Loading..

০৪ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বাক্যের সংজ্ঞা, গুণ ও প্রকরণ

 বাক্যের সংজ্ঞা, গুণ প্রকরণ

ভাষার মূল উপকরণ বাক্য এবং বাক্যের মৌলিক উপাদান শব্দ। যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা কোনো বিষয়ে বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় তাকে বাক্য বলে। কতগুলো পদের সমষ্টিতে বাক্য গঠিত হলেও যে কোনো পদসমষ্টিই বাক্য নয়। বাক্যের বিভিন্ন পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বা অন্বয় থাকা আবশ্যক। এ ছাড়াও বাক্যের অন্তর্গত বিভিন্ন পদ দ্বারা মিলিতভাবে একটি অখণ্ড ভাব পূর্ণ রূপে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন তবেই তা বাক্য হবে।  

বাক্যের গুণ

ভাষার বিচারে বাক্যের তিনটি গুণ রয়েছে। যেমন : আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি, যোগ্যতা

বাক্যের প্রকরণ

অংশ অনুসারে বাক্য দুই প্রকার। যেমন : উদ্দেশ্য ও বিধেয়

গঠন অনুসারে বাক্য তিন প্রকার। যেমন : সরল বাক্য, মিশ্র বা জটিল বাক্য ও যৌগিক বাক্য

অর্থ অনুসারে বাক্য পাঁচ প্রকার। যেমন : বিবৃতিসূচক, প্রশ্নোত্তরসূচক, আবেগসূচক /বিস্ময়সূচক, ইচ্ছাসূচক ও আদেশসূচক

আকাঙ্ক্ষা (বাক্যের গুণ)

বাক্যের অর্থ পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে ইচ্ছা তাই আকাঙ্ক্ষা। যেমন : ‘চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে’-এটুকু বললে বাক্যটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে না, আরও কিছু ইচ্ছা থাকে। বাক্যটি এভাবে পূর্ণাঙ্গ করা যায়; চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এখানে আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয়েছে বলে এটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য।

আসত্তি (বাক্যের গুণ)

মনোভাব প্রকাশের জন্য বাক্যে শব্দগুলো এমনভাবে পর পর সাজাতে হবে যাতে মনোভাব প্রকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য সুশৃঙ্খল পদবিন্যাসই আসত্তি। যেমন: কাল বিতরণী হবে উৎসব স্কুলে আমাদের পুরস্কার অনুষ্ঠিত। লেখা হওয়াতে পদ সন্নিবেশ ঠিকভাবে না হওয়ায় শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত ভাবটি যথাযথ প্রকাশিত হয়নি। তাই এটি একটি বাক্য হয়নি। মনোভাব পূর্ণ ভাবে প্রকাশ করার জন্য সকল পদকে নিম্নলিখিতভাবে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট করতে হয়। যেমন : কাল আমাদের স্কুলে পুরস্কার বিতরণী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। বাক্যটি আসত্তিসম্পন্ন।

যোগ্যতা (বাক্যের গুণ)

বাক্যস্থিত পদসমূহের অন্তর্গত এবং ভাবগত মিলবন্ধনের নাম যোগ্যতা। যেমন : বর্ষার বৃষ্টিতে প্লাবনের সৃষ্টি হয়। এটি একটি যোগ্যতাসম্পন্ন বাক্য। কারণ বাক্যটিতে পদসমূহের অর্থগত এবং ভাবগত সমন্বয় রয়েছে। কিন্তু ‘বর্ষার রৌদ্র প্লাবনের সৃষ্টি করে’ - বললে বাক্যটি ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা হারাবে। কারণ রৌদ্র প্লাবন সৃষ্টি করে না।

শব্দের যোগ্যতার সঙ্গে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জড়িত থাকে-

ক) রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতা : প্রকৃতি-প্রত্যয়জাত অর্থে শব্দ সর্বদা ব্যবহৃত হয়। যোগ্যতার প্রতি লক্ষ রেখে কতগুলো শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেমন :

শব্দ               রীতিসিদ্ধ                 প্রকৃতি + প্রত্যয়          প্রকৃতি + প্রত্যয়জাত অর্থ

১. বাধিত       অনুগৃহীত বা কৃতজ্ঞ     বাধ + ইত                 বাধাপ্রাপ্ত

২. তৈল         তিল জাতীয়             তিল + ষ্ণ                   তিলজাত স্নেহ পদার্থ,

                                                                             বিশেষ কোনো শস্যের রস

খ) দুর্বোধ্যতা

অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করলে বাক্যের যোগ্যতা বিনষ্ট হয়। যেমন : তুমি আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছ। (চাতুরী বা মায়া অর্থে কিন্তু বাংলা ‘প্রপঞ্চ’ শব্দটি অপ্রচলিত)।

গ) উপমার ভুল প্রয়োগ

ঠিকভাবে উপমা অলংকার ব্যবহার না করলে যোগ্যতার হানি ঘটে। যেমন : আমার হৃদয়-মন্দিরে আশার বীজ উপ্ত হলো। বীজ ক্ষেত্রে বপন করা হয়, মন্দিরে নয়। কাজেই বাক্যটি হওয়া উচিত : আমার হৃদয়-ক্ষেত্রে আশার বীজ উপ্ত হলো।

ঘ) বাহুল্যদোষ

প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহারে বাহুল্যদোষ বটে এবং এর ফলে শব্দ তার যোগ্যতাগুণ হারিয়ে থাকে। যেমন : দেশের সব আলেমগণই এ ব্যাপারে আমাদের সমর্থন দান করেন। ‘আলেমগণ’ বহু বচনবাচক শব্দ। এর সঙ্গে ‘সব’ শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার বাহুল্যদোষ সৃষ্টি করেছে।

ঙ) বাগধারার শব্দ পরিবর্তন

বাগধারা ভাষাবিশেষের ঐতিহ্য। এর যথেচ্ছ পরিবর্তন করলে শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। যেমন: অরণ্যে রোদন (অর্থ : নিষ্ফল আবেদন)-এর পরিবর্তে যদি বলা হয়-‘বনে ক্রন্দন’ তবে বাগধারাটি তার যোগ্যতা হারাবে।

চ) গুরুচণ্ডালী দোষ

তৎসম শব্দের সঙ্গে দেশীয় শব্দের প্রয়োগ কখনো কখনো গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে। এ দোষে দুষ্ট শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। ‘গরুর গাড়ি’, ‘শবদাহ’, ‘মড়াপোড়া’ প্রভৃতি স্থলে যথাক্রমে ‘গরুর শকট’, ‘শবপোড়া’, ‘মড়াদাহ’ প্রভৃতির ব্যবহার গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে।

উদ্দেশ্য বিধেয়

প্রতিটি বাক্যে দুটি অংশ থাকে : উদ্দেশ্য ও বিধেয়

বাক্যের যে অংশে কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হয় তাকে উদ্দেশ্য বলে। আর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যা বলা হয় তাকে বিধেয় বলে। যেমন :

খোকা এখন         বই পড়ছে

(উদ্দেশ্য)              (বিধেয়)

বিশেষ্য বা বিশেষ্যস্থানীয় অন্যান্য পদ বা পদসমষ্টিযোগে গঠিত বাক্যাংশও বাক্যের উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন :

সৎ লোকেরাই প্রকৃত সুখী - বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত বিশেষণ

মিথ্যা কথা বলা খুবই অন্যায়          - ক্রিয়াজাত বাক্যাংশ

উদ্দেশ্যের প্রকারভেদ

একটিমাত্র পদবিশিষ্ট কর্তৃপদকে সরল উদ্দেশ্য বলে। উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশেষণাদি যুক্ত থাকলে তাকে সম্প্রসারিত উদ্দেশ্য বলে।

উদ্দেশ্যের সম্প্রসারণ :      সম্প্রসারণ             উদ্দেশ্য  বিধেয়

১. বিশেষণ যোগে-             কুখ্যাত  দস্যুদল ধরা পড়েছে।

২. সম্বন্ধ যোগে-  হাসিমের               ভাই        এসেছে।

৩. সমার্থক বাক্যাংশ যোগে-            যারা অত্যন্ত পরিশ্রমী        তারাই    উন্নতি করে।

৪. অসমাপিকা ক্রিয়াবিশেষণ যোগে-           চাটুকার পরিবৃত হয়েই      বড় সাহেব            থাকেন।

৫. বিশেষণ স্থানীয় বাক্যাংশ যোগে-              যার কথা তোমরা বলে থাক             তিনি       এসছেন।

বিধেয়ের সম্প্রসারণ :        উদ্দেশ্য  সম্প্রসারণ             বিধেয়

১. ক্রিয়া বিশেষণ যোগে-  ঘোড়া     দ্রুত       চলে।

২. ক্রিয়া বিশেষণীয় যোগে-             জেট বিমান           অতিশয় দ্রুত       চলে।

৩. কারকাদি যোগে-           ভুবনের ঘাটে ঘাটে             ভাসিছে।

৪. ক্রিয়া বিশেষণ স্থানীয় বাক্যাংশ যোগে-   তিনি       যে ভাবেই হোক   আসবেন।

৫. বিধেয় বিশেষণ যোগে-               ইনি         আমার বিশেষ     অন্তরঙ্গ বন্ধু (হন)।

সরল বাক্য

যে বাক্যে একটিমাত্র কর্তা (উদ্দেশ্য) এবং একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া (বিধেয়) থাকে তাকে সরল বাক্য বলে। যেমন : পুকুরে পদ্মফুল জন্মে। এখানে ‘পদ্মফুল’ উদ্দেশ্য আর ‘জন্মে বিধেয়।

এরূপ : বৃষ্টি হচ্ছে। তোমরা বাড়ি যাও। খোকা আজ সকালে স্কুলে গিয়েছে। স্নেহময়ী জননী (উদ্দেশ্য) স্বীয় সন্তানকে প্রাণাপেক্ষা ভালোবাসেন (বিধেয়)। বিশ্ববিখ্যাত মহাকবিরা (উদ্দেশ্য) ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন লেখনী দ্বারা অমরতার সঙ্গীত রচনা করেন। (বিধেয়)।

মিশ্র বা জটিল বাক্য

যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্যের এক বা একাধিক আশ্রিত বাক্য পরস্পর সাপেক্ষভাবে ব্যবহৃত হয় তাকে মিশ্র বা জটিল বাক্য বলে। যেমন :

আশ্রিত বাক্য        প্রধান খণ্ডবাক্য

১. যে পরিশ্রম করে             সেই সুখ লাভ করে।

২. সে যে অপরাধ করেছে তা মুখ দেখেই বুঝেছি।

আশ্রিত খণ্ডবাক্য তিন প্রকার। যেমন :

ক) বিশেষ্য স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য / Noun clause

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য / Subordinate clause প্রধান খণ্ডবাক্যের যে কোনো পদের আশ্রিত থেকে বিশেষ্যের কাজ করে তাকে বিশেষ্যস্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন :

আমি মাঠে গিয়ে দেখলাম, খেলা শেষ হয়ে গিয়েছে। (বিশেষ্য স্থানীয় খণ্ডবাক্য ক্রিয়ার কর্মরূপে ব্যবহৃত)

এরূপ : তিনি বাড়ি আছেন কিনা, আমি জানি না। ব্যাপারটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে ফল ভালো হবে না।

খ) বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য / Adjective clause

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের অন্তর্গত কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামের দোষ, গুণ ও অবস্থা প্রকাশ করে তাকে বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন :

লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। (আশ্রিত বাক্যটি ‘সেই’ সর্বনামের অবস্থা প্রকাশ করছে)।

এরূপ : খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি, আমার দেশের মাটি।

        ধনধান্য পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা।

        যে এ সভায় অনুপস্থিত সে বড় দুর্ভাগা।

গ) ক্রিয়াবিশেষণ স্থানীয় খণ্ডবাক্য / Adverbial clause

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য ক্রিয়াপদের স্থান, কাল ও কারণ নির্দেশক অর্থে ব্যবহৃত হয় তাকে ক্রিয়াবিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন : যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।

                তুমি আসবে বলে আমি অপেক্ষা করছি।

                যেখানে আকাশ আর সমুদ্র একাকার হয়ে গেছে সেখানেই দিকচক্রবাল।

যৌগিক বাক্য

পরস্পর নিরপেক্ষ দুই বা ততোধিক সরল বা মিশ্র বাক্য মিলিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করলে তাকে যৌগিক বাক্য বলে।

জ্ঞাতব্য : যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত নিরপেক্ষ বাক্যগুলো এবং, ও, কিন্তু, অথবা, অথচ, কিংবা, বরং, তথাপি প্রভৃতি অব্যয় যোগে সংযুক্ত বা সমন্বিত থাকে। যেমন :

নেতা জনগণকে উৎসাহিত করলেন বটে কিন্তু কোনো পথ দেখাতে পারলেন না।

বস্ত্র মলিন কেন, কেহ জিজ্ঞাসা করিলে সে ধোপাকে গালি পাড়ে অথচ ধৌত বস্ত্রে তাহার গৃহ পরিপূর্ণ।

উদয়াস্ত পরিশ্রম করব তথাপি অন্যের দ্বারস্থ হব না।

বাক্য রূপান্তর

অর্থের কোনোরূপ রূপান্তর না করে এক প্রকারের বাক্যকে অন্য প্রকার বাক্যে রূপান্তর করার নামই বাক্য রূপান্তর।

ক) সরল বাক্যকে মিশ্র বাক্যে রূপান্তর

মিশ্র বাক্যের সংযোগচিহ্ন : যদি, তবে, যে, সে, যারা-তারা, যে-সেই, যেই-সেই, যে-তাকে/তারা, যা-তা, যেসব-তাদের/যেসকল-তারা, যাদের-তাদের/তারাই, যে-সেটি

সরল বাক্যকে মিশ্র বাক্যে পরিণত করতে হলে সরল বাক্যের কোনো অংশকে খণ্ডবাক্যে পরিণত করতে হয় এবং উভয়ের সংযোগ বিধানে সম্বন্ধসূচক (যদি, তবে, যে, সে প্রভৃতি) পদের সাহায্যে উক্ত খণ্ডবাক্য ও প্রধান বাক্যটিকে পরস্পর সাপেক্ষ করতে হয়।

১. সরল বাক্য      :               ভালো ছেলেরা শিক্ষকের আদেশ পালন করে।

    মিশ্র বাক্য         :               যারা ভালো ছেলে তারা শিক্ষকের আদেশ পালন করে।

২. সরল বাক্য     :               তার দর্শনমাত্রই আমরা প্রস্থান করলাম।

    মিশ্র বাক্য         :               যেই তার দর্শন পেলাম সেই আমরা প্রস্থান করলাম।

৩. সরল বাক্য     :               ভিক্ষুককে দান কর।

    মিশ্র বাক্য         :               যে ভিক্ষা চায় তাকে দান কর।

খ) মিশ্র বাক্যকে সরল বাক্যে রূপান্তর : মিশ্র বাক্যকে সরল বাক্যে রূপান্তর করতে হলে মিশ্র বাক্যের অপ্রধান খণ্ডবাক্যটিকে সংকুচিত করে একটি পদ বা একটি বাক্যাংশে পরিণত করতে হয়। যেমন :

১. মিশ্র বাক্য        :               যাদের বুদ্ধি নেই তারাই এ কথা বিশ্বাস করবে।

    সরল বাক্য       :               নির্বোধরা/ বুদ্ধিহীনরা এ কথা বিশ্বাস করবে।

২. মিশ্র বাক্য        :               যতদিন জীবিত থাকব ততদিন এ ঋণ স্বীকার করব।

   সরল বাক্য        :               আজীবন এ ঋণ স্বীকার করব।

৩. মিশ্র বাক্য        :               যে সকল পশু মাংস ভোজন করে তারা অত্যন্ত বলবান।

   সরল বাক্য        :               মাংসভোজী পশু অত্যন্ত বলবান।

গ) সরল বাক্যকে যৌগিক বাক্যে রূপান্তর

যৌগিক বাক্যের সংযোগচিহ্ন : এবং, কিন্তু, তথাপি, তবে, তাই

সরল বাক্যকে যৌগিক বাক্যে পরিণত করতে হলে সরল বাক্যের কোনো অংশকে নিরপেক্ষ বাক্যে রূপান্তর করতে হয়। এবং যথাসম্ভব সংযোজক বা বিয়োজক অব্যয়ের প্রয়োগ করতে হয়। যেমন :

১. সরল বাক্য      :               তিনি আমাকে পাঁচ টাকা দিয়ে বাড়ি যেতে বললেন।

  যৌগিক বাক্য     :               তিনি আমাকে পাঁচটি টাকা দিলেন এবং বাড়ি যেতে বললেন।

২. সরল বাক্য     :               পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এখন থেকেই তোমার পড়া উচিত।

  যৌগিক বাক্য     :               এখন থেকেই তোমার পড়া উচিত তবেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে।

৩. সরল বাক্য     :               আমি বহু কষ্টে শিক্ষা লাভ করেছি।

  যৌগিক বাক্য     :               আমি বহু কষ্ট করেছি ফলে শিক্ষা লাভ করেছি।

ঘ) যৌগিক বাক্যকে সরল বাক্যে রূপান্তর করতে হলে

১. বাক্যসমূহের একটি সমাপিকা ক্রিয়াকে অপরিবর্তিত রাখতে হয়।

২. অন্যান্য সমাপিকা ক্রিয়াকে অসমাপিকা ক্রিয়ায় পরিণত করতে হয়।

৩. অব্যয় পদ থাকলে তা বর্জন করতে হয়।

৪. কোনো কোনো স্থলে একটি বাক্যকে হেতুবোধক বাক্যাংশে পরিণত করতে হয়। যেমন :

১. যৌগিক বাক্য                  : সত্য কথা বলিনি তাই বিপদে পড়েছি।

   সরল বাক্য                        : সত্য কথা না বলে বিপদে পড়েছি।

২. যৌগিক বাক্য                 : তার বয়স হয়েছে কিন্তু বুদ্ধি হয়নি।

   সরল বাক্য                        : তার বয়স হলেও বুদ্ধি হয়নি।

৩. যৌগিক বাক্য                 : মেঘ গর্জন করে তবে ময়ূর নৃত্য করে।

   সরল বাক্য                        : মেঘ গর্জন করলে ময়ূর নৃত্য করে।

ঙ) যৌগিক বাক্যকে মিশ্র বাক্যে রূপান্তর

যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত পরস্পর নিরপেক্ষ বাক্য দুটির প্রথমটির পূর্বে ‘যদি’ কিংবা ‘যদিও’ এবং দ্বিতীয়টির পূর্বে ‘তাহলে’ (তাহা হইলে) কিংবা ‘তথাপি’ অব্যয়গুলো ব্যবহার করতে হয়। যেমন :

১. যৌগিক বাক্য  :               দোষ স্বীকার কর তবে তোমাকে কোনো শাস্তি দেব না।

   মিশ্র বাক্য          :               যদি দোষ স্বীকার কর তাহলে তোমাকে কোনো শাস্তি দেব না।

২. যৌগিক বাক্য :               তিনি অত্যন্ত দরিদ্র কিন্তু তাঁর অন্তঃকরণ অতিশয় উচ্চ।

   মিশ্র বাক্য          :               যদিও তিনি অত্যন্ত দরিদ্র তথাপি তাঁর অন্তঃকরণ অতিশয় উচ্চ।

সাপেক্ষ অব্যয়ের সাহায্যেও যৌগিক বাক্যকে মিশ্র বাক্যে পরিবর্তন করা যায়। যেমন :

৩. যৌগিক বাক্য :               এ গ্রামে একটি দরগাহ আছে সেটি পাঠানযুগে নির্মিত হয়েছে।

   মিশ্র বাক্য          :               এ গ্রামে যে দরগাহ আছে সেটি পাঠানযুগে নির্মিত হয়েছে।

চ) মিশ্র বাক্যকে যৌগিক বাক্যে রূপান্তর

মিশ্র বাক্যকে যৌগিক বাক্যে পরিবর্তন করতে হলে খণ্ডবাক্যকে এক একটি স্বাধীন বাক্যে পরিবর্তন করে তাদের মধ্যে সংযোজক অব্যয়ের ব্যবহার করতে হয়। যেমন :

১.মিশ্র বাক্য         :               যদি সে কাল আসে তাহলে আমি যাব।

  যৌগিক বাক্য     :               সে কাল আসবে এবং আমি যাব।

২. মিশ্র বাক্য        :               যখন বিপদ আসে তখন দুঃখও আসে।

  যৌগিক বাক্য     :               বিপদ এবং দুঃখ এক সময়ে আসে।

৩. মিশ্র বাক্য        :               যদিও তাঁর টাকা আছে তথাপি তিনি দান করেন না।

  যৌগিক বাক্য     :               তাঁর টাকা আছে কিন্তু তিনি দান করেন না।

বাক্য বিশ্লেষণ

সংজ্ঞা : বাক্যের বিভিন্ন অংশ পৃথক করে তাদের পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ণয় প্রণালীকে বাক্য বিশ্লেষণ বলে।

ক) সরল বাক্যের বিশ্লেষণ

১. মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র শাক্যসিংহ যৌবনে সংসার ত্যাগ করেন।

২. ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা) দীন ইসলামের জন্য তাঁর যথাসবস্ব দান করেছিলেন।

ওপরে লিখিত বাক্য দুটিকে চারটি অংশে বিশ্লেষণ করতে হবে। যেমন: উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক, বিধেয়, বিধেয়ের সম্প্রসারণ।

বিশ্লেষণ

উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক                    উদ্দেশ্য                  বিধেয়ের সম্প্রসারক                          বিধেয়

১. মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র             শাক্যসিংহ                             যৌবনে সংসার                                    ত্যাগ করেন।

২. ইসলামের প্রথম খলিফা           হযরত আবু বকর (রা)       দীন ইসলামের জন্য          দান করেছিলেন তাঁর যথাসর্বস্ব

                                               

খ) মিশ্র বাক্যের বিশ্লেষণ

মিশ্র বাক্যের বিশ্লেষণ করতে হলে-

১. প্রথমে প্রধান বাক্যটি প্রদর্শন করতে হয়।

২. খণ্ডবাক্য (গুলো) প্রদর্শন করে তাদের সঙ্গে প্রধান বাক্যের সম্বন্ধ উল্লেখ করতে হয়।

৩. প্রধান ও অপ্রধান খণ্ডবাক্যের মধ্যে কোনো সংযোজক পদ থাকলে তাও দেখাতে হয়। যেমন :

    আমি স্থির করলাম যে, এরূপ অল্প বয়স্ক বালককে পাঠাব না। এখানে প্রধান বাক্য (১) আমি স্থির করলাম।

    সংযোজক পদ-যে, বিশেষ্য-স্থানীয়-খণ্ডবাক্য (২) অল্প বয়স্ক বালককে পাঠাব না।

বিশ্লেষণ

উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক        উদ্দেশ্য  বিধেয়ের সম্প্রসারক          বিধেয়    সংযোজক বা সাপেক্ষ অব্যয়

১.                                  আমি      অল্প বয়স্ক বালককে                         স্থির করলাম        যে

২.                                 (আমি)

                                    (উহ্য)                     পাঠাব না।             এবং

গ) যৌগিক বাক্যের বিশ্লেষণ

যৌগিক বাক্যের বিশ্লেষণ করতে হলে

১. প্রত্যেকটি স্বাধীন বা নিরপেক্ষ বাক্যকে সরল বাক্যের ন্যায় বিশ্লেষণ করতে হবে।

২. কোনো সংযোজক অব্যয় থাকলে তা প্রদর্শন করতে হবে। যেমন : ত্যাগ এবং জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে। এখানে দুটি বাক্য আছে। যেমন :

১. ত্যাগ মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে।

২. জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে। বাক্য দুটির সংযোজক অব্যয় ‘এবং’।

বিশ্লেষণ

উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক        উদ্দেশ্য                  বিধেয়ের সম্প্রসারক          বিধেয়                    সংযোজক অব্যয়

১.                                  ত্যাগ                      মানুষকে মুক্তির পথে        পরিচালিত করে          এবং

২.                                  জ্ঞান                       মানুষকে মুক্তির পথে        পরিচালিত করে

বাক্য সংক্ষেপন

একাধিক পদ বা উপবাক্যকে একটি শব্দে প্রকাশ করা হলে তাকে বাক্য সংক্ষেপণ বলে। এটি বাক্য সংকোচন বা এককথায় প্রকাশেরই নামান্তর। এখানে বাক্য সংকোচনের উদাহরণ দেওয়া গেল।

বাক্য সংক্ষেপণের বা বাক্য সংকোচনের উদাহরণ

অকাল পক্ব হয়েছে যা                        - অকালপক্ব।

অক্ষির সমক্ষে বর্তমান                        - প্রত্যক্ষ।

অভিজ্ঞতার অভাব আছে যার                 - অনভিজ্ঞ।

অহংকার নেই যার                              - নিরহংকার

অনেকের মধ্যে একজন                       - অন্যতম।

অনুতে (বা পশ্চাতে) জন্মেছে যে              - অনুজ।

আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত                         - আদ্যন্ত, আদ্যোপান্ত।

আকাশে বেড়ায় যে                             - আকাশচারী, খেচর।

আচারে নিষ্ঠা আছে যার                       - আচারনিষ্ঠ।

আপনাকে কেন্দ্র করে যার চিন্তা              - আত্মকেন্দ্রিক।

আপনাকে যে পণ্ডিত মনে করে                - পণ্ডিতম্মন্য।

আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস আছে যার           - আস্তিক

আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস নেই যার           - নাস্তিক।

ইতিহাস রচনা করেন যিনি                       - ঐতিহাসিক।

ইতিহাস বিষয়ে অভিজ্ঞ যিনি                     - ঐতিহাসবেত্তা।

ইন্দ্রিয়কে জয় করেছে যে                         - জিতেন্দ্রিয়।

ঈষৎ আমিষ (আঁধ) গন্ধ যার                      - আঁষটে।

উপকারীর উপকার যে স্বীকার করে              - কৃতজ্ঞ।

উপকারীর উপকার যে স্বীকার করে না           - অকৃতজ্ঞ।

উপকারীর অপকার করে যে                        - কৃতজ্ঞ।

একই মাতার উদরে জাত যারা                    - সহোদর।

এক থেকে শুরু করে ক্রামাগত                      - একাধিক্রমে।

কর্ম সম্পাদনে পরিশ্রমী                               - কর্মঠ।

কোনো ভাবেই যা নিবারণ করা যায় না            - অনিবার্য।

চক্ষুর সম্মুখে সংঘটিত                                - চাক্ষুষ।

জীবিত থেকেও যে মৃত                               - জীবন্মৃত।

তল স্পর্শ করা যায় না যার                           - অতলস্পর্শী।

দিনে যে একবার আহার করে                        - একাহারী।

নষ্ট হওয়াই স্বভাব যার                                - নশ্বর।

নদী মেঘলা যে দেশের                                 - নদীমেঘলা

নৌকা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে যে                  - নাবিক।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত                                    - আপাদমস্তক।

ফল পাকলে যে গাছ মরে যায়                         - ওষধি।

বিদেশে থাকে যে                                        - প্রবাসী।

বিশ্বজনের হিতকর                                      - বিশ্বজনীন।

মৃতের মতো অবস্থা যার                                - মুমূর্ষু।

যা দমন করা যায় না                                    - অদম্য।

যা দমন করা কষ্টকর                                   - দুর্দমনীয়।

যা নিবারণ করা কষ্টকর                                - দুর্নিবার।

যা পূর্বে ছিল এখন নেই                                  - ভূতপূর্ব।

যা বালকের মতোই সুলভ                              - বালসুলভ।

যার উপস্থিত বুদ্ধি আছে                                - প্রত্যুৎপন্নমতি।

যার সর্বস্ব হারিয়ে গেছে                                - সর্বহারা, হৃতসর্বস্ব।

যার কোনো কিছু থেকেই ভয় নেই                   - অকুতোভয়।

যার আকার কুৎসিত                                     - কদাকার।

যা বিনা যত্নে লাভ করা গিয়েছে                      - অযত্নলব্ধ।

যা বার বার দুলছে                                       - দোদুল্যমান।

যা দীপ্তি পাচ্ছে                                              - দেদীপ্যমান।

যা সাধারণের মধ্যে দেখা যায় না এমন              - অনন্যসাধারণ।

যা পূর্বে দেখা যায়নি এমন                               - অদৃষ্টপূর্ব।

যা কষ্টে জয় করা যায়                                    - দুর্জয়।

যা কষ্টে লাভ করা যায়                                   - দুর্লভ।

যা অধ্যয়ন করা হয়েছে                                 - অধীত।

যা জলে চরে                                              - জলচর।

যা স্থলে চরে                                               - স্থলচর।

যা জলে ও স্থলে চরে                                    -উভচর।

যা বলা হয়নি                                            - অনুক্ত।

যা কখনো নষ্ট হয় না                                 - অবিনশ্বর।

যা মর্ম স্পর্শ করে                                      - মর্মস্পর্শী

যা বলার যোগ্য নয়                                      - অকথ্য।

যা অতি দীর্ঘ নয়                                           - নাতিদীর্ঘ।

যার বংশ পরিচয় এবং স্বভাব কেউই জানে না      - অজ্ঞাতকুলশীল।

যার প্রকৃত বর্ণ ধরা যায় না                               - অচিন্তনীয়, অচিন্ত্য।

যা কোথাও উঁচু কোথাও নিচু                            - বন্ধুর।

যা সম্পন্ন করতে বহু ব্যয় হয়                           - ব্যয়বহুল।

যা খুব শীতল বা উষ্ণ নয়                              - নাতিশীতোষ্ণ।

যার বিশেষ খ্যাতি আছে                              - বিখ্যাত।

যা আঘাত পায়নি                                      - অনাহত।

যা উদিত হচ্ছে                                        - উদীয়মান।

যার অন্য উপায় নেই                                   - অনন্যোপায়।

যার কোনো উপায় নেই                              - নিরুপায়।

যা ক্রমশ বর্ধিত হচ্ছে                                - বর্ধিষ্ণু।

যা পূর্বে শোনা যায়নি                                   - অশ্রুতপূর্ব।

যে শুনেই মনে রাখতে পারে                            - শ্রুতিধর।

যে বস্তু থেকে উৎখাত হয়েছে                           - উদ্বাস্তু।

যে নারী নিজে বর বরণ করে নেয়                   - স্বয়ংবরা।

যে গাছে ফল ধরে, কিন্তু ফুল ধরে না                 - বনস্পতি।

যে রোগ নির্ণয় করতে হাতড়ে মরে                       - হাতুড়ে।

যে নারীর সন্তান বাঁচে না                                           - মৃতবৎসা।

যে গাছ কোনো কাজে লাগে না                                   - আগাছা।

যে গাছ অন্য গাছকে আশ্রয় করে বাঁচে                          - পরগাছা।

যে পুরুষ বিয়ে করেছে                                            - কৃতদার।

যে মেয়ের বিয়ে হয়নি                                           - অনুঢ়া।

যে ক্রমাগত রোদন করছে                                         - রোরুদ্যমান।

যে ভবিষ্যতের চিন্তা করে না বা দেখে না                      - অপরিণামদর্শী।

যে ভবিষ্যৎ না ভেবেই কাজ করে                                   - অবিমৃশ্যকারী।

যে বিষয়ে কোনো বিতর্ক (বা বিসংবাদ) নেই                       - অবিসংবাদী।

যে বন হিংস্র জন্তুতে পরিপূর্ণ                                      - শ্বাপদসংকুল।

যিনি বক্তৃতা দানে পটু                                                - বাগ্মী।

যে সকল অত্যাচারই সয়ে যায়                                      - সর্বংসহা।

যে নারী বীর সন্তান প্রসব করে                                       - বীরপ্রসু।

যে নারীর কোনো সন্তান হয় না                                       - বন্ধ্যা।

যে নারী জীবনে একমাত্র সন্তান প্রসব করেছে                       - আকবন্ধ্যা।

যে পুরুষের চেহারা দেখতে সুন্দর                                   - সুদর্শন।

যে রব শুনে এসেছে                                                  - রবাহৃত।

লাভ করার ইচ্ছা                                                      - লিপ্সা।

শুভ ক্ষণে জন্ম যার                                                   - ক্ষণজন্মা।

সন্মুখে অগ্রসর হয়ে অভ্যর্থনা                                      - প্রত্যুদ্গমন।

সকলের জন্য প্রযোজ্য                                              - সর্বজনীন।

হনন করার ইচ্ছা                                                      - জিঘাংসা।

শব্দের যোগ্যতার বিকাশ বাগধারা

বাংলা ভাষায় এমন বহু শব্দ আছে, যাদের আভিধানিক অর্থের সঙ্গে ব্যবহারিক অর্থের যথেষ্ট প্রভেদ আছে। বহুভাবে এ ধরনের পার্থক্য দৃষ্ট হয়ে থাকে। যেমন :

১. শিষ্টরীতি বা রীতিসিদ্ধ প্রয়োগঘটিত

ছাত্রটির মাথা ভালো। এখানে ‘মাথা বলতে ‘দেহের অঙ্গবিশেষ’ না বুঝিয়ে বোঝায় ‘মেধা’।

২. শব্দের অর্থ সংকোচে

ইনি আমার বৈবাহিক। এখানে ‘বৈবাহিক’ শব্দে ‘বিবাহ সূত্রে সম্পর্কিত’ অর্থ না বুঝিয়ে ‘ছেলে বা মেয়ের শ্বশুর সম্পর্কিত’ ব্যক্তিকে বোঝাচ্ছে।

৩. শব্দের অর্থান্তর প্রাপ্তিতে

মেয়ের শ্বশুরবাড়ি তত্ত্ব পাঠানো হয়েছে। এখানে ‘তত্ত্ব’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘সংবাদ’ না বুঝিয়ে ‘উপঢৌকন’ অর্থ বোঝাচ্ছে। একে নতুন অর্থের আবির্ভাব বলা চলে।

৪. শব্দের উৎকর্ষ প্রাপ্তিতে

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। এখানে ‘পরমহংস’ শব্দের সঙ্গে হাঁসের কোনো সম্পর্ক নেই। এর অর্থ ‘সন্ন্যাসী’।

৫. শব্দের অপকর্ষ (বা অধোগতি) বোঝাতে

জ্যাঠামি করো না। এখানে ‘জ্যাঠামি’ শব্দের সঙ্গে ‘জ্যাঠা’র (পিতার বড় ভাইয়ের) কোনো সম্পর্ক নেই। শব্দটি ‘ধৃষ্টতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, শব্দের ব্যবহার দুই প্রকার। যেমন : বাচ্যার্থ ও লক্ষ্যার্থ।

১. বাচ্যার্থ : যে সকল শব্দ তাদের আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয় তাদের বাচ্যার্থ বলে।

২. লক্ষ্যার্থ : যে সকল শব্দ তাদের আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে, অন্য অর্থে ব্যবহৃত হয় তাদের লক্ষ্যার্থ বলে।

বাগধারা বা বাক্যরীতি

কোনো শব্দ বা শব্দসমষ্টি বাক্যে ব্যবহৃত হয়ে অর্থের দিক দিয়ে যখন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন সে সকল শব্দ বা শব্দসমষ্টিকে বাগধারা বা বাক্যরীতি বলা হয়।

‘মুখ’ শব্দযোগে বাগধারার উদাহরণ

ক) এ ছেলে বংশের মুখ রক্ষা করবে।                                            - (সম্মান বাঁচানো)

খ) শুধু শুধু ছেলেটাকে মুখ করছ কেন?                                         - (গালমন্দ করা)

গ) এবার গিন্নির মুখ ছুটেছে।                                                          - (গালিগালাজের আরম্ভ)

ঘ) টক খেয়ে মুখ ধরে আসছে।                                                        - (মুখের স্বাদ নষ্ট হওয়া)

ঙ) খোদা মুখ তুলে চাইলে অবশ্যই ব্যবসায়ে লাভ হবে।         - (অনুগ্রহ লাভ করা)

বিশেষ্য শব্দের প্রয়োগভেদে অর্থ পার্থক্য

১. হাত

ক) হাত আসা       -              কাজ করতে করতেই কাজে হাত আসবে। (দক্ষতা)

খ) হাত গুটান       -              হাত গুটিয়ে বসে আছ কেন? (কার্যে বিরতি)

গ) হাত করা         -              সাহেবকে হাত করতে পারলেই কাজ হবে। (আয়ত্তে আনা)

ঘ) হাত ছাড়া         -              টাকাগুলো হাত ছাড়া করো না। (হস্তচ্যুত)

ঙ) হাত থাকা        -              এ ব্যাপারে আমার কোনো হাত নেই। (প্রভাব)

দ্রষ্টব্য : বাগধারা গঠনে বিভিন্ন পদের ব্যবহারকে রীতিসিদ্ধ প্রয়োগও বলে।

‘হাত’ শব্দের রীতিসিদ্ধ প্রয়োগ

ক) হাতের পাঁচ (শেষ সম্বল)             :               এ টাকা কটিই ছিল আমার হাতের পাঁচ।

খ) হাতে হাতে (অবিলম্বে) :               হাতে হাতে এ কাজের ফল পাবেন।

গ) হাতে খড়ি (বিদ্যারম্ভ) :               এ মাসেই খোকার হাতে খড়ি হবে।

ঘ) হাতে কলমে (স্বহস্তে, কার্যকর ভাবে):     হাতে-কলমে শিক্ষা কেতাবি শিক্ষার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।

২. মাথা

ক) মাথা ধরা        -              রোগ বিশেষ        

খ) গাঁয়ের মাথা   -              মোড়ল

গ) মাথা ব্যথা      -              আগ্রহ

ঘ) মাথা খাওয়া   -              শপথ করা

ঙ) মাথা দেওয়া   -              দায়িত্ব গ্রহণ        

চ) মাথা ঘামানো -              ভাবনা করা

ছ) মাথাপিছু         -              জনপ্রতি

মাথা শব্দের রীতিসিদ্ধ প্রয়োগ                         বাক্য গঠন

রাস্তার মাথায়      -              মিলন স্থলে           রাস্তার মাথায় তার সঙ্গে দেখা।

মাথা গরম করা   -              রাগান্বিত হওয়া   রাগের মাথায় কথাটা বলেছি।

রাগের মাথায়      -              হঠাৎ ক্রোধবশত মাথা গরম করে আর কী হবে?

মাথা হেঁট করা      -              লজ্জায় মাথা নিচু করা       মাথা হেঁট হবে কেন?

মাথা উঁচু করে চলা             -              গর্বভরে চলা        মাথা উচুঁ করেই চলতে চাই।

বিশেষণ শব্দের রীতিসিদ্ধ প্রয়োগ

১. কাঁচা

কাঁচা আম             -              অপরিপক্ক আম। কাঁচা খাতা            -              খসড়া।

কাঁচা কথা              -              গুরুত্বহীন কথা।   কাঁচা ইট -              অদগ্ধ ইট।

কাঁচা ঘুম                -              অল্প ক্ষণের ঘুম।                কাঁচা চুল                -              কালো চুল।

কাঁচা বয়স            -              অপরিণত বয়স। কাঁচা সোনা           -              নিখাদ স্বর্ণ।

বাক্য গঠন : কাঁচা সোনার মতো তার গায়ের রং।

কাঁচা (আনাড়ি) লোকই কাঁচা (অনিপুণভাবে) কাজ করে থাকে।

২. পাকা

পাকা কথা (শেষ সিদ্ধান্তসূচক) চাই।

পাকা বন্দোবস্ত (স্থায়ী) করে এসেছি।

এ হচ্ছে পাকা রাঁধুনির (দক্ষ) রান্না

ইঁচড়ে পাকা (অকালে পরিপক্ক) ছেলেদের কথা অসহ্য।

একেবারে পাকা হাতের (দক্ষ লেখকের) লেখা।

আমি কি তোমার পাকা ধানে মই দিয়েছি (হক নষ্ট করা) যে, আমার সঙ্গে শত্রুতা করছ?

ক্রিয়া শব্দের রীতিসিদ্ধ প্রয়োগ

১ .করা

মনে করলাম এবার তীর্থে যাব।                      (সংকল্প করা)

সে ফুটবল খেলায় নাম করেছে।                     (যশস্বী হওয়া)

টাকা করে নাম কিনতে চাও?                           (খ্যাতি লাভের চেষ্টা করা)

চাকরি পাওয়ার কোনো জো করে উঠতে পারিনি।      (সুযোগ পাওয়া)

২. ধরা

কান ধরা                -              কর্ণ মর্দন করা।              মনে ধরা               -              পছন্দ হওয়া।

দোষ ধরা              -              অপরাধ গণনা করা।          আগুন ধরা            -              আগুন লাগা।

পথ ধরা                 -              উপায় দেখা                 ম্যাও ধরা              -              দায়িত্ব নেওয়া।

হাতে-পায়ে ধরা       -              অনুরোধ করা।     গোঁ ধরা                          -              একগুঁয়েমি করা।

গলা ধরা               -              কণ্ঠ রুদ্ধ হওয়া। (কথা রুদ্ধ হয়ে যাওয়া)

দ্রষ্টব্য

শব্দাত্মক ও পদাত্মক বাগধারার অর্থের পার্থক্য ঘটে। যেমন :

গা

গা সওয়া               -              অভ্যস্ত হওয়া।                  গা লাগা               - মনোযোগ দেওয়া।

গায়ে সওয়া          -              দেহে সহ্য হওয়া।                গায়ে লাগা            - অনুভূত হওয়া।

পা

পায়ে পড়া             -              ক্ষমা প্রার্থনা করা।              পায়ে পড়া             - খোশামুদে।

হাত

হাত আসা             -              অভ্যস্থ হওয়া।      হাতে আসা           - আয়ত্ত হওয়া।

রোগ

রোগ ধরা              -              রোগ নির্ণয়।         রোগ ধরা              - রোগাক্রান্ত হওয়া।

বাগ্ধারার ব্যবহার

বাগ্ধারা                                          অর্থ                                    বাক্যরচনা

অকাল কুষ্মাণ্ড                       অপদার্থ, অকেজো             -              অকাল কুষ্মাণ্ড ছেলেটার ওপর এ কাজের দায়িত্ব দিও না।

অক্কা পাওয়া                         মারা যাওয়া                   -               শয়তানটা শেষ পর্যন্ত অক্কা পেয়েছে।

অগস্তা যাত্রা                          চিরদিনের জন্য প্রস্থান      -              ডাকাতি মামলার আসামি হওয়ায় করিম গ্রাম থেকে অগস্তা যাত্রা করেছে।

অগাধ জলের মাছ                              সুচতুর ব্যক্তি       -              সরল মনে হলেও লোকটা আসলে অগাধ জলের মাছ।

অর্ধচন্দ্র                                  গলা ধাক্কা             -              শয়তানটাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদায় করে দাও।

অন্ধের ষষ্ঠি /নড়ি                                একমাত্র অবলম্বন               -              বিধবার একমাত্র সন্তান তার অন্ধের ষষ্ঠি/অন্ধের নড়ি।

অগ্নিশর্মা                               নিরতিশয় ক্রুদ্ধ    -              তিনি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেন।

অগ্নিপরীক্ষা                          কঠিন পরীক্ষা       -              জাতিকে এ অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে, ভয় পেলে চলবে না।

অন্ধকারে ঢিল মারা            আন্দাজে কাজ করা            -              অন্ধকারে ঢিল মেরে সব কাজ ঠিকভাবে করা যায় না।

অকূল পাথার                       ভীষণ বিপদ         -              অকূল পাথারে আল্লাহই একমাত্র সহায়।

অনুরোধে ঢেঁকি গেলা        অনুরোধে দুরূহ কাজ

                      সম্পন্ন করতে সম্মতি জ্ঞাপন      -              অনুরোধে ঢেঁকি গেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমি এ কাজ করতে পারব না।

অদৃষ্টের পরিহাস                ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা -              অদৃষ্টের পরিহাসে রাজাও ভিখারি হয়।

অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী          সামান্য বিদ্যার অহংকার  -              কিছুই জানে না, আবার দেমাক কত - অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী আর কি।

অনধিকার চর্চা                     সীমার বাইরে পদক্ষেপ    -              কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি অনধিকার চর্চা করি না।

অরণ্যে রোদন                     নিষ্ফল আবেদন -              কৃপণের নিকট চাঁদা চাওয়া অরণ্যে রোদন মাত্র।

অহিনকুল সম্বন্ধ

/দা-কুমড়া                            ভীষণ শত্রুতা       -              দুভাইয়ের মধ্যে অহিনকুল সম্বন্ধ /দা-কুমড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্ধকার দেখা                                      দিশেহারা হয়ে পড়া            -              এ বিপদে আমি যে সব অন্ধকার দেখছি।

অমাবস্যার চাঁদ

/ডুমুরের ফুল                       দুর্লভ বস্তু              -              তোমার দেখা পাওয়াই ভার, অমাবস্যার চাঁদ /ডুমুরের ফুল হয়ে পড়েছ।

আকাশ পাতাল                    প্রচুর ব্যবধান       -              ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ।

আক্কেল সেলামি                  নির্বুদ্ধিতার দণ্ড    -              বিনা টিকেটে রেলগাড়িতে চড়ে আক্কেল সেলামি দিতে হলো।

আঙুল ফুলে কলাগাছ                        হঠাৎ বড়লোক     -              যুদ্ধের বাজারে দেদার টাকা পয়সা কামাই করে অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া দুর্লভ বস্তু প্রাপ্তি              -              হারানো ছেলেকে ফিরে পেয়ে বাপ-মা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন।

আদায় কাঁচকলায়                               শত্রুতা   -              তার সঙ্গে আমার আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক, সে আমার দুশমন।

আদা জল খেয়ে লাগ                         প্রাণপণ চেষ্টা করা               -              কাজটি শেষ করার জন্য সে আদা জল খেয়ে লেগেছে।

আক্কেল গুড়ম                      হতবুদ্ধি, স্তম্ভিত   -              ইঁচড়ে পাকা ছেলেটার কথা শুনে আমার আক্কেল গুড়ম।

আমড়া কাঠের ঢেঁকি           অপদার্থ)               -              ও হচ্ছে ধনীর দুলাল, আমড়া কাঠের ঢেঁকি, ওকে দিয়ে কিছুই হবে না।

আকাশ ভেঙে পড়া                              ভীষণ বিপদে পড়া             -              ব্যাংক ফেল করেছে শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

আমতা আমতা করা                           ইতস্তত করা, দ্বিধা করা     -              আমতা আমতা না করে স্পষ্ট কথায় দোষ স্বীকার কর।

আটকপালে                          হতভাগ্য                -              ছেলেটা এতিম, আটকপালে।

আঠার মাসে বছর                               দীর্ঘসূত্রতা             -              তোমার তো আঠার মাসে বছর, কোনো কাজই তাড়াতাড়ি করতে পার না।

আলালের ঘরের দুলাল    অতি আদরে নষ্ট পুত্র         -              বড়লোকের ঘরে দুই/একজন আলালের ঘরের দুলাল মিলবেই।

আকাশে তোলা                    অতিরিক্ত প্রশংসা করা      -              চাটুকাররা ধনী ব্যক্তিদের কথায় কথায় আকাশে তোলে।

আষাঢ়ে গল্প                        আজগুবি কেচ্ছা   -              চাঁদে যাওয়ার কথাটা একসময় ছিল আষাঢ়ে গল্প।

ইঁদুর কপালে                       নিতান্ত মন্দ ভাগ্য               -              আমার মতো ইঁদুর কপালে লোকের দাম এক কানাকড়িও না।

ইঁচড়ে পাকা                          অকালপক্ক            -              অতবড় মানুষটার সাথে তর্ক করছে, কী ইঁচড়ে পাকা ছেলে বাবা।

ইতর বিশেষ                         পার্থক্য  -              সৃষ্টিকর্তার নিকট সব মানুষই সমান, ইতর বিশেষ নেই।

উত্তম মধ্যম                         প্রহার, পিটুনি       -              গৃহস্থ চোরটাকে উত্তম মধ্যম দিয়ে ছেড়ে দিল।

উড়নচণ্ডী                               অমিতব্যয়ী           -              এমন উড়নচণ্ডী হলে দুদিনে টাকাকড়ি সব শেষ হবে।

উভয় সংকট                        দু’দিকেই বিপদ     -   সত্যকথা বললে বাবার ক্ষতি আবার মিথ্যাকথা বললে মায়ের ক্ষতি,

                                                                   আমার হয়েছে উভয় সংকট /শাঁখের করাতের অবস্থা।

উলুবনে মুক্ত ছড়ানো        অস্থানে মূল্যবান দ্রব্য প্রদান            -              তাকে সদুপদেশ দান, উলুবনে মুক্ত ছড়ানোর মতোই নিষ্ফল।

উড়োচিঠি                              বেনামি পত্র          -              ডাকাতরা জমিদার বাড়িতে উড়োচিঠি দিয়ে ডাকাতি করেছিল।

উড়ে এসে জুড়ে বসা          অনধিকারীর অধিকার       -              লোকটার মাতব্বরি দেখলে গা জ্বলে যায়। ও এখানকার লোক নয়, উড়ে এসে

                                       জুড়ে বসেছে।

একক্ষুরে মাথা মুড়ানো     একই স্বভাবের    -              সকলেই একক্ষুরে মাথা মুড়িয়েছে দেখছি, পরীক্ষায় সবাই ফেল করেছে।

একচোখা                              পক্ষপাতিত্ব, পক্ষপাতদুষ্ট -              একচোখা লোকের কাছে সুবিচার পাওয়া যায় না।

এক মাঘে শীত যায় না       বিপদ একবারই আসে না -              আমাকে ফাঁকি দিলে, মনে রেখো, এক মাঘে শীত যায় না।

এলোপাতাড়ি                      বিশৃঙ্খলা              -              এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে শত্রুদলের ক্ষতি করতে পারবে না।

এসপার ওসপার                 মীমাংসা                -              চুপ করে থেকে লাভ কী, এসপার ওসপার একটা করে ফেল।

একাদশে বৃহস্পতি                             সৌভাগ্যের বিষয়               -              এখন তার একাদশে বৃহস্পতি, ধুলোমুঠোও সোনামুঠো হচ্ছে।

এলাহি কাণ্ড                          বিরাট আয়োজন -              বড় বাড়িতে বিয়ে, সেতো এক এলাহি কাণ্ড হবে।

কলুর বলদ                           একটানা খাটুনি   -              কলুর বলদের মতো সংসারের চাকায় ঘুরে মরছি।

কথার কথা                           গুরুত্বহীন কথা     -              কারও মনে আঘাত দেওয়ার জন্য একথা বলিনি, এটা একটা কথার কথা।

কপাল ফেরা                         সৌভাগ্য লাভ      -              লটারির টিকেট কিনে সে তার কপাল ফেরাতে চায়।

কত ধানে কত চাল                             হিসাব করে চলা  -              নিজেকে তো আর উপার্জন করতে হয় না, কত ধানে কত চাল হয় বুঝবে কেমন করে।

কড়ায় গণ্ডায়                         সম্পূর্ণ, পুরোপুরি                -              সে কড়ায় গণ্ডায় তার পাওনা বুজে নিল।

কান খাড়া করা                     মনোযোগী হওয়া                -              আমি কী বলি তা শোনার জন্য সে কান খাড়া করে রইল।

কাঁচা পয়সা                           নগদ উপার্জন      -              কাঁচা পয়সা পাও কি না, তাই খরচ করতে বাধে না।

কাঁঠালের আমসত্ত্ব                              অসম্ভব বস্তু          -              ঐ হাড়কিপ্টে করবে দান, কাঁঠালের আমসত্ত্ব আর কি।

কুপমণ্ডুক                               ঘরকুনো/সীমাবদ্ধ জ্ঞান সম্পন্ন       -              তুমি তো কুপমণ্ডুক, ঘরে হৈতে আঙ্গিনা বিদেশ।

কেতাদুরস্ত                            পরিপাটি             - কথাবার্তায়, পোশাকপরিচ্ছদে কেতাদুরস্ত হলেও সে অন্তঃসারশূন্য।

কাঠের পুতুল                       নির্জীব, অসার     -              রাজা কাঠের পুতুলের মতো সিংহাসনে বসেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীই দেশ শাসন করতেন।

কথা চিঁড়ে ভেজা                  ফাঁকা বুলিতে কার্যসাধন   -              কাজটি করাতে হলে নগদ কিছু চাল, শুধু কথায় চিড়ে ভেজে না।

কান পাতলা                         সহজেই বিশ্বাসপ্রবণ          -              কান পাতলা লোকের অধীনে কাজ করা কঠিন।

কাছা ঢিলা                             অসাবধান             -              কাছা ঢিলা লোককে কোনো বড় দায়িত্ব দিতে নেই।

কুল কাঠের আগুন                              তীব্র জ্বালা             -              তোমার কথার খোঁচায় আমার সারা দেহে কুলকাঠের আগুন জ্বলছে।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ                              সামান্য থেকে অসামান্য পরিস্থিতি -              ব্যাপারটা নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবে।

কেউকেটা                             সামান্য  -              ও একেবারে কেউকেটা লোক নয়, ওর সঙ্গে লাগতে যেও না।

কেঁচে গণ্ডুস                           পুনরায় আরম্ভ     -              সবটাই ভুল হয়েছে, আবার কেঁচে গণ্ডুস করতে হবে দেখছি।

কৈ মাছের প্রাণ                    যা সহজে মরে না                -              লোকটা এত অত্যাচারেও মরেনি, কৈ মাছের প্রাণ দেখছি।

খয়ের খাঁ /ঢাকের কাঠি     চাটুকার /মোসাহেব            -              তুমি তো বড় সাহেবের খয়ের খাঁ/ঢাকের কাঠি, তিনি যা বলেন তুমি তাই বল।

খণ্ড প্রলয়                              তুমুল কাণ্ড, ভীষণ ব্যাপার                -              সামান্য ঘটনা থেকে এমন খণ্ড প্রলয় হবে ভাবিনি।

গড্ডলিকা প্রবাহ                 অন্ধ অনুকরণ       -              গড্ডলিকা প্রবাহে যারা গা ভাসিয়ে দেয়, আমি তাদের দলে নেই।

গদাই লস্করি চাল                               অতি ধীর গতি, আলসেমি                -              এমন গদাই লস্করি চালে চললে ট্রেন ফেল করবে।

গনেশ উল্টানো                   উঠে যাওয়া, ফেল মারা     -              কর্মচারীদের চুরির ফলে দোকানটা গণেশ উল্টিয়েছে।

গলগ্রহ                   পরের বোঝাস্বরূপ থাকা   -              কারো গলগ্রহ হয়ে থাকা যে কী কষ্ট, তা আমার বিলক্ষণ জানা আছে।

গোঁয়ার গোবিন্দ                  নির্বোধ অথচ হঠকারী        -              সে যেমন জেদি তেমনি রাগী, তার মতো গোঁয়ার গোবিন্দকে নিয়ে পথ চলা যায় না।

গোল্লায় যাওয়া                     নষ্ট হওয়া, অধঃপাতে যাওয়া           -              কুসঙ্গে পড়ে ছেলেটা গোল্লায় গেছে।

গোবর গণেশ                       মূর্খ         -              না জানে লেখাপড়া, না আছে বুদ্ধি - ছেলেটা একেবারে গোবর গণেশ।

গাছে তুলে মই কাড়া          আশা দিয়ে আশ্বাস ভঙ্গ করা            -              আমাকে এগিয়ে দিয়ে সরে পড়েছ, একেই বলে গাছে তুলে মই কাড়া।

গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়ানো      কোনো দায়িত্ব গ্রহণ না করা          -              গায়ে ফুঁ বেড়ালে সংসার চলবে কেমন করে?

গোঁফ খেজুরে                       নিতান্ত অলস       -              গোঁফ খেজুরে লোক দিয়ে কোনো কাজই হয় না।

গোড়ায় গলদ

/বিসমিল্লায় গলদ                               শুরুতে ভুল           -              অঙ্ক মিলবে কেমন করে? গোড়াতেই তো গলদ।

গুড়ে বালি                             আশায় নৈরাশা    -              আশা করেছিলাম মামার সম্পত্তি পাব, এখন দেখছি সে গুড়ে বালি।

ঘর ভাঙানো                         সংসার বিনষ্ট করা               -              তোমার মতো ঘর ভাঙানো বৌ আর দেখিনি।

ঘাটের মড়া                           অতি বৃদ্ধ               -              টাকার লোভে ঘাটের মড়ার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিও না।

ঘোড়ারোগ                            সাধ্যের অতিরিক্ত সাধ      -              মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে পেয়ে গাড়ি কিনতে চাও, একেই বলে গরিবের ঘোড়ারোগ।

ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া

                মধ্যবর্তীকে অতিক্রম করে কাজ করা            -              বড় বাবুকে না জানিয়ে বড় সাহেবকে বলা, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো।

চক্ষুদান করা                        চুরি করা                -              কে আমার কলমটার চক্ষুদান করল?

চাঁদের হাট                            আনন্দের প্রাচুর্য  -              ধনেজনে চৌধুরী সাহেবের সংসার যেন চাঁদের হাট।

চিনির বলদ          ভারবাহী কি ফল লাভের অংশীদার নয় -     সংসারে চিনির বলদের মতো খেটে মরছি, কিছুই পাই না।

চোখের বালি                        চক্ষুশূল  -              বখাটে ছেলেটা সকলের চোখের বালি।

চোখের পর্দা                         লজ্জা      -              তোমার দেখছি চোখের পর্দা নেই; কেমন করে এ কাজ করলে?

ছকড়া নকড়                         সস্তা দর -              নিলামের মাল, তাই ছকড়া নকড়ায় বিক্রি হয়ে গেল।

ছাপোষা                অত্যন্ত গরিব       -              আমার মতো ছাপোষা লোকের কোনো শখ থাকতে নেই।

ছিনিমিনি খেলা                   নষ্ট করা -              পরের টাকায় ছিনিমিনি খেলতে লজ্জা করল না?

ছেলের হাতের মোয়া         সহজলভ্য বস্তু     -              রত্নহার ছেলের হাতের মোয়া নয় যে চাইলেই পাবে।

জগাখিচুড়ি পাকানো                          গোলমাল বাধানো              -              ব্যাপারটা জগাখিচুড়ি পাকিয়ে সে সরে পড়ল।

জিলাপির প্যাঁচ                   কুটিলতা                -              ভালোমানুষ মনে হলেও তার ভেতরে রয়েছে জিলাপির প্যাঁচ।

ঝোপ বুঝে কোপ মারা       সুযোগ মতো কাজ করা     -              ঝোপ বুঝে কোপ মারতে পেরেছে বলেই সে কৃতকার্য হয়েছে।

টনক নড়া                              চৈতন্যোদয় হওয়া/ বুঝে ওঠা          -              ব্যবসায় ক্ষতি হতেই তার টনক নড়ল।

ঠাট বজায় রাখা                   অভাব চাপা রাখা                -              অভাবে পড়লেও তিনি ঠাট বজায় রেখে চলেছেন।

ঠোঁটকাটা                               বেহায়া   -              তোমার মতো ঠোঁট কাটা ছেলে আর দেখিনি, মুখের ওপর এ কথা বললে।

ঢাক ঢাক গুড় গুড়                গোপন রাখার চেষ্টা            -              ঢাক ঢাক গুড় গুড় করে লাভ কী, ব্যাপারটা খুলে বল।

তালকানা                              বেতাল হওয়া       -              চোখে চশমা, আর চশমা খুঁজে বেড়াচ্ছে, আচ্ছা তালকানা লোক।

তাসের ঘর                            ক্ষণস্থায়ী বস্তু        -              ঠুনকো বন্ধুত্ব স্বার্থের সামান্য আঘাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়।

তামার বিষ                           অর্থের কু প্রভাব  -              হঠাৎ বড় লোক কি না তাই তামার বিষে বিবেকহীন হয়ে পড়েছে।

থ বনে যাওয়া                      স্তম্ভিত হওয়া        -              তোমার কাণ্ড দেখে আমি তো থ বনে গেলাম।

দহরম মহরম                      ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক        -              সাহেবের সাথে তোমার যখন এত দহরম মহরম তখন কাজটা করিয়ে দাও ভাই।

দুমুখো সাপ                         দুজনকে দুরকম কথা বলে

                                পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টিকারী -              লোকটা একটা দুমুখো সাপ; আমাদের দুজনকে দুরকম কথা বলে দুজনের

                                                                   মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করেছে।

দুধের মাছি                           সুসময়ের বন্ধু      -              সুদিনে যে দুধের মাছি, দুর্দিনে তার সাক্ষাৎ মেলে না।

ধরাকে সরা জ্ঞান করা        সকলকে তুচ্ছ ভাবা            -              বড়লোক হয়েছ বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করো না।

ধরি মাছ না ছুঁই পানি         কৌশলে কার্যোদ্ধার            -              এ ব্যাপারে আমার ভূমিকা হবে ধরি মাছ না ছুঁই পানি।

ননীর পুতুল                          শ্রমবিমুখ              -              ছেলেটি একেবারে ননীর পুতুল, একটু পরিশ্রমেই হাঁফিয়ে ওঠে।

নয়ছয়                    অপচয়   -              সে বাড়ি বিক্রির টাকাগুলো নয়ছয় করে ফেলল।

নেই আঁকড়া                          একগুঁয়ে                -              এমন নেই আঁকড়া ছেলে আর তো দেখিনি বাবা যা বলবে তাই।

পটল তোলা                         অক্কা পাওয়া         -              শয়তানটা পটল তুলেছে, এবার গাঁয়ের লোকের হাড় জুড়াবে।

পালের গোদা                      দলপতি -              পুলিশ পালের গোদাকে ধরতে পারেনি, সাধারণ মানুষের হাতে হাতকড়া পরিয়েছে।

পুকুরচুরি                               বড় রকমের চুরি -              কিছু কর্মচারী পুকুরচুরি করে প্রতিষ্ঠানে লালবাতি জ্বালিয়েছে।

ফপর দালালি                      অতিরিক্ত চালবাজি           -              সবখানে ফপর দালালি চলে না, জায়গা বুঝে কাজ করতে হয়।

ফোড়ন দেওয়া                     টিম্পনি কাটা        -              কথায় কথায় ফোড়ন দিয়ে কাজ করা দায় হয়ে উঠবে।

বক ধার্মিক

/বিড়াল তপস্বী                    ভণ্ড সাধু -              মুখে ধর্মের কথা বললেও লোকটা আসলে বক ধার্মিক।

বর্ণচোরা                                কপট ব্যক্তি          -              লোকটা বর্ণচোরা, তার আসল রূপ ধরা যায় না।

বালি বাঁধ                              অস্থায়ী বস্তু           -              বড়র পিরিত যেন বালির বাঁধ।

বাঁ হাতের ব্যাপার                               ঘুষ গ্রহণ                -              এ অফিসের কিছু কর্মচারী বাঁ হাতের ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত।

বাঘের দুধ/চোখ                 দুঃসাধ্য বস্তু          -              টাকায় বাঘের দুধ মেলে।

বুদ্ধির ঢেঁকি                           নিরেট মূর্খ            -              হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি।

ব্যাঙের আধুলি                    সামান্য সম্পদ     -              এই সামান্য কটা টাকা ব্যাঙের আধুলি আর কি।

ব্যাঙের সর্দি                         অসম্ভব ঘটনা       -              জেলের বাস্তু ঘুঘুকে দেখাচ্ছে জেলের ভয়, ব্যাঙের আবার সর্দি।

ভরাডুবি                সর্বনাশ  -              আমি কারো ভরাডুবি করিনি যে সবাই আমার বিরুদ্ধে লেগেছে।

ভূতের ব্যাগার                     অযথা শ্রম             -              জীবনভর ভূতের ব্যাগার খেটে গেলাম, লাভ কিছুই হলো না।

ভিজে বিড়াল                       কপটাচারী            -              সমাজের ভিজে বেড়ালদের চেনা সহজ নয়।

ভূশণ্ডির কাক                        দীর্ঘজীবী               -              স্ত্রী, পুত্র, কন্যা-সবার মৃত্যুর পরও বৃদ্ধ ভূশণ্ডির কাকের মতো বেঁচে আছে।

মগের মুল্লুক                         অরাজক দেশ       -              এটা কি মগের মুল্লুক পেয়েছ যে যা খুশি তাই করবে?

মণিকাঞ্চন যোগ

/সোনায় সোহাগা                উপযুক্ত মিলন    -              যেমন বর, তেমনি কনে, একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ/সোনায় সোহাগা।

মন না মতি                           অস্থির মানব মন -              মানুষের মন তো বদলেই থাকে; কথায় বলে- ‘মন না মতি’।

মাছের মায়ের পুত্রশোক   কপট বেদনাবোধ               -              নিজের পুত্রের মৃত্যুতে একফোঁটা চোখের পানি পড়ল না, এ যে মাছের মায়ের পুত্রশোক।

মিছরির ছুরি                         মুখে মধু অন্তরে বিষ          -              শুনতে মধু

সমার্থক শব্দ

যেসব শব্দ একই অর্থ প্রকাশ করে তাদের সমার্থক বা একার্থক শব্দ বলে। রচনার মাধুর্য সৃষ্টির জন্য একটা অর্থকেই বিভিন্ন বাক্যে বিভিন্ন শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা প্রয়োজন। কবিতায় এর প্রয়োগ বেশি। এখানে কতগুলো সমার্থক শব্দের উদাহরণ দেওয়া হলো।

শব্দে প্রয়োগ

অন্ধকার -              আঁধার, তমসা, তিমির     

আকাশ  -              অম্বর, গগন, নভঃ, ব্যোম

আগুন    -              অগ্নি, অনল, পাবক, বহ্নি, হুতাশন

ঈশ্বর      -              আল্লাহ, খোদা, জগদীশ্বর, ধাতা, বিধাতা, ভগবান, সৃষ্টিকর্তা, স্রষ্টা

কান        -              কর্ণ, শ্রবণ

চুল          -              অলক, কুন্তল, কেশ, চিকুর

চোখ       -              অক্ষি, চক্ষু, নয়ন, নেত্র, লোচন

জল        -              অম্বু, জীবন, নীর, পানি, সলিল

তীর        -              কূল, তট, সৈকত

দিন        -              দিবস, দিবা

দেবতা   -              অমর, দেব, সুর

দেহ        -              গাত্র, গা, তনু, শরীর

ধন          -              অর্থ, বিত্ত, বিভব, সম্পদ

পৃথিবী   -              অবনী, ধরা, ধরণী, ধরিত্রী, বসুন্ধরা, ভূ, মেদিনী

পর্বত      -              অচল, অদ্রি, গিরি, পাহাড়, ভূধর, শৈল

পিতা      -              আব্বা, জনক, বাবা

পুত্র         -              ছেলে, তনয়, নন্দন, সুত

মাতা      -              গর্ভধারিণী, প্রসূতি, মা, জননী

কোকিল -              পরভৃত, পিক

গরু         -              গো, গাভী, ধেনু

চাঁদ         -              চন্দ্র, নিশাকর, বিধু, শশধর, শশাঙ্ক, সুধাংশু, হিমাংশু

রাজা      -              নৃপতি, নরপতি, ভূপতি

সূর্য          -              আদিত্য, তপন, দিব্যকর, ভাস্কর, ভানু, মার্তণ্ড, রবি, সবিতা

স্বর্গ         -              দেবলোক, দ্যুলোক, বেহেশত

নদী        -              তটিনী, স্রোতস্বতী, স্রোতস্বিনী

নারী       -              অবলা, কামিনী, মহিলা, স্ত্রীলোক, রমণী

মৃত্যু       -              ইন্তেকাল, ইহলীলা-সংবরণ, ইহলোক ত্যাগ, চিরবিদায়, জান্নাতবাসী হওয়া

                                দেহত্যাগ, পঞ্চত্বপ্রাপ্তি, পরলোকগমন, লোকান্তরগমন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ, স্বর্গলাভ

সাপ        -              অহি, আশীবিষ, নাগ, ফণী, ভুজঙ্গ, সর্প

সমুদ্র      -              অর্ণব, জলধি, জলনিধি, পারাবার, বারিধি, রত্নাকর, সাগর, সিন্ধু

হাতি       -              কর, বাহু, ভুজ, হস্ত

বাক্যে প্রয়োগ

* কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।

* গগনে উদিল রবি লোহিত বরণ।

* দিবসে আলস্যে নিদ্রা অতি দূষণীয়।

* অবলা সবলা আজ নহে তো দুর্বলা।

* প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপে গলিছে তুষারপিণ্ড।

বিভিন্নার্থক শব্দ

একই শব্দের নানা প্রকার অর্থ থাকলে তাকে বিভিন্নার্থক শব্দ বলে। যেমন :

১.অঙ্ক

১. সংখ্যা               -              টাকার অঙ্ক কত হবে?

২. আঁক -              অঙ্কটা কষ।

৩. চি‎হ্ন  -              পদাঙ্ক (পদচিহ্ন) অনুসরণ কর।

৪. কোল                -              শিশুকন্যাটিকে অঙ্কে নিয়ে জননী আদর করছেন।

৫. নাটকের প্রধান পরিচ্ছেদ            -              এই নাটকের ষষ্ঠ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যটি খুব করুণ।

২. অচল

১. গতিহীন           -              শরীর অচল হয়ে পড়েছে।

২. একনিষ্ঠ           -              ঈশ্বরে অচল ভক্তি হোক।

৩. মেকি, অব্যবহার্য           -              এ অচল টাকা কে নেবে?

৪. অপ্রচলিত       -              হাজার টাকার এই নোটটি অচল।

৫. নির্বাহ এবং করা কঠিন                -              অর্থের অভাবে সংসার অচল হয়ে গেছে।

৬. পর্বত                -              উচল বলিয়া অচলে বাড়িনু পড়িনু অগাধ জলে।

৩. অন্তর

১. মন    -              অন্তর মম বিকশিত কর।

২. অন্য  -              তিনি দেশান্তরে গিয়েছেন।

৩. ব্যবধান, পার্থক্য           -              এখান থেকে একঘন্টা অন্তর বাস ছাড়ে।

৪. আত্মীয়            -              অন্তর মম বিকশিত কর, অন্তরতর হে।

৪. কূট

১. কুটিল               -              তার কূট বুদ্ধির সঙ্গে পারবে কেন?

২. জটিল               -              এটা কূট প্রশ্নোত্তর, উত্তর দেওয়া কঠিন।

৩. কপট, জাল     -              কূট সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে সে এসে ধরা পড়েছে।

৪. পর্বতশৃঙ্গ         -              পর্বতকূটে আরোহণ করা দুরুহ।

৫. গুণ

১. ধর্ম    -              দ্রব্যের গুণ জানতে হয়।

২. ক্রিয়া                -              ওষুধে গুণ করেছে।

৩. উৎকর্ষ              -              তুমি তো নিজের গুণকীর্তন করছ।

৪. উপকরণ         -              শিক্ষার গুণ অনেক।

৫. দড়ি  -              মাঝিরা নৌকার গুণ টেনে এসেছে।

৬. ধর্ম

১. সৎকাজ, পুণ্যকাজ        -              অহিংসা পরম ধর্ম।

২. সুনীতি              -              এটা ধর্মসংগত কাজ।

৩. সম্প্রদায় বিশেষের উপাসনাপদ্ধতি- প্রত্যেক ধর্মই মানুষের চরিত্রকে উন্নত করে।

৪. স্বভাব               -              মানুষ ও পশুর ধর্ম পৃথক।

৭. পক্ষ

১. দল    -              তুমি কোন পক্ষে?

২.মাসার্ধ               -              দুই পক্ষ নিয়ে মাস।

৩. চাঁদের ক্ষয় বা বৃদ্ধি কাল              -              এখন শুক্লপক্ষ।

৪. পাখির ডানা    -              যাদের পক্ষ আছে তাদের পাখি বলে।

৫. বিয়ে সংখ্যা    -              ছেলেটি তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তান।

বিপরীতার্থক শব্দ

একটি শব্দের বিপরীত অর্থবাচক শব্দকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে।

শব্দের পূর্বে সাধারণত অ, অন, অনা, অপ, অব, দুর, ন, না, নি, নির প্রায়ই না-বাচক বা নিষেধবোধক অর্থ প্রকাশ করে। তাই শব্দের বিরোধার্থক শব্দ তৈরিতে এই উপসর্গগুলো কিছুটা সাহায্য করে। তবে গঠনগত দিক থেকে শব্দের বিপরীতার্থক শব্দগুলো প্রায়ই মূল শব্দের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য। যেমন :

শব্দ         বিপরীতার্থক        শব্দ         বিপরীতার্থক           শব্দ         বিপরীতার্থক শব্দ

কাজ            অকাজ           সঞ্চয়              ব্যয়           আকর্ষণ          বিকর্ষণ

উপচয়          অপচয়          উন্নত        অবনত, অনুন্নত      পথ            বিপথ

কৃতজ্ঞ      অকৃতজ্ঞ, কৃতজ্ঞ    উৎকর্ষ      অপকর্ষ               বাদী          বিবাদী

কেজো          অকেজো          যশ         অপযশ               যুক্ত           বিযুক্ত

চেতন            অচেতন           সবল      দুর্বল                 সফল        বিফল

চেনা               অচেনা           সুকৃত     দুষ্কৃত                  সুশ্রী          বিশ্রী

জানা              অজানা            সুখ         দুঃখ               স্মৃতি      বিস্মৃতি

জ্ঞানী             অজ্ঞান               সুলভ     দুর্লভ             ঠিক        বেঠিক

ধর্ম                 অধর্ম               সুশীল    দুঃশীল             তাল       বেতাল

নশ্বর             অবিনশ্বর            আসল     নকল             হাল        বেহাল

লক্ষ্মী              অলক্ষ্মী             আস্তিক   নাস্তিক            হুঁশ          বেহুঁশ

শান্ত               অশান্ত              লায়েক  নালায়েক              অগ্র         পশ্চাৎ

শিষ্ট              অশিষ্ট                  খুঁত         নিখুঁত             অচল      সচল

শুভ                অশুভ                  খোঁজ      নিখোঁজ         অনুকূল  প্রতিকূল

শ্রদ্ধা              অশ্রদ্ধা                     বিরত     নিরত          অন্তর     বাহির

অন্ত               অনন্ত                    অন্তরঙ্গ  বহিরঙ্গ           অধম      উত্তম

স্থাবর           অস্থাবর,জঙ্গম             আশা      নিরাশা        উৎসাহ   নিরুৎসাহ

অতিবৃষ্টি          অনাবৃষ্টি                   অধমর্ণ   উত্তমর্ণ         অল্প      অধিক

অভিজ্ঞ            অনভিজ্ঞ                  অর্থ         অনর্থ         দোষী     নির্দোষ

আচার            অনাচার                    ধনী      নির্ধন, দরিদ্র  আকুঞ্চন    প্রসারণ

আত্মীয়             অনাত্মীয়                 প্রবল      দুর্বল            আগে     পিছে

আদর               অনাদর                   রোগ       নীরোগ          আপদ    নিরাপদ

আবশ্যক            অনাবশ্যক            সচেষ্ট     নিশ্চেষ্ট             আপন    পর

আবিল                অনাবিল                সদয়      নির্দয়            আদান   প্রদান

আস্থা                  অনাস্থা                সম্বল      নিঃসম্বল                আদি      অন্ত

ইচ্ছা                  অনিচ্ছা                  সরস      নীরস            আবির্ভাব    তিরোভাব

ইষ্ট                     অনিষ্ট                 সাকার   নিরাকার          আমদানি         রপ্তানি

উপস্থিত            অনুপস্থিত             আঁটি       শাঁস                   আয়        ব্যয়

অজ্ঞ                    বিজ্ঞ                  আসল   নকল                  উপকার অপকার

অনুরক্ত               বিরক্ত                  ইতর      ভদ্র                 মান        অপমান

অনুরাগ                  বিরাগ                ইদানীং  তদানীং             ইহলোক     পরলোক

ডোবা                   ভাসা                   লঘু         গুরু                  ইহা         উহা

তিরস্কার             পুরস্কার                    লাভ       ক্ষতি, লোকসান  মিলন     বিরহ

উচ্চ                     নিচ                    তেজী     নিস্তেজ

উত্থান                পতন                     দাতা      গ্রহীতা                        শত্রু        মিত্র

উদয়                  অস্ত                        দিন        রাত                         শীঘ্র        বিলম্ব

উন্নতি                অবনতি                      দীর্ঘ        হ্রস্ব                        সত্য       মিথ্যা

ঊর্ধ্ব                    অধ                        দুষ্ট          শিষ্ট                       সমষ্টি     ব্যাষ্টি

এলোমেলো         গোছানো                      দূর          নিকট                 সার্থক    ব্যর্থ

ওঠা                      নামা                        দেওয়া   নেওয়া                 সুন্দর     কুৎসিত

ওস্তাদ                সাগরেদ                      দেনা       পাওনা               সৃষ্টি        ধ্বংস

কৃত্রিম                স্বাভাবিক                   ধনী         নির্ধন, গরিব         স্থির        চঞ্চল

কোমল               কর্কশ                        নতুন      পুরাতন                স্মৃতি      বিস্মৃতি

ক্রয়                  বিক্রয়                          নরম       শক্ত                স্বকীয়    পরকীয়

ক্ষুদ্র                    বৃহৎ                          নিদ্রিত   জাগ্রত                স্বতন্ত্র      পরতন্ত্র

খাঁটি                 ভেজাল                      নিন্দা      প্রশংসা                 স্বর্গ         নরক

খাতক                মহাজন                        বন্ধন      মুক্তি                 স্বাধীন    পরাধীন

খুচরা                 পাইকারি                        বন্ধু         শত্রু                হরণ       পূরণ

খোলা                    বন্ধ                               বর          বৌ               হার         জিত

গরিষ্ঠ                    লঘিষ্ঠ                          বর্ধমান  ক্ষীয়মান                হাল্কা       বারি

গুরু                       লঘু                           বড়         ছোট                  কম         বেশি

গৃহী                     সন্ন্যাসী                          বাচাল    স্বল্পভাষী             হ্রাস         বৃদ্ধি

গ্রহণ                     বর্জন                               জীবন     মরণ                জোয়ার  ভাটা

ঘাটতি                  বাড়তি                        বেহেশত্      দোজখ            মুখ্য        গৌণ

ঘাত                    প্রতিঘাত                         বোকা     চালাক              টাটকা    বাসি

চোর                        সাধু                           ব্যর্থ        সার্থক            মৃদু         প্রবল

চোখা                     ভোঁতা                         ভয়         সাহস             ঠকা        জেতা

ছাত্র                     অছাত্র                         ভিতর    বাহির                  রাজা      প্রজা

জন্ম                      মৃত্যু                           ভীতু       সাহসী             ঠান্ডা       গরম

জয়                       পরাজয়                      ভীরু       নির্ভীক               রুগ্ণ       সুদ্ধ

জড়                      চেতন                         ভূত         ভবিষ্যৎ             জাগরিত     নিদ্রিত

ভোঁতা                  ধারাল                           উত্তর      দক্ষিণ             পূর্ব         পশ্চিম

বাক্যে বিপরীতার্থক শব্দের প্রয়োগ

 যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে।

 ব্যবসায়ে লাভ-ক্ষতি আছেই।

 জীবনে হাসি-কান্না পর্যায়ক্রমে আসে।

 সাগরে জোয়ার-ভাটা পানির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।

 হালকা আর ভারি যন্ত্রগুলো ধোয়ামোছা কর।

 ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?’

 এ জগৎ হরণ-পূরণের মেলা।

 খেলায় হার-জিত থাকবেই।

 পরাধীন হয়ে সুখভোগের চেয়ে স্বাধীন হয়ে দুঃখ ভোগ করাও ভালো।

 ছেলেটি বড়ই চঞ্চল, কিন্তু মেয়েটি কেমন ধীরস্থির।

 সবলের সদম্ভ অত্যাচার দুর্বল আর কতদিন সইবে?

 সাহস দিয়ে ভয়কে জয় কর।

বাচ্যের সংজ্ঞা প্রকরণ

১. রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’ লিখেছেন।

২. রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক ‘গীতাঞ্জলি’ লিখিত হয়েছে।

৩. আমার খাওয়া হলো না।

ওপরের প্রথম বাক্যে কর্তার, দ্বিতীয় বাক্যে কর্ম, তৃতীয় বাক্যে ক্রিয়ার প্রাধান্য রয়েছে। বাক্যের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশভঙ্গিকে বলা হয় ‘বাচ্য’।

বাচ্য প্রকরণ

বাচ্য প্রধানত তিন প্রকার। যেমন : কর্তৃবাচ্য, কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্য

কর্তৃবাচ্য

যে বাক্যে কর্তার অর্থপ্রাধান্য রক্ষিত হয় এবং ক্রিয়াপদ কর্তার অনুসারী হয় তাকে কর্তৃবাচ্যের বাক্য বলে। যেমন : ছাত্ররা অঙ্ক করছে।

১. কর্তৃবাচ্যে ক্রিয়াপদ সর্বদাই কর্তার অনুসারী হয়।

২. কর্তৃবাচ্যে কর্তায় প্রথমা বা শূন্য বিভক্তি এবং কর্মে দ্বিতীয়া, ষষ্ঠী বা শূন্য বিভক্তি হয়।

  যেমন : শিক্ষক ছাত্রদের পড়ান। রুগি পথ্য সেবন করে।

কর্মবাচ্য

যে বাক্যে কর্মের সাথে ক্রিয়ার সম্বন্ধ প্রধানভাবে প্রকাশিত হয় তাকে কর্মবাচ্য বলে। যেমন : শিকারি কর্তৃক ব্যাঘ্র নিহত হয়েছে।

১. কর্মবাচ্যে কর্মে প্রথমা, কর্তায় তৃতীয়া বিভক্তি ও দ্বারা দিয়া (দিয়ে), কর্তৃক অনুসর্গের ব্যবহার এবং ক্রিয়াপদ কর্মের অনুসারী হয়। যেমন : আলেকজাণ্ডার কর্তৃক পারস্য দেশ বিজিত হয়। চোরটা ধরা পড়েছে।

২. কখনো কখনো কর্মে দ্বিতীয়া বিভক্তি হতে পারে। যেমন : আসামিকে জরিমানা করা হয়েছে।

ভাববাচ্য

যে বাচ্যে কর্ম থাকে না এবং বাক্যে ক্রিয়ার অর্থই বিশেষভাবে ব্যক্ত হয় তাকে ভাববাচ্য বলে।

১. ভাববাচ্যের ক্রিয়া সর্বদাই নাম পুরুষের হয়। ভাববাচ্যের কর্তায় ষষ্ঠী, দ্বিতীয়া অথবা তৃতীয়া বিভক্তি প্রযুক্ত হয়। যেমন :

ক) আমার (কর্তায় ষষ্ঠী) খাওয়া হলো না।    (নাম পুরুষের ক্রিয়া)

খ) আমাকে (কর্তায় দ্বিতীয়া) এখন যেতে হবে।           (নাম পুরুষের ক্রিয়া)

গ) তোমার দ্বারা (কর্তায় তৃতীয়া) এ কাজ হবে না।     (নাম পুরুষের ক্রিয়া)

২. কখনো কখনো ভাববাচ্যে কর্তা উহ্য থাকে, কর্ম দ্বারাই ভাববাচ্য গঠিত হয়। যেমন :

 এ পথে চলা যায় না। এবার ট্রেনে ওঠা যাক। কোথা থেকে আসা হচ্ছে?

৩. মূল ক্রিয়ার সঙ্গে সহযোগী ক্রিয়ার সংযোগ ও বিভিন্ন অর্থে ভাববাচ্যের ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন :

    এ ব্যাপারে আমাকে দায়ী করা চলে না। এ রাস্তা আমার চেনা নেই।

কর্মকর্তৃবাচ্য

যে বাক্যে কর্মপদই কর্তৃস্থানীয় হয়ে বাক্য গঠন করে তাকে কর্মকর্তৃবাচ্যের বাক্য বলা হয়। যেমন : কাজটা ভালো দেখায় না। বাঁশি বাজে এ মধুর লগনে। সুতি কাপড় অনেক দিন টেকে।

বাচ্য পরিবর্তন

কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য

নিয়ম : কর্তৃবাচ্যের বাক্যকে কর্মবাচ্যে পরিবর্তিত করতে হলে-

১. কর্তায় তৃতীয়া

২. কর্মে প্রথমা বা শূন্য বিভক্তি

৩. ক্রিয়া কর্মের অনুসারী হয়।

জ্ঞাতব্য : কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া অকর্মক হলে সেই বাক্যের কর্মবাচ্য হয় না।

কর্তৃবাচ্য                                                  কর্মবাচ্য

ক) বিদ্বানকে সকলেই আদর করে।                ক) বিদ্বান সকলের দ্বারা আদৃত হন।

খ) খোদাতায়ালা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন।        খ) বিশ্বজগৎ খোদাতায়ালা কর্তৃক সৃষ্ট হয়েছে।

গ) মুবারক পুস্তক পাঠ করছে।                    গ) মুবারক কর্তৃক পুস্তক পঠিত হচ্ছে।

লক্ষণীয় : কর্তৃবাচ্যে ব্যবহৃত তৎসম মিশ্রক্রিয়াটি কর্মবাচ্যে যৌগিক ক্রিয়াজাত ক্রিয়াবিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হয়।

কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্য

নিয়ম : কর্তৃবাচ্যের বাক্যকে ভাববাচ্যে পরিবর্তিত করতে হলে-

১. কর্তায় ষষ্ঠী বা দ্বিতীয়া বিভক্তি হয়

২. ক্রিয়া নাম পুরুষের হয়। যেমন :

কর্তৃবাচ্য                            ভাববাচ্য

ক) আমি যাব না।                ক) আমার যাওয়া হবে না।

খ) তুমিই ঢাকা যাবে।           খ) তোমাকেই ঢাকা যেতে হবে।

গ) তোমরা কখন এলে?       গ) তোমাদের কখন আসা হলো?

কর্মবাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য

নিয়ম : কর্মবাচ্যের বাক্যকে কর্তৃবাচ্যে পরিবর্তিত করতে হলে-

১. কর্তায় প্রথমা, কর্মে দ্বিতীয়া বা শূন্য বিভক্তি প্রযুক্ত হয়

২. ক্রিয়া কর্তা অনুযায়ী হয়। যেমন :

কর্মবাচ্য                                               কর্তৃবাচ্য

ক) দস্যুদল কর্তৃক গৃহটি লুন্ঠিত হয়েছে।       ক) দস্যুদল গৃহটি লুন্ঠন করেছে।

খ) হালাকু খাঁ কর্তৃক বাগদাদ বিধ্বস্ত হয়।    খ) হালাকু খাঁ বাগদাদ ধ্বংস করেন।

ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য

নিময় : ভাববাচ্যের বাক্যকে কর্তৃবাচ্যে রূপান্তরিত করতে হলে-

১. কর্তায় প্রথমা বিভক্তি প্রযুক্ত হয়

২. ক্রিয়া কর্তার অনুসারী হয়। যেমন :

ভাববাচ্য                                   কর্তৃবাচ্য

ক) তোমাকে হাঁটতে হবে।             ক) তুমি হাঁটবে।

খ) এবার একটি গান করা হোক।    খ) এবার (তুমি) একটি গান কর।

গ) তার যেন আসা হয়।      গ) সে যেন আসে।

উক্তির সংজ্ঞা প্রকরণ

কোনো কথকের বাক কর্মের নামই উক্তি।

উক্তি দুই প্রকার। প্রত্যক্ষ উক্তি ও পরোক্ষ উক্তি।

যে বাক্যে বক্তার কথা অবিকল উদ্ধৃত হয় তাকে প্রত্যক্ষ উক্তি বলে। যেমন : তিনি বললেন, ‘বইটা আমার দরকার।’

যে বাক্যে বক্তার উক্তি অন্যের জবানিতে রূপান্তরিতভাবে প্রকাশিত হয় তাকে পরোক্ষ উক্তি বলে। যেমন : তিনি বললেন যে বইটা তাঁর দরকার।

উক্তি পরিবর্তনের নিয়ম

১. প্রত্যক্ষ উক্তিতে বক্তার বক্তব্যটুকু উদ্ধরণ চিহ্নের (‘‘ ‘‘) অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরোক্ষ উক্তিতে উদ্ধরণ চিহ্ন লোপ পায়। প্রথম উদ্ধরণ চিহ্ন স্থানে ‘যে’ এই সংযোজক অব্যয়টি ব্যবহার করতে হয়। বাক্যের সংগতি রক্ষার জন্য উক্তিতে ব্যবহৃত বক্তার পুরুষের পরিবর্তন করতে হয়। যেমন :

প্রত্যক্ষ উক্তি        : খোকা বলল, ‘আমার বাবা বাড়ি নেই।’

পরোক্ষ উক্তি       : খোকা বলল যে, তার বাবা বাড়ি ছিলেন না।

২. বাক্যের অর্থ-সঙ্গতি রক্ষার জন্য সর্বনামের পরিবর্তন করতে হয়। যেমন :

প্রত্যক্ষ উক্তি        : রশিদ বলল, ‘আমার ভাই আজই ঢাকা যাচ্ছেন।’

পরোক্ষ উক্তি       : রশিদ বলল যে, তার ভাই সেদিনই ঢাকা যাচ্ছিলেন।

৩. প্রত্যক্ষ উক্তির কালবাচক পদকে পরোক্ষ উক্তিতে অর্থ অনুসারী করতে হয়। যেমন :

প্রত্যক্ষ উক্তি        : শিক্ষক বললেন, ‘কাল তোমাদের ছুটি থাকবে।’

পরোক্ষ উক্তি       : শিক্ষক বললেন যে, পরদিন আমাদের ছুটি থাকবে।

৪. প্রত্যক্ষ উক্তির বাক্যের সর্বনাম এবং কালসূচক শব্দের পরোক্ষ উক্তিতে নিম্নলিখিত পরিবর্তন সংঘটিত হয়।

প্রত্যক্ষ   পরোক্ষ          প্রত্যক্ষ            পরোক্ষ       প্রত্যক্ষ      পরোক্ষ

এই         সেই        আগামীকাল         পরদিন        এখানে     সেখানে

ইহা         তাহা       গতকাল            আগেরদিন       এখন      তখন

এ            সে          গতকল্য           পূর্বদিন

আজ       সেদিন       ওখানে              ঐখানে

ক) প্রত্যক্ষ উক্তি : ছেলে লিখেছিল, ‘শহরে খুব গরম পড়েছে।’

    পরোক্ষ উক্তি   : ছেলে লিখেছিল যে, শহরে খুব গরম পড়েছিল। অথবা ছেলে লিখেছিল শহরে খুব গরম পড়েছে।

খ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : করিম বলেছিল, ‘আমি বাজারে যাচ্ছি।’

    পরোক্ষ উক্তি   : করিম বলেছিল যে, সে বাজারে যাচ্ছে।

গ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : মনসুর বলল, ‘আমি ঢাকা যাব।’

    পরোক্ষ উক্তি   : মনসুর বলল যে, সে ঢাকা যাবে।

৫. প্রত্যেক্ষ উক্তিতে কোনো চিরন্তন সত্যের উদ্ধৃতি থাকলে পরোক্ষ উক্তিতে কালের কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন :

ক) প্রত্যক্ষ উক্তি : শিক্ষক বললেন, ‘পৃথিবী গোলাকার।’

    পরোক্ষ উক্তি   : শিক্ষক বললেন যে, পৃথিবী গোলাকার।

খ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : বৈজ্ঞানিক বললেন, ‘চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে।’

    পরোক্ষ উক্তি   : বৈজ্ঞানিক বললেন যে, চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে।

৬. প্রশ্নবোধক, অনুজ্ঞাসূচক ও আবেগসূচক প্রত্যক্ষ উক্তিকে পরোক্ষ উক্তিতে পরিবর্তন করতে হলে প্রধান খণ্ডবাক্যের ক্রিয়াকে ভাব অনুসারে পরিবর্তন করতে হয়। যেমন :

প্রশ্নোত্তরবোধক বাক্য

ক) প্রত্যক্ষ উক্তি : শিক্ষক বললেন, ‘তোমরা কি ছুটি চাও?

    পরোক্ষ উক্তি   : আমরা ছুটি চাই কি না, শিক্ষক তা জিজ্ঞাসা করলেন।

খ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : বাবা বললেন, ‘কবে নাগাদ তোমাদের ফল বের হবে?’

    পরোক্ষ উক্তি   : আমাদের ফল কবে নাগাদ বের হবে, বাবা তা জানতে চাইলেন।

অনুজ্ঞাসূচক বাক্য

ক) প্রত্যক্ষ উক্তি : হামিদ বলল, ‘তোমরা আগামীকাল এসো।’

   পরোক্ষ উক্তি    : হামিদ তাদের পরদিন আসতে (বা যেতে) বলল।

খ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : তিনি বললেন, ‘দয়া করে ভেতরে আসুন।’

   পরোক্ষ উক্তি    : তিনি (আমাকে) ভেতরে যেতে অনুরোধ করলেন।

আবেগসূচক বাক্য

ক) প্রত্যক্ষ উক্তি : লোকটি বলল, ‘বাঃ! পাখিটি তো চমৎকার।’

   পরোক্ষ উক্তি    : লোকটি আনন্দের সাথে বলল যে, পাখিটি চমৎকার।

খ) প্রত্যক্ষ উক্তি  : ভিখারিনী দুঃখের সাথে বলল, ‘শীতে আমরা কতই না কষ্ট পাচ্ছি।’

   পরোক্ষ উক্তি    : ভিখারিনী দুঃখের সাথে বলল যে তারা শীতে বড়ই কষ্ট পাচ্ছে।

যতি (ছেদচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন)

বাক্যের অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝার জন্য বাক্যের মধ্যে বা বাক্যের সমাপ্তিতে কিংবা বাক্যে আবেগ (হর্ষ, বিষাদ), জিজ্ঞাসা ইত্যাদি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বাক্যগঠনে যেভাবে বিরতি দিতে হয় এবং লেখার সময় বাক্যের মধ্যে তা দেখানোর জন্য যেসব সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তাই যতি বা ছেদচিহ্ন।

নিচে বিভিন্ন প্রকার যতিচি‎হ্ন নাম, আকৃতি এবং তাদের বিরতি কালের পরিমাণ নির্দেশিত হলো :

যতিচি‎হ্নর নাম    আকৃতি  বিরতি-কাল=পরিমাণ

কমা                   ,               ১(এক) বলতে যে সময় প্রয়োজন।               

সেমিকোলন         ;               ১ বলার দ্বিগুণ সময়।

দাঁড়ি (পূর্ণচ্ছেদ)    ।              এক সেকেন্ড।

জিজ্ঞাসা চিহ্ন       ?              ঐ

বিস্ময় চিহ্ন          !              ঐ

কোলন                :               ঐ

কোলনড্যাস         :-             ঐ

ড্যাস                  -              ঐ

হাইফেন               -              থামার প্রয়োজন নেই।

ইলেক বা লোপচিহ্ন           ’               থামার প্রয়োজন নেই।

উদ্ধরণ চিহ্ন        ‘‘ ‘‘        ‘এক’ উচ্চারণে যে সময় লাগে।

ব্র্যাকেট (বন্ধনী- চিহ্ন)       ( )            থামার প্রয়োজন নাই।

                                { }            থামার প্রয়োজন নাই।

                                [ ]            থামার প্রয়োজন নাই।

কমা [পাদচ্ছেদ (,)]

ক) বাক্য পাঠকালে সুস্পষ্টতা বা অর্থবিভাগ দেখানোর জন্য যেখানে স্বল্প বিরতির প্রয়োজন সেখানে কমা ব্যবহৃত হয়।

  যেমন : সুখ চাও, সুখ পাবে পরিশ্রমে।

খ) পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত একাধিক বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ একসঙ্গে বসলে শেষ পদটি ছাড়া বাকি সবগুলোর পরই কমা বসবে।

  যেমন : সুখ, দুঃখ, আশা, নৈরাশ্য একই মালিকার পুষ্প।

গ) সম্বোধনের পরে কমা বসাতে হয়। যেমন : রশিদ, এদিকে এসো।

ঘ) জটিল বাক্যের অন্তর্গত প্রত্যেক খণ্ডবাক্যের পরে কমা বসবে। যেমন : কাল যে লোকটি এসেছিল, সে আমার পূর্বপরিচিত।

ঙ) উদ্ধরণ চিহ্নের পূর্বে (খণ্ডবাক্যের শেষে) কমা বসাতে হবে। যেমন : সাহেব বললেন, ‘ছুটি পাবেন না।’

চ) মাসের তারিখ লিখতে বার ও মাসের পর ‘কমা’ বসবে। যেমন : ১৬ই পৌষ, বুধবার, ১৩৯৯ সন।

ছ) বাড়ি বা রাস্তার নম্বরের পরে কমা বসবে। যেমন : ৬৮, নবাবপুর রোড, ঢাকা-১০০০।

জ) নামের পরে ডিগ্রিসূচক পরিচয় সংযোজিত হলে সেগুলোর প্রত্যেকটির পরে কমা বসবে।

    যেমন : ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, এম.এ.পি-এইচ.ডি।

সেমিকোলন (;)

কমা অপেক্ষা বেশি বিরতির প্রয়োজন হলে, সেমিকোলন বসে। যেমন : সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ আমরা, এ মায়ার বাঁধন কি সত্যিই দুচ্ছেদ্য?

দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ। ()

বাক্যের পরিসমাপ্তি বোঝাতে দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ ব্যবহার করতে হয়। যেমন : শীতকালে এ দেশে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে।

প্রশ্নোত্তরবোধক চিহ্ন (?)

বাক্যে কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করা হলে বাক্যের শেষে প্রশ্নোত্তরবোধক চি‎হ্ন বসে। যেমন : তুমি এখন এলে? সে কি যাবে?

আবেগ বা বিস্ময় সম্বোধন চিহ্ন (!)

হৃদয়াবেগ প্রকাশ করতে হলে এ সম্বোধন পদের পরে (!) চি‎‎হ্নটি বসে। যেমন :

আহা! কী চমৎকার দৃশ্য।

জননী! আজ্ঞা দেহ মোরে যাই রণস্থলে। কিন্তু আধুনিক নিয়মে সম্বোধন স্থলে কমা চিহ্নের ব্যবহার করা হয়।

কোলন (:)

একটি অপূর্ণ বাক্যের পরে অন্য একটি বাক্যের অবতারণা করতে হলে কোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন : সভায় সাব্যস্ত হলো : একমাস পরে নতুন সভাপতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কোলনড্যাস (:-)

কোলনড্যাসে ‘এক সেকেন্ড’ থামতে হয়। উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতে গেলে কোলনচিহ্ন ব্যবহার করতে হয়।

ড্যাস (-)

যৌগিক ও মিশ্র বাক্যে পৃথক ভাবাপন্ন দুই বা তার বেশি বাক্যের সমন্বয় বা সংযোগ বোঝাতে ড্যাস ব্যবহৃত হয়। যেমন:

তোমরা দরিদ্রের উপকার কর- এতে তোমাদের সম্মান যাবে না-বাড়বে।

উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতে হলে কোলন ও ড্যাস চি‎হ্ন একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। যেমন : পদ পাঁচ প্রকার :- বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া।

হাইফেন বা সংযোগ চিহ্ন (-)

সমাসবদ্ধ পদের অংশগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর জন্য হাইফেনের ব্যবহার হয়। যেমন : এ আমাদের শ্রদ্ধা-অভিনন্দন, আমাদের প্রীতি-উপহার।

ইলেক (’) বা লোপ চিহ্ন

কোনো বর্ণ বিশেষের লোপ বোঝাতে বিলুপ্ত বর্ণের জন্য (’) লোপচি‎হ্ন নেওয়া হয়। যেমন :

মাথার ‘পরে জ্বলছে রবি (‘পরে = ওপরে)

পাগড়ি বাঁধা যাচ্ছে কা’রা? (কা’রা = কাহারা)

উদ্ধরণ চিহ্ন (`` ``)

বক্তার প্রত্যক্ষ উক্তিকে এই চি‎হ্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। যেমন : শিক্ষক বললেন, ‘গতকাল তুরস্কে ভয়ানক ভূমিকম্প হয়েছে।’

ব্র্যাকেট বা বন্ধনী চিহ্ন ( ), { }, [ ]

এই তিনটি চি‎হ্নই গণিতশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রথম বন্ধনীটি বিশেষ ব্যাখ্যামূলক অর্থে সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন : ত্রিপুরায় (বর্তমানে কুমিল্লা) তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

ব্যাকরণিক চিহ্ন

বিশেষভাবে ব্যাকরণে নিম্নলিখিত চি‎হ্নগুলো ব্যবহৃত হয়।

ক) ধাতু বোঝাতে ( ) চি‎হ্ন                                         : স্থা = স্থা ধাতু

খ) পরবর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন বোঝাতে (<) চি‎হ্ন              : জাঁদরেল < জেনারেল

গ) পূর্ববর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন বোঝাতে (>) চি‎হ্ন              : গঙ্গা > গাঙ

ঘ) সমানবাচক বা সমন্তবাচক বোঝাতে সমান ( = ) চি‎হ্ন   : নর ও নারী = নরনারী

বাক্যের শ্রেণিবিভাগ : স্বরভঙ্গি বাগভঙ্গি

১. অ-নে-ক অ-নে-ক দিন আগে বাংলাদেশে বিজয় সিংহ নামের খুব সাহসী এক রাজপুত্র ছিলেন।

২. প্রকৃতি কী সুন্দর সাজেই না সেজেছে।

৩. তাজ্জব ব্যাপার।

৪. দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?

৫. ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।’

৬. ‘দীর্ঘজীবী হও।’

৭. ‘সবারে বাস রে ভালো।’

৮. উঠে বস।

ওপরের প্রথম বাক্যটি বিবৃতিমূলক, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাক্য দুটি বিস্ময়সূচক, চতুর্থ বাক্যটি প্রশ্নোত্তরসূচক, পঞ্চম বাক্যটি প্রার্থনামূলক, ষষ্ঠ বাক্যটি আশীর্বাদবোধক; সপ্তম বাক্যটি অনুরোধমূলক, অষ্টম বাক্যটি আদেশসূচক।

হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আবেগ-উচ্ছ্বাস, অনুরোধ-প্রার্থনা, আদেশ-মিনতি, শাসন-তিরস্কার কণ্ঠস্বরের নানা ভঙ্গিতে উচ্চারণের মধ্যে প্রকাশিত হয়।

বিশেষ জোর দিয়ে কথা বলা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, কাঁপন, টেনে টেনে শব্দ উচ্চারণ ইত্যাদির দ্বারা বাক্যের বিশেষ বিশেষ অর্থ ও ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। বিভিন্ন ভঙ্গিতে কণ্ঠধ্বনি উচ্চারণের ফলে যে ধ্বনিতরঙ্গ সৃষ্টি হয় তা নানা প্রকার ভাব ও অর্থ সৃষ্টি করে। এই ধ্বনিতরঙ্গ বা স্বরতরঙ্গকে স্বরভঙ্গি বলে। এই স্বরভঙ্গিই বাগভঙ্গির ভিত্তি।

স্বরভঙ্গির দ্বারা যে শব্দ ও বাক্য সৃষ্ট ও উচ্চারিত হয় তাকে লিখিত আকারে এবং উচ্চারিত অবস্থায় বাগভঙ্গি বলা যেতে পারে।

বাক্যের অর্থগত প্রকরণ

বাক্য নিম্নলিখিত কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত হতে পারে।

১. বিবৃতিসূচক বাক্য / Assertive sentence

এ ধরনের বাক্যে সাধারণ হ্যাঁ বা না বোঝায়। বিবৃতিমূলক বাক্য দুই প্রকার। যেমন :

হ্যাঁ বাচক বাক্য / Affirmative sentence: সে ঢাকা যাবে। আমি বলতে চাই।

না বাচক বাক্য / Negative sentence: সে ঢাকা যাবে না। আমি বলতে চাই না।

২. প্রশ্নোত্তরসূচক বাক্য / Interrogative sentence

এ ধরনের বাক্যে প্রশ্নোত্তর জিজ্ঞাসা করা হয়। যেমন : কোথায় যাচ্ছ? কী পড়ছ? কেন এসেছ? যাবে নাকি?

৩. আবেগসূচক বাক্য /বিস্ময়সূচক বাক্য / Exclamative sentence

যে বাক্যে অবেগজাতীয় কথা যেমন : আনন্দ, দুঃখ, বিরক্তি, লজ্জা, ঘৃণা বোঝায়। যেমন : হুররে! আমরা খেলায় জিতেছি। ছিছি! তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। আহ! তার কী কষ্ট। বাহ! কত সুন্দর দৃশ্য।

৪. ইচ্ছাসূচক বাক্য / Optative sentence

এ ধরনের বাক্যে শুভজনক প্রার্থনা, আশিস, আকাঙ্ক্ষা করা হয়। যেমন : তোমার মঙ্গল হোক। ঈশ্বর তোমাকে জয়ী করুন। পরীক্ষায় সফল হও। দীর্ঘজীবী হও।

৫. আদেশসূচক বাক্য / Imperative sentence

এ ধরনের বাক্যে আদেশ করা হয়। যেমন : শিক্ষক মহোদয় শ্রেণিকক্ষে এলে উঠে দাঁড়াবে। চুপটি করে বস। উঠে দাঁড়াও। দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ কর।

সকলপ্রকার বাক্যের নমুনা

স্বরভঙ্গি তথা বাগ্ভঙ্গির সাহায্যে ক্রোধ, আদর, আনন্দ, দুঃখ, বিরক্তি, লজ্জা, ঘৃণা প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। যথা :

১. সাধারণ বিবৃতিতে            :               সে আজ যাবে।

২. জিজ্ঞাসায়                     :               সে আজ যাবে?

৩. বিস্ময় প্রকাশে               :               সে আজ যাবে।

৪. ক্রোধ প্রকাশে                :               আমি তোমাকে দেখে নেব।

৫. আদর বোঝাতে             :               বড্ড শুকিয়ে গেছিস রে।

৬. আনন্দ প্রকাশে              :               বেশ বেশ, খুব ভালো হয়েছে।

৭. দুঃখ প্রকাশে                 :               আহা! গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙেছে।

৮. বিরক্তি প্রকাশে              :               আঃ! ভালো লাগছে না, এখন এখান থেকে যাও তো।

৯. ভীতি প্রদর্শনে                :               যাবি কি না বল?

১০. লজ্জা প্রকাশে              :               ছিঃ ছিঃ! তার সঙ্গে পারলে না।

১১. ধিক্কার দিতে                :               ছিঃ! তোমার এই কাজ।

১২. ঘৃণা প্রকাশে                :               তুমি এত নীচ।

১৩. অনুরোধ প্রকাশে          :               কাজটি করে দাও না ভাই।

১৪. প্রার্থনা                      :               ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।

ছেদ ও বিরতিসূচক চি‎‎হ্নগুলো বাগ্ভঙ্গির লিখিত আকার প্রকাশে সাহায্য করে। দাঁড়ি, কমা, প্রশ্নোত্তরবোধক ও বিস্ময়সূচক চি‎‎হ্ন বাক্যের ভাব ও অর্থবোধের জন্য উপকারক।

বাক্যের পদ সংস্থাপনার ক্রম / Syntax নিয়মাবলি

বাক্যের অন্তর্ভুক্ত পদগুলো উপযুক্ত স্থানে বসানোই পদ সংস্থাপনার ক্রম। একে কেউ কেউ পদক্রম বলে থাকেন।

নিয়মাবলি

১. সাদারণ বাক্যের প্রথমে সম্প্রসারকসহ উদ্দেশ্য (বা কর্তা) এবং বাক্যের শেষে সম্প্রসারকসহ বিধেয় (বা ক্রিয়াপদ) বসবে। যেমন :

                মনোযোগী           ছাত্ররাই রীতিমত                পড়াশোনা করে।

                (সম্প্রসারক)         (কর্তৃপদ)              (সম্প্রসারক)         (ক্রিয়াপদ)

কিন্তু বাক্যকে শক্তিশালী করার জন্য এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। যেমন : লোকটি ছিল অত্যন্ত চতুর।

২. সম্বন্ধ পদ বিশেষ্যের পূর্বে বসবে। যেমন : ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে।

অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য বা ছন্দের অনুরোধে সম্বন্ধ পদ পরেও বসতে পারে। যেমন : হে আদি জননী সিন্ধু, বসুন্ধরা সন্তান তোমার।

৩. কারক-বিভক্তিযুক্ত পদ বা অসমাপিকা ক্রিয়াপদ বিশেষণের আগে বসে। যেমন : লোকটি ব্যবহারে খুবই ভদ্র। রাজশাহীর আম খেতে চমৎকার।

৪. বিধেয় বিশেষণ সর্বদাই বিশেষ্যের পরে বসে। যেমন : লোকটি যে জ্ঞানী তাতে সন্দেহ নেই।

৫. বাক্যের প্রথমে কর্তা, পরে কর্ম এবং শেষে ক্রিয়াপদ বসে। যেমন : আমি ‘শাহনামা’ পরেছি।

ক) কবিতায় এর ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন : লহ নমস্কার, সুন্দর আমার।

খ) বাক্যে জোর দিতে গেলেও নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে। যেমন : জানি, তোমার মুরোদ কতটুকু।

৬. বহুপদময় বিশেষণ অবশ্যই বিশেষ্যের পূর্বে বসে। যেমন : তোমার দাঁত বেরকরা হাসি দেখলে সবারই পিত্ত জ্বলে যায়।

না-এর ব্যবহার

বাক্যে ‘না’ বা ‘নে’ অব্যয়ের ব্যবহার

ক) সমাপিকা ক্রিয়ার পরে বসে। যেমন : আমি যাব না। আমি ভাত খাই নে, রুটি খাই।

খ) অসমাপিকা ক্রিয়ার পূর্বে বসে। যেমন : না চাইতে দানের কোনো মর্যাদা নেই।

গ) বিশেষণীয় বিশেষণ রূপে বিশেষণের পূর্বে বসে। যেমন : না ভালো, না মন্দ।

ঘ) ‘যদি’ দিয়ে বাক্য আরম্ভ করলে ‘না’ সমাপিকা ক্রিয়ার পূর্বে বসে। যেমন: তুমি যদি আজ না যাও, তা হলে খুবই ক্ষতি হবে।

‘না’ (নঞ ব্যতীত) অন্য অর্থে

ক) বিকল্পার্থে : জিজ্ঞাসাবাচক বাক্যে-তুমি বাড়ি যাবে, না আমি যাব?

খ) অনুরোধ বা আদেশ অর্থে (নিরর্থকভাবে বাক্যের শেষে) : একটা গান গাও না ভাই।

 

মন্তব্য করুন