Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:৩৮ অপরাহ্ণ

সংবিধান বাংলাদেশ


১. সংবিধানের ধারণা ও গুরুত্ব
সংবিধান হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নিয়মনীতি ও মৌলিক দলিল, যেখানে জনগণের অধিকার-কর্তব্য এবং সরকারের ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট উল্লেখ থাকে। এরিস্টটলের মতে, “সংবিধান হলো এমন এক জীবন পদ্ধতি যা রাষ্ট্র স্বয়ং বেছে নিয়েছে।”
• বাস্তব উদাহরণ (পরিবারের নিয়ম): আমাদের পরিবারে যেমন কিছু নিয়ম থাকে রাত ১০টার মধ্যে ঘুমোনো, পড়া শেষ করে খেলতে যাওয়া বা গুরুজনদের সম্মান করা; যা পরিবারের সব সদস্য এমনকি বাবা-মাকেও মেনে চলতে হয়। ঠিক তেমনি সংবিধান হলো রাষ্ট্রের ‘পারিবারিক নিয়মের বই’
• বাংলাদেশের বাস্তব প্রয়োগ: সংবিধানের বলেই বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া, ১৮ বছর হলে ভোট দেওয়া কিংবা প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে শিক্ষা পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকার ভোগ করে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীও কিন্তু এই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন, এটিই সংবিধানের মূল শক্তি।
২. সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতি
সংবিধান মূলত চার উপায়ে তৈরি বা প্রণয়ন করা যায়:
1. অনুমোদনের মাধ্যমে:
• ধারণা: শাসক যখন স্বপ্রণোদিত হয়ে জনগণকে তাদের অধিকার মেনে নিয়ে দলিলে সই করেন। (যেমন: ইংল্যান্ডের ম্যাগনা কার্টা - ১২১৫)।
• বাস্তব উদাহরণ: কোনো স্কুলের প্রধান শিক্ষক যদি নিজে থেকেই শিক্ষার্থীদের অধিকার দিয়ে ঘোষণা দেন"এখন থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা শ্রেণি পত্রিকা বের করতে পারবে"।
1. পরিকল্পনার মাধ্যমে:
• ধারণা: প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন করেন। (যেমন: বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র)।
• বাস্তব উদাহরণ: ক্লাসের বার্ষিক পিকনিক কীভাবে হবে, তা নিয়ে ক্যাপ্টেন, মনিটর ও শিক্ষক মিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো। ১৯৭২ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ জন সদস্যের গণপরিষদ কমিটি ঠিক একইভাবে আলোচনা করে বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি করেছিল।
1. বিপ্লবের দ্বারা:
• ধারণা: শাসক যখন অন্যায় অত্যাচার করে, তখন জনগণ বিপ্লব ও সংগ্রামের মাধ্যমে নতুন নিয়ম বা সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে। (যেমন: রাশিয়া, চীন, কিউবা)।
• বাস্তব উদাহরণ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান শাসকমণ্ডলীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের (বিপ্লব ও সংগ্রাম) মাধ্যমে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে এবং নিজেদের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে।
1. ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে:
• ধারণা: এটি কোথাও একবারে লেখা থাকে না, বরং দীর্ঘদিনের আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। (যেমন: ব্রিটেনের সংবিধান)।
• বাস্তব উদাহরণ: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের সালিশ ব্যবস্থা। কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা না থাকলেও বহু বছর ধরে সমাজের গণ্যমান্য বা মাতব্বররা ঐতিহ্যগত প্রথা মেনে বিচার করেন এবং সবাই তা মেনে চলে।
৩. সংবিধানের শ্রেণিবিভাগ
(ক) লিপিবদ্ধকরণের ভিত্তিতে
• লিখিত সংবিধান: যে সংবিধানের অধিকাংশ ধারা লিখিত ও স্পষ্ট আকারে প্রকাশ করা থাকে।
◦ বাস্তব উদাহরণ (বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র): স্কুলের লিখিত নিয়মাবলি নির্দেশিকা বা ডায়রির মতো। যেখানে নির্দিষ্ট করে বলা থাকে—“সকাল ৮টার মধ্যে স্কুলে আসতে হবে এবং নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরতে হবে”।
• অলিখিত সংবিধান: প্রথা, আচার ও অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে যা বছরের পর বছর চলে আসে।
◦ বাস্তব উদাহরণ (ব্রিটেন): আমাদের পারিবারিক রীতিনীতি। যেমন—ঈদের দিনে সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া বা উৎসব পালন করা। এটি কোথাও নির্দিষ্ট করে লেখা নেই, কিন্তু পরিবারের সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা মেনে চলে।
(খ) সংশোধনের ভিত্তিতে
• সুপরিবর্তনীয় সংবিধান: আইনসভার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় খুব সহজেই সংশোধন করা যায়।
◦ বাস্তব উদাহরণ (ব্রিটিশ সংবিধান): ক্লাসের সিটিং প্ল্যান। শিক্ষক চাইলে সাধারণ কারণে যেকোনো দিন তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের সিট পরিবর্তন করে দিতে পারেন।
• দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান: খুব সহজে চাইলেই পরিবর্তন করা যায় না, জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয়।
◦ বাস্তব উদাহরণ (বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র): বোর্ড পরীক্ষার কোনো নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়। এটি শিক্ষক একা করতে পারেন না, মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের অনেকগুলো আনুষ্ঠানিক ধাপ পার হতে হয়। বাংলাদেশে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য জাতীয় সংসদের মোট সদস্যের ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) ভোটের কঠোর বিধান রয়েছে।
৪. উত্তম সংবিধানের বৈশিষ্ট্যসমূহ
একজন শিক্ষার্থী সহজেই বিষয়গুলো একটি ক্রিকেট দলের নিয়মাবলির সাথে তুলনা করে মনে রাখতে পারে:
• সুস্পষ্টতা: নিয়মগুলো অস্পষ্ট হওয়া যাবে না। যেমন—ক্রিকেটে বা স্কুলে "দেরিতে আসলে শাস্তি" না লিখে নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা উচিত।
• সংক্ষিপ্ততা: রেসিপি বই যদি ১০০ পৃষ্ঠার হয় তবে কেউ তা পড়বে না। তাই সংবিধান অপ্রয়োজনীয় কথামালা বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্ত ও বোধগম্য হওয়া প্রয়োজন।
• মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা: দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার সুরক্ষা দেওয়া। যেমন: বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষা, মতপ্রকাশ ও জীবনধারণের অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
• জনমতের প্রতিফলন ও সুষম প্রকৃতি: নিয়মগুলো এমন হতে হবে যা খুব বেশি কঠোরও নয়, আবার খুব সহজও নয়; জনগণের প্রকৃত চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
• নির্দিষ্ট সংশোধন পদ্ধতি: পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা কোন উপায়ে হবে তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা।
৫. বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য
ইতিহাস:
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশ পরিচালনার জন্য একটি নিয়মপুস্তিকার প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পর যেমন সাথে সাথে নিয়মকানুন জরুরি হয়, তেমনি।
• কমিটি গঠন: ১৯৭২ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করা হয়।
• গৃহীত ও কার্যকর: ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।
• অবকাঠামো: এতে সর্বমোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, ১১টি ভাগ এবং ৭টি তফসিল রয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি (বাস্তব রূপক):
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে— ১. জাতীয়তাবাদ, ২. সমাজতন্ত্র, ৩. গণতন্ত্র, ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা
বাস্তব ধারণা: এই ৪টি মূলনীতি একটি ঘরের ৪টি খুঁটির মতো। যেকোনো একটি খুঁটি বা স্তম্ভ সরালে যেমন পুরো ঘরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ধসে পড়বে, তেমনি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি রক্ষায় এই চার নীতির ভূমিকা অপরিসীম।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:
1. সংবিধান সর্বোচ্চ আইন: দেশের অন্য যেকোনো আইন যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেই আইন বাতিল বলে গণ্য হবে।
2. সর্বজনীন ভোটাধিকার: ধর্ম, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়স হলেই সবাই সমান ভোট দেওয়ার অধিকার পায়।
3. স্বাধীন বিচার বিভাগ: দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রীও অপরাধ করলে দেশের স্বাধীন আদালত তাদের বিচার করতে পারেন।
4. এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র: ভারতের মতো এটি কোনো অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত নয়, বাংলাদেশের সমস্ত শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়।
৬. সংশোধনীসমূহ (কেন ও কীভাবে?)
কেন সংশোধনের প্রয়োজন হয়?
ক্লাসে আগে হয়তো নিয়ম ছিল "মোবাইল ফোন আনা সম্পূর্ণ নিষেধ।" কিন্তু পরিস্থিতির প্রয়োজনে যখন অনলাইন ক্লাস শুরু হলো, তখন নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। একইভাবে, সময়ের সাথে সমাজের প্রয়োজন বদলালে সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার করতে হয়।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধনী (২০১৮ পর্যন্ত ১৭টি):


সংশোধনী ও সাল
মূল পরিবর্তন
সহজ বাস্তব অর্থ
বাস্তব জীবনের রূপক বা উদাহরণ

১ম (১৯৭৩)
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিধান গঠন।
মুক্তিযুদ্ধে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের আইনি পথ তৈরি।
পরিবারে কেউ গুরুতর অপরাধ করলে তার বিচারের মুখোমুখি হওয়া নিশ্চিত করা।

৪র্থ (১৯৭৫)
রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তন।
সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে মূল শাসনক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে প্রদান।
পুরো ক্রিকেট টিমের সিদ্ধান্ত বাকিদের বাদ দিয়ে একা দলনেতা (ক্যাপ্টেন) নিচ্ছেন।

৮ম (১৯৮৮)
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা স্বীকৃতি নির্ধারণ।
কোনো পরিবারের নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিচয় বহন করা।

১২তম (১৯৯১)
সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
দলের সবাই মিলে আলোচনার ভিত্তিতে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতি চালু হওয়া।

১৫তম (২০১১)
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ও মূল চার নীতি পুনঃস্থাপন।
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে পূর্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনা।
পরিবর্তিত কোনো নিয়ম তুলে দিয়ে আবার পুরনো পারিবারিক নিয়ম বা নীতিতে ফিরে আসা।



পরীক্ষার উত্তরপত্রে গুছিয়ে লেখার কৌশল :
1. পয়েন্টভিত্তিক লেখা: সংবিধানের গুরুত্ব বা বৈশিষ্ট্য লেখার ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর সরাসরি বোল্ড করে পয়েন্টাকারে লিখলে শিক্ষক দ্রুত মূলভাব অনুধাবন করতে পারেন।
2. বাস্তব উদাহরণের প্রয়োগ: প্রথা, লিখিত/অলিখিত রূপ বা সংশোধনীর মতো জটিল সংজ্ঞার পরে নিজের ভাষায় একটি ছোট বাস্তব রূপক তুলে ধরলে উত্তরটি অন্যান্য সাধারণ খাতা থেকে স্বতন্ত্র ও উচ্চ নম্বর পাওয়ার যোগ্য হয়।
3. তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা: সংবিধানের মৌলিক উপাত্তগুলো (যেমন: অনুচ্ছেদ ১৫৩টি, ১১টি ভাগ, ৭টি তফসিল, ৪টি মূলনীতি এবং সংশোধনের ক্ষেত্রে ২/৩ অংশ সংসদ সদস্যের ভোট) আলাদা ছক বা ছোট বক্স করে পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট