Loading..

ভিডিও ক্লাস

রিসেট

১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ণ

প্রোটিনের গঠন ও সরল প্রোটিন (Simple Protein):

প্রোটিনের গঠন ও সরল প্রোটিন (Simple Protein): 


প্রোটিন (Protein) জীবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু এবং কোষের প্রধান গঠনমূলক উপাদান। গ্রিক শব্দ Proteios থেকে Protein শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ "প্রথম" বা "সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ"। জীবদেহের বৃদ্ধি, কোষের গঠন, টিস্যুর মেরামত, এনজাইম ও হরমোন উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়ায় প্রোটিন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কার্বোহাইড্রেট ও চর্বির মতো প্রোটিনও একটি প্রধান পুষ্টি উপাদান, তবে এটি প্রধানত দেহ গঠন ও মেরামতের কাজে ব্যবহৃত হয়।


প্রোটিনের গঠন (Structure of Protein)

প্রোটিন মূলত কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O), নাইট্রোজেন (N) দ্বারা গঠিত। অনেক প্রোটিনে সালফার (S) এবং কিছু ক্ষেত্রে ফসফরাস (P), লোহা (Fe), তামা (Cu), জিঙ্ক (Zn) ইত্যাদিও থাকতে পারে।

প্রোটিনের মৌলিক একক হলো অ্যামিনো অ্যাসিড (Amino Acid)। প্রকৃতিতে প্রায় ৩০০-এরও বেশি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকলেও জীবদেহে প্রোটিন গঠনে প্রধানত ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড ব্যবহৃত হয়।

অ্যামিনো অ্যাসিডের সাধারণ গঠন

প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডে থাকে—

একটি অ্যামিনো গ্রুপ (–NH₂)

একটি কার্বক্সিল গ্রুপ (–COOH)

একটি হাইড্রোজেন পরমাণু (H)

একটি পরিবর্তনশীল পার্শ্ব শৃঙ্খল (R-group)

R-group-এর ভিন্নতার কারণেই বিভিন্ন ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়।

পেপটাইড বন্ধন (Peptide Bond)

একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের কার্বক্সিল গ্রুপ এবং অন্য একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের অ্যামিনো গ্রুপ থেকে একটি পানি (H₂O) অণু অপসারিত হয়ে যে সমযোজী বন্ধন সৃষ্টি হয় তাকে পেপটাইড বন্ধন বলে।

দুইটি অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হলে ডাইপেপটাইড, তিনটি হলে ট্রাইপেপটাইড, এবং অনেকগুলো যুক্ত হলে পলিপেপটাইড গঠিত হয়। এক বা একাধিক পলিপেপটাইড শৃঙ্খল নির্দিষ্টভাবে ভাঁজ হয়ে কার্যকরী প্রোটিন তৈরি করে।


প্রোটিনের গঠনের স্তর

১. প্রাথমিক গঠন (Primary Structure)

অ্যামিনো অ্যাসিডের সরলরৈখিক বিন্যাসকে প্রাথমিক গঠন বলে। এই বিন্যাস জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

২. দ্বিতীয়ক গঠন (Secondary Structure)

পলিপেপটাইড শৃঙ্খল হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে ভাঁজ হয়ে দুটি প্রধান আকৃতি ধারণ করে—

α-Helix

β-Pleated Sheet

৩. তৃতীয়ক গঠন (Tertiary Structure)

দ্বিতীয়ক গঠন আরও ভাঁজ হয়ে একটি ত্রিমাত্রিক আকৃতি ধারণ করে। এই আকৃতি প্রোটিনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে।

৪. চতুর্থক গঠন (Quaternary Structure)

একাধিক পলিপেপটাইড শৃঙ্খল একত্রে যুক্ত হয়ে চতুর্থক গঠন সৃষ্টি করে।

উদাহরণ: হিমোগ্লোবিন।

সরল প্রোটিন (Simple Protein)

সংজ্ঞা

যে প্রোটিন কেবলমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত এবং হাইড্রোলাইসিস করলে শুধুমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন হয়, তাকে সরল প্রোটিন (Simple Protein) বলে।

এদের মধ্যে কোনো অপ্রোটিন অংশ (Prosthetic group) থাকে না।

সরল প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য

শুধুমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে গঠিত।

অপ্রোটিন অংশ থাকে না।

হাইড্রোলাইসিসে কেবল অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন হয়।

দেহের গঠন, বৃদ্ধি ও টিস্যু মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিছু পানিতে দ্রবণীয়, কিছু লবণ দ্রবণে দ্রবণীয় এবং কিছু অদ্রবণীয়।


সরল প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ

১. অ্যালবুমিন (Albumin)

বৈশিষ্ট্য

পানিতে দ্রবণীয়।

উত্তাপে জমাট বাঁধে (Coagulation)।

উদাহরণ

ডিমের সাদা অংশের Ovalbumin

রক্তের Serum Albumin

দুধের Lactalbumin

কাজ

রক্তের অসমোটিক চাপ বজায় রাখা।

বিভিন্ন পদার্থ পরিবহন করা।

২. গ্লোবিউলিন (Globulin)

বৈশিষ্ট্য

বিশুদ্ধ পানিতে অদ্রবণীয়।

পাতলা লবণ দ্রবণে দ্রবণীয়।

উদাহরণ

Serum Globulin

Legumin (মটরশুঁটি)

কাজ

রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিবডি তৈরি।

পুষ্টি সঞ্চয়।

৩. গ্লুটেলিন (Glutelin)

বৈশিষ্ট্য

পানিতে অদ্রবণীয়।

পাতলা ক্ষারে দ্রবণীয়।

উদাহরণ

ধানের Oryzenin

গমের Glutelin

৪. প্রোলামিন (Prolamin)

বৈশিষ্ট্য

৭০–৮০% অ্যালকোহলে দ্রবণীয়।

উদাহরণ

গমের Gliadin

ভুট্টার Zein

যবের Hordein

৫. হিস্টোন (Histone)

বৈশিষ্ট্য

ক্ষারধর্মী প্রোটিন।

DNA-এর সঙ্গে যুক্ত থাকে।

কাজ

ক্রোমোজোম গঠন।

জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ।

৬. প্রোটামিন (Protamine)

বৈশিষ্ট্য

অত্যন্ত ক্ষারধর্মী।

কম আণবিক ভর।

উদাহরণ

মাছের শুক্রাণুতে পাওয়া যায়।

৭. স্ক্লেরোপ্রোটিন (Scleroprotein)

বৈশিষ্ট্য

পানিতে অদ্রবণীয়।

শক্ত ও আঁশযুক্ত।

উদাহরণ

কেরাটিন (চুল, নখ)

কোলাজেন (হাড়, টেন্ডন)

ইলাস্টিন (ত্বক, রক্তনালি)


সরল প্রোটিনের গুরুত্ব

১. কোষ ও টিস্যুর গঠন করে। ২. দেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে। ৩. এনজাইম ও কিছু হরমোন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ৫. রক্তে বিভিন্ন পদার্থ পরিবহন করে। ৬. দেহের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখে। ৭. প্রয়োজনে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে (প্রতি গ্রাম প্রোটিন থেকে প্রায় ৪ কিলোক্যালরি শক্তি উৎপন্ন হয়)।

সরল প্রোটিন ও যৌগিক প্রোটিনের পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য

সরল প্রোটিন

যৌগিক প্রোটিন

গঠন

শুধুমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিড

অ্যামিনো অ্যাসিড + অপ্রোটিন অংশ

হাইড্রোলাইসিস

কেবল অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন হয়

অ্যামিনো অ্যাসিড ও অপ্রোটিন অংশ উৎপন্ন হয়

উদাহরণ

অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন, কেরাটিন

হিমোগ্লোবিন, কেসিন, লিপোপ্রোটিন


প্রোটিন জীবনের মৌলিক ভিত্তি। এর গঠন যত জটিল, কার্যকারিতাও তত বৈচিত্র্যময়। সরল প্রোটিন কেবল অ্যামিনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত হওয়ায় এদের রাসায়নিক গঠন তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও জীবদেহের বৃদ্ধি, গঠন, মেরামত, রোগ প্রতিরোধ ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীববিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোটিনের গঠন ও শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অপরিহার্য।

মন্তব্য করুন