেক সমমে অভিভাবকরা রেগে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন।
এমনটি না করে অভিভাবকদের কৌশলী হয়ে তাদেরকে বোঝাতে হবে। তাদের মতামতের অসম্মান হয় এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়।
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের খুব দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে দেহে প্রচুর পুষ্টি ও সুষম খাবারের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় নিজেদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
এ সময়ে সন্তানের নিয়মিত খাদ্যতালিকার ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন দায়িত্ব পালন করা জরুরি। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যেন প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, কার্বোহাইড্রেট, জিংক সমৃদ্ধ শাকসবজি, ফলমুল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই সময়ে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেকগুলো মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তারা হঠাৎ করেই খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে পারে। তাদের মানসিক পরিবর্তন বুঝতে তাদেরকে সময় দিতে হবে।
এছাড়া বন্ধুদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ভুল পথে যাচ্ছে কিনা সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে নেতিবাচক কিছু দেখলে হঠাৎ কিছু করে না বসে বুঝিয়ে বলতে হবে, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য অনুধাবন করতে শেখাতে হবে।
ছেলে-মেয়েদের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। এ বিষয়ে আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের মাঝেই অনীহা ও অসতর্কতা লক্ষ্য করা যায়।
সমাজের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই শিশু, কিশোররা। তাই তাদের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের ব্যাপারে উদাসীন হওয়া উচিত নয়।
এজন্য ছেলে-মেয়ে ও অভিভাবক উভয়েরই বয়ঃসন্ধিকাল কী, এ সময়ে কী কী পরিবর্তন ঘটে এবং এতে পরিবারের ভূমিকা কী সে ব্যাপারে জানতে হবে। আশা করছি, আজকের আর্টিকেলে সেসব তথ্য জানাতে পেরেছি।