Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২৬ আগস্ট, ২০২৫ ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

চাল: জীবনের প্রধান খাদ্যশস্য

চাল বলতে আমরা সাধারণত ধানের ভেতরের খাদ্যশস্যকেই বুঝি। ধান থেকে তুষ বা খোসা ছাড়িয়ে যে দানাটি পাওয়া যায় তাকেই চাল বলা হয়। চাল বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য, বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে। চাল সাধারণত আকার, গঠন ও গুণাগুণ অনুসারে বিভক্ত করা হয়-

বাদামি চাল

সবচেয়ে পুরনো শস্য হলো বাদামি চাল। ধান ছাড়ানো হলে চালের যে অংশটি উন্মুক্ত হয় তা অনেকটা বাদামি রঙের। এই চাল আগে ঢেকি ছাঁটা চাল হিসেবেই বিক্রি করা হত। চালের পুষ্টিগুণের পুরোটা মেলে বাদামি চাল থেকে। এই চালের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার। প্রতি কাপ শুকনো চালে যে পরিমাণ ফাইবার থাকে তা সাদা চালের তুলনায় ১.৫ গ্রাম বেশি। বাদামি চাল যে ফাইবার থাকে তা অদ্রবণীয়। যা হজমের জন্য খুব ভাল। অন্ত্রের জন্যও ভাল।

সাদা চাল

চালের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো এই সাদা চাল। অনেকেই ঝকঝকে সাদা চাল খেতে পছন্দ করেন। এ চাল তাই বাজারে বেশ বিক্রি হয়। অধিকাংশ বাড়িতে, হোটেলে সাদা চালই ব্যবহার করা হয়। ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার ন্যাশনালের মতে, সাদা চালে আলাদাভাবে যোগ করা হয় আয়রন, থায়ামিন, নিয়াসিন, ফলিক অ্যাসিড। তবে চালের প্রতি কাপে ক্যালোরির পরিমাণ ১৬০। স্বাভাবিক চালকে অনেক সময় ইউরিয়া কিংবা অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করে সাদা করা হয়।

কালো চাল

সাদা চাল, বাদামি চাল, লাল চাল ও কালো চাল-এই চার রকমের চালের মধ্যে কালো চালের গুণাগুণ আধুনিক পুষ্টিবিদদের নজর কেড়েছে। চিকিৎসা-সংক্রান্ত গুণাগুণের জন্য কালো চালকে ‘ওয়ার্ল্ড সুপার ফুড’ বলা হয়। ১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম পরিচিতি লাভ শুরু করে কালো চাল। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে যেমন, চিন, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে এই চালের চাষ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এই চালের বহিরাংশে অ্যান্থোসায়ানিন বেশি মাত্রায় উপস্থিত থাকায় চালের রঙ কালো হয়। কৃষিবিজ্ঞানীরা চার রকমের কালো চালের খোঁজ পেয়েছেন। এগুলো হল ব্ল্যাক জাপনিকা চাল, ব্ল্যাক গ্লুটিনউস চাল, ইতালিয়ান কালো চাল ও থাই ব্ল্যাক জেসমিন চাল। হাফ কাপ কালো চালের পুষ্টিগুণ বিচার করলে দেখা যায় এতে শক্তি আছে ৩৫৬ কিলো ক্যালোরি, প্রোটিন ৮.৮৯ গ্রাম, ফ্যাট ৩.৩৩ গ্রাম, শর্করা ৭৫.৫৬ গ্রাম, ফাইবার ২.২ গ্রাম, আয়রন ২.৪ মিলিগ্রাম।

কালো চালে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রচুর থাকায় শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ত্বক পরিষ্কার করে ও শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেয়। কালো চাল শরীরের প্রদাহ কমায় ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে। এতে থাকা ফাইবার হার্টকে সুস্থ রাখে। গবেষণায় জানা গেছে, কালো চাল নিয়মিত খেলে সংবহন তন্ত্রে এথেরসক্লেরো টিক প্লাক তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে শিরা-ধমনির ভেতরে ফ্যাট জমে না ও রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। এমনকী, এই চাল ক্যানসারও প্রতিরোধ করে। কালো চাল হজমেও সাহায্য করে। এই চালে প্রচুর ভিটামিন বি থাকায় মানসিক চাপ কমায় ও স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।

লাল চাল

দেখতেই লাল, তবে এই চাল কিন্তু বেশ মিষ্টিও। এই চালের মধ্যে মিষ্টি আর নোনতা দুই স্বাদই থাকে। বলা হয় লিউকোমিয়া, সার্ভিক্যাল ও কোলন ক্যানসার রুখতে সাহায্য করে। এই চালের মধ্যে রয়েছে প্রোঅ্যান্থোসায়ানিডিন। যা মূলত ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রুখে দেয়। জার্নাল অফ এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ফুড কেমিস্ট্রিতে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, লাল চালের অ্যান্টিডায়াবেটিক প্রভাব রয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, লাল চালের তুষের নির্যাসের সংস্পর্শে আসার সাথে বেসাল গ্লুকোজ (রক্ত শর্করার সঠিক নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ) ২.৩ থেকে ২.৭-গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই লাল চালে টোকোট্রিয়েনল রয়েছে যা মূলত ভিটামিন ই। নিউরোপ্রোটেকশন, অ্যান্টি-ক্যাসার এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালের খোসার লাল রংটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকার কারণে। আর এটি ফেলে না দিয়ে খাদ্যে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করাই ভালো।

বাসমতী চাল

স্বাদে ও গন্ধে চালের দুনিয়ায় সেরার সেরা স্বাস্থ্যকর বাসমতি চাল। অন্য যে কোনো চালের থেকে, বাসমতি চালে ২০% বেশি ফাইবার থাকে। এছাড়াও বাসমতি চালের গ্লাইসেমিক সূচক, কম থেকে মাঝারি মাত্রার। শরীরে এনার্জি বজায় রাখতে এর তুলনা নেই। বাসমতী চালের ভাত দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ সবল রাখতে সাহায্য করে। দেশের যে কোনও জায়গায় পাওয়া যায় এই চাল এবং দামও আয়ত্তের বাইরে নয়।

জেসমিন চাল

দুর্দান্ত স্বাদ এবং স্বাস্থ্যগুণের জন্য খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জেসমিন চাল। এখন বহু রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে এই চালের ভাত। প্রচুর পরিমাণ অ্যামিনো অ্যাসিড থাকায় মস্তিষ্কের জন্য উপকারী এটি। শরীরে বিষক্রিয়া ঠেকাতেও এর জবাব নেই।

আঠালো চাল

সাদা ভাতের মতো জনপ্রিয় নয় এই চালের ভাত। এতে উপস্থিত তামা এর অণুগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে তাই এই চালের ভাত আঠালো প্রকৃতির হয়। বেশ দামি এই চাল খুব একটা সুলভ নয়, তবে ভাত বানাতে একেবারে কম সময় লাগে। সবথেকে বড় কথা, অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

সতর্কতা

বাজারের সব চালই ভালো নয়। বাড়তি দামের আশায় অনেক বিক্রেতা চালে লাল, কালো বা বিভিন্ন রং মেশাতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার খেয়াল রাখতে হবে চাল থেকে রং উঠছে কি না। চালের প্রাকৃতিক যে বাদামি বা লাল, কালো রং তা পানিতে ধুলেও সাধারণত উঠবে না (উঠলেও অতি সামান্য)। অন্যদিকে দোকানি যদি বাড়তি রং প্রয়োগ করে তাহলে তা ধোয়ার সময় বোঝা যাবে। এছাড়া মিনিকেট এবং নাজিরশাইল নামের কোনো ধান বাংলাদেশে চাষ হয় না। মুনাফার লোভে মোটা চাল ছেঁটে চিকন করে মিনিকেট নামে বাজারে বিক্রি করছেন মিলমালিকরা। যে প্রক্রিয়ায় মোটা চাল ছেঁটে চিকন করে কম দামের চাল বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

চালের যেমন উপকারিতা আছে, তেমনি অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত খাওয়ার কিছু অপকারিতাও রয়েছে। নিচে তা তুলে ধরা হলো-

চালের অপকারিতা

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়: সাদা চাল অতিরিক্ত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে।

ওজন বৃদ্ধি করে: ভাতে ক্যালোরি বেশি থাকায় অতিরিক্ত চাল খেলে শরীরে চর্বি জমতে পারে এবং ওজন দ্রুত বাড়তে পারে।

পুষ্টির ঘাটতি: সাদা চাল বেশি খেলে শরীর ভরে গেলেও ফাইবার, ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি দেখা দেয়, কারণ তুষ ও ভুসি সরিয়ে ফেলার ফলে এসব উপাদান কমে যায়।

হজমে সমস্যা: বারবার অতিরিক্ত ভাত খেলে পেট ফাঁপা বা বদহজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হৃদরোগের ঝুঁকি: সাদা চালের অতিরিক্ত গ্রহণে রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা ওঠানামা করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অতিরিক্ত ভাত খেলে ঘুম ঘুম ভাব আসে: ভাতে উচ্চ কার্বোহাইড্রেট থাকায় শরীরে ইনসুলিন বাড়ে, যার ফলে অনেক সময় ভাত খাওয়ার পর অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব আসে।

বৃক্কের (কিডনির) ওপর চাপ ফেলতে পারে: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চাল খেলে কিডনিতে পটাশিয়াম-সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনি সমস্যা আছে।

ব্যবহার:

·     ভাত রান্না

·     পোলাও, খিচুড়ি, বিরিয়ানি

·     মিষ্টান্ন (পায়েস, ক্ষীর, ফিরনি ইত্যাদি)

·     চালের গুঁড়া থেকে পিঠা, রুটি, চিঁড়া

চাল শুধু আমাদের ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং একটি জাতির খাদ্যনিরাপত্তা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক। পরিমিত চাল গ্রহণের মাধ্যমে আমরা যেমন শরীরকে শক্তি ও পুষ্টি দিতে পারি, তেমনি এর চাষ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারি। আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সচেতনভাবে ও পরিমিতভাবে গ্রহণ করাই সর্বোত্তম পথ।

তাই চালের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

 

 

 

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট