সহকারী শিক্ষক
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
নক্ষত্রের হাসি
নক্ষত্রের হাসি
বাংলাদেশের নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার রামপুর এক ছোট্ট গ্রাম। যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নবগঙ্গা নদী। সেখানে থাকত সুপ্রিয়া আট বছরের এক কন্যা, যার কণ্ঠে লুকিয়ে ছিল মিষ্টি সুরের অমৃতধারা। কিন্তু সুপ্রিয়া ছিল লাজুক, ভাবত তার গান কেউ শুনতে চাইবে না। সে নদীর তীরে বসে প্রকৃতির সাথে কথা বলত, আর তার গলায় ভেসে আসত মনছোঁয়া গান।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন আকাশ লাল চাঁদনি শাড়ি পরেছিল, সুপ্রিয়া নদীর পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে গান গাইল:
“নদীর জল যেন রূপালী সিল্কের পোশাক,
পাখিরা সুরে সুরে বোনে আকাশের আঁচল।
আমার গান যাবে কি ওই মেঘের ভেলায় চড়ে,
নাকি রইবে এই নদী-তীরের বালুর গহ্বরে?”
হঠাৎ একটি দোয়েল পাখি এসে ডালে বসে তার সাথে সুর মেলালো। পাতারা মর্মর ধ্বনি তুলল, নদীর ঢেউ তাল দিল। সুপ্রিয়া বুঝতে পারল, প্রকৃতি তার গান শুনছে, আর তাকে উত্তর দিচ্ছে হাজার কণ্ঠে।
পরের দিন স্কুলে সবাই মিলে উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু গানের কোনো স্বেচ্ছাসেবক মিল ছিল না। সুপ্রিয়া সাহস করে এক ধাপ এগিয়ে গেল। সে যখন মঞ্চে দাঁড়াল, তখন তার মনে পড়ল নদীর কথা, পাখির সুরের কথা। সে গান গাইল গ্রামের ঋতুদের, ফসলের মাঠের, সমাবেশের আনন্দের। তার কণ্ঠ ছিল যেন সুরের ডানা—হাল্কা, মসৃণ, অনন্ত উড়ানের স্বপ্নে ভরা।
শোনা যেত তার গানে বর্ষার মেঘের গর্জন, শরতের কাশফুলের দোল, শীতের শিশিরের ঝিলিক। সবাই নিশ্চুপ হয়ে শুনল। একজন শিক্ষক বললেন, “সুপ্রিয়ার গান তো আমাদের সংস্কৃতির আয়না, যাতে আমাদের সব ঋতু, সব আবহ ভেসে উঠেছে!”
সেদিন সুপ্রিয়া শিখল, প্রতিটি শিশুর মাঝে লুকিয়ে থাকে এক বিশেষ নক্ষত্রের আলো। কেউ হয়ত লাজুক, কেউ ভিন্নভাবে সক্ষম, কেউ বা অন্য ভাষায় কথা বলে—তবু তারাও পারে সকলকে এক সুতোয় বাঁধতে। তার গানের মতোই, বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবীতে সবাই যেন নিজের সুর খুঁজে পায়, আর মিলেমিশে তৈরি করে এক মহাসঙ্গীত।
গ্রামবাসী সুপ্রিয়াকে বলল, “তুমি আমাদের ছোট্ট নক্ষত্র, যার হাসি এখন উজ্জ্বল করে তুলেছে আমাদের আকাশ।”
মো: রাজু আহমেদ
সহকারী শিক্ষক (বাংলা)
কে, এন,পি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
লোহাগড়া, নড়াইল।