সহকারী শিক্ষক
১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ দশম
বিষয়ঃ বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা
অধ্যায়ঃ দশম
মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে সন্ধ্যায়। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী পরিবারের সকলেই আর একান্ত শিষ্যরা -তার চারপাশ ঘিরে আছেন, কারাগারের অন্ধকার ঘরে! প্রধান কারারক্ষী এসে শেষ বিদায় নিয়ে গেলেন. তার চোখেও অশ্রু টলমল করছে। ---হায়! কি অদ্ভুত শাস্তি!! যে মরবে সে শান্ত, ধীরস্থির। আর যে মারবে তার চোখে জল।
কারাগার প্রধান বললেন,-'এথেন্সের হে মহান সন্তান- আপনি আমাকে অভিশাপ দিবেন না, আমি দায়িত্ব পালন করছি মাত্র।' এতোবছর কারাগারে কাজকর্ম করতে গিয়ে আপনার মতো সৎ, সাহসী, নীতিবান এবং আপনার মতো এমন জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো আমি কোথাও দেখিনি।
মৃত্যুর ঠিক আগে সক্রেটিস তার পরিবারের
নারী ও শিশুদের চলে যেতে বললেন। সুন্দর বেশ-পোষাক পরলেন তিনি। শিষ্য'রা সবাই কাঁদছে, কিন্তু সক্রেটিস যেন একেবারেই শান্ত, স্বাভাবিক! মৃত্যুতে যেন তাঁর কিছুই যায় আসে না! বলাবাহুল্য, মৃত্যুদন্ডটা চাইলেই তিনি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন।।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো, --দেবতাদের প্রতি ভিন্নমত প্রকাশ। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও তরুণদের বিপথগামী হতে উৎসাহ প্রদান করা।
নিয়ম অনুযায়ী খোলা মাঠে তার বিচার বসেছিলো। বিচারক ছিলেন তৎকালীন সমাজের ৫০০জন জ্ঞানীগুণী মানুষ। ---এদের অনেকেই ছিলেন গ্রীসের রাজার একান্ত অনুগত। সক্রেটিসের মেধা ও বিশেষত: তরুণদের কাছে তার জনপ্রিয়তায় জ্বলন ছিলো তাদের।
সক্রেটিসকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার এমন মোক্ষম সুযোগ তারা ছেড়ে দিবে কেন? তবুও হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেন সক্রেটিস, কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও বিচারকদের নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে ভুললেন না। ফলাফল: ---হেমলক লতার বিষপানে মৃত্যু!
সক্রেটিস নিজেই তার আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। কঠোর যুক্তি দিয়ে বিচারকদের নানান প্রশ্নবাণে জর্জারিত করেছিলেন। বিচারকরা তাঁর একটি প্রশ্নেরও সঠিক কোন উত্তর দিতে পারেনি।
মৃত্যুর আগে একমাস কারাগারে বন্দী ছিলেন তিনি, তৎকালীন সময়ে নিয়ম ছিলো এমনই। এই একমাসে কারারক্ষীরাও তাঁর জ্ঞানে-গুনে মুগ্ধ হয়ে গেলো, তারা তাঁকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতে চাইলো, সক্রেটিস বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখান করে বললেন, -'আজ পালিয়ে গেলে ইতিহাস আমায় কাপুরুষ ভাববে।' তিনি মনে করতেন, অপমানের ঘৃণিত জীবনের চেয়ে বীরের মতো মৃত্যুই উত্তম!
সেদিন সন্ধ্যায় প্রধান কারারক্ষী চলে যাওয়ার পরে জল্লাদ পেয়ালা হাতে কারাগারে প্রবেশ করলো, পেয়ালা ভর্তি হেমলকের বিষ! সক্রেটিস জল্লাদকে বললেন কি করতে হবে আমায় বলে দাও। জল্লাদ বললো, পেয়ালার পুরোটা বিষ পান করতে হবে, একফোঁটাও নষ্ট করা যাবেনা। সক্রেটিস বললেন, -'তবে তাই হোক।' তিক্ত বিষের পুরো পেয়ালা তিনি জলের মতো মূহুর্তেই করে পান করে ফেললেন। চারপাশে বসে থাকা শিষ্যরা চিৎকার করে কাঁদছেন, এমন নির্মম মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না!
জল্লাদ তখন আরও কঠোর নির্দেশটি দিলো।
বললো, --'নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে এখন কিছুক্ষণ পায়চারী করতে হবে। যাতে বিষের প্রভাব পুরোটা শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।' উপস্থিত সবাই হায়! হায়! করে উঠলেন!!
শুধু ম্লান হাসি হাসলেন মৃত্যু পদযাত্রী সক্রেটিস;
বললেন --'আজীবন আইন মেনেছি, মৃত্যুতে আইন ভাঙবো কেন?' দূর্বল পায়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, যতক্ষণ তাঁর শক্তিতে কুলোয় ততক্ষণ হাঁটলেন। তারপর ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে শয্যায় এলিয়ে পড়লেন। অবস্থা দেখে শিষ্যরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, সক্রেটিস শিষ্যদের বললেন, --'তোমরা উচ্চস্বরে কেঁদোনা, আমাকে একটু শান্তিতে মরতে দাও!'
জল্লাদের পাষাণ মনেও তখন শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির ভাব উদয় হল, বিনয়ে আর লজ্জায় সে মাথা নামিয়ে নিলো। চাদর দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিলেন সক্রেটিস। একসময় চাদরটা সরালেন, একজন শিষ্যকে ডেকে বললেন, -'প্রতিবেশীর কাছ থেকে আমি একটা মুরগী ধার করেছিলাম, ওটা ফেরত দিয়ে দিও।'
ঐদিন সক্রেটিসের করুণ মূত্যুর খবর
এথেন্সে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষেরা বিক্ষোভ মিছিল সহকারে এথেন্সের রাস্তায় নেমে আসে এবং সক্রেটিসের বিরুদ্ধে মিথ্যা রায় দেওয়া বিচারকদের পিটিয়ে হত্যা করে। কিছু বিচারক ও জল্লাদ অনুশোচনায় আত্মহত্যা করেছিলো
এই ছিলো মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের তার শেষ কথা।
কিছুক্ষণ পরেই অনিশ্চিত যাত্রায় চলে গেলেন মহাজ্ঞানী সক্রেটিস। তাঁর শিষ্যদের মাঝে সেরা ছিলেন প্লেটো, প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বের এ ঘটনাগুলো প্লেটো তাঁর রচিত বিখ্যাত 'রিপাবলিক' গ্রন্থে লিখে গুরুকে অমর করে গেছেন।
প্লেটোর শিষ্য ছিলেন মহাজ্ঞানী এ্যারিষ্টটল।
তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ দ্যা 'পলিটিক্স', এ্যারিষ্টটল ছিলেন সর্বকালের জ্ঞানী মানুষদের সামনের সারির একজন। আর মহাবীর আলেকজ্যান্ডার দ্যা গ্রেটের নাম আমরা সবাই জানি, এই বিশ্বজয়ী আলেকজ্যান্ডারের শিক্ষক ছিলেন এ্যারিষ্টটল।
প্রহসনের বিচারে সক্রেটিসের মৃত্যু হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে মারতে পারেনি। শিষ্যদের মাঝে জ্ঞানের আলো দিয়ে বেঁচে রইবেন তিনি অনন্তকাল।©