সহকারী শিক্ষক
২৪ এপ্রিল, ২০২৪ ০৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ ষষ্ঠ
বিষয়ঃ বিজ্ঞান
অধ্যায়ঃ নবম অধ্যায়
বল ও শক্তি
বল
যা স্থির বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তাকে গতিশীল করে বা করতে চায় বা যা গতিশীল বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তার গতির পরিবর্তন করে বা করতে চায় তাকে বল বলে।
বলের একক নিউটন। যে পরিমাণ বল 1 Kg ভরের কোনো বস্তুর উপর প্রযুক্ত হয়ে 1ms-2 ত্বরণ সৃষ্টি করে তাকে 1N বল বলে।
যখন m = 1 Kg, a = 1 ms-2 তখন F = 1 N হয়।
অর্থাৎ, F = 1Kg × 1ms-2 = 1N
অভিকর্ষ
কোনো বস্তুকে পৃথিবী যে বল দ্বারা আকর্ষণ করে তাকে অভিকর্ষ বা মার্ধ্যাকর্ষণ বলে। কোনো বস্তুকে উপর থেকে নিচে ছেড়ে দিলে যে বলের প্রভাবে বস্তুটি নিচে পড়তে থাকে এবং বস্তুটিতে ত্বরণের সৃষ্টি হয় তাকে অভিকর্ষ বল বলে। অভিকর্ষ বলের প্রভাবে বস্তুতে সৃষ্ট ত্বরণকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বলে। অর্থাৎ, অভিকর্ষ বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে মুক্তভাবে পড়ন্ত কোনো বস্তুর বেগ বৃদ্ধির হারকে অভিকর্ষজ ত্বরণ বলে। পৃথিবী যে বল দ্বারা কোনো বস্তুকে আকর্ষণ করে তাকে বস্তুর ওজন বলে। অর্থাৎ,বস্তুর ওজন এক প্রকারের বল।
অর্থাৎ, বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল = বস্তুর ওজন = ভর × অভিকর্ষজ ত্বরণ
বা, F = W = mg
মহাকর্ষ
মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বলে। যেমন- চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে যে আকর্ষণ তা মহাকর্ষ। আবার, মহাবিশ্বের যে কোনো দুটি বস্তুর মধ্যে যদি একটি পৃথিবী হয় এবং অপরটি পৃথিবী পৃষ্ঠে বা পৃষ্ঠের কাছাকাছি অবস্থিত কোন বস্তু হয় সে ক্ষেত্রে মহাকর্ষকে অভিকর্ষ বলে।
তাড়িতচৌম্বক বল
দুটি চুম্বক অথবা লোহা ও চুম্বকের মধ্যে যে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে চৌম্বক বল বলে। আবার, দুটি সমধর্মী বা বিপরীত ধর্মী আধানের মধ্যে যে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে তড়িৎ বল। যখন দুটি আহিত কাণা স্থির থাকে তখন তাদের মধ্যে কেবল তড়িৎ বল ক্রিয়া করে। যখন আহিত কণাগুলো গতিশীল থাকে তখন তড়িৎবলের পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত বল ক্রিয়া করে যা হলো চৌম্বক বল। তাড়িতচুম্বক বল মহাকর্ষ বলের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এই বল আকর্ষণ ও বিকর্ষণধর্মী হতে পারে।
ঘর্ষণ
দুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে থেকে যদি একের উপর দিয়ে অপরটি চলতে চেষ্টা করে তবে বস্তুদ্বয়ের স্পর্শ তলে এই গতির বিরুদ্ধে একটা বাধার উৎপত্তি হয় এই বাধাকে ঘর্ষণ বলে।
ঘর্ষণ বল
দুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে থেকে যদি একের উপর দিয়ে অপরটি চলতে চেষ্টা করে তবে বস্তুদ্বয়ের স্পর্শ তলে এই গতির বিরুদ্ধে যে বল উৎপন্ন হয় তাকে ঘর্ষণ বল বলে।
আপাত দৃষ্টিতে যে দুটো তলদেশের মধ্যে ঘর্ষণ হচ্ছে তাকে অনেক মসৃণ মনে হয় কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে দেখা যায় সব তলদেশই অমসৃন বা এবড়োথেবড়ো এবং এই এবড়োথেবড়ো অংশগুলো একে অন্যকে স্পর্শ করে বা খাঁজগুলো একে অন্যের সাথে আটকে যায়, সে কারণেই গতি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং আমরা বলি বিপরীত দিক থেকে ঘর্ষণ বলের জন্ম হয়েছে।
ঘর্ষণ কমানোর উপায়
(১) তলকে যথাসম্ভব মসৃণ করা। মসৃণপৃষ্ঠে ঘর্ষণ কম হয়।
(২) ঘর্ষণরত দুটি তলের মধ্যে তেল, মবিল বা গ্রিজ জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা।
(৩) চাকা যেহেতু ছোট এক জায়গায় স্পর্শ করে, তাই চাকা ব্যবহার করে ঘর্ষণ কমানো যায়।
(৪) ঘুরন্ত চাকায় বল - বিয়ারিং ব্যবহার করে ঘর্ষণ কামানো যায়।
(৫) দুটি পৃষ্ঠদেশকে খুব অল্প জায়গায় পরস্পরকে স্পর্শ করানো।
(৬) দুটি পৃষ্ঠের মধ্যে লম্বভাবে আরোপিত বল কমানো।
ঘর্ষণ বাড়ানোর উপায়
(১) যে দুটো তলে ঘর্ষণ হয় তাদের অমসৃণ করে তোলা।
(২) যে দুটি তলে ঘর্ষণ হয় সেই দুটি তল জোরে চেপে ধরা।
(৩) ঘর্ষণরত তলের মাঝে খাঁজকাটা - জুতার তলা কিংবা গাড়ির চাকায় যেটা করা হয়।
(৪) ঘর্ষণরত তল দুটি স্থির থাকলে ঘর্ষণ বেশি হয় বলে সেগুলোকে স্থির রাখার ব্যবস্থা করা।
(৫) বাতাস বা তরলে ঘর্ষণরত পৃষ্ঠদেশ বাড়িয়ে দেওয়া।
(৬) দুটি পৃষ্ঠের মধ্যে লম্বভাবে আরোপিত বল বৃদ্ধি করা।
সরল যন্ত্র
সরল যন্ত্র (simple machine) এমন একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা যা বলের দিক অথবা পরিমাণ পরিবর্তন করে। সাধারণভাবে বলা যায় সবচেয়ে সরল উপায়ে যান্ত্রিক সুবিধা ব্যবহার করে বলবৃদ্ধি করার ব্যবস্থাকে সরল যন্ত্র বলে। সরল যন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা কে যান্ত্রিক সুবিধা বলে। দুইটি বলের পরিমাণের অনুপাতকে যান্ত্রিক সুবিধা বলা হয়।
সরল যন্ত্র একটিমাত্র বলের ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি কাজ করে।
লিভার
লিভার হলো একটি সরল যন্ত্র, যাতে একটি শক্ত দণ্ড অবলম্বনের জন্য কোনাে কিছুর উপর ভর করে মুক্তভাবে ওঠানামা করে বা ঘােরে। লিভারের একটি সাধারণ উদাহরণ হলাে শাবলকে ইট বা পাথরের উপরে ভর করে কোনাে ভারি বস্তুকে উঠাতে সাহায্য করে। এখানে ভারি বস্তুটি হলাে ভার এবং এই ভারকে উঠাতে যে বল প্রয়ােগ করা হয় তা হলাে বল। শক্ত দণ্ডটিকে ঠেকানাের জন্য কোনাে অবলম্বনের যে বিন্দুতে মুক্তভাবে ওঠানামা করে বা ঘােরে তা হলাে ফালক্রাম। লিভার কোনাে ভারি বস্তুকে কম বল প্রয়ােগ করে উঠাতে বা সরাতে সাহায্য করে।
লিভারের নীতিমালা
বল × বল বাহুর দৈর্ঘ্য = ভার × ভার বাহুর দৈর্ঘ্য
বা, বল বাহুর দৈর্ঘ্য / ভার বাহুর দৈর্ঘ্য = ভার / বল
এখানে, বল যে বিন্দুতে প্রযুক্ত হয় তা থেকে ফালক্রাম পর্যন্ত দূরত্ব হলো বল বাহুর দৈর্ঘ্য (y)। অনুরূপভাবে ভার থেকে ফালক্রাম পর্যন্ত দূরত্ব হলো ভার্বাহুর দৈর্ঘ্য (x)।
বল বাহর দৈর্ঘ্য (y) ভার বাহুর দৈর্ঘ্য (x) থেকে যতগুণ বেশি হবে বল বাহুতে ছোট বল (f) প্রয়োগ করে তত গুণ বেশি বড় বল (F) সামাল দেওয়া যাবে।
যান্ত্রিক সুবিধা : F / f = y / x
কপিকল
কপিকল এক ধরনের সরল যন্ত্র। এটি মূলত একটি চাকা, যার কিনারা বরাবর একটি খাঁজ রয়েছে, যেখানে একটি দড়ি বা তার পেঁচিয়ে লাগানো থাকে। এটি বিশেষ ধরনের চাকা দিয়ে তৈরি, যা একটি অক্ষকে কেন্দ্র করে অবাধে ঘুরতে পারে এবং চাকার ওপর দিয়ে একটি রশ্মি সহজে চলতে পারে।
আমরা প্রায়শই স্কুল-কলেজে কপিকলের সাহায্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে দেখি। আদর্শ কপিকলের ক্ষেত্রে ঘর্ষণজনিত ক্ষয় শূন্য বলে গণ্য করায় রশির উভয় দিকে এর ওপর টান বল সমান থাকে। কপিকল ভারোত্তোলনের কাজে, শিল্প-কারখানা, গবেষণাগারে, এমনকি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা হয়।
যেকোনো মানুষ শুধু তার শরীরের ক্ষমতা ব্যবহার করে যতটা ওজন তুলতে পারে, কপিকল ব্যবহার করে তার চেয়ে ভারী বস্তু টেনে তোলা সম্ভব।
কপিকলের যান্ত্রিক সুবিধা = বল যতটা পথ অতিক্রম করে / ভার যতটা পথ অতিক্রম করে
হেলানো তল
কোনো তলের দুই প্রান্ত দুটি ভিন্ন উচ্চতায় থাকলে তাকে হেলানো তল বলা হয়। কোনো বস্তুকে খাড়াভাবে নিম্নস্থান থেকে উচ্চস্থানে তুলতে যে বল প্রয়োগ করতে হয় তার থেকে অনেক কম বল প্রয়োগ করে আনত তলের সাহায্যে বস্তুকে উপরে ওঠানো যায়।যান্ত্রিক সুবিধা = অতিক্রান্ত দূরত্ব / অতিক্রান্ত উচ্চতা
চাকা-অক্ষদণ্ড
চাকা-অক্ষদন্ড এক ধরনের সরল যন্ত্র। এটা মূলত লিভারের ভিন্নরূপ। এখানে ভারকে একটি রশির মাথায় বাঁধা হয় এবং চাকাটিকে ঘুরিয়ে সে রশিটি অক্ষদন্ডে জড়ানো হয়। চাকা ও অক্ষদন্ডের ব্যাসার্ধের অনুপাতের ওপর এর যান্ত্রিক সুবিধা নির্ভর করে। অর্থাৎ যদি চাকার ব্যাসর্ধ অক্ষদন্ডের ব্যাসার্ধের ৬ গুণ হয় তবে ১ কিলোগ্রাম বল প্রয়োগ করে ৬ কিলোগ্রাম ভরের বস্তুকে উপরে উঠানো যাবে। তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, চাকা অক্ষদন্ডের যান্ত্রিক সুবিধা বৃদ্ধি জন্য এর চাকার ব্যাসার্ধ বেশি হওয়া প্রয়োজন। মোটরগাড়ির হুইল, স্ক্রু-ড্রাইভার ইত্যাদি চাকা-অক্ষদন্ডের মতো কাজ করে।
যান্ত্রিক সুবিধা = বড় চাকার ব্যাসার্ধ / অক্ষ দণ্ডের ব্যাসার্ধ
ফাল
ফাল একটি সরল যন্ত্র যার এক প্রান্তে সরু এবং অন্য প্রান্ত মোটা। এটি দুটি বাঁকযুক্ত সমতল দিয়ে তৈরি। এই সমতলগুলি মিলিত হয়ে একটি ধারালো প্রান্ত তৈরি করে। বল প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রান্ত জিনিস বিভক্ত করতে পারে।
যান্ত্রিক সুবিধা = ফলার দৈর্ঘ্য / ফলার পুরুত্ব = L / t
জ্যাক স্ক্রু একসাথে লিভার ও হেলানো তলের নীতি মেনে কাজ করে। স্ক্রু পেঁচানো অংশের উচ্চতা হলো হেলানো তলের উচ্চতা এবং পেঁচানো পথ দিয়ে ঘুরে যেতে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে তা হলো হেলানো তলের দৈর্ঘ্য। এই যন্ত্রে হেলানো তলের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে যান্ত্রিক সুবিধা পাওয়া যায়। অন্য দিকে হাতলে যেদিকে বল প্রয়োগ করা হয় ভার কাজ করে তার লম্ব বরাবর। ফলে জ্যাক স্ক্রু একই সাথে বল বৃদ্ধি ও বলের দিক পরিবর্তন করে কাজকে সহজ করে।
স্ক্রু
একটি স্ক্রু হল একটি রড বা পেরেক যার বৃত্তাকার বাঁকা পৃষ্ঠে খাঁজ রয়েছে। সহজ ভাষায়, একটি ঘূর্ণায়মান বাঁকযুক্ত সমতলকে স্ক্রু বলা হয়। এটি এমন একটি মেশিন যা ঘূর্ণন গতিকে রৈখিক গতিতে রূপান্তর করে । এটি দুটি বস্তুকে দৃঢ়ভাবে একসাথে ধরে রাখতে এবং জিনিস তুলতে ব্যবহৃত হয়। স্ক্রুটির মাথায় একটি স্ক্রু ড্রাইভারের ডগা জন্য একটি খাঁজ রয়েছে।
যান্ত্রিক সুবিধা = রেঞ্জের দৈর্ঘ্য / দুটো খাঁজের মাঝখানের দূরত্ব = L / l
কাজ
কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগে যদি বস্তুটির সরণ ঘটে তাহলে বল ও বলের অভিমুখে সরণের উপাংশের গুণফলকে কাজ বলে।
ধরা যাক, A বিন্দুতে অবস্থিত কোনো বস্তুর উপর AB বরাবর F বল প্রয়োগ করা হলো। ফলে বস্তুটির AB বরাবরই সরণ ঘটে। তাহলে F বল দ্বারা সম্পন্ন কাজের পরিমাণ,
W = বল × বলের দিকে সরণের উপাংশ
= F × S
কাজের একক জুল। বলের একককে সরণের একক দিয়ে গুন করলে কাজের একক পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, কাজের একক = বলের একক × সরণের একক = নিউটন × মিটার = জুল।
কোনো বস্তুর উপর এক নিউটন বল প্রয়োগের ফলে বলের ক্রিয়া রেখা বরাবর বস্তুর সরণ এক মিটার হলে সম্পন্ন কাজের পরিমাণকে এক জুল বলে।
যদি বল, F = 1N এবং বলের দিকে সরণ, S = 1m হয়, তবে কাজ,W = 1N × 1m = 1J (জুল)
শক্তি
কোনো বস্তু বা ব্যবস্থার কাজ করা সামর্থ্যকে শক্তি বলে। কোনো বস্তু বা ব্যবস্থা যে পরিমাণ কাজ করতে সক্ষম তা দিয়ে এর শক্তি নির্ণয় করা হয়। তাই কাজ ও শক্তির পরিমাণ অভিন্ন এবং শক্তির একক কাজের এককের অনুরূপ অর্থাৎ জুল (J)।
গতিশক্তি
কোনো গতিশীল বস্তু তার গতির জন্য কাজ করার যে সামর্থ্য অর্জন করে তাকে গতিশক্তি বলে। স্থির বস্তুতে বল প্রয়োগ করলে বস্তু গতিপ্রাপ্ত হয়। গতিশীল বস্তু স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে। এই কাজই হচ্ছে গতিশক্তির পরিমাপক। বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল বস্তুতে গতিশক্তি হিসেবে জমা থাকে। গতিশীল বস্তু স্হির অবস্থায় আসার পূর্ব পর্যন্ত যে পরিমাণ কাজ করতে পারে তার দ্বারা বস্তুটির গতিশক্তি পরিমাপ করা হয়। আবার, বস্তুটি যে বেগে গতিশীল বস্তুটিকে স্থির অবস্থান থেকে ওই বেগ দিতে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়েছে তা হচ্ছে বস্তুটির গতিশক্তি।
কোনো বস্তু যখন স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার গতিশক্তি থাকে না। ধরা যাক, m ভরের একটি স্থির বস্তুর উপর F বল প্রয়োগ করায় বস্তুটি V বেগ প্রাপ্ত হলো এবং এই সময়ে বস্তুটি বলের দিকে S দূরত্ব অতিক্রম করে। বস্তুটিকে এই বেগ দিতে কৃত কাজই বস্তুর গতিশক্তি।
তাহলে,
গতিশক্তি = কৃত কাজ
= বল × সরণ
= F × S
বা, Ek = maS -------- (1)
কিন্তু v2 = u2+ 2aS —-------- (2)
বা, as = v2/2
অর্থাৎ, Ek = ½ mv2 —----------- (3)
যেহেতু বস্তুর ভর m একটি রাশি,সুতরাং, Ek = ধ্রুবক × v2
বা, Ek ∝ v2
অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভরের কোনো বস্তুর গতিশক্তি এর বেগের বর্গের সমানুপাতিক।
বস্তুর বেগ দ্বিগুন হলে গতিশক্তি চারগুণ হবে, বেগ তিনগুণ হলে গতিশক্তি নয়গুণ হবে।
পড়ন্ত বস্তুর গতিশক্তির ক্ষেত্রে (2) ও (3) নং সমীকরণ সমন্বয় করে পাই,
Ek = ½ m(u2+ 2gh)
বা, Ek = ½ m (02+ 2gh) [যেহেতু স্থির অবস্থান থেকে পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে u=0]
Ek = ½ m × 2gh
Ek = mgh
যেহেতু বস্তুর ভর, m এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ, g ধ্রুবক সুতরাং,
Ek = ধ্রুবক × h
Ek ∝ h
অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর গতি শক্তি উচ্চতার সমানুপাতিক।
উচ্চতা দ্বিগুণ হলে গতিশক্তি দ্বিগুণ হবে, উচ্চতা তিনগুণ হলে গতিশক্তি তিনগুণ হবে।
শক্তির রূপান্তর
শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, শক্তি কেবল এক রূপ থেকে অপর এক বা একাধিক রূপে পরিবর্তিত হতে পারে। মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয়। এটা শক্তির অবিনশ্বরতা বা শক্তির সংরক্ষণশীলতা বা শক্তির নিত্যতা। আমরা যখন ঘরে বাতি জালাই তখন বৈদ্যুতিক শক্তিকে আলোতে রূপান্তরিত করি, যখন হিটার ব্যবহার করি তখন তাপে রূপান্তর করি, যখন লাউডস্পিকারে গান শুনি তখন সেটাকে শব্দে রূপান্তরিত করি, যখন ফ্যান চালাই তখন তাকে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত কারি। কাজেই শক্তির সৃষ্টি নেই কিংবা ধ্বংস নেই, শুধু এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়।
দুইটি বস্তুর সংঘর্ষের পরে তাদের বেগ
v1 = [u1(m1-m2) + 2m2u2] / m1+m2
v2 = [u2(m2-m1) + 2m1u1] / m1+m2
যদি দুইটি বস্তুর ভর সমান হয় অর্থাৎ, m1 = m2 তবে v1 = u2 এবং v2 = u1
অর্থাৎ, সংঘর্ষের পরে বস্তু দুইটি পরস্পরের বেগ বিনিময় করে।
যখন বস্তু দুইটির ভর সমান ও দ্বিতীয় বস্তুটি স্থির হয় অর্থাৎ, m1 = m2 এবং u2= 0 হয়, তবে v1 = 0 এবং v2 = u1
অর্থাৎ, সংঘর্ষের পরে প্রথম বস্তুটি থেমে যাবে এবং দ্বিতীয় বস্তুটি প্রথম বস্তুর প্রাথমিক বেগ নিয়ে চলতে থাকবে।
যেমন ক্যারম খেলার সময় একটা গুটি স্থির রেখে অন্য একটি গুটি দিয়ে টোকা মেরে সেটাকে আঘাত করলে টোকা দেওয়া গুটি স্থির হয়ে যাবে এবং স্থির গুটিটা গতিশীল গুটির বেগে বের হয়ে যাবে। প্রথম গুটির গতি যত বেশি হয় স্থির গুটি তত বেশি গতিতে অন্যদিকে ছুটে যায়। কারণ শক্তির সৃষ্টি বা বিনাস নেই, শক্তি শুধু এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়।
শক্তির পরিমাপ
কাজ সম্পাদনকারী কোন ব্যক্তি বা যন্ত্রের কাজ করার হার বা শক্তি রূপান্তরের হারকে ক্ষমতা বলে। অর্থাৎ একক সময় ব্যক্তি বা যন্ত্রটি দ্বারা সম্পাদিত কাজের পরিমাণই হচ্ছে ক্ষমতা।
কোন ব্যক্তি বা যন্ত্র t সময়ে W পরিমাণ কাজ সম্পাদন করলে,
ক্ষমতা = কাজ / সময়
বা, P = W / t
কাজের একককে সময়ের একক দ্বারা ভাগ করলে ক্ষমতার একক পাওয়া যায়। ক্ষমতার একক হচ্ছে ওয়াট (W)।
1s এ এক জুল কাজ করার ক্ষমতা কে 1W ওয়াট বলে।
অর্থাৎ, P = W / t = 1J / 1s = 1W
বিভব শক্তি
স্বাভাবিক অবস্থা বা অবস্থান পরিবর্তন করে কোনো বস্তুকে অন্য কোনো অবস্থায় বা অবস্থানে আনলে বস্তু কাজ করার যে সামর্থ্য অর্জন করে তাকে বিভব শক্তি বলে।
একটি স্প্রিং বা রাবার ব্যান্ডকে টানটান করলে এই টানটান অবস্থার জন্য স্প্রিংটি তার পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সময় কাজ সম্পন্ন করতে পারে। স্প্রিংটি তার স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কাজ করার যে সামর্থ্য অর্জন করে সেটি তার বিভব শক্তি। একটি স্প্রিং এর এক প্রান্তে একটি ভর ঝুলিয়ে দিলে যদি বস্তুটির সরণ x হয় তবে স্প্রিং এর বিভব শক্তি,
U = ½ Kx2
এখানে, K সমানুপাতিক ধ্রুবক।
অভিকর্ষজ বিভব শক্তি
অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করে কোনো বস্তুর অবস্থান পরিবর্তন করলে বস্তু কাজ করার যে সামর্থ্য লাভ করে তাকে অভিকর্ষজ বিভব শক্তি বলে।
m ভরের কোনো বস্তুকে ভূপৃষ্ঠ থেকে h উচ্চতায় উঠাতে কৃত কাজই হচ্ছে বস্তুতে সঞ্চিত বিভব শক্তির পরিমাপ। আর এক্ষেত্রে কৃত কাজ হচ্ছে বস্তুর উপর প্রযুক্ত অভিকর্ষ বল তথা বস্তুর ওজন এবং উচ্চতার গুণফলের সমান।
অর্থাৎ, বিভব শক্তি = বস্তুর ওজন × উচ্চতা = বস্তুর ভর × অভিকর্ষজ ত্বরণ × উচ্চতা
বা, Ep = mgh —----------- (1)
যেহেতু বস্তুর ভর m ও অভিকর্ষজ ত্বরণ, g ধ্রুবক সুতরাং, (1) নং সমীকরণ অনুসারে পাই,
Ep, = ধ্রুবক × h
বা, Ep∝ h
অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর বিভব শক্তি উচ্চতার সমানুপাতিক।
উচ্চতা দ্বিগুণ হলে বিভবশক্তি দ্বিগুণ হবে, উচ্চতা তিনগুণ হলে বিভব শক্তি তিনগুণ হবে।
ভর ও শক্তির সম্পর্ক
বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে বস্তুর ভর ও শক্তি অভিন্ন বিষয়। যদি কোন বস্তুর ভর m কে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় তবে সেই শক্তির পরিমাণ, E = mc2। যেখানে C হচ্ছে আলোর বেগ যেহেতু আলোর বেগ 3×108 m/s, কাজেই সামান্য পরিমাণ ভরকে শক্তির শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে আমরা বিশাল শক্তি পেয়ে যাব। নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্রে এই তত্ত্বটি কাজে লাগানো হয়। সূর্যের মধ্যেও এই প্রক্রিয়ায় শক্তি তৈরি হয় বলে এটি পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে শক্তি দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো পাঁচ বিলিয়ন বছর শক্তি দিয়ে যাবে।
পাঠ উপস্থাপন
শিবুব্রত মন্ডল (এম, এসসি)
সহকারী শিক্ষক (গণিত ও বিজ্ঞান)
বেতমোর রাজপাড়া ইউনিয়ন আদর্শ
মধ্যমিক বিদ্যালয়।
মাষ্টার ট্রেইনার (গণিত)
Mobile: 01718638797
Email: [email protected]