Loading..

০৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

সব ভাষায় লিঙ্গভেদে শব্দভেদ আছে, বাংলা ভাষায়ও আছে। বাংলা ভাষায় বহু বিশেষ্য পদ রয়েছে যাদের কোনোটিতে পুরুষ ও কোনোটিতে স্ত্রী বোঝায়। যে শব্দে পুরুষ বোঝায় তাকে পুরুষবাচক শব্দ আর যে শব্দে স্ত্রী বোঝায় তাকে স্ত্রীবাচক শব্দ বলে। যেমন : বাপ-মা, ভাইবোন, ছেলেমেয়ে কেউই মৃত্যুর সময় তার কাছে ছিল না। এ বাক্যে বাপ, ভাই ও ছেলে পুরুষবাচক শব্দ আর মা, বোন ও মেয়ে স্ত্রীবাচক শব্দ।

বাংলায় পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। যেমন :

১. পতি/স্বামী ও পত্নীবাচক অর্থে

আব্বা-আম্মা         চাচা-চাচি             কাকা-কাকি          জ্যাঠা-জেঠি           দাদা-দাদি              নানা-নানি

নন্দাই-ননদ           দেওর-জা              ভাই-ভাবি/বৌদি  বাবা-মা                 মামা-মামী

২. পুরুষ ও মেয়ে বা সাধারণ পুরুষ বা স্ত্রীজাতীয় অর্থে

খোকা-খুকি        পাগল-পাগলি        বামন-বামনি        ভেড়া-ভেড়ি          মোরগ-মুরগি       

বালক-বালিকা    দেওর/দেবর-ননদ

নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ

কতগুলো শব্দ নিত্য স্ত্রীবাচক। এগুলোর পুরুষবাচক শব্দ নেই। যেমন : সতীন, সৎমা, এয়ো, দাই, সধবা ইত্যাদি।

 কতগুলো শব্দের আগে নর, মন্দা ইত্যাদি পুরুষবাচক শব্দ এবং স্ত্রী, মাদী, মাদা ইত্যাদি স্ত্রীবাচক শব্দ যোগ করে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক শব্দ গঠন করা হয়। যেমন :

নর/ মদ্দা/ হুলো বিড়াল-মেনি বিড়াল           মদ্দা হাঁস-মাদী হাঁস           মদ্দা ঘোড়া-মাদী ঘোড়া     

পুরুষ লোক-মেয়েলোক/স্ত্রীলোক            বেটাছেলে-মেয়েছেলে          পুরুষ কয়েদি-স্ত্রী/মেয়ে কয়েদি 

এঁড়ে বাছুর-বকনা বাছুর                     বলদ গরু- গাই গরু

 কতগুলো পুরুষবাচক শব্দের আগে স্ত্রীবাচক শব্দ প্রয়োগ করে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। যেমন :

কবি-মহিলা কবি                 ডাক্তার-মহিলা ডাক্তার          সভ্য-মহিলা সভ্য           কর্মী-মহিলা কর্মী

শিল্পী-মহিলা বা নারী শিল্পী       সৈন্য-নারী/ মহিলা সৈন্য      পুলিশ-মহিলা পুলিশ

 কতগুলো শব্দের শেষে পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ যোগ করে পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ গঠন করা হয়। যেমন :

বোন-পো-বোন-ঝি     ঠাকুর-পো-ঠাকুর-ঝি    ঠাকুর দাদা/টাকুরদা-ঠাকুরমা     গয়লা-গয়লা-বউ     জেলে-জেলে বউ

 অনেক সময় আলাদা আলাদা শব্দে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক বোঝায়। যেমন :

বাবা-মা         ভাই-বোন                 কর্তা-গিন্নি           ছেলে-মেয়ে        সাহেব-বিবি        জামাই-মেয়ে

বর-কনে        দুলহা-দুলাইন/দুলহিন     বেয়াই-বেয়াইন     তাওই-মাওই       বাদশা-বেগম       শুক-সারী

বাংলা স্ত্রী প্রত্যয়যোগে শব্দগঠন

বিভিন্নভাবে পুরুষ থেকে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠন করা যেতে পারে। যেমন:

বাংলা স্ত্রী প্রত্যয়যোগে শব্দ গঠন

পুরুষবাচক শব্দের সঙ্গে কতগুলো প্রত্যয় (ঈ, নি, নী, আনী, ইনী, ন) যোগ করে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠন করা হয়। যেমন :

* ঈ-প্রত্যয়

বেঙ্গমা-বেঙ্গমী     ভাগনা/ভাগনে-ভাগনী

* নী-প্রত্যয়

কামার-কামারনী জেলে-জেলেনী   কুমার-কুমারনী   ধোপা-ধোপানী    মজুর-মজুরনী

আবার পুরুষবাচক শব্দের শেষে ঈ থাকলে স্ত্রীবাচক শব্দে নী হয় এবং এর আগের ঈ ই হয়। যেমন :

ভিখারি-ভিখারিনী              অভিসারী-অভিসারিণী

* আনী-প্রত্যয়

ঠাকুর-ঠাকুরানী           নাপিত-নাপিতানী            মেথর-মেথরানী     চাকর-চাকরানী

* ইনী- প্রত্যয়

কাঙাল-কাঙালিনী        গোয়ালা-গোয়ালিনী           বাঘ-বাঘিনী

* উন-প্রত্যয়

ঠাকুর-ঠাকরুন/ঠাকুরানী

* আইন-প্রত্যয় : নতুন নতুন প্রত্যয়ের প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন

ঠাকুর-ঠাকুরাইন

সংস্কৃত স্ত্রী প্রত্যয়যোগে শব্দগঠন

তৎসম পুরুষবাচক শব্দের পরে আ, ঈ, আনী, নী, ইকা প্রভৃতি প্রত্যয়যোগে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। যেমন :

* আ-যোগে

ক. সাধারণ অর্থে

মৃত-মৃতা      বিবাহিত-বিবাহিতা              মাননীয়-মাননীয়া             বৃদ্ধ-বৃদ্ধা          প্রিয়-প্রিয়া                প্রথম-প্রথমা  চতুর-চতুরা                       চপল-চপলা                    নবীন-নবীনা      কনিষ্ঠ-কনিষ্ঠা     মলিন-মলিনা

খ. জাতি বা শ্রেণিবাচক

অজ-অজা             কোকিল-কোকিলা              শিষ্য-শিষ্যা          ক্ষত্রিয়-ক্ষত্রিয়া     শূদ্র-শূদ্রা

* ঈ-প্রত্যয় যোগে

ক. সাধারণ অর্থে

নিশাচর-নিশাচরী           ভয়ংকর-ভয়ংকরী              রজক-রজকী        কিশোরী-কিশোরী

সুন্দর-সুন্দরী                চতুর্দশ-চতুর্দশী                ষোড়শ-ষোড়শী

খ. জাতি বা শ্রেণিবাচক

সিংহ-সিংহী          ব্রাহ্মণ-ব্রা‏‏হ্মণী      মানব-মানবী        বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী     কুমার-কুমারী      ময়ূর-ময়ূরী

* ইকা-প্রত্যয় যোগে

ক) যেসব শব্দের শেষে ‘অক্’ রয়েছে সেসব শব্দে ‘অক্’ স্থলে ‘ইকা’ হয়-

বালক-বালিকা             নায়ক-নায়িকা      গায়ক-গায়িকা     সেবক-সেবিকা    অধ্যাপক-অধ্যাপিকা

গণক-গণকী                নর্তক-নর্তকী        চাতক-চাতকী      রজক-রজকী আর বাংলায় রজকিনী

খ) ক্ষুদ্রার্থে ইকা যোগ হয়-

 নাটক-নাটিকা     মালা-মালিকা      গীত-গীতিকা       পুস্তক-পুস্তিকা (এগুলো স্ত্রী প্রত্যয় নয়, ক্ষুদ্রার্থক প্রত্যয়)

* আনী-যোগ করে

ইন্দ্র-ইন্দ্রানী          মাতুল-মাতুলানী আচার্য-আচার্যানী (কিন্তু আচার্যের কর্মে নিয়োজিত অর্থে আচার্য)

এরূপ : শূদ্র-শূদ্রা (শূদ্র জাতীয় স্ত্রীলোক শূদ্রানী (শূদ্রের স্ত্রী)), ক্ষত্রিয়-ক্ষত্রিয়া/ক্ষত্রিয়ানী ইত্যাদি

 আনী কোনো কোনো সময় অর্থের পার্থক্য ঘটে। যেমন : অরণ্য-অরণ্যানী (বৃহৎ অরণ্য), হিম-হিমানী (জমানো বরফ)

* ঈনী, নী, যোগে

 মায়াবী-মায়াবিনী       কুহক-কুহকিনী     যোগী-যোগিনী     মেধাবী-মেধাবিনী        দুঃখী- দুঃখিনী

বিশেষ নিয়মে সাধিত স্ত্রীবাচক শব্দগঠন

 যেসব পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘তা’ রয়েছে, স্ত্রীবাচক বোঝাতে সেসব শব্দে ‘স্ত্রী’ হয়। যেমন :

নেতা-নেত্রী      কর্তা-কর্ত্রী         শ্রোতা-শ্রোত্রী          ধাতা-ধাত্রী

 পুরুষবাচক শব্দের শেষে অত্, বান্, মান্, ঈয়ান থাকলে যথাক্রমে অতী, বতী, মতি, ঈয়সী হয়। যেমন :

সৎ-সতী             মহৎ-মহতী       গুণবান-গুণবতী        রূপবান-রূপবতী      শ্রীমান-শ্রীমতী

বুদ্ধিমান-বুদ্ধিমতী   গরীয়ান-গরিয়সী

 কোনো কোনো পুরুষবাচক শব্দ থেকে বিশেষ নিয়মে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। যেমন :

সম্রাট-সম্রাজ্ঞী        রাজা-রানি          যুবক-যুবতী         শ্বশুর-শাশুড়ি        নর-নারী      বন্ধু-বান্ধবী    দেবর-জা

শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী    স্বামী-স্ত্রী          পতি-পত্নী           সভাপতি-সভানেত্রী

নিত্য স্ত্রীবাচক তৎসম শব্দগঠন

সতীন, অর্ধাঙ্গিনী, কুলটা, বিধবা, অসূর্যষ্পশ্যা, অরক্ষণীয়া, সপত্নী ইত্যাদি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য /জ্ঞাতব্য

বাংলায় কতগুলো তৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের পরে আবার স্ত্রীবাচক প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন : অভাগা-অভাগী/ অভাগিনী, ননদাই-ননদিনী/ননদী ইত্যাদি।

তৎসম পুরুষবাচক বিশেষ্য শব্দের সঙ্গে পুরুষবাচক বিশেষণ ব্যবহৃত এবং স্ত্রীবাচক বিশেষ্য শব্দের সঙ্গে স্ত্রীবাচক বিশেষণ ব্যবহৃত হয়। যেমন : বিদ্বান লোক এবং বিদুষী নারী। এখানে ‘লোক’ পুরুষবাচক বিশেষ্য এবং ‘নারী’ স্ত্রীবাচক বিশেষ্য। ‘বিদ্বান’ পুরুষবাচক বিশেষণ এবং ‘বিদুষী’ স্ত্রীবাচক বিশেষণ। কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণের এ নিয়ম মানা হয় না। যেমন : সংস্কৃতে ‘সুন্দর বালক ও সুন্দরী বালিকা’ বাংলায় ‘সুন্দর বালক ও সুন্দর বালিকা’।

* কতগুলো বাংলা শব্দে পুরুষ ও স্ত্রী দুই বোঝায়। যেমন : জন, পাখি, শিশু, সন্তান, শিক্ষিত, গুরু ইত্যাদি।

* কতগুলো শব্দে কেবল পুরুষ বোঝায়। যেমন : কবিরাজ, ঢাকী, কৃতদার, অকৃতদার ইত্যাদি।

* কতগুলো শব্দ শুধু স্ত্রীবাচক হয়। যেমন : সতীন, সৎমা, সধবা ইত্যাদি।

* কিছু পুরুষবাচক শব্দের দুটি করে স্ত্রীবাচক শব্দ রয়েছে। যেমন :

দেবর-ননদ (দেবরের বোন) /জা (দেবরের স্ত্রী)           ভাই-বোন এবং ভাবি (ভাইয়ের স্ত্রী)

শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী (শিক্ষিকা) (পেশা অর্থে)                  শিক্ষকপত্নী (শিক্ষকের স্ত্রী)

বন্ধু-বান্ধবী (মেয়ে বন্ধু) ও বন্ধুপত্নী (বন্ধুর স্ত্রী)         দাদা-দিদি (বড় বোন) ও বৌদি (দাদার স্ত্রী)

* বাংলা স্ত্রীবাচক শব্দের বিশেষণ স্ত্রীবাচক হয় না। যেমন :

  সুন্দর বলদ-সুন্দর গাই, সুন্দর ছেলে-সুন্দর মেয়ে, মেজ খুড়ো-মেজ খুড়ি

* বিধেয় বিশেষণ অর্থাৎ বিশেষ্যের পরবর্তী বিশেষণও স্ত্রীবাচক হয় না। যেমন :

   মেয়েটি পাগল হয়ে গেছে (পাগলি হয়ে গেছে হবে না)। আসমা ভয়ে অস্থির (অস্থিরা হবে না)

* কুল-উপাধিরও স্ত্রীবাচকতা রয়েছে। যেমন : ঘোষ (পুরুষ) - ঘোষজা (কন্যা অর্থে) /ঘোষজায়া (পত্নী অর্থে)

দ্বিরুক্ত শব্দের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

দ্বিরুক্ত অর্থ দুবার উক্ত হয়েছে এমন। বাংলা ভাষায় কোনো কোনো শব্দ, পদ বা অনুকার শব্দ একবার ব্যবহার করলে যে অর্থ প্রকাশ করে, সেগুলো দুইবার ব্যবহার করলে অন্য কোনো সম্প্রসারিত অর্থ প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দের পরপর দুইবার প্রয়োগেই দ্বিরুক্ত শব্দ গঠিত হয়। যেমন : আমার জ্বর জ্বর লাগছে। অর্থাৎ ঠিক জ্বর নয়, জ্বরের ভাব অর্থে এই প্রয়োগ।

দ্বিরুক্ত শব্দ নানা রকম হতে পারে। যেমন :

ক. শব্দের দ্বিরুক্তি     : শব্দে যে দ্বিরুক্ত ব্যবহার করা হয় তাকে শব্দের দিরুক্তি বলে।

খ. পদের দ্বিরুক্তি      : পদে যে দ্বিরুক্ত ব্যবহার করা হয় তাকে শব্দের দিরুক্তি বলে।

গ. ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি : কোনো কিছুর স্বাভাবিক বা কাল্পনিক অনুকৃতিবিশিষ্ট শব্দের রূপকে ধ্বন্যাত্মক শব্দ বলে।

শব্দের দ্বিরুক্তি

শব্দের দ্বিরুক্তির কিছু নিয়ম :

১. একই শব্দ দুইবার ব্যবহার করা হয় এবং শব্দ দুটি অবিকৃত থাকে। যেমন : ভালো ভালো ফল, ফোঁটা ফোঁটা পানি, বড় বড় বই

২. একই শব্দের সঙ্গে সমার্থক আর একটি শব্দ যোগ করে ব্যবহৃত হয়। যেমন : ধনদৌলত, খেলাধুলা, লালন-পালন, বলা-কওয়া, খোঁজখবর

৩. দ্বিরুক্ত শব্দ-জোড়ার দ্বিতীয় শব্দটির আংশিক পরিবর্তন হয়। যেমন : মিটমাট, ফিটফাট, বকাঝকা, তোড়জোড়, গল্পসল্প, রকম-সকম

৪. সমার্থক বা বিপরীতার্থক শব্দ যোগে: যেমন: লেনদেন, দেনাপাওনা, টাকাপয়সা, ধনীগরিব, আসাযাওয়া

যুগ্মরীতিতে দ্বিরুক্ত শব্দের গঠন

একই শব্দ ঈষৎ পরিবর্তন করে দ্বিরুক্ত শব্দ গঠনের রীতিকে বলে যুগ্মরীতি। যুগ্মরীতিতে দ্বিরুক্ত গঠনের কয়েকটি নিয়ম রয়েছে। যেমন :

১. শব্দের আদি স্বরের পরিবর্তন করে                      : চুপচাপ, মিটমাট, জারিজুরি

২. শব্দের অন্ত্যস্বরের পরিবর্তন করে                        : মারামারি, হাতাহাতি, সরাসরি, জেদাজেদি

৩. দ্বিতীয়বার ব্যবহারের সময় ব্যঞ্জনধ্বনির পরিবর্তনে   : ছটফট, নিশপিশ, ভাতটাত

৪. সমার্থক বা একার্থক সহচর শব্দ যোগে                   : চালচলন, রীতিনীতি, বনজঙ্গল, ভয়ডর

৫. ভিন্নার্থক শব্দ যোগে                                          : ডালভাত, তালাচাবি, পথঘাট, অলিগলি

৬. বিপরীতার্থক শব্দ যোগে                                     : ছোটবড়, আসা-যাওয়া, জন্মমৃত্যু, আদানপ্রদান

বিশিষ্টার্থক বাগধারায় দ্বিরুক্ত শব্দের প্রয়োগ

সতর্কতা : ছেলেটিকে চোখে চোখে রেখো।

ভাবের প্রগাঢ়তা  : ফুলগুলো তুই আনরে বাছা বাছা।

কালের বিস্তার     : থেকে থেকে শিশুটি কাঁদছে।

আধিক্য : লোকটা হাড়ে হাড়ে শয়তান। খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে, পরশে মুখে মুখে, নীরবে চোখে চোখে যায়।

পদের দ্বিরুক্তি

পদের দ্বিরুক্তির কিছু নিয়ম

১. দুটি পদে একই বিভক্তি প্রয়োগ করা হয়, শব্দ দুটি ও বিভক্তি অপরিবর্তিত থাকে। যেমন :

ঘরে ঘরে লেখাপড়া হলো। দেশে দেশে ধন্য ধন্য করতে লাগল। মনে মনে আমিও এ কথাই ভেবেছি।

২. দ্বিতীয় পদের আংশিক ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটে কিন্তু পদবিভক্তি অবিকৃত থাকে। যেমন :

চোর হাতে নাতে ধরা পড়েছে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

পদের দ্বিরুক্তির প্রয়োগ

বিভিন্নভাবে পদের দ্বিরুক্তি হতে পারে। যেমন:

ক. বিশেষ্য শব্দযুগলের বিশেষণরূপে ব্যবহার

১. আধিক্য বোঝাতে          : রাশি রাশি ধান, ধামা ধামা ধান।

২. সামান্য বোঝাতে           : আমি আজ জ্বর জ্বর বোধ করছি। দেখেছ তার কবি কবি ভাব।

৩. পরস্পরতা বা ধারাবাহিকতা বোঝাতে    : তুমি দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছ। তুমি বাড়ি বাড়ি হেঁটে চাঁদা তুলেছ।

৪. ক্রিয়া বিশেষণ               : ধীরে ধীরে যায়, ফিরে ফিরে চায়।

৫. অনুরূপ কিছু বোঝাতে     : তার সঙ্গী সাথী কেউ নেই।

৬. আগ্রহ বোঝাতে             : ও দাদা দাদা বলে কাঁদছে।

খ. বিশেষণ শব্দযুগলের বিশেষণ রূপে ব্যবহার

১. আধিক্য বোঝাতে                   : ভালো ভালো আম নিয়ে এসো। ছোট ছোট ডাল কেটে ফেল।

২. তীব্রতা বা সঠিকতা বোঝাতে     : গরম গরম জিলাপি, নরম নরম হাত।

৩. সামান্যতা বোঝাতে                 : উড়– উড়– ভাব, কালো কালো চেহারা।

গ. সর্বনাম শব্দ

বহুবচন বা আধিক্য বোঝাতে          : সে সে লোক গেল কোথায়? কে কে এলো? কেউ কেউ বলে।

ঘ. ক্রিয়াবাচক শব্দ

১. বিশেষণ রূপে : এদিকে রুগির তো যায় যায় অবস্থা। তোমার নেই নেই ভাব গেল না।

২. স্বল্পকাল স্থায়ী বোঝাতে             : দেখতে দেখতে আকাশ কালো হয়ে এলো।

৩. ক্রিয়া বিশেষণ                         : দেখে দেখে যেও। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলে কীভাবে?

৪. পৌনঃপুনিকতা বোঝাতে            : ডেকে ডেকে হয়রান হয়েছি।

ঙ. অব্যয়ের দ্বিরুক্তি

১. ভাবের গভীরতা বোঝাতে           : তার দুঃখ দেখে সবাই হায় হায় করতে লাগল। ছি ছি, তুমি কী করেছ?

২. পৌনঃপুনিকতা বোঝাতে             : বার বার সে কামান গর্জে উঠল।

৩. অনুভূতি বা ভাব বোঝাতে            : ভয়ে গা ছম ছম করছে। ফোঁড়াটা টন টন করছে।

৪. বিশেষণ বোঝাতে                     : পিলসুজে বাতি জ্বলে মিটির মিটির।

৫. ধ্বনিব্যঞ্জনা                          : ঝির ঝির করে বাতাস বইছে। বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর।

পদাত্মক দ্বিরুক্তি

বিভক্তিযুক্ত পদের দুইবার ব্যবহারকে পদাত্মক দ্বিরুক্তি বলা হয়। এগুলো দুই রকমে গঠিত হয়। যেমন :

১. একই পদের অবিকৃত অবস্থায় দুইবার ব্যবহার। যেমন: ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলাম। হাটে হাটে বিকিয়ে তোর ভরা আপন।

২. যুগ্মরীতিতে গঠিত দ্বিরক্ত পদের ব্যবহার। যেমন : হাতেনাতে, আকাশে-বাতাসে, কাপড়-চোপড়, দলেবলে

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি

কোনো কিছুর স্বাভাবিক বা কাল্পনিক অনুকৃতিবিশিষ্ট শব্দের রূপকে ধ্বন্যাত্মক শব্দ বলে। এ জাতীয় ধ্বন্যাত্মক শব্দের দুইবার প্রয়োগের নাম ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি। ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি দ্বারা বহুত্ব, আধিক্য ইত্যাদি বোঝায়। ধ্বন্যাত্মক দ্বিরক্তি শব্দ কয়েকটি উপায়ে গঠিত হয়। যেমন :

১. মানুষের ধ্বনির অনুকার    : ভেউ ভেউ-মানুষের উচ্চস্বরে কান্নার ধ্বনি     ট্যা ট্যা      হি হি

২. জীবজন্তুর ধ্বনির অনুকার  : ঘেউ ঘেউ (কুকুরের ধ্বনি)    মিউ মিউ (বিড়ালের ডাক)  

                                       কুহু কুহু (কোকিলের ডাক)    কা কা (কাকের ডাক)

৩. বস্তুর ধ্বনির অনুকার         : ঘচাঘচ (ধান কাটার শব্দ)     মড়মড় (গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ)

                                       ঝমঝম (বৃষ্টি পড়ার শব্দ)    হু হু (বাতাস প্রবাহের শব্দ)

৪. অনুভূতিজাত কাল্পনিক ধ্বনির অনুকার : ঝিকিমিকি (উজ্জ্বল্য)। ঠা ঠা (রোদের তীব্রতা), কুট কুট (শরীরে কামড় লাগার মতো অনুভূতি)  মিনমিন, পিটপিট, ঝি ঝি

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি গঠন

১. একই (ধ্বন্যাত্মক) শব্দের অবিকৃত প্রয়োগ : ধবধব, ঝনঝন, পটপট্

২. প্রথম শব্দটির শেষে আ যোগ করে         : গপাগপ, টপটপ, পটাপট

৩. দ্বিতীয় শব্দটির শেষে ই যোগ করে        : ধরাধরি, ঝমঝমি, ঝনঝনি

৪. যুগ্মরীতিতে গঠিত ধ্বন্যাত্মক শব্দ        : কিচিরমিচির (পাখি বা বানরের শব্দ)  টাপুর টুপুর (বৃষ্টি পতনের শব্দ)

                                                     হাপুসহুপুস (গোগ্রাসে কিছু খাওয়ার শব্দ)

৫. আনি-প্রত্যয় যোগেও বিশেষ্য দ্বিরুক্তি গঠিত হয়  : পাখিটার ছটফটানি দেখলে কষ্ট হয়।

                                                              তোমার বকবকানি আর ভালো লাগে না।

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্ত শব্দের ব্যবহার (বিভিন্ন পদরূপে)

১. বিশেষ্য              : বৃষ্টির ঝমঝমানি আমাদের অস্থির করে তোলে।

২. বিশেষণ             : নামিল নভে বাদল ছলছল বেদনায়।

৩. ক্রিয়া                : কলকলিয়ে উঠল সেথায় নারীর প্রতিবাদ।

৪. ক্রিয়া বিশেষণ     : চিকচিক করে বালি কোথা নাহি কাদা।

সংখ্যাবাচক শব্দের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

সংখ্যা মানে গণনা বা গণনা দ্বারা লব্ধ ধারণা। সংখ্যা গণনার মূল একক ‘এক’। কাজেই সংখ্যাবাচক শব্দে এক, একাধিক, প্রথম, প্রাথমিক ইত্যাদির ধারণা করতে পারি। যেমন : এক টাকা, দশ টাকা। এক টাকাকে এক এক করে দশবার নিলে হয় দশ টাকা।

সংখ্যাবাচক শব্দ চার প্রকার। যেমন :

১. অঙ্কবাচক সংখ্যা       ২. পরিমাণ বা গণনাবাচক সংখ্যা   ৩. ক্রমবাচক সংখ্যা       ৪. তারিখবাচক শব্দ

অঙ্কবাচক সংখ্যা

‘তিন টাকা’ বলতে এক টাকার তিনটি একক বা এককের সমষ্টি বোঝায়।আমাদের একক হলো ‘এক’। সুতরাং এক+এক+এক=তিন। এভাবে আমরা এক থেকে একশ পর্যন্ত গণনা করতে পারি। এক থেকে একশ পর্যন্ত এভাবে গণনার পদ্ধতিকে বলা হয় দশ গুণোত্তর পদ্ধতি। এক থেকে দশ পর্যন্ত আমরা এভাবে লিখে থাকি। যেমন : এক (১), দুই (২), তিন (৩), চার (৪), পাঁচ (৫), ছয় (৬), সাত (৭), আট (৮), নয় (৯), দশ (১০)।

এখানে যেসব সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে তাদের বলে অঙ্ক। এক থেকে নয় পর্যন্ত অঙ্কে লিখিত। দশ লিখতে এক লিখে তার ডানে একটি শূন্য (১০) দিতে হয়। এই শূন্যের অর্থ বাম দিকে লিখিত পূর্ণ সংখ্যাটির দশগুণ। এটিই দশ গুণোত্তর প্রণালীর নিয়ম।

এ ধরনের প্রতিটি ‘দশ’ কে একক ধরে আমরা বিশ বা কুড়ি (২০), ত্রিশ (৩০), চল্লিশ (৪০), পঞ্চাশ (৫০), ষাট (৬০), সত্তর (৭০), আশি (৮০), নব্বই (৯০), পর্যন্ত গণনা করি। তারপরের দশকের একককে বলা হয় একশ (১০০)।

এভাবে আমরা দশের গুণন ও এককের সংকলন করে বিভিন্ন সংখ্যা লিখে থাকি। যেমন :

এক দশ+এক=এগার (১০+১ =১১), এক দশ চার=চৌদ্দ (১০+৪=১৪) ইত্যাদি।

এভাবে দশকের ঘরে দুই (২) হলে বলি দুই দশ=বিশ (১০+১০= ২০) ও দুই দশ এক=একুশ (১০+১০+১=২১)।

এরূপ: তিন দশ+এক=একত্রিশ, চার দশ+এক=একচল্লিশ ইত্যাদি।

পরিমাণ বা গণনা বাচক সংখ্যা

একাধিকবার একই একক গণনা করলে যে সমষ্টি পাওয়া যায় তাই পরিমাণ বা গণনাবাচক সংখ্যা। যেমন : সপ্তাহ বলতে আমরা সাত দিনের সমষ্টি বুঝিয়ে থাকি। সপ্ত (সাত) + অহ (দিনক্ষণ)=সপ্তাহ। এখানে দিন একটি একক।

এরূপ : সাতটি দিন বা সাতটি একক মিলে হয়েছে সপ্তাহ।

পূর্ণসংখ্যার গুণবাচক সংখ্যা

একগুণ=এক। যেমন : একেক্কে এক (অর্থাৎ ১X১=১)। 

এরূপ : দুয়েক্কে দুই, সাতেক্কে সাত ইত্যাদি। দুই গুণ-দ্বিগুণ বা দুগুণ। যেমন : দুই দু গুণে চার (২X2=৪)।

এরূপ : পাঁচ দু গুণে দশ (৫X২=১০), সাত দু গুণে চৌদ্দ (৭X২=১৪)। তিন গুণ=তিরিক্কে। যেমন : তিন তিরিক্কে নয় (৩X৩=৯)

চার গুণ=চার বা চৌকা। যেমন : তিন চারে বা চৌকা বার (৩X৪=১২)

পাঁচ গুণ=পাঁচা। যেমন : পাঁচ পাঁচা পঁচিশ (৫X৫=২৫)

ছয় গুণ=ছয়ে। যেমন : তিন ছয়ে আঠার (৩X৬=১৮)

সাত গুণ=সাতা। যেমন : তিন সাতা একুশ (৩X৭=২১)

আট গুণ=আটা। যেমন: তিন আটা (বা তে আটা) চব্বিশ (৩X৮=২৪)

নয় গুণ=নং বা নয়। যেমন : তিন নং (বা তিন নয়) সাতাশ (৩X৯=২৭)

দশ গুণ=দশং বা দশ। যেমন : তিন বিশং (বা তিন দশে) ত্রিশ (৩X১০=৩০)

বিশ গুণ=বিশং বা বিশ। যেমন : তিন বিশং (বা তিন বিশ) ষাট (৩X২০=৬০)

ত্রিশ গুণ=ত্রিশং বা ত্রিশ। যেমন : তিন ত্রিশং (বা তিন ত্রিশ) নব্বই (৩X৩০=৯০)

এরূপ : চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই, বা শ’-এর পূরণবাচক সংখ্যা গণনা করা হয়।

পূর্ণসংখ্যার ন্যূনতা বা আধিক্য বাচক ‘সংখ্যা শব্দ’ (ক) ন্যূন

এক এককের চার ভাগের এক ভাগ ১/৪  = চৌথা, সিকি বা পোয়া  

’’     ’’      তিন ভাগের এক ভাগ ১/৩ = তেহাই

’’     ’’      দুই ভাগের এক ভাগ ১/২   = অর্ধ বা আধা

’’     ’’      আট ভাগের এক ভাগ ১/৮  = আট ভাগের একক বা এক অষ্টমাংশ

তেমনি এক পঞ্চমাংশ (১/৫)

এক দশমাংশ (১/১০)

এ সবের আরও ভাঙতি হলে

চার ভাগের তিন (৩/৪)=তিন চতুর্থাংশ

আট ভাগের তিন (৩/৮)=তিন অষ্টমাংশ

এক এককের (৩/৪) কে পরবর্তী সংখ্যার পৌনে বলা হয়। যেমন : পৌনে তিন (২/৩/৪) পৌনে ছয় (৫/৩/৪)

পৌনে অর্থ পোয়া অংশ বা এক চতুর্থাংশ (১/৪) কম অর্থাৎ পৌনে=(১-১/৪)=৩/৪

সওয়া=১/১/৪ (সওয়া বা সোয়া এক)

দেড়=১/১২=১/২ কম ২

আড়াই=২/১/২=১/২ কম ৩

এগুলো ছাড়া অর্ধযুক্ত থাকলে সর্বত্র ‘সাড়ে’ বলা হয়। যেমন : ৩/১/২=সাড়ে তিন, ৪/১/২=সাড়ে চার ইত্যাদি।

ক্রমবাচক সংখ্যা

একই সারি, দল বা শ্যেলিতে অবস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সংখ্যার ক্রম বা পর্যায় বোঝাতে ক্রম বা পূরণবাচক সংখ্যা ব্যবহৃত হয়। যেমন: দ্বিতীয় লোকটিকে ডাক। এখানে গণনার একজনের পরের লোকটিকে বোঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় লোকটির আগের লোকটিকে বলা হয় ‘প্রথম’ এবং প্রথম লোকটি পরের লোকটিকে বলা হয় ‘দ্বিতীয়’। এরূপ : তৃতীয়, চতুর্থ ইত্যাদি।

তারিখবাচক শব্দ

বাংলা মাসের তারিখ বোঝাতে যে সংখ্যাবাচক শব্দ ব্যবহৃত হয় তাকে তারিখবাচক শব্দ বলে। যেমন : পয়লা বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ।

তারিখবাচক শব্দের প্রথম চারটি অর্থাৎ ১ থেকে ৪ পর্যন্ত হিন্দি নিয়মে সাধিত হয়। বাকি শব্দ বাংলার নিজস্ব ভঙ্গিতে গঠিত। নিচে বাংলা অঙ্কবাচক, গণনাবাচক, পূরণবাচক ও তারিখবাচক সংখ্যাগুলো দেওয়া হলো :

অঙ্ক/সংখ্যা   গণনাবাচক     পূরণবাচক            তারিখবাচক

১              এক            প্রথম                   পহেলা (হিন্দি) 

২              দুই             দ্বিতীয়                  দোসরা (হিন্দি) 

৩              তিন            তৃতীয়                 তেসরা (হিন্দি)    

৪              চার             চতুর্থ                  চৌঠা  (হিন্দি) 

৫              পাঁচ             পঞ্চম                  পাঁচই

৬              ছয়              ষষ্ঠ                      ছয়ই

৭              সাত            সপ্তম                   সাতই

৮              আট             অষ্টম                  আটই

৯              নয়             নবম                     নয়ই

১০             দশ            দশম                   দশই

১১            এগার           একাদশ              এগারই

১২            বার             দ্বাদশ                    বারই

১৩            তের            ত্রয়োদশ                 তেরই

১৪            চৌদ্দ            চতুর্দশ                 চৌদ্দই

১৫            পনের           পঞ্চদশ                 পনেরই

১৬            উনিশ           উনবিংশ               উনিশে

১৭            বিশ/কুড়ি       বিংশ                   বিশে

১৮            একুশ           একবিংশ            একুশে

বচনের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বচন’ ব্যাকরণের একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ সংখ্যার ধারণা। ব্যাকরণে বিশেষ্য বা সর্বনামের সংখ্যাগত ধারণা প্রকাশের উপায়কে বলে বচন।

বাংলা ভাষায় বচন দুই প্রকার। যেমন :

১. একবচন

যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একটিমাত্র সংখ্যার ধারণা হয় তাকে একবচন বলে। যেমন : সে এলো। মেয়েটি স্কুলে যায়নি।

২. বহুবচন

যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একের অধিক অর্থাৎ বহু সংখ্যার ধারণা হয় তাকে বহুবচন বলে। যেমন : তারা গেল। মেয়েরা এখনও আসেনি।

বচনের গঠন

* শুধু বিশেষ্য ও সর্বনাম শব্দের বচনভেদে হয়। কোনো কোনো সময় টা, টি, খানা, খানি ইত্যাদি যোগ করে বিশেষ্যের একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন : গরুটা, বাছুরটা, কলমটা, খাতাখানা, বইখানি ইত্যাদি।

* বাংলায় বহুবচন প্রকাশের জন্য রা, এরা, গুলা, গুলি, গুলো, দিগ, দের প্রভৃতি বিভক্তি যুক্ত হয় এবং সব, সকল, সমুদয়, কূল, বৃন্দ, বর্গ, নিচয়, রাজি, রাশি, পাল, দাম, নিকর, মালা, আবলি প্রভৃতি সমষ্টিবোধক শব্দ ব্যবহৃত হয়। সমষ্টিবোধক শব্দগুলোর বেশিরভাগই তৎসম বা সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত।

* প্রাণিবাচক, অপ্রাণিবাচক, ইতর প্রাণিবাচক ও উন্নত প্রাণিবাচক শব্দভেদে বিভিন্ন ধরনের বহু বচনবোধক প্রত্যয় ও সমষ্টিবোধক শব্দ যুক্ত হয়। যেমন :

রা : কেবল উন্নত প্রাণিবাচক শব্দের সঙ্গে ‘রা’ বিভক্তির ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন : ছাত্ররা খেলা দেখতে গেছে। তারা সকলেই লেখাপড়া করে। শিক্ষকেরা জ্ঞান দান করেন। যে ধরনের শব্দে ‘রা’ যুক্ত, সে ধরনের শব্দের শেষে কোনো কোনো সময় ‘এরা’ ব্যবহৃত হয়। যেমন : মেয়েরা ঝিয়েরা একত্র হয়েছে। সময় সময় কবিতা বা অন্যান্য প্রয়োজনে অপ্রাণী ও ইতর প্রাণিবাচক শব্দেও রা, এরা যুক্ত হয়। যেমন : ‘পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায় পিপীলিকারা বিধাতার কাছে পাখা চায়।’ কাকেরা এক বিরাট সভা করল। (যদিও ব্যক্তি বাদে প্রাণী বা বস্তুবাচক শব্দের (পাখি, গরু, মেঘ) সাথে ‘রা’ ব্যবহৃত হয় না তবুও করা হয়)

গুলা, গুলি, গুলো : এগুলো প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে যুক্ত হয়। যেমন : অতগুলো কুমড়া দিয়ে কী হবে? আমগুলো টক। টাকাগুলো দিয়ে দাও। ময়ূরগুলো পুচ্ছ নাড়িয়ে নাচছে।

উন্নত প্রাণিবাচক মনুষ্য শব্দের বহুবচনে ব্যবহৃত শব্দ

গণ-দেবগণ, নরগণ, জনগণ

বৃন্দ-সুধীবৃন্দ, ভক্তবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ

মণ্ডলী-শিক্ষকমণ্ডলী, সম্পাদকমণ্ডলী

বর্গ-পণ্ডিতবর্গ, মন্ত্রিবর্গ

প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক শব্দে বহুবচনে ব্যবহৃত শব্দ

কুল-কবিকুল, পক্ষিকুল, মাতৃকুল, বৃক্ষকুল

সকল-পর্বতসকল, মনুষ্যসকল

সব-ভাইসব, পাখিসব

সমূহ-বৃক্ষসমূহ, মনুষ্যসমূহ

অপ্রাণিবাচক শব্দে ব্যবহৃত বহুবচনবোধক শব্দ

আবলি, গুচ্ছ, দাম, নিকর, পুঞ্জ, মালা, রাজি, রাশি ইত্যাদি অপ্রাণিবাচক বহুবচনে ব্যবহৃত হয়। যেমন : গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুস্তকাবলি, কবিতাগুচ্ছ, কুসুমদাম, কমলনিকর, মেঘকুঞ্জ, পর্বতমালা, তারকারাজি, বালিরাশি, কুসুম ইত্যাদি।

বহুবচনের প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য

ক) বিশেষ্য শব্দের একবচনের ব্যবহারেও অনেক সময় বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন :

সিংহ বনে থাকে। (একবচন ও বহুবচন দুই বোঝায়)                 পোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হয়। (বহুবচন)

বাজারে লোক জমেছে। (বহুবচন)                                                  বাগানে ফুল ফুটেছে। (বহুবচন)

খ) একবচনাত্মক বিশেষ্যের আগে অজস্র, অনেক, বিস্তর, বহু, নানা, ঢের ইত্যাদি বহুত্ববোধক শব্দ বিশেষণ হিসেবে প্রয়োগ করেও বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন :

অজস্র লোক।       অনেক ছাত্র।         বিস্তর টাকা।                         বহু মেহমান।

নানা কথা।                            ঢের খরচ।             অঢেল টাকা পয়সা।

গ) অনেক সময় বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের দ্বিত্ব প্রয়োগেও বহুবচন সাধিত হয়। যেমন :

হাঁড়ি হাঁড়ি সন্দেশ।             কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।                বড় বড় মাঠ।                       লাল লাল ফুল।

ঘ) বিশেষ নিয়মে সাধিত বহুবচন। বহুবাচক সর্বনাম ও বিশেষ্য :

মেয়েরা কানাকানি করছে।               এটাই করিমদের বাড়ি।    রবীন্দ্রনাথরা প্রতিদিন জন্মায় না। সকলে সব জানে না।

ঙ) কতিপয় বিদেশি শব্দে, সে ভাষার অনুসরণে বহুবচন হয়। যেমন :

আন যোগে : বুজুর্গ-বুজুর্গান             সাহেব-সাহেবান

বিশেষ দ্রষ্টব্য

* পাল ও যূথ শব্দ দুটি কেবল জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত হয়। যেমন :

রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। হস্তিযূথ মাঠের ফসল নষ্ট করছে।

* ওপরে বর্ণিত বহুবচনবোধক প্রত্যয় ও সমষ্টিবোধক শব্দের অধিকাংশই তৎসম অর্থাৎ সংস্কৃত এবং সে কারণে অধিকাংশই সাধুরীতি ও সংস্কৃত শব্দে প্রযোজ্য। খাঁটি বাংলা শব্দের বহুবচনে এবং চলিত রীতিতে ‘রা, এরা, গুলা, গুলো, দের’ ইত্যাদি প্রত্যয় এবং ‘অনেক, বহু, সব’ এসব শব্দের ব্যবহারই বহুল প্রচলিত।

* একই সঙ্গে দুইবার বহুবচনবাচক প্রত্যয় বা শব্দ ব্যবহৃত হয় না। যেমন :

সব মানুষই অথবা মানুষ অথবা মানুষেরা মরণশীল (শুদ্ধ)। সকল মানুষেরাই মরণশীল (ভুল)।

* গুলো বহুবচনজাতীয় চিহ্ন তাই এর সাথে ‘কে’ (একবচন) বসে না। যেমন: এগুলোকে, তাদেরকে, আমাদেরকে ইত্যাদি।

পদাশ্রিত নির্দেশকের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

কয়েকটি অব্যয় বা প্রত্যয় কোনো না কোনো পদের আশ্রয়ে বা পরে সংযুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা জ্ঞাপন করে। এদের পদাশ্রিত অব্যয় বা পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। বাংলায় নির্দিষ্টতা জ্ঞাপক প্রত্যয় ইংরেজি Definite Article 'The' - এর স্থানীয়। বচনভেদে পদাশ্রিত নির্দেশকেরও বিভিন্নতা প্রযুক্ত হয়।

নির্দেশক সংখ্যা নির্দেশ করে তাই সংখ্যার দিক দিয়ে নির্দেশক দুই প্রকার। যেমন :

১. একবচন : টা, টি, খানা, খানি, গাছা, গাছি ইত্যাদি নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। যেমন :

টাকাটা   বাড়িটা                   কাপড়খানা           বইখানি                 লাঠিগাছা                              চুড়িগাছি

২. বহুবচন : গুলি, গুলা, গুলো, গুলিন প্রভৃতি নির্দেশক প্রত্যয় সংযুক্ত হয়। যেমন:

মানুষগুলি             লোকগুলো           আমগুলো                             পটলগুলিন

পদাশ্রিত নির্দেশকের ব্যবহার

টা বা টি

* শব্দের সঙ্গে টা বা টি যুক্ত হলে অনির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন: একটি দেশ, সে যেমনই হোক দেখতে। কিন্তু অন্য সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে টা বা টি যুক্ত হলে নির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন : তিনটি টাকা, দশটি বছর।

* নিরর্থকভাবেও নির্দেশক টা বা টির ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন: সারাটি সকাল তোমার আশায় বসে আছি। ন্যাকামিটা এখন রাখ।

* নির্দেশক সর্বনামের পরে টা বা টি যুক্ত হলে তা সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। যেমন : ওটি যেন কার তৈরি? এটা নয় ওটা আন। সেইটেই ছিল আমার প্রিয় কলম।

গোটা ও খানা

* ‘গোটা’ বচনবাচক শব্দটির আগে বসে এবং খানা, খানি পরে বসে। এগুলো নির্দেশক ও অনির্দেশক দুই অর্থেই প্রযোজ্য। ‘গোটা’ শব্দ আগে বসে এবং সংশ্লিষ্ট পদটি নির্দিষ্টতা না বুঝিয়ে অনির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন : গোটা দেশই ছারখার হয়ে গেছে। গোটাদুই কমলালেবু আছে (অনির্দিষ্ট)। গোটাসাতেক আম এনো।

* দুখানা কম্বল চেয়েছিলাম (নির্দিষ্ট)। একখানা বই কিনে নিও (অনির্দিষ্ট)। কিন্তু কবিতায় বিশেষ অর্থে ‘খানি’ নির্দিষ্টার্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন : ‘আমি অভাগা এনেছি বহিয়া নয়ন জলে ব্যর্থ সাধনখানি।

টাক, টুক, টুকু, টো

* টাক, টুক, টুকু, টো ইত্যাদি পদাশ্রিত নির্দেশক নির্দিষ্টতা ও অনির্দিষ্টতা উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যেমন : পোয়াটাক দুধ দাও (অনির্দিষ্টতা)। সবটুকু ওষুধই খেয়ে ফেলো (নির্দিষ্টতা)।

বিশেষ অর্থে

বিশেষ অর্থে নির্দিষ্টতা জ্ঞাপনে ‘কেতা, তা, পাটি’ ব্যবহৃত হয়। যেমন :

কেতা : এ তিনকেতা জমির দাম দশ হাজার টাকা মাত্র। দশ টাকার পাঁচকেতা নোট।

তা : দশ তা কাগজ দাও।

পাটি : আমার একপাটি জুতো ছিঁড়ে গেছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

এই, ঐ, ও, ইত্যাদি নির্দেশক বসলে পরের শব্দের পরে টি/টা/খানা/খানি বসে না। যেমন : এই কাজটি, এই উক্তিটি, ওই বইখানা ইত্যাদি।

সমাস

সমাস মানে সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ। অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। যেমন : দেশে সেবা=দেশসেবা, বই ও পুস্তক=বইপুস্তক, নেই পরোয়া যার =বেপরোয়া। বাক্যে শব্দের ব্যবহার সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে সমাসের সৃষ্টি। সমাস দ্বারা দুই বা ততোধিক শব্দের সমন্বয়ে নতুন অর্থবোধক পদ সৃষ্টি হয়। এটি শব্দ তৈরি ও প্রয়োগের একটি বিশেষ রীতি। সমাসের রীতি সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে। তবে খাঁটি বাংলা সমাসের দৃষ্টান্তও প্রচুর পাওয়া যায়। সেগুলোতে সংস্কৃতের নিয়ম খাটে না।

সমাসের বৈশিষ্ট্য

১. পাশাপাশি দুই বা তার অধিক শব্দ থাকতে হবে

২. এসব শব্দের মধ্যে অর্থসংগতি থাকতে হবে

৩. এসব শব্দের মধ্যে বৃহৎ শব্দ তৈরির যোগ্যতা থাকতে হবে

৪. নতুন শব্দ গঠন করার ক্ষমতা থাকতে হবে

৫. একাধিক শব্দকে সংকোচিত করার ক্ষমতা থাকতে হবে

৬. শব্দগুলোর বিভক্তি লোপ পেতে হবে

সমাসের প্রয়োজনীয়তা

বাংলা ব্যাকরণে সমাসের প্রয়োজন অনেক। সমাসের মাধ্যমে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি ছাড়াও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো যায়। যেমন:

১. সমাসের মাধ্যমে অনেক নতুন শব্দ গঠন করা যায়

২. ভাষাকে সহজসরল, সংক্ষিপ্ত, প্রাঞ্জল ও শ্রুুতিমধুর করা যায়

৩. অল্পকথায় ব্যাপকভাব প্রকাশ করা যায়

৪. সহজভাবে শব্দ উচ্চারণ করা যায়

৫. বক্তব্যকে সুন্দর, শ্রুতিমধুর, সংক্ষিপ্ত, সহজসরল, অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যায়

৬. বাক্যকে গতিশীল করা যায়।

সমাসের সাথে অন্য নিয়মের পার্থক্য

সন্ধি ও সমাস

১. বর্ণের সাথে বর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে। আর শব্দের সাথে শব্দের মিলনকে সমাস বলে।

২. সন্ধি ব্যাকরণের ধ্বনিতত্ত্বে অবস্থিত। আর সমাস ব্যাকরণের রূপতত্ত্বে অবস্থিত।

৩. সন্ধি ৩ প্রকার। যেমন: স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি।

    আর সমাস ৬ প্রকার। যেমন: দ্বন্দ্বসমাস, দ্বিগুসমাস, কর্মধারয়সমাস, তৎপুরুষসমাস, অব্যয়ীভাবসমাস ও বহুব্রীহিসমাস।

৪. সন্ধিতে বিভক্তি লোপ পায় না। আর সমাসে অলুক বাদে অন্য সমাসের বিভক্তি লোপ পায়।

৫. সন্ধিতে বর্ণে বর্ণে মিলন ঘটে। সন্ধিতে শব্দের মিলন বর্ণ ও উচ্চারণভিত্তিক। দুটি বর্ণের মিলন ঘটে।

    আর সমাসে শব্দে শব্দে বা পদে পদে মিলন ঘটে। সমাসে শব্দের মিলন অর্থভিত্তিক। দুই বা দুয়ের অধিক শব্দের মিলন ঘটে।

৬. সন্ধি অল্প সংখ্যক নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে। আর সমাস অনেক নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে।

৭. সন্ধির ফলে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে না। আর সমাসের ফলে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে।

৮. সন্ধি শব্দকে গতিশীল করে। সমাস বাক্যকে গতিশীল করে।

৯. সন্ধির নমুনা হলো বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়, প্রতি+এক=প্রত্যেক, হিম+আলয়=হিমালয়

    আর সমাসের নমুনা হলো: বিদ্যার জন্য আলয়=বিদ্যালয়, একের পরে এক=প্রত্যেক, হিমের আলয়=হিমালয়।

১০. সন্ধি উচ্চারণকে পরিষ্কার করে। আর সমাস বক্তব্যকে সুন্দর, শ্রুতিমধুর ও সংক্ষিপ্ত করে। 

উপমান ও উপমিত কর্মধারয়

উপমান কর্মধারয়               উপমিত কর্মধারয়              রূপক কর্মধারয়

উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে সাধারণ ধর্ম বা গুণ বজায় থাকলে যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে।                  উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে সাধারণ ধর্ম বা গুণ বজায় না থাকলে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে।     উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করলে যে সমাস হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। 

উপমান বাচক পদ থাকে,

সাধারণ ধর্ম বাচক পদ থাকে

কিন্তু উপমেয় বাচক পদ থাকে না। উপমেয় বাচক পদ ও উপমান বাচক পদ থাকে কিন্তু সাধারণ ধর্মবাচক পদ থাকে না।  

দুটি শব্দের একটি শব্দ বিশেষ্য, অপরটি বিশেষণ।    দুটি শব্দই বিশেষ্য শব্দ।    দুটি শব্দই বিশেষ্য শব্দ।

সাধারণ ধর্মবাচক শব্দের প্রাধান্য। যেমন:

তুষারের ন্যায় ধবল=তুষারধবল

তুষার=উপমান ও বিশেষ্য

ধবল=উপমিত ও বিশেষণ               উপমেয় বাচক শব্দের প্রাধান্য। যেমন:

পুরুষসিংহের ন্যায়=পুরুষসিংহ

পুরুষ=উপমেয় ও বিশেষ্য

সিংহ=উপমান ও বিশেষ্য উপমেয় শব্দের পূর্বে বসে আর উপমান পরে বসে।

 

সমস্যমান পদে ন্যায় বসে। যদি তুলনামূলক শব্দ অর্থাৎ ‘মতো/ন্যায়’ থাকে তাহলে শব্দের মাঝে বসে।               সমস্যমান পদে ন্যায় বসে। যদি তুলনামূলক শব্দ অর্থাৎ ‘মতো/ন্যায়’ থাকে তাহলে শব্দের শেষে বসে।    সমস্যমান পদে রূপ বসে।

রূপ শব্দটি দুটি শব্দের মাঝে বসে।

তুষারশ্রুভ্র=তুষারের ন্যায়/মতো শুভ্র            মুখচন্দ্র=মুখ চন্দ্রের ন্যায়/মতো      মনমাঝি=মন রূপ মাঝি

বিদ্যাধন=বিদ্যা রূপ ধন

অলুক দ্বন্দ্ব, অলুক তৎপুরুষ ও অলুক বহুব্রীহি

অলুক অর্থ লোপ হয় না এমন। যে সমাসে পূর্বশব্দের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক সমাস বলে। তিনটি সমাসেই অলুকসমাস হয়। যেমন:

অলুক দ্বন্দ্ব             অলুক তৎপুরুষ   অলুক বহুব্রীহি

যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে।  যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বশব্দের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে।      যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বশব্দের বা পরশব্দের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। 

দুধেভাতে=দুধে ও ভাতে।

হাতেকলমে= হাতে ও কলমে।        ঘিয়েভাজা=ঘিয়ে ভাজা।

গায়েপড়া=গায়ে পড়া।      কানেখাটো=কানে খাটো যে।

মাথায়পাগড়ি=মাথায় পাগড়ি যার।

সমাসের উপাদান

সমাসের প্রক্রিয়ায় সমাসবদ্ধ বা সমাসনিষ্পন্ন পদকে সমস্ত পদ বলে। সমস্ত পদ বা সমাসবদ্ধ পদটির অন্তর্গত পদকে সমস্যমান পদ বলে। সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশ বা শব্দকে পূর্বপদ বলে এবং পরবর্তী অংশ বা শব্দকে উত্তরপদ বা পরপদ বলে। সমস্ত পদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ করা হয় তাকে সমাসবাক্য, ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে। যেমন : বিলাতফেরত রাজকুমার সিংহাসনে বসলেন। এখানে বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন-তিনটিই সমাসবদ্ধ পদ। এগুলোর গঠন প্রক্রিয়া ও রকম-বিলাত হতে ফেরত, রাজার কুমার, সিংহ চিহ্নিত আসন-এগুলো হলো ব্যাসবাক্য। এসব ব্যাসবাক্যে ‘বিলাত’, ‘ফেরত’, ‘রাজা, ‘কুমার,’ ‘সিংহ’, ‘আসন’ হলো এক একটি সমস্যমান পদ। আর বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন সমস্ত পদ। বিলাত, রাজা ও সিংহ হলো পূর্বপদ এবং ফেরত, কুমার ও আসন হলো পরপদ।

ক্রম        উপাদান                সংজ্ঞা

১             সমাসজাত শব্দ

/সমাসবদ্ধ শব্দ

/সমস্ত= শব্দ      শব্দে শব্দে তৈরিকৃত শব্দই সমাসজাত শব্দ।

সমাসের প্রক্রিয়ায় সমাসবদ্ধ বা সমাস নিষ্পন্ন পদটির নাম সমস্ত পদ।

২             সমস্যমানপদ      সমাসজাত শব্দ বা ব্যাসবাক্যের প্রতিটি পদকে সমস্যমানপদ বলে। 

সমস্ত পদ বা সমাসবদ্ধ পদটির অন্তর্গত পদগুলোই সমস্যমান পদ।

৩             ব্যাসবাক্য

/সমাসবদ্ধ

/বিগ্রহবাক্য          সমস্যমানপদকে ব্যাসবাক্য বলে। 

সমস্ত পদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ করা হয় তার নাম সমাসবাক্য, ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।

৪             পূর্বপদ  ব্যাসবাক্যে প্রথম শব্দকে পূর্বপদ বলে।

সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশ বা শব্দকে বলা হয় পূর্বপদ।

৫             পরপদ /উত্তরপদ              ব্যাসবাক্যে শেষ পদকে পরপদ বা উত্তরপদ বলে।

আর পরবর্তী অংশ বা শব্দকে বলা হয় উত্তরপদ বা পরপদ।

নমুনা

বিলাতফেরত রাজকুমার সিংহাসনে বসলেন। এখানে ‘বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন’ তিনটিই সমাসবদ্ধ পদ।

এগুলোর গঠন প্রক্রিয়া : বিলাত হতে ফেরত, রাজার কুমার, সিংহ চিহ্নিত আসন-এগুলো হলো ব্যাসবাক্য।

এসব ব্যাসবাক্যে ‘বিলাত’, ‘ফেরত’, ‘রাজা, ‘কুমার,’ ‘সিংহ’, ‘আসন’ হলো এক একটি সমস্যমান পদ।

আর বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন সমস্ত পদ।

বিলাত, রাজা ও সিংহ হলো পূর্বপদ আর ফেরত, কুমার ও আসন হলো পরপদ।

সমাসের প্রকরণ

সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। যেমন : দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব সমাস। দ্বিগু সমাসকে অনেক ব্যাকরণবিদ কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ কর্মধারয়কেও তৎপুরুষ সমাসের অন্তর্ভূক্ত বলে মনে করেছেন। এদিক থেকে সমাস মূলত চার প্রকার। যেমন: দ্বন্দ্ব, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, অব্যয়ীভাব সমাস। কিন্তু সাধারণভাবে ছয়টি সমাসেরই আলোচনা করা গেলো। এছাড়া প্রাদিসমাস, নিত্যসমাস, অলুকসমাস ইত্যাদি কয়েকটি অপ্রধান সমাস রয়েছে। সংক্ষেপে সেগুলোও আলোচনা করা হয়েছে।

সকল সমাসের সংজ্ঞা

সমাস : অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে।

১. দ্বন্দ্ব সমাস : যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

২. দ্বিগু সমাস : সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। যেমন: মা ও বাবা=মা-বাবা।

৩. কর্মধারয় সমাস : যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: নীল যে পদ্ম =নীলপদ্ম।

৪. তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মন দিয়ে গড়া =মনগড়া।

৫. বহুব্রীহি সমাস : যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্যকোনো পদকে বোঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: মহান আত্মা যার=মহাত্মা।

৬. অব্যয়ীভাব সমাস : পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাকে তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন: মরণ পর্যন্ত=আমরণ।

৭. প্রাদি সমাস : প্র, প্রতি, অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎপ্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয় তবে তাকে বলে প্রাদি সমাস। যেমন: প্র যে বচন =প্রবচন।

৮. নিত্যসমাস : যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্যসমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয় না তাকে নিত্যসমাস বলে। যেমন: অন্য গ্রাম=গ্রামান্তর।

৯. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন : দুধে-ভাতে, হাতে-কলমে।

১০. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় : যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ=স্মৃতিসৌধ।

১১. উপমান কর্মধারয় : সাধারণ ধর্মবাচক পদের সাথে উপমানবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: তুষারের ন্যায় শুভ্র=তুষারশুভ্র।

১২. উপমিত কর্মধারয় : সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: মুখ চন্দ্রের ন্যায়=মুখচন্দ্র।

১৩. রূপক কর্মধারয় : উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন : মন রূপ মাঝি=মনমাঝি।

১৪. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) ইত্যাদি লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: বিপদকে আপন্ন=বিপদাপন্ন।

১৫. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তির (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মধু দিয়ে মাখা=মধুমাখা।

১৬. অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি লোপ না হলে অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: তেলে ভাজা=তেলে ভাজা।

১৭. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মেয়েদের জন্য স্কুল= মেয়েস্কুল।

১৮. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে ইত্যাদি) লোপে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: বিলাত থেকে ফেরত =বিলাতফেরত।

১৯. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তির (র, এর) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: রাজার পুত্র=রাজপুত্র।

২০. অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : র/এর-বিভক্তি লোপ না পেয়ে যে সমাস হয় তাকে অলুক ষষ্ঠী সমাস বলে। যেমন: মাটির মানুষ=মাটির মানুষ।

২১. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি (এ,য়, তে) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: গাছে পাকা =গাছপাকা।

২২. নঞ্ তৎপুরুষ সমাস : না বাচক নঞ অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ন আচার =অনাচার।

২৩. উপপদ তৎপুরুষ সমাস : কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয় তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন: পঙ্কে জন্মে যা=পঙ্কজ।

২৪. অলুক তৎপুরুষ সমাস : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ঘিয়ে ভাজা=ঘিয়ে ভাজা।

২৫. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য হলে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন: খোশ মেজাজ যার =খোসমেজাজ।

২৬. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ এবং পরপদ কোনোটিই যদি বিশেষণ না হয় তাকে বলে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি। যেমন: দুই কান কাটা যার=দু কানকাটা।

২৭. ব্যতিহার বহুব্রীহি : ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যতিহার বহুব্রীহি হয়। যেমন: কানে কানে যে কথা=কানাকানি।

২৮. নঞ্ বহুব্রীহি : বিশেষ্য পূর্বপদের আগে নঞ্ (না অর্থবোধক) অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস করা হলে তাকে নঞ্ বহুব্রীহি বলে। যেমন: নাই জ্ঞান যার=অজ্ঞান।

২৯. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোনো অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায় তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন: হাতে খড়ি দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে=হাতেখড়ি।

৩০. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি। যেমন: এক দিকে চোখ যার=একচোখা।

৩১. অলুক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। যেমন: মাথায় পাগড়ি যার=মাথায় পাগড়ি।

৩২. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি : পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। যেমন: দশ গজ পরিমাণ যার= দশগজি।

৩৩. নিপাতনে বহুব্রীহি সিদ্ধ : যে সমাস কোনো নিয়মের অধীনে নয় তাকে নিপাতনে বহুব্রীহি সিদ্ধ বলে। যেমন : দু দিকে অপ যার=দ্বীপ। জীবিত থেকেও যে মৃত= জীবন্মৃত।

দ্বন্দ্ব সমাসের সংজ্ঞা

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন :

তাল ও তমাল=তাল-তমাল      দোয়াত ও কলম=দোয়াত-কলম

এখানে তাল ও তমাল এবং দোয়াত ও কলম প্রতিটি পদেরই অর্থের প্রাধান্য সমস্ত পদে রক্ষিত হয়েছে। দ্বন্দ্ব সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের সম্বন্ধ বোঝানোর জন্য ব্যাসবাক্যে এবং, ও, আর-এ তিনটি অব্যয় পদ ব্যবহৃত হয়। যেমন : মাতা ও পিতা=মাতাপিতা।

দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকরণ

দ্বন্দ্ব সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমন :

১. মিলনার্থক শব্দযোগে: মা-বাপ, মাসি-পিসি, জ্বিন-পরি, চা-বিস্কুট ইত্যাদি।

২. বিরোধার্থক শব্দযোগে : দা-কুমড়া, অহি-নকুল, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি।

৩. বিপরীতার্থক শব্দযোগে : আয়-ব্যয়, জমা-খচর, ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো, লাভ-লোকসান ইত্যাদি।

৪. অঙ্গবাচক শব্দযোগে : হাত-পা, নাক-কান, বুক-পিঠ, মাথা-মুন্ডু, নাক-মুখ ইত্যাদি।

৫. সংখ্যাবাচক শব্দযোগে : সাত-পাঁচ, নয়-ছয়, সাত-সতের, উনিশ-বিশ ইত্যাদি।

৬. সমার্থক শব্দযোগে : হাট-বাজার, ঘর-দুয়ার, কল-কারখানা, মোল্লা-মৌলভি, খাতা-পত্র ইত্যাদি।

৭. প্রায় সমার্থক ও সহচর শব্দযোগে : কাপড়-চোপড়, পোকা-মাকড়, দয়া-মায়া, ধূতি-চাদর ইত্যাদি।

৮. দুটি সর্বনামযোগে : যা-তা, যে-সে, যেমন-তেমন, যথা-তথা, তুমি-আমি, এখানে-সেখানে ইত্যাদি।

৯. দুটি ক্রিয়াযোগে : দেখা-শোনা, যাওয়া-আসা, চলা-ফেরা, দেওয়া-থোওয়া ইত্যাদি।

১০. দুটি ক্রিয়া বিশেষণযোগে : ধীরে-সুস্থে, আগে-পাশে, আকারে-ইঙ্গিতে ইত্যাদি।

১১. দুটি বিশেষণযোগে : ভালো-মন্দ, কম-বেশি, আসল-নকল, বাকি-বকেয়া ইত্যাদি।

অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন : দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে, দেশে-বিদেশে, হাতে-কলমে।

* তিন বা বহু পদে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন : সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাক-মুখ-চোখ ইত্যাদি।

দ্বন্দ্ব সমাসের গাণিতিক গঠন

ক্রমিক   পূর্বপদ                  + ও/আর              + পরপদ               =দ্বন্দ্ব সমাস

১             /বিশেষ্য                + ও/আর              + বিশেষ্য              =দ্বন্দ্ব সমাস

২             /সর্বনাম                + ও/আর              +সর্বনাম               =দ্বন্দ্ব সমাস

৩             /বিশেষণ              + ও/আর              + বিশেষণ             =দ্বন্দ্ব সমাস

৪             /ক্রিয়া                    + ও/আর              + ক্রিয়া                  =দ্বন্দ্ব সমাস

৫             /ক্রিয়াবিশেষণ        + ও/আর              + ক্রিয়াবিশেষণ          =দ্বন্দ্ব সমাস

দিগু সমাসের সংজ্ঞা ও ব্যবহার

সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাসে সমাসনিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমন :

তিন কালের সমাহার=ত্রিকাল     চৌরাস্তার সমাহার=চৌরাস্তা       তিন মাথার সমাহার=তেমাথা

শত অব্দের সমাহার=শতাব্দী     পঞ্চবটের সমাহার=পঞ্চবটী          ত্রি (তিন) পদের সমাহার=ত্রিপদী

এরূপ : অষ্টধাতু, চতুর্ভুজ, চতুরঙ্গা, ত্রিমোহিনী, তেরনদী, পঞ্চভূত, সাতসমুদ্র ইত্যাদি।

দ্বিগু সমাসের গাণিতিক গঠন

সংখ্যা    + বিশেষ্য              + র/এর + সমাহার             =দ্বিগু সমাস

কর্মধারয় সমাসের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন : নীল যে পদ্ম=নীলপদ্ম      শান্ত অথচ শিষ্ট=শান্তশিষ্ট      কাঁচা অথচ মিঠা=কাঁচামিঠা

কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকার হতে পারে। যেমন : মধ্যপদলোপী, উপমান, উপমিত ও রূপক কর্মধারয় সমাস।

কর্মধারয় সমাস গঠনের নিয়ম

কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমন :

১. দুটি বিশেষণ পদে একটি বিশেষ্যকে যেমন : যে চালাক সেই চতুর=চালাক-চতুর।

২. দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝালে। যেমন : যিনি জজ তিনিই সাহেব=জজ সাহেব।

৩. কার্যে পরম্পরা বোঝাতে দুটি কৃদন্ত বিশেষণ পদের কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন : আগে ধোয়া পরে মোছা =ধোয়ামোছা।

৪. পূর্বপদে স্ত্রীবাচক বিশেষণ থাকলে কর্মধারয় সমাসে সেটি পুরুষ বাচক হয়। যেমন :

সুন্দরী যে লতা=সুন্দরলতা       মহতী যে কীর্তি=মহাকীর্তি

৫. বিশেষণবাচক মহান বা মহৎ শব্দ পূর্বপদ হলে, ‘মহৎ’ ও ‘মহান’ স্থানে ‘মহা’ হয়। যেমন :

মহৎ যে জ্ঞান=মহাজ্ঞান          মহান যে নবি =মহানবি          মহৎ/মহতী যে কীর্তি=মহাকীর্তি

৬. পূর্বপদে ‘কু’ বিশেষণ থাকলে এবং পরপদের প্রথমে স্বরধনি থাকলে ‘কু’ স্থানে ‘কৎ’ হয়। যেমন

কু যে অর্থ=কদর্থ                  কু যে আচার=কদাচার

৭. পরপদে ‘রাজা’ শব্দ থাকলে কর্মধারয় সমাসে ‘রাজ’ হয়। যেমন : মহান যে রাজা=মহারাজ।

৮. বিশেষণ ও বিশেষ্য পদে কর্মধারয় সমাস হলে কখনো কখনো বিশেষণ পরে আসে, বিশেষ্য আগে যায়। যেমন :

সিদ্ধ যে আলু=আলুসিদ্ধ          অধম যে নর=নরাধম

কর্মধারয় সমাসের গাণিতিক গঠন

১. সাধারণ কর্মধারয়

* বিশেষণ + যে + বিশেষ্য=কর্মধারয় সমাস অথবা বিশেষ্য + যে + বিশেষণ=কর্মধারয় সমাস

* বিশেষ্য +বিশেষ্য +যে=কর্মধারয় সমাস

* যা+ বিশেষণ + তাই + বিশেষণ=কর্মধারয় সমাস

* যে + বিশেষণ+ সে + বিশেষণ=কর্মধারয় সমাস

* যে + বিশেষ্য + সেই+ বিশেষ্য=কর্মধারয় সমাস অথবা যে + বিশেষণ + সেই+ বিশেষণ=কর্মধারয় সমাস

* যিনি + বিশেষ্য + তিনি + বিশেষ্য=কর্মধারয় সমাস

২. মধ্যপদলোপি কর্মধারয়

বিশেষ্য + চিহ্নিত/মিশ্রিত/বিষয়ক/রক্ষার্থে/মাখা/ + বিশেষ্য=মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

৩. উপমান কর্মধারয়

বিশেষ্য + র/এর + মতো/ন্যায় + বিশেষণ= উপমান কর্মধারয়

৪. উপমিত কর্মধারয়

বিশেষ্য + বিশেষ্য + র/এর + মতো/ন্যায়= উপমিত কর্মধারয়

৫. রূপক কর্মধারয়

বিশেষণ (বিশেষ্য থাকলেও বিশেষণ অর্থ প্রকাশ পায়)+ রূপ + বিশেষ্য=রূপক কর্মধারয়

মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন :

সিংহ চিহ্নিত আসন=সিংহাসন                        সাহিত্য বিষয়ক সভা=সাহিত্যসভা          স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ=মৃতিসৌধ

মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + চিহ্নিত/মিশ্রিত/বিষয়ক/রক্ষার্থে/মাখা/ + বিশেষ্য=মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

উপমান কর্মধারয়

উপমান অর্থ তুলনীয় বস্তু। প্রত্যক্ষ কোনো বস্তুর সাথে পরোক্ষ কোনো বস্তুর তুলনা করলে প্রত্যক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমেয় আর যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাকে বলা হয় উপমান। উপমান ও উপমেয়ের একটি সাধারণ ধর্ম থাকবে। যেমন : ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ কেশ=ভ্রমরকৃষ্ণকেশ

এখানে ভ্রমর উপমান এবং কেশ উপমেয়। কৃষ্ণত্ব হলো সাধারণ ধর্ম। সাধারণ ধর্মবাচক পদের সাথে উপমানবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন : তুষারের ন্যায় শুভ্র=তুষারশুভ্র         অরুণের ন্যায় রাঙা=অরুণরাঙা

উপমান কর্মধারয় সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + র/এর + মতো/ন্যায় + বিশেষণ=উপমান কর্মধারয়

উপমিত কর্মধারয়

সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে (এ ক্ষেত্রে সাধারণ গুণটিকে অনুমান করে নেওয়া হয়)। এ সমাসে উপমেয় পদটি পূর্বে বসে। যেমন :

মুখ চন্দ্রের ন্যায়=চন্দ্রমুখ     পুরুষ সিংহের ন্যায়=সিংহপুরুষ

উপমিত কর্মধারয় সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + বিশেষ্য + র/এর + মতো/ন্যায়=উপমিত কর্মধারয়

রূপক কর্মধারয়

উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারয় সমাস হয়। এ সমাসে উপমেয় পদ পূর্বে বসে এবং উপমান পদ পরে বসে এবং সমস্যমান পদে ‘রূপ’ অথবা ‘ই’ যোগ করে ব্যাসবাক্য গঠন করা হয়। যেমন :

ক্রোধ রূপ অনল=ক্রোধানল         বিষাদ রূপ সিন্ধু= বিষাদসিন্ধু                মন রূপ মাঝি=মনমাঝি

আরও কয়েক ধরনের কর্মধারয় সমাস রয়েছে। কখনো কখনো সর্বনাম, সংখ্যাবাচক শব্দ এবং উপসর্গ আগে বসে পরপদের সাথে কর্মধারয় সমাস গঠন করতে পারে। যেমন :

অব্যয় : কুকর্ম, যথাযোগ্য        

সর্বনাম : সেকাল, একাল         

সংখ্যাবাচক শব্দ : একজন, দোতলা          

উপসর্গ : বিকাল, সকাল, বিদেশ, বেসুর

রূপক কর্মধারয় সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষণ (বিশেষ্য থাকলেও বিশেষণ অর্থ প্রকাশ পায়)+ রূপ + বিশেষ্য=রূপক কর্মধারয়

তৎপুরুষ সমাসের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের পূর্বপদে দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত যে কোনো বিভক্তি থাকতে পারে আর পূর্বপদের বিভক্তি অনুসারে এদের নামকরণ হয়। যেমন : বিপদকে আপন্ন=বিপদাপন্ন। এখানে দ্বিতীয়া বিভক্তি ‘কে’ লোপ পেয়েছে বলে এর নাম দ্বিতীয়া তৎপুরুষ।

তৎপুরুষ সমাস নয় প্রকার। যেমন : দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস, তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস, চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস, পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস, ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস, সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস, নঞ তৎপুরুষ সমাস, উপপদ তৎপুরুষ সমাস ও অলুক তৎপুরুষ সমাস।

দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) ইত্যাদি লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন:

দুঃখকে প্রাপ্ত=দুঃখপ্রাপ্ত               বিপদকে আপন্ন=বিপদাপন্ন         পরলোকে গত =পরলোকগত

ব্যাপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন :

চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী=চিরসুখী। এরূপ : গা-ঢাকা, রথদেখা, বীজবোনা, ভাতরাঁধা, ছেলে-ভুলানো (ছড়া), নভেল-পড়

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য (বস্তুবাচক/ব্যক্তি) + কে/ব্যাপিয়া +বিশেষ্য=দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস

তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তির (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন :

মন দিয়ে গড়া=মনগড়া         শ্রম দ্বারা লব্ধ=শ্রমলব্ধ          মধু দিয়ে মাখা= মধুমাখা       ধনে আঢ্য=ধনাঢ্য

ঊন, হীন, শূন্য প্রভৃতি শব্দ উত্তরপদ হলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন :

এক দ্বারা উন=একোন    বিদ্যা দ্বারা হীন= বিদ্যাহীন      

জ্ঞান দ্বারা বা জ্ঞানে শূন্য   পাঁচ দ্বারা কম=পাঁচ কম (এক শ)

ক) উপকরণবাচক বিশেষ্য পদ পূর্বপদে বসলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন : স্বর্ণ দ্বারা মণ্ডিত=স্বর্ণমণ্ডিত

এরূপ : হীরকখচিত, চন্দনচর্চিত, রত্নশোভিত ইত্যাদি।

খ) পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি লোপ না হলে অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন :

তেলে ভাজা=তেলেভাজা, কলে ছাঁটা=কলেছাঁটা

এরূপ : তাঁতেবোনা, মায়েখেদানো, পোকায়কাটা (কাপড়), হাতেকাটা (সুতা)

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + দ্বারা/দিয়ে/কর্তৃক + বিশেষ্য=তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস

চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন :

গুরুকে ভক্তি=গুরুভক্তি              আরামের জন্য কেদারা=আরামকেদারা          বসতের নিমিত্ত বাড়ি=বসতবাড়ি 

বিয়ের জন্য পাগলা = বিয়েপাগলা

এরূপ : ছাত্রাবাস, ডাকমাশুল, চোষকাগজ, শিশুমঙ্গল, মুসাফিরখানা, হজ্জযাত্রা, মালগুদাম, রান্নাঘর, মাপকাঠি, মেয়েস্কুল, বালিকা-বিদ্যালয়, পাগলাগারদ ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + জন্য/নিমিত্ত + বিশেষ্য=চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস

পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে ইত্যাদি) লোপে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন:

খাঁচা থেকে ছাড়া=খাঁচাছাড়া                  বিলাত থেকে ফেরত= বিলাতফেরত

সাধারণত চ্যুত, আগত, ভীত, গৃহীত, বিরত, মুক্ত, উত্তীর্ণ, পালানো, ভ্রষ্ট ইত্যাদি পরপদের সঙ্গে যুক্ত হলে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: স্কুল থেকে পালানো= স্কুলপালানো         জেল থেকে মুক্ত=জেলমুক্ত

এরূপ : জেলখালাস, বোঁটাখসা, আগাগোড়া, শাপমুক্ত, ঋণমুক্ত

কোনো কোনো সময় পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে ‘এর’ ‘চেয়ে’ ইত্যাদি অনুসর্গের ব্যবহার হয়। যেমন: পরাণের চেয়ে প্রিয়= পরাণপ্রিয়।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + হতে/থেকে/চেয়ে + বিশেষ্য=পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস

ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তির (র, এর) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন :

চায়ের বাগান=চাবাগান          রাজার পুত্র=রাজপুত্র             খেয়ার ঘাট =খেয়াঘাট

এরূপ : ছাত্রসমাজ, দেশসেবা, দিল্লীশ্বর, বাঁদরনাচ, পাটক্ষেত, ছবিঘর, ঘোড়দৌড়, শ্বশুরবাড়ি, বিড়ালছানা ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + র/এর + বিশেষ্য=ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস

সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি (এ,য়, তে) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন :

গাছে পাকা= গাছপাকা       দিবায় নিন্দ্রা=দিবানিদ্রা

এরূপ: বাকপটু, গোলাভরা, তালকানা, অকালমৃত্যু, বিশ্ববিখ্যাত, ভোজনপটু, দানবীর, বাক্সবন্দি, বস্তাপচা, রাতকানা, মনমরা ইত্যাদি।

সপ্তমী তৎপুরুষ সমাসে কোনো কোনো সময় ব্যাসবাক্যে পরপদ সমস্তপদের পূর্বে আসে। যেমন :

পূর্বে ভূত=ভূতপূর্ব              পূর্বে অশ্রুত=অশ্রুতপূর্ব    পূর্বে অদৃষ্ট=অদৃষ্টপূর্ব

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + এ/তে/য় + বিশেষ্য=সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস

নঞ তৎপুরুষ সমাস

না বাচক নঞ অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন :

ন আচার=অনাচার        ন কাতর=অকাতর

এরূপ : অনাদর নাতিদীর্ঘ, নাতিখর্ব, অভাব, বেতাল ইত্যাদি।

খাঁটি বাংলায় অ, আ, না কিংবা অনা হয়। যেমন : ন কাল= অকাল বা আকাল

এরূপ : আধোয়া নামঞ্জুর, অকেজো, অজানা, অচেনা, আলুনি, নাছোড়, অনাবাদী, নাবালক ইত্যাদি।

না বাচক অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ অর্থে নঞ তৎপুরুষ সমাস হতে পারে। যেমন :

অভাব-ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস (বিশ্বাসের অভাব)     ভিন্নতা -ন লৌকিক = অলৌকিক     অল্পতা - ন কেশা = অকেশা

বিরোধ- ন সুর  = অসুর                             অপ্রশস্ত- ন কাল   = অকাল          মন্দ     - ন ঘাট = অঘাট

এরূপ : অমানুষ, অসঙ্গত, অভদ্র, অনন্য, অগম্য ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

ন /নাই /নয় (অ/অন/বে/না/নি/গর) + বিশেষ্য=নং/নঞ তৎপুরুষ সমাস

উপপদ তৎপুরুষ সমাস

যে পদের পরবর্তী ক্রিয়ামূলের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয় যুক্ত হয় সে পদকে উপপদ বলে। কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয় তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন : জলে চরে যা=জলচর            জল দেয় যে= জলদ         পঙ্কে জন্মে যা=পঙ্কজ

এরূপ : গৃহস্থ, সত্যবাদী, ইন্দ্রজিৎ, ছেলেধরা, ধামাধরা, পকেটমার, পাতাচাটা, হাড়ভাঙ্গা, মাছিমারা, ছারপোকা, ঘরপোড়া, বর্ণচোরা, গলাকাটা, পা-চাটা, পাড়াবেড়ানি, ছা-পোষা ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য + এ বিভক্তি + ক্রিয়া + যে = উপপদ তৎপুরুষ সমাস

অলুক তৎপুরুষ সমাস

যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন : গায়ে পড়া= গায়েপড়া

এরূপ : ঘিয়ে ভাজা, কলে ছাঁটা, কলের গান, গরুর গাড়ি ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের গাণিতিক সূত্র

বিশেষ্য+বিশেষ্য (বিভক্তি লোপ পায় না)=অলুক তৎপুরুষ সমাস

বহুব্রীহি সমাসের সংজ্ঞা

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্যকোনো পদকে বোঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: বহুব্রীহি (ধান) আছে যার=বহুব্রীহি। এখানে ‘বহু’ কিংবা ‘ব্রীহি’ কোনোটিরই অর্থের প্রাধান্য নেই, যার বহু ধান আছে এমন লোককে বোঝাচ্ছে।

বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত যার, যাতে ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্যরূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন :

আয়ত লোচন যার=আয়তলোচনা (স্ত্রী)    মহান আত্মা যার=মহাত্মা               স্বচ্ছ সলিল যার=স্বচ্ছসলিলা

নীল বসন যার=নীলবসনা                   স্থির প্রতিজ্ঞা যার=স্থিরপ্রতিজ্ঞ         ধীর বুদ্ধি যার=ধীরবুদ্ধি

‘সহ’ কিংবা ‘সহিত’ শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে ‘সহ’ ও ‘সহিত’ এর স্থলে ‘স’ হয়। যেমন :

বান্ধবসহ বর্তমান=সবান্ধব                 সহ উদর যার=সহোদর>সোদর

এরূপ : সজল, সফল, সদর্প, সলজ্জ, সকল্যাণ ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদে ‘অক্ষি’ শব্দের স্থলে ‘অক্ষ’ ও ‘নাভি’ শব্দ স্থলে ‘নাভ’ হয়। যেমন :

কমলের ন্যায় অক্ষি যার=কমলাক্ষ     পদ্ম নাভিতে যার=পদ্মনাভ

এরূপ : ঊর্ণনাভ

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘জায়া’ শব্দ স্থানে ‘জানি’ হয় এবং পূর্বপদের কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন :

যুবতী জায়া যার= যুবজানি (যুবতী স্থলে ‘যুব’ ও ‘জায়া’ স্থলে জানি হয়েছে)।

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘চুড়া’ শব্দ সমস্ত পদে ‘চূড়’ ও ‘কর্ম’ শব্দ সমস্ত পদে ‘কর্মা’ হয়। যেমন :

চন্দ্র চূড়া যার= চন্দ্রচূড়               বিচিত্র কর্ম যার=বিচিত্রকর্মা

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘গন্ধ’ শব্দ স্থানে ‘গন্ধি’ বা ‘গন্ধা’ হয়। যেমন :

সুগন্ধ যার=সুগন্ধি                             পদ্মের ন্যায় গন্ধ যার= পদ্মগন্ধি       মৎস্যের ন্যায় গন্ধ যার=মৎস্যগন্ধা

বহুব্রীহি সমাসের প্রকরণ ও গঠন

বহুব্রীহি সমাস আট প্রকার। যেমন : সমানাধিকরণ, ব্যাধিকরণ, ব্যতিহার, নঞ, মধ্যপদলোপী, প্রত্যয়ান্ত, অলুক ও সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

১. সাধারণ বহুব্রীহি

* বিশেষ্য+ বিশেষ্য+ যার=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য+ সপ্তমি বিভক্তি+ বিশেষ্য+ যার=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষণ+ বিশেষ্য+ যার=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য + র/এর + দিকে/সাথে+ বিশেষ্য+ যার=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য + বিশেষ্য + যে = বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য + ক্রিয়াপদ + যে=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য+ ক্রিয়া +যিনি=বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য+ ক্রিয়া +যিনি=বহুব্রীহি সমাস

* সংখ্যা + বিশেষ্য+ র/এর + বিশেষ্য +যার=বহুব্রীহি সমাস

  অথবা সংখ্যা + বিশেষ্য+ যে + বিশেষ্য +র/এর=বহুব্রীহি সমাস

২. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

* বিশেষণ + বিশেষ্য +যার =সমানাধিকার বহুব্রীহি সমাস

৩. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

* বিশেষ্য+ বিশেষ্য/ক্রিয়া বিশেষ্য+ যার = ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস

৪. ব্যতিহার বহুব্রীহি

* বিশেষ্য-বিভক্তি+বিশেষ্য-বিভক্তি+ যে+ ক্রিয়াবিশেষ্য /নামক্রিয়া =ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস

৫. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

* বিশেষ্য+ র/এর + সহিত বর্তমান = মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য+ বিশেষ্য+ দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস

৬. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

* বিশেষ্য + বিশেষ্য +প্রত্যয়+যার = প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

৭. অলুক বহুব্রীহি

* বিশেষ্য + বিভক্তি + বিশেষ্য + যার = অলুক বহুব্রীহি (বিভক্তি লোপ পায় না)

৮. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

* সংখ্যাবাচক বিশেষ্য +বিশেষ্য + প্রত্যয়+যার = সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

৯. নঞ বহুব্রীহি

* বিশেষ্য+ নাই/+যাতে=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস অথবা নাই +বিশেষ্য+ যার=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

* নয়+ বিশেষ্য + (যার) =নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

* ন (নয় করা যায়) + বিশেষ্য+ যা=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য হলে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন :

হত হয়েছে শ্রী যার=হতশ্রী          খোশ মেজাজ যার= খোশমেজাজ

এরূপ : হৃতসর্বস্ব, উচ্চশির, পীতাম্বর, নীলকণ্ঠ, জবরদস্তি, সুশীল, সুশ্রী, বদবখ্ত, কমবখ্ত ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

বিশেষণ + বিশেষ্য +যার =সমানাধিকার বহুব্রীহি সমাস

ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ এবং পরপদ কোনোটিই যদি বিশেষণ না হয় তবে তাকে বলে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি। যেমন :

আশীতে (দাঁতে) বিষ যার=আশীবিষ           কথা সর্বস্ব যার=কথাসর্বস্ব

পরপদ কৃদন্ত বিশেষণ হলেও ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন :

দুই কান কাটা যার=দু কানকাটা              বোঁটা খসেছে যার= বোঁটাখসা

এরূপ : ছা-পোষা, পা-চাটা, পাতা- চাটা, পাতাছেঁড়া, ধামাধরা ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

বিশেষ্য+ বিশেষ্য/ক্রিয়া বিশেষ্য+ যার = ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস

ব্যতিহার বহুব্রীহি

ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যতিহার বহুব্রীহি হয়। এ সমাসে পূর্বপদে ‘আ’ এবং উত্তরপদে ‘ই’ যুক্ত হয়। যেমন :

হাতে হাতে যে যুদ্ধ=হাতাহাতি         কানে কানে যে কথা=কানাকানি

এরূপ: চুলাচুলি, কাড়াকাড়ি, গালাগালি, দেখাদেখি, কোলাকুলি, লাঠালাঠি, হাসাহাসি, গুঁতাগুঁতি, ঘুষাঘুষি ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

বিশেষ্য-বিভক্তি+বিশেষ্য-বিভক্তি+ যে+ ক্রিয়াবিশেষ্য /নামক্রিয়া =ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস

নঞ বহুব্রীহি

বিশেষ্য পূর্বপদের আগে নঞ্ (না অর্থবোধক) অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস করা হলে তাকে নঞ বহুব্রীহি বলে। নঞ বহুব্রীহি সমাসে সাধিত পদটি বিশেষণ হয়। যেমন :

ন (নাই) জ্ঞান যার=অজ্ঞান           বে (নাই) হেড যার=বেহেড          না (নাই) চারা (উপায়) যার=নাচার

নি (নাই) ভুল যার=নির্ভুল             না (নয়) জানা যা=নাজানা /অজানা

এরূপ: নাহক, নিরূপায়, নির্ঝঞ্ঝাট, অবুঝ, অকেজো, বেপরোয়া, বেহুশ, অনন্ত, বেতার ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

 বিশেষ্য+ নাই/+যাতে=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস অথবা নাই +বিশেষ্য+ যার=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

 নয়+ বিশেষ্য + (যার) =নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

 ন (নয় করা যায়) + বিশেষ্য+ যা=নং/নঞ বহুব্রীহি সমাস

মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোনো অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন :

বিড়ালের চোখের ন্যায় চোখ যে নারীর=বিড়ালচোখী       

হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে=হাতেখড়ি

এরূপ : গায়েহলুদ, মেনিমুখো ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

* বিশেষ্য+ র/এর + সহিত বর্তমান = মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস

* বিশেষ্য+ বিশেষ্য+ দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস

প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে ‘আ’, ‘এ’, ‘ও’ ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি। যেমন :

এক দিকে চোখ (দৃষ্টি) যার=একচোখা (চোখ+আ)           ঘরের দিকে মুখ যার=ঘরমুখো (মুখ+ও)

নি (নেই) খরচ যার=নি খরচে (খরচ+এ)

এরূপ: দোটানা, দোমনা, একগুঁয়ে, অকেজো, একঘরে, দোনলা, দোতলা, ঊনপাজুরে ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

বিশেষ্য + বিশেষ্য +প্রত্যয়+যার = প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

অলুক বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে।

অলুক বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদটি বিশেষণ হয়। যেমন : মাথায় পাগড়ি যার=মাথায়পাগড়ি   গলায় গামছা যার=গলায়গামছা (লোকটি)

এরূপ : হাতে-খড়ি, কানে-কলম, গায়ে-পড়া, হাতে-বেড়ি, মাথায়-ছাতা, মুখে-ভাত, কানে-খাটো ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

বিশেষ্য + বিভক্তি + বিশেষ্য + যার = অলুক বহুব্রীহি (বিভক্তি লোপ পায় না)

সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। এ সমাসে সমস্তপদে ‘আ’ বা ‘ঈ’ যুক্ত হয়। যেমন : দশ গজ পরিমাণ যার=দশগজি           চৌ (চার) চাল যে ঘরের=চৌচালা

এরূপ : চারহাতি, তেপায়া ইত্যাদি। কিন্তু সে (তিন) তার (যে যন্ত্রের) =সেতার (বিশেষ)।

বহুব্রীহি সমাসের গাণিতিক গঠন

সংখ্যাবাচক বিশেষ্য +বিশেষ্য + প্রত্যয়+যার = সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাস কোনো নিয়মের অধীনে নয় সেই সমাসকে নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি বলে। যেমন : 

দু দিকে অপ যার=দ্বীপ                      অন্তর্গত অপ যার=অন্তরীপ              নরাকারের পশু যে=নরপশু   

জীবিত থেকেও যে মৃত= জীবন্মৃত  পণ্ডিত হয়েও যে মুর্খ=পণ্ডিতমুর্খ

অব্যয়ীভাব সমাসের সংজ্ঞা

পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। অব্যয়ীভাব সমাসে কেবল অব্যয়ের অর্থযোগে ব্যাসবাক্যটি রচিত হয়। যেমন :

জানু পর্যন্ত লম্বিত (পর্যন্ত শব্দের অব্যয় ‘আ’) = আজানুলন্বিত (বাহু)        মরণ পর্যন্ত=আমরণ

অব্যয়ীভাব সমাসের প্রকরণ

সামীপ্য (নৈকট্য), বিপ্সা (পৌনঃপুনিকতা), পর্যন্ত, অভাব, অনতিক্রম্যতা, সাদৃশ্য, যোগ্যতা প্রভৃতি নানা অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস হয়। নিচের উদাহরণগুলোতে অব্যয়ীভাব সমাসের অব্যয় পদটি বন্ধনীর মধ্যে দেখানো হলো।

১. সামীপ্য (উপ) : কণ্ঠের সমীপে=উপকণ্ঠ, কূলের সমীপে= উপকূল

২. বিপ্সা (অনু, প্রতি)         : দিন দিন=প্রতি দিন, ক্ষণে ক্ষণে= প্রতিক্ষণে, ক্ষণ ক্ষণ=অনুক্ষণ

৩. অভাব (নিঃ=নির)          : আমিষের অভাব=নিরামিষ, ভাবনার অভাব=নির্ভাবনা, জলের অভাব-নির্জল

                                             উৎসাহের অভাব= নিরুৎসাহ

৪. পর্যন্ত (আ)      : সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত= আসমুদ্রহিমাচল, পা থেকে মাথা পর্যন্ত=আপাদমস্তক

৫. সাদৃশ্য (উপ)  : শহরের সদৃশ=উপশহর, গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ, বনের সদৃশ=উপবন

৬. অনতিক্রম্যতা (যথা)    : রীতিকে অতিক্রম না করে= যথারীতি, সাধ্যকে অতিক্রম না করে=যথাসাধ্য

                                            এরূপ : যথাবিধি, যথাযোগ্য

৭. অতিক্রান্ত (উৎ)             : বেলাকে অতিক্রান্ত=উদ্বেল, শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত =উচ্ছৃঙ্খল

৮. বিরোধ (প্রতি)                : বিরুদ্ধ বাদ=প্রতিবাদ, বিরুদ্ধ কূল= প্রতিকুল

৯. পশ্চাৎ (অনু)   : পশ্চাৎ গমন=অনুগমন, পশ্চাৎ ধাবন= অনুধাবন

১০. ঈষৎ (আ)     : ঈষৎ নত=আনত, ঈষৎ রক্তিম=আরক্তিম

১১. ক্ষুদ্র অর্থে (উপ)       : উপগ্রহ, উপনদী

১২. পূর্ণ বা সমগ্র অর্থে (পরি বা সম)            : পরিপূর্ণ, সম্পূর্ণ

১৩. দূরবর্তী অর্থে (প্র, পর)              : অক্ষির অগোচরে=পরোক্ষ। এরূপ : প্রপিতামহ

১৪. প্রতিনিধি অর্থে (প্রতি)               : প্রতিচ্ছায়া, প্রতিচ্ছবি, প্রতিবিদ্ধ

১৫. প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থে (প্রতি)               : প্রতিপক্ষ, প্রত্যুত্তর

প্রাদি সমাস

উল্লিখিত প্রধান ছয়টি সমাস ছাড়াও কয়েকটি অপ্রধান সমাস রয়েছে। প্রাদি, নিত্য, উপপদ ও অলুক সমাস সম্বন্ধে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো। এসব সমাসের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায় না। এজন্য এদের অপ্রধান মনে করা হয়।

প্র, পরি, অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎপ্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয় তবে তাকে বলে প্রাদি সমাস। যেমন :

* প্র (প্রকৃষ্ট রূপে)  যে বচন=প্রবচন                 

* প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) ভাত (আলোকিত)=প্রভাত

* প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) গতি=প্রগতি

* পরি (চতুর্দিকে) যে ভ্রমণ= পরিভ্রমণ

* অনুতে (পশ্চাতে) যে তাপ=অনুতাপ         

নিত্যসমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্যসমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয় না তাকে নিত্যসমাস বলে। তদর্থবাচক ব্যাখ্যামূলক শব্দ বা বাক্যাংশ যোগে এগুলোর অর্থ বিশদ করতে হয়। যেমন :

অন্য গ্রাম=গ্রামান্তর                                           কেবল দর্শন =দর্শনমাত্র             অন্য গৃহ=গৃহান্তর

(বিষাক্ত) কাল (যম) তুল্য (কাল বর্ণের নয়) সাপ=কালসাপ    তুমি আমি ও সে=আমরা            দুই এবং নব্বই=বিরানব্বই

বিশেষ দ্রষ্টব্য /জ্ঞাতব্য

১. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে শব্দ পরিবর্তন হয়ে বসে। যেমন:

*রাজা স্থলে রাজ           * পিতা/মাতা/ভ্রাতা স্থলে পিতৃ/মাতৃ/ভ্রাতৃ হয়

যেমন :

গজনীর রাজা=গজনীরাজ        রাজার পুত্র = রাজপুত্র        পিতার ধন=পিতৃধন             মাতার সেবা = মাতৃসেবা

ভ্রাতার স্নেহ= ভ্রাতৃস্নেহ         পুত্রের বধূ = পুত্রবধু

২. ব্যাসবাক্যে ‘রাজা’ শব্দ পরে থাকলে সমস্তপদে তা আগে আসে। যেমন: পথের রাজা=রাজপথ, হাঁসের রাজা=রাজহাঁস।

৩. পরপদে সহ, তুল্য, নিভ, প্রায়, সহ প্রতিম-এসব পক্ষ থাকলেও ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন :

পত্নীর সহ= পত্নীসহ            কন্যার সহ=কন্যাসহ        সহোদরের প্রতিম= সহোদরপ্রতিম /সোদরপ্রতিম

৪. কালের কোনো অংশবোধক শব্দ পরে থাকলে তা পূর্বে বসে। যেমন : অহ্নের (দিনের) পূর্বভাগ=পূর্বা‎হ্ন।

৫. পরপদে রাজি, গ্রাম, বৃন্দ, গণ, যূথ প্রভৃতি সমষ্টিবাচক শব্দ থাকলে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন :

ছাত্রের বৃন্দ= ছাত্রবৃন্দ          গুণের গ্রাম-গুণগ্রাম                  হস্তীর যুথ=হস্তীযুথ

৬. অর্ধ শব্দ পরপদ হলে সমস্তপদে তা পূর্বপদ হয়। যেমন : পথের অর্ধ-অর্ধপথ, দিনের অর্ধ-অর্ধদিন

৭. শিশু ও দুগ্ধ শব্দ পরে থাকলে স্ত্রীবাচক পূর্বপদ পুরুষবাচক হয়। যেমন : মৃগীর শিশু=মৃগশিশু  ছাগীর দুগ্ধ=ছাগদুগ্ধ

৮. অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস

ঘোড়ার ডিম         মাটির মানুষ         হাতের পাঁচ           মামার বাড়ি          সাপের পা                             মনের মানুষ        

কলের গান

কিন্তু ভ্রাতার পুত্র=ভ্রাতুষ্পুত্র (নিপাতনে সিদ্ধ)

৯. গায়েহলুদ, হাতেখড়ি প্রভৃতি সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় না অর্থাৎ হলুদ বা খড়ি বোঝায় না, অনুষ্ঠান বিশেষকে বোঝায়। সুতরাং এগুলো অলুক তৎপুরুষ নয়, অলুক বহুব্রীহি সমাস।

উপসর্গের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বাংলা ভাষায় এমন কতগুলো অব্যয়সূচক শব্দাংশ রয়েছে যা স্বাধীন পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না। এগুলো অন্য শব্দের আগে বসে। এর প্রভাবে শব্দটির কয়েক ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়। যেমন :

১. নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি হয়       

২. শব্দের অর্থের পূর্ণতা সাধিত হয়       

৩. শব্দের অর্থের সম্প্রসারণ ঘটে                

৪. শব্দের অর্থের সংকোচন ঘটে         

৫. শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে

ভাষায় ব্যবহৃত এসব অব্যয়সূচক শব্দাংশের নাম উপসর্গ। যেমন : ‘কাজ’ একটি শব্দ। এর আগে ‘অ’ অব্যয়টি যুক্ত হলে হয় ‘অকাজ’- যার অর্থ নিন্দনীয় কাজ। এখানে অর্থেও সংকোচন হয়েছে।

‘পূর্ণ’ (ভরা) শব্দের আগে ‘পরি’ যোগ করায় ‘পরিপূর্ণ’ হলো। এটি পূর্ণ শব্দের সম্প্রসারিত রূপ (অর্থে ও আকৃতিতে)।

‘হার’ শব্দের পূর্বে ‘আ’ যুক্ত করে ‘আহার’ ‘প্র’ যুক্ত করে ‘প্রহার’ (মারা), ‘বি’ যুক্ত করে ‘বিহার’ (ভ্রমণ) ‘পরি’ যোগ করে ‘পরিহার’ (ত্যাগ), ‘উপ’ যোগ করে ‘উপহার’ (পুরস্কার), ‘সম’ যোগ করে ‘সংহার’ (বিনাশ) ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে বিভিন্ন শব্দ তৈরি হয়েছে।

উপসর্গগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অন্য শব্দের আগে যুক্ত হলে এদের অর্থদ্যোতকতা বা নতুন শব্দ সৃজনের ক্ষমতা থাকে।

বাংলা ভাষায় তিন প্রকার উপসর্গ আছে। যেমন : ১. বাংলা       ২. তৎসম /সংস্কৃত        ৩. বিদেশি উপসর্গ

বাংলা উপসর্গ

বাংলা উপসর্গ মোট ২১টি : অ, অঘা, অজ, অনা, আ, আড়, আন, আব, ইতি, ঊন (ঊনা), কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা।

নিচে এদের প্রয়োগ দেখানো হলো।

   উপসগ               অর্থদ্যোতকতা                                     উদাহরণ

১. অ                       নিন্দিত     অর্থে                       অকেজো, অচেনা, অপয়া

    -                         অভাব         ”                              অচিন, অজানা, অথৈ

    -                         ক্রমাগত       ”                              অঝোর, অঝোরে

২. অঘা                      বোকা         ”                              অঘারাম, অঘাচণ্ডী

৩. অজ                   নিতান্ত (মন্দ)   ”                              অজপাড়াগাঁ, অজমুর্খ, অজপুকুর

৪. অনা                       অভাব         ”                              অনাবৃষ্টি, অনাদর

    -                           ছাড়া            ”                              অনাছিষ্টি, অনাচার

    -                            অশুভ          ”                              অনামুখো

৫. আ                          অভাব         ”                              আকাঁড়া, আধোয়া, আলুনি

    -                          বাজে, নিকৃষ্ট    ”                              আকাঠা, আগাছা

৬. আড়                         বক্র           ”                              আড়চোখে, আড়নয়নে

    -                          আধা, প্রায়       ”                              আক্ষ্যাপা, আড়মোড়া, আড়পাগলা

    -                          বিশিষ্ট           ”                              আড়কোলা (পাথালিকোলা), আড়গড় (আস্তাবর)

৭. আন                         না             ”                              আনকোরা

                                বিক্ষিপ্ত          ”                              আনচান, আনমনা

৮. আব                  অস্পষ্টতা            ”                              আবছায়া, আবডাল

৯. ইতি                  এ বা এর             ”                              ইতিকর্তব্য, ইতিপূর্বে

    -                          পুরনো             ”                              ইতিকথা, ইতিহাস

১০. ঊন/ঊনা                   কম           ”                              ঊনপাঁজুরে, উনিশ

১১. কদ্                 নিন্দিত               ”                              কদবেল, কদর্য, কদাকার

১২. ক                কুৎসিত/অপকর্ষ        ”                              কুঅভ্যাস, কুকথা, কুনজর, কুসঙ্গ

১৩. নি                   নাই/নেতি             ”                            নিখুঁত, নিখোঁজ, নিলাজ, নিভাঁজ, নিরেট

১৪. পাতি                      ক্ষুদ্র              ”                           পাতিহাঁস, পাতিশিয়াল, পাতিলেবু, পাতকুয়ো

১৫. বি             ভিন্নতা/নাই বা নিন্দনীয়   ”                              বিভূঁই, বিফল, বিপথ

১৬. ভর                      পূর্ণতা               ”                              ভরটে, ভরসাঁঝ, ভরপুর, ভরদুপুর, ভরসন্ধ্যে

১৭. রাম                 বড় বা উৎকৃষ্ট         ”                              রামছাগল, রামদা, রামশিঙ্গা, রামবোকা

১৮. স                         সঙ্গে                 ”                              সরাজ, সরব, সঠিক, সজোর, সপাট

১৯. সা                        উৎকৃষ্ট               ”                              সাজিরা, সাজোয়ান

২০. সু                         উত্তম                ”                           সুনজর, সুখবর, সুদিন, সুনাম সুকাজ

২১. হা                        অভাব                ”                              হাপিত্যেশ, হাভাতে, হাঘরে

জ্ঞাতব্য : বাংলা উপসর্গ সাধারণত বাংলা শব্দের পূর্বেই যুক্ত হয়ে থাকে।

বাক্যে বাংলা উপসর্গের উদাহরণ

আমি অবেলাতে দিলাম পাড়ি অথৈ সায়রে।              

অঘারাম বাস করে অজ পাড়াগাঁয়ে।             

ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া।

আকাঠার নায়ে দিলাম কাঁঠালের গলুই।                      

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

ইতিহাস কথা কয়। ঊনাভাতে দুনা বল।                       

নিনাইয়ার শতেক নাও।

ভর দুপুরে কোথায় যাও?                                 

এতদিন কোথায় নিখোঁজ হয়েছিলে?

আমি অবেলাতে দিলাম পাড়ি অথৈ সায়রে।              

অঘারাম বাস করে অজ পাড়াগাঁয়ে।             

ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া।

আকাঠার নায়ে দিলাম কাঁঠালের গলুই।                      

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

ইতিহাস কথা কয়। ঊনাভাতে দুনা বল।                       

নিনাইয়ার শতেক নাও।

ভর দুপুরে কোথায় যাও?                                 

এতদিন কোথায় নিখোঁজ হয়েছিলে?

সংস্কৃত/তৎসম উপসর্গ

বাংলা ভাষায় বহু সংস্কৃত শব্দ হুবহু এসে গেছে। সেই সঙ্গে সংস্কৃত উপসর্গও তৎসম শব্দের আগে বসে শব্দের নতুন রূপে অর্থের সংকোচন সম্প্রসারণ করে থাকে।

তৎসম উপসর্গ বিশটি : প্র, পরা, অপ, সম, নি, অনু, অব, নির, দুর, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অতি, অপি, অভি, উপ, আ।

বাংলা উপসর্গ যেমন বাংলা শব্দের আগে বসে তেমনি তৎসম উপসর্গ তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের আগে বসে।

বাংলা উপসর্গের মধ্যে ‘আ, সু, নি, বি’-চারটি উপসর্গ তৎসম শব্দেও পাওয়া যায়। বাংলা ও সংস্কৃত উপসর্গের মধ্যে পার্থক্য এই যে, যে শব্দটির সঙ্গে উপসর্গ যুক্ত হয় সেই শব্দটি বাংলা হলে উপসর্গটি বাংলা আর যে শব্দটি তৎসম হলে সেই উপসর্গটিও তৎসম হয়। যেমন : আকাশ, সুনজর, বিনামা, নিলাজ বাংলা শব্দ। অতএব উপসর্গ আ, সু, বি, নি এগুলোও বাংলা। আর আকণ্ঠ, সুতীক্ষ্ণ, বিপক্ষ ও নিদাঘ তৎসম শব্দ। কাজেই এসব শব্দের উপসর্গ আ, সু, বি, নি তৎসম উপসর্গ।

বাক্যে তৎসম উপসর্গের উদাহরণ

কালের প্রভাবে নিয়মের পরিবর্তন ঘটেছে। ওসমান রণক্ষেত্রে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেও পরাজিত হলেন। সমাগত সুধীজনকে সাদর অভিনন্দন জানানো হলো। তাঁর পুত্রদের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান নেই বলে তাঁর দুঃখের সীমা-পরিসীমা নেই। দুর্ভাগ্যবশত ঢাকার অধিবাসীরা আজ দুর্ভিক্ষপীড়িত অথচ তারাই ছিলো।

বিদেশি উপসর্গ

আরবি, ফারসি, ইংরেজি, হিন্দি-এসব ভাষার বহু শব্দ দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষায় প্রচলিত রয়েছে। এর কতগুলো খাঁটি উচ্চারণে আবার কতগুলো বিকৃত উচ্চারণে বাংলায় ব্যবহৃত হয়। এ সঙ্গে কতগুলো বিদেশি উপসর্গও বাংলায় চালু রয়েছে। দীর্ঘকাল ব্যবহারে এগুলো বাংলা ভাষায় বেমালুম মিশে গিয়েছে। বেমালুম শব্দটিতে ‘মালুম’ আরবি শব্দ আর ‘বে’ ফারসি উপসর্গ। এরূপ : বেহায়া, বেনজির, বেশরম, বেকার ইত্যাদি। নিচে কয়েকটি বিদেশি উপসর্গের উদাহরণ দেয়া হলো।

ফারসি উপসর্গ

উপসর্গ               যে অর্থে প্রযুক্ত                                             উদাহরণ

০১. কার্           কাজ            অর্থে                        কারখানা, কারসাজি, কারচুপি, কারবার, কারদানি

০২. দর্            মধ্যস্থ, অধীন     ”                              দরপত্তনী, দরপাট্টা, দরদালান

০৩. না                   না             ”                              নাচার, নারাজ, নামঞ্জুর, নাখোশ, নালায়েক

০৪. নিম্               আধা            ”                              নিমরাজি, নিমখুন

০৫. ফি                 প্রতি            ”                              ফি-রোজ, ফি-হপ্তা, ফি-বছর, ফি-সন, ফি-মাস

০৬. বদ্                 মন্দ            ”                              বদমেজাজ, বদরাগী, বদমাশ, বদহজম, বদনাম

০৭. বে                    না             ”                     বেআদব, বেআক্কেল, বেকসুর, বেকায়দা, বেগতিক, বেতার

০৮. বর্            বাইরে, মধ্যে      ’’                       বরখাস্ত, বরদাস্ত, বরখেলাপ, বরবাদ

০৯. ব্                  সহিত            ”                              বমার, বনাম, বকলম

১০. কম্                স্বল্প             ”                              কমজোর, কমবখ্ত

আরবি উপসর্গ

উপসর্গ  যে অর্থে প্রযুক্ত                             উদাহরণ

১. আম্  সাধারণ                 অর্থে       আমদরবার, আমমোক্তার

২. খাস  বিশেষ                   ”            খাসমহল, খাসখবর, খসকামরা, খাসদরবার

৩. লা     না                         ”           লাজওয়াব, লাখেরাজ, লাওয়ারিশ, লাপাত্তা

৪. র্গ       অভাব                    ”           গরমিল, গরহাজির, গররজি

ইংরেজি উপসর্গ

উপসর্গ       যে অর্থে প্রযুক্ত                                                               উদাহরণ

১. ফুল                   পূর্ণ                                         অর্থে       ফুল-হাতা, ফুল-শার্ট, ফুল-বাবু, ফুল-প্যান্ট

২. হাফ                  আধা                                      ”                              হাফ-হাতা, হাফ-টিকেট, হাফ-স্কুল, হাফ-প্যান্ট

৩. হেড                   প্রধান                                     ”                              হেড-মাস্টার, হেড-অফিস, হেড-পন্ডিত, হেড-মৌলভি

৪. সাব                   অধীন                                     ”                              সাব-অফিস, সাব-জজ, সাব-ইনসপক্টের

প্রাদেশিক উপসর্গ (উর্দু-হিন্দি)

উপসর্গ            যে অর্থে প্রযুক্ত                                    উদাহরণ

১. হর                  প্রত্যেক                 অর্থে       হররোজ, হরমাহিনা, হরকিসিম, হরহামেশা

বাক্যে বিদেশি উপসর্গের উদাহরণ

হিসেবে গরমিল থাকলে খাসমহল লাটে উঠবে। বহাল তবিয়তে দস্তখত করে ফি-রোজ হেড-অফিসে আসা যাওয়া কর।

বাংলা ও সংস্কৃত ধাতুর সাধারণ আলোচনা

বাংলা ভাষায় বহু ক্রিয়াপদ রয়েছে। সেসব ক্রিয়াপদের মূল অংশকে বলা হয় ধাতু বা ক্রিয়ামূল অন্যকথায় ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে দুটো অংশ পাওয়া যায় :

১. ধাতু বা ক্রিয়ামূল

২. ক্রিয়া বিভক্তি

ক্রিয়াপদ থেকে ক্রিয়া বিভক্তি বাদ দিলে যা থাকে তাই ধাতু। যেমন : ‘করে’ একটি ক্রিয়াপদ। এতে দুটো অংশ রয়েছে : কর+এ; এখানে ‘কর’ ধাতু বা ক্রিয়ামূলের সঙ্গে ‘এ’ বিভক্তি যুক্ত হয়ে ‘করে’ ক্রিয়াপদটি গঠিত হয়েছে।

প্রচলিত বেশকিছু ধাতু বা ক্রিয়ামূল চেনার একটা উপায় হলো : বর্তমান কালের অনুজ্ঞায় তুচ্ছার্থক মধ্য পুরুষের ক্রিয়ার রূপ লক্ষ করা : কারণ, এই রূপ আর ধাতুরূপ এক। যেমন : তুই, কর্ খা, যা, ডাক্, দেখ্, লেখ্ ইত্যাদি। এগুলো যেমন ধাতুও, তেমনি মধ্যম পুরুষের তুচ্ছার্থক বর্তমান কালের অনুজ্ঞার ক্রিয়াপদও।

ধাতুর প্রকরণ

ধাতুকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

১. মৌলিক ধাতু : যেসব ধাতু বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় তাদের মৌলিক ধাতু বলে।

২. সাধিত ধাতু : মৌলিক ধাতু কিংবা কোনো কোনো নামশব্দের সঙ্গে আ-প্রত্যয়যোগে যে ধাতু গঠিত হয় তাকে সাধিত ধাতু বলে।

৩. যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু : বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে কর্, দে, পা, খা, ছাড় ইত্যাদি মৌলিক ধাতু সংযুক্ত হয়ে যে নতুন ধাতু গঠিত হয় তাকে সংযোগমূলক ধাতু বলে।

মৌলিক ধাতুর সংজ্ঞা ও প্রকরণ

যেসব ধাতু বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় তাদের মৌলিক ধাতু বলে। এদের সিদ্ধ বা স্বয়ংসিদ্ধ ধাতুও বলা হয়। যেমন : চল্, পড়, কর্, শো, হ, খা ইত্যাদি।

বাংলা ভাষায় মৌলিক ধাতুকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন : বাংলা, সংস্কৃত ও বিদেশি ধাতু।

বাংলা ধাতু

যেসব ধাতু বা ক্রিয়ামূল সংস্কৃত থেকে সোজাসুজি আসেনি তাদের বাংলা ধাতু বলে। যেমন : কাট্, কাঁদ, জান্, নাচ্ ইত্যাদি।

সংস্কৃত ধাতু

বাংলা ভাষায় যেসব তৎসম ক্রিয়াপদের ধাতু প্রচলিত রয়েছে তাদের সংস্কৃত ধাতু বলে। যেমন : কৃ, কাঁদ, জান্, নাচ্ ইত্যাদি।

এখানে সংস্কৃত ধাতু ও তা থেকে গঠিত পদ এবং সংস্কৃত ধাতুর একই অর্থবোধক বাংলা ধাতু ও তা থেকে গঠিত পদের উদাহরণ দেয়া হলো।

সংস্কৃত ধাতু          সাধিত পদ                   বাংলা ধাতু            সাধিত পদ

অঙ্ক্                   অঙ্কন, অঙ্কিত                       আঁক্                  আঁকা

কথ্                     কথ্য, কথিত                       কহ্               কওয়া, কহন

কৃৎ                     কর্তন, কর্তিত                       কাট্                কাটা

কৃ                        কৃত, কর্তব্য                         কর              করা, করে

ক্রন্দ্                        ক্রন্দন                            কাঁদ্        কাঁদা, কাঁদুনে

ক্রী                         ক্রয়, ক্রীত                        কিন্        কেনা, কেনাকাটা

খাদ্                        খাদ্য, খাদক                      খা           খাওয়া, খাওন

গঠ্                              গঠিত                          গড়্         গড়া, গড়ন

ঘৃষ্                           ঘৃষ্ট ঘর্ষণ                         ঘষ্          ঘষা

দৃশ্                             দৃশ্য, দর্শন                    দেখ্        দেখা, দেখন

ধৃ                              ধৃত, ধারণ                       ধর্          ধরা, ধরন

পঠ্                       পঠন, পাঠ্য, পঠিত                  পড়         পড়া, পড়ন

বন্ধ্                                   বন্ধন                       বাঁধ্         বাঁধন, বাঁধা

বুধ্                             বুদ্ধ, বোধ                          বুঝ্         বুঝার্

ক্ষ                           রক্ষণ, রক্ষিত, রক্ষী                  রাখ্        রাখা

শ্রু                               শ্রবণ, শ্রুত                        শুন্            শুনা, শোনা

স্থা                              স্থান, স্থানীয়                          থাক্        থাকা

হস্                                হাস, হাসন                      হাস্         হাসা, হাসি

বিদেশাগত ধাতু

প্রধানত হিন্দি এবং ক্বচিৎ আরবি-ফারসি ভাষা থেকে যেসব ধাতু বা ক্রিয়ামূল বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে তাদের বিদেশাগত ধাতু বা ক্রিয়ামূল বলা হয়। যেমন : ভিক্ষে মেগে খায়। এ বাক্যে ‘মাগ’ ধাতু হিন্দি ‘মঙ্’ থেকে আগত। এছাড়াও কতগুলো ক্রিয়ামূল রয়েছে যাদের ক্রিয়ামূলের মূল ভাষা নির্ণয় করা কঠিন। এ ধরনের ক্রিয়ামূলকে বলা হয় অজ্ঞাতমূল ধাতু। যেমন : ‘হের ঐ দুয়ারে দাঁড়িয়ে কে? ‘এ বাক্যে ‘হের’ ধাতুটি কোন ভাষা থেকে আগত তা জানা যায় না। তাই এটি অজ্ঞাতমূল ধাতু।

ধাতু        যে অর্থে ব্যবহৃত হয়          ধাতু        যে অর্থে ব্যবহৃত হয়

আঁট        শক্ত করে বাঁধা                 ফির্           পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি

খাট্         মেহনত করা                   চাহ্         প্রার্থনা করা

চেঁচ্         চিৎকার করা                   বিগড়     নষ্ট হওয়া

জম্         ঘনীভূত হওয়া                 ভিজ্       সিক্ত হওয়া

ঝুল্         দালা                            ঠেল্        ঠেলা

টান্         আকর্ষণ                         ডাক্        আহ্বান করা

টুট্           ছিন্ন হওয়া                     লটক্      ঝুলানো

ডর্           ভীত হওয়া

সাধিত ধাতুর সংজ্ঞা ও প্রকরণ

মৌলিক ধাতু কিংবা কোনো কোনো নাম- শব্দের সঙ্গে ‘আ’ প্রত্যয় যোগে যে ধাতু গঠিত হয় তাকে সাধিত ধাতু বলে। যেমন : দেখ্+আ= দেখা, পড়+আ=পড়া, বল+আ=বলা। সাধিত ধাতুর সঙ্গে কাল ও পুরুষসূচক বিভক্তি যুক্ত করে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন : মা শিশুকে চাঁদ দেখায়। (এখানে দেখ্+আ+বর্তমান কালের সাধারণ নামপুরুষের ক্রিয়া বিভক্তি ‘য়’=দেখায়)। এরূপ : শোনায়, বসায় ইত্যাদি। গঠনরীতি ও অর্থের দিক থেকে সাধিত ধাতুকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যেমন :

১. নামধাতু

২. প্রযোজক (নিজন্ত) ধাতু

৩. কর্মবাচ্যের ধাতু

নামধাতু

বিশেষ্য, বিশেষণ এবং অনুকার অব্যয়ের পরে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে যে নতুন ধাতুটি গঠিত হয় তাই নাম ধাতু। যেমন: সে ঘুমাচ্ছে। ‘ঘুম্’ থেকে নামধাতু ‘ঘুমা’। ‘ধমক্’ থেকে নামধাতু ‘ধমকা’। যেমন আমাকে ধমকিও না।

প্রযোজক ধাতু

মৌলিক ধাতুর পরে প্রেরণার্থ (অপরকে নিয়োজিত করা অর্থে)। ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে প্রযোজক ধাতু বা নিজন্ত ধাতু গঠিত হয়। যেমন: কর্+আ=করা (এখানে ’কর্’ একটি ধাতু)। যেমন : সে নিজে করে না, আর একজনকে দিয়ে করায়। অনুরূপভাবে- পড়+আ=পড়া; তিনি ছেলেকে পড়াচ্ছেন।

কর্মবাচ্যের ধাতু

মৌলিক ধাতুর সঙ্গে ‘আ’ প্রত্যয় যোগে কর্মবাচ্যের ধাতু সাধিত হয়। এটি বাক্যমধ্যস্থ কর্মপদের অনুসারী ক্রিয়ার ধাতু। যেমন : দেখ্+আ=দেখা; কাজটি ভালো দেখায় না। ধর্+আ= হারা; যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর।

‘কর্মবাচ্যের ধাতু’ বলে আলাদা নামকরণের প্রয়োজন নেই। কারণ, এটি প্রযোজক ধাতুরই, অন্তর্ভূক্ত। যেমন : ‘দেখায়’ ও ‘হারায়’ প্রযোজক ধাতু।

যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু

বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে কর্, দে, পা, খা, ছাড় ইত্যাদি মৌলিক ধাতু সংযুক্ত হয়ে যে নতুন ধাতু গঠিত হয় তাই সংযোগমূলক ধাতু। যেমন : যোগ (বিশেষ্য পদ) + কর্ (ধাতু)=‘যোগ কর’ (সংযোগমূলক ধাতু)। বাক্য-তিনের সঙ্গে পাঁচ যোগ করো। সাবধান (বিশেষ্য) +হ (ধাতু=সাবধান হ, সংযোগমূলক ধাতু)। বাক্য-এখনও সাবধান হও, নতুবা আখেরে খারাপ হবে। সংযোগমূলক ধাতুজাত ক্রিয়া সকর্মক ও অকর্মক দুই হতে পারে।

নিচে সংযোগমূলক ধাতু যোগে গঠিত কয়েকটি ক্রিয়াপদের উদাহরণ দেওয়া হলো। যেমন :

১. কর্-ধাতু যোগে

ক) বিশেষ্যের সঙ্গে                                 : ভয় কর্, লজ্জা কর, গুণ কর

খ) বিশেষণের সঙ্গে                                 : ভালো কর্, মন্দ কর্, সুখী কর্

গ) ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের সঙ্গে                   : ক্রয় কর্, দান কর্, দর্শন কর্, রান্না কর্

ঘ) ক্রিয়াজাত (কৃদন্ত) বিশেষণের সঙ্গে         : সঞ্চিত কর্, স্বগিত কর্

ঙ) ক্রিয়া-বিশেষণের সঙ্গে                        : জলদি কর্, তাড়াতাড়ি কর্, একত্র কর্)

চ) অব্যয়ের সঙ্গে                                   : না র্ক, হাঁ র্ক, হায় হায় র্ক, ছি ছি কর্

ছ) ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে                      : খাঁ খাঁ কর্,বন বন কর্, টন টন কর্

জ) ধ্বন্যাত্মক শব্দসহ ক্রিয়া বিশেষণ গঠনে   : চট কর্, ধাঁ কর্, হন হন কর্

২. হ- ধাতু যোগে                                   : বড় হ, ছোট হ, ভালো হ, রাজি হ, সুখী হ

৩. দে- ধাতু যোগে                                  : উত্তর দে, ঢাকা দে, দাগা দে, জবাব দে, কান দে, দৃষ্টি দে

৪. পা- ধাতু যোগে                                   : কান্না পা, ভয় পা, দুঃখ পা, লজ্জা পা, ব্যথা পা, টের পা

৫. খা- ধাতু যোগে                                    : মার খা, হিমশিম খা, ছাক খা, ঘষা খা

৬. কাট্- ধাতু যোগে                                : সাঁতার কাট্, ভেংচি কাট্, জিভ কাট্,

৭. ছাড়- ধাতু যোগে                                 : গলা ছাড়, ডাক ছাড়, হাল ছাড়

৮. ধর্- ধাতু যোগে                :                     গলা ধর্, ঘুণে ধর্, পচা ধর্, মাথা ধর্, গোঁ ধর্

প্রত্যয়ের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

ভাষার সমৃদ্ধি শব্দের উপর নির্ভরশীল। যে ভাষায় যত বেশি শব্দ আছে সে ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় শব্দ গঠনের একটি অন্যতম রীতি হলো প্রত্যয়। কিন্তু প্রত্যয়ের নিজের কোনো স্বাধীন অর্থ নেই। কৃৎ ও তদ্ধিত দুধরনের প্রত্যয়ই শব্দ গঠনের সহায়ক। যা পরে যুক্ত হয় তাই প্রত্যয়। সুতরাং যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ধাতু বা প্রাতিপদিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাই প্রত্যয়। যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ধাতু বা শব্দের পরে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে তাকে প্রত্যয় বলে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে, ‘ধাতু বা শব্দের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন অর্থে যে বর্ণ বা বর্ণসমূহ যুক্ত হইয়া শব্দ প্রস্তুত হয় তাহাদিগকে প্রত্যয় বলে।’ যেমন :

হাত+ আ= হাতা           মনু+অ=মানব         চল্+অন্ত=চলন্ত      √কৃ+অক = কারক

এখানে, ‘ আ’, ‘অ’, ‘অন্ত’, আর ‘অক’ প্রত্যয়। ‘হাত’, ‘মনু’ নাম-প্রকৃতি এবং চল্’, ‘কৃ’ ক্রিয়াপ্রকৃতি।

প্রত্যয় প্রধানত দুই প্রকার। যেমন : কৃৎপ্রত্যয় ও তদ্ধিত প্রত্যয়।

প্রত্যয়ের উপাদান বা বিষয়

প্রত্যয়ের মাধ্যমে শব্দগঠনের ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতি’ ও ‘প্রাতিপদিক’ এ দুটি উপাদান বা বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

১. প্রকৃতি : শব্দ বা ধাতুর মূলই হলো প্রকৃতি। অর্থাৎ ‘মৌলিক শব্দের যে অংশকে আর কোনোভাবেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় তাকে বলা হয় প্রকৃতি।’ অথবা ভাষায় যার বিশ্লেষণ সম্ভব নয়, এমন মৌলিক শব্দকে প্রকৃতি বলে। শব্দ কিংবা পদ থেকে প্রত্যয় ও বিভক্তি অপসারণ করলে প্রকৃতি অংশ পাওয়া যায়। ‘প্রকৃতি’ কথাটি বোঝানোর জন্য প্রকৃতির আগে () চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতি চিহ্নটি ব্যবহার করলে ‘প্রকৃতি’ শব্দটি লেখার প্রয়োজন হয় না। যেমন : পড়্+উয়া=পড়–য়া। নাচ্+উনে= নাচুনে।

প্রকৃতি দুই প্রকার। যেমন:

ক. ক্রিয়াপ্রকৃতি : প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দের বিশ্লেষণে মৌলিক ভাবদ্যোতক যে অংশ পাওয়া যায় তা যদি অবস্থান, গতি বা অন্য কোনো প্রকারের ক্রিয়া বোঝায় তাকে ক্রিয়াপ্রকৃতি বলে। যেমন: √চল্ (চলন্ত=চল্+অন্ত-প্রত্যয়), √পড়্, √রাখ্, √দৃশ্, √কৃ।

খ. নামপ্রকৃতি বা সংজ্ঞা প্রকৃতি : প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দের বিশ্লেষণে মৌলিক ভাবদ্যোতক যে অংশ পাওয়া যায় তা যদি কোনো দ্রব্য, জাতি, গুণ বা কোনো পদার্থকে বোঝায় তাকে নামপ্রকৃতি বলে। যেমন : মা, চাঁদ, গাছ, হাতল (হাত+অল-প্রত্যয়)।

প্রত্যয়ে প্রাতিপদিক

বিভক্তিহীন নাম শব্দকে প্রাতিপদিক বলে। যেমন : হাত, বই, কলম, মাছ ইত্যাদি।

১. ক্রিয়াবাচক শব্দমূলের ক্ষেত্রে ধাতু চিহ্ন () ব্যবহৃত হয়। যেমন :

√চল্+অন্ত=চলন্ত      √পঠ্+অক=পাঠক

২. ‘ধাতু’ ও ‘প্রত্যয়’ উভয়কে একসঙ্গে উচ্চারণ করার সময় ধাতুর অন্ত্যধ্বনি এবং প্রত্যয়ের আদিধ্বনি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রভাবে সমতা প্রাপ্ত হয়। যেমন :

√কাঁদ্+না= কান্না         √রাঁধ্+না=রান্না

উল্লিখিত উদাহরণে ধাতুর অন্ত্যধ্বনি ‘দ্’ ও ‘ধ্’ প্রত্যয়ের আদিধ্বনি ‘ন’-এর সমতা প্রাপ্ত হয়েছে।

প্রত্যয়ে কৃদন্ত পদ

কৃৎপ্রত্যয় সাধিত পদটিকে বলা হয় কৃদন্ত পদ। যেমন :

পড়+উয়া=পড়–য়া       নাচ্+উনে=নাচুনে

এখানে ‘পড়–য়া’ ও ‘নাচুনে’ কৃদন্ত পদ।

 তৎসম বা সংস্কৃত প্রকৃতির সঙ্গেও অনুরূপভাবে কৃৎপ্রত্যয় যোগে কৃদন্তপদ সাধিত হয়। যেমন :

 গম্+অন=গমন       কৃ+তব্য=কর্তব্য

প্রত্যয়ে গুণ ও বৃদ্ধি

কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃৎপ্রত্যয় যোগ করলে কৃৎপ্রকৃতির আদিস্বর পরিবর্তিত হয়। এ পরিবর্তনকে বলা হয় গুণ ও বৃদ্ধি। যেমন :

১. গুণ :

ক) ‘ই বা ঈ’ স্থলে ‘এ’ হয়। যেমন : চিন্+আ=চেনা   নী+আ=নেওয়া

খ) ‘উ বা ঊ’ স্থলে ‘ও’ হয়। যেমন :  ধু+আ=ধোয়া

গ) ‘ঋ’ স্থলে ‘র্অ’ হয়।     যেমন : কৃ+তা=করতা>কর্তা

২. বৃদ্ধি

ক) ‘অ’ স্থলে ‘আ’ হয়।     যেমন : পচ্+অ (ণক) =পাচক

খ) ই বা ঈ স্থলে ‘ঐ’ হয়। যেমন : শিশু+অ(ঞ্চ) =শৈশব

গ) উ বা ঊ স্থলে ‘ঔ’ হয়। যেমন : যুব+অন=যৌবন

ঘ) ঋ স্থলে ‘আর’ হয়।    যেমন : কৃ+ঘ্যণ=কার্য

কৃৎপ্রত্যয়

ধাতুর পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : √ধর্+আ=ধরা ডুব্+উরি=ডুবুরি √দৃশ্+য=দৃশ্য

কৃৎপ্রত্যয় দুপ্রকার। যেমন :

ক) সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় : সংস্কৃত নিয়মানুযায়ী ঐ ভাষার ধাতুর সঙ্গে যেসব সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : √কৃ+তব্য=কর্তব্য, √দৃশ্+অন =দর্শন ইত্যাদি।

খ) বাংলা কৃৎপ্রত্যয় : সংস্কৃত বা তৎসম ধাতু বিবর্জিত বাংলা ধাতুর সঙ্গে প্রাকৃত ভাষা থেকে আগত যেসব প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের বাংলা কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : নাচ্+অন=নাচন, √ডুব্+অন্ত=ডুবন্ত ইত্যাদি।

কৃৎপ্রত্যয়ের বিস্তারিত আলোচনা

তোমরা লক্ষ করেছ যে, ক্রিয়ামূলকে বলা হয় ধাতু আর ধাতুর সঙ্গে পুরুষ ও কালবাচক বিভক্তি যোগ করে গঠন করা হয় ক্রিয়াপদ। ধাতুর সঙ্গে যখন কোনো ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি যুক্ত হয়ে বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ তৈরি হয় তখন (১) ক্রিয়ামূল বা ধাতুকে বলা হয় ক্রিয়াপ্রকৃতি বা প্রকৃতি আর (২) ক্রিয়াপ্রকৃতির সঙ্গে যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি যুক্ত হয় তাকে বলে কৃৎপ্রত্যয়। যেমন : চল্ (ক্রিয়াপ্রকৃতি)+অন (কৃৎপ্রত্যয়)=চলন (বিশেষ্য পদ)। চল্ (ক্রিয়াপ্রকৃতি)+অন্ত (কৃৎপ্রত্যয়)=চলন্ত (বিশেষণ পদ)।

কৃৎপ্রত্যয়যোগে বাংলাশব্দ গঠন

(০) শূন্য-প্রত্যয় : কোনো প্রকার প্রত্যয়-চিহ্ন ব্যতিরেকেই কিছু ক্রিয়া-প্রকৃতি বিশেষ্য ও বিশেষণ পদ রূপে বাক্যে ব্যবহৃত হয়।

এরূপ স্থলে (০) শূন্য প্রত্যয় ধরা হয়। যেমন : এ মোকদ্দমায় তোমার জিত্ হবে না, হার-ই হবে। গ্রামে খুব ধরপাকড় চলছে।

অ-প্রত্যয় : কেবল ভাববাচ্যে অ-প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন :   ধর্+অ=ধর      মার+অ=মার

আধুনিক বাংলায় অ-প্রত্যয় সর্বত্র উচ্চারিত হয় না। যেমন : হার্+অ=হার     জিত্+অ=জিত

কোনো কোনো সময় অ-প্রত্যয়যুক্ত কৃদন্ত শব্দের দ্বিত্ব প্রয়োগ হয়। যেমন : (আসন্ন সম্ভাব্যতা অর্থে দ্বিত্বপ্রাপ্ত)

কাঁদ্+অ=কাঁদকাঁদ (চেহারা)      এরূপ : পড়+অ=পড়পড়    মর্+অ=মরমর (অবস্থা)

ইত্যাদি কখনো কখনো দ্বিত্বপ্রাপ্ত কৃদন্ত পদে উ-প্রত্যয় হয়। যেমন : ডুব্+উ=ডুবুডুবু       উড়+উ=উড়–উড়–

অন্-প্রত্যয় : ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে ‘অন’ প্রত্যয়ের ব্যবহার হয়। যেমন : কাঁদ্+অন=কাঁদন (কান্নার ভাব)।

এরূপ : নাচন, বাড়ন, ঝুলন, দোলন।

বিশেষ নিয়ম

ক) আ-কারান্ত ধাতুর সঙ্গে অন্ স্থলে ‘ওন’ হয়। যেমন : খা+অন=খাওন   ছা+অন=ছাওন   দে+অন=দেওন

খ) আ-কারান্ত প্রযোজক (নিজন্ত) ধাতুর পরে ‘আন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘আনো’ হয়। যেমন :  

জানা+আন=জানানো।

এরূপ : শোনানো, ভাসানো।

৪. অনা-প্রত্যয়: দুল্+অনা=দুলনা>দোলনা      খেল+অনা= খেলনা

৫. অনি, (বিকল্পে) উনি-প্রত্যয় :   র্চি+অনি= চিরনি> চিরুনি     বাঁধ্+অনি = বাঁধনি>বাঁধুনি     আঁট+ অনি= আঁটনি >আঁটুনি

৬. অন্ত-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ‘অন্ত’ প্রত্যয় হয়। যেমন: উড়+অন্ত=উড়ন্ত    ডুব্+অন্ত=ডুবন্ত

৭. অক-প্রত্যয় : মুড়+অক=মোড়ক   ঝল্+অক=ঝলক

৮. আ-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘আ’ প্রত্যয় হয়। যেমন : পড়+আ=পড়া (পড়া বই)

এরূপ : রাঁধ (বিশেষ্য), রাঁধা (বিশেষণ), কেনা, বেচা, ফোটা

৯. আও-প্রত্যয় : ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে ‘আও’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন :    পাকড়+আও=পাকড়াও      

চড়+আও=চড়াও

১১. আন (আনো) প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে প্রযোজক ধাতু ও কর্মবাচ্যের ধাতুর পরে ‘আন/আনো’ প্রত্যয় হয়। যেমন : চাল্=আন=চালান/চালানো   মান্+আন=মানান/মানানো

১২. আনি-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে প্রযুক্ত হয়। যেমন :

জান্+আনি=জানানি           শুন্+আনি=শুনানি        উড়+আনি= উড়ানি        উড়+উনি=উড়িন

১৩. আরি বা বিকল্পে রি/উরি- প্রত্যয় : ডুব্+উরি=ডুবুরী          এরূপ : ধুনারী, পুজারী ইত্যাদি।

১৪. আল-প্রত্যয় : ম্+আল=মাতাল         মিশ্+আল =মিশাল

১৫. ই-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে ‘ই’ প্রত্যয় প্রযুক্ত হয়। যেমন: ভাজ্+ই= ভাজি   বেড়+ই=বেড়ি

১৬. ইয়া>ইয়ে-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ইয়া/ ইয়ে প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন :

র্ম+ইয়া=মরিয়া (মরতে প্রস্তুত)     বল্+ইয়ে=বলিয়ে (বাকপটু)।

এরূপ : নাচিয়ে, পাইয়ে, লিখিয়ে, বাজিয়ে, কইয়ে ইত্যাদি।

১৭. উ-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘উ’ প্রত্যয়ের প্রয়োগ হয়। যেমন :

ডাক্+উ=ডাকু      ঝাড়+উ=ঝাড়–     উড়+উ=উড়– (দ্বিত্ব উড়–উড়–)

১৮. ‘উয়া’ বিকল্পে ‘ও’- প্রত্যয় : বিশেষ্য বিশেষণ গঠনে ‘উয়া’ এবং ‘ও’ প্রত্যয় হয়। যেমন :

পড়+উয়া=পড়–য়া>পড়ো      উড়+উয়া=উড়–য়া>উড়ো     উড়+ও=উড়ো (চিঠি)

১৯. তা-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ‘তা’ প্রত্যয় হয়। যেমন :  র্ফি+তা=ফিরতা>ফেরতা   পড়+তা=পড়তা   

বহ্+তা= বহতা

২০. তি-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘তি’ প্রত্যয় হয়। যেমন : ঘাট্+তি=ঘাটতি    বাড়+তি=বাড়তি

এরূপ : কাটতি, উঠতি ইত্যাদি।

২১. না-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে ‘না’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন: কাঁদ্+না=কাঁদনা> কান্না, রাঁধ্+না=রাঁধনা>রান্না। এরূপ: ঝরনা

কৃৎপ্রত্যয়যোগে সংস্কৃতশব্দ গঠন

অনট্-প্রত্যয় : (‘ট’ ইৎ (বিলুপ্ত) হয়, ‘অন’ থাকে)। যেমন :

নী+অনট্=নী+অন>নে+অন (গুণসূত্রে)=নয়ন         শ্রু+ অনট্=শ্রু+অন (গুণ ও সন্ধির ফলে)=শ্রবণ

এরূপ : স্থান, ভোজন, নর্তন, দর্শন ইত্যাদি।

ক্ত-প্রত্যয় (‘ক্’ ইৎ ‘ত’ থাকে) :   জ্ঞা+ক্ত (জ্ঞা+ত) =জ্ঞাত      খ্যা+ক্ত=খ্যাত।

বিশেষ নিয়ম

ক) ক্ত-প্রত্যয় যুক্ত হলে নিম্নলিখিত ধাতুর অন্ত্যস্বর ‘ই’ কার হয়। যেমন :  পঠ্+ক্ত+(পঠ্+ই+ত) =পঠিত।

এরূপ : লিখিত, বিদিত, বেষ্টিত, চলিত, পতিত, লুণ্ঠিত, ক্ষুধিত, শিক্ষিত ইত্যাদি।

খ) ক্ত প্রত্যয় যুক্ত হলে, ধাতুর অন্তস্থিত ‘চ’ ও ‘জ’ স্থলে ‘ক’ হয়। যেমন : সিচ্+ক্ত=(সিক্+ত) সিক্ত। 

এরূপ : মুচ্+ক্ত=মুক্ত, ভুজ্+ক্ত=ভুক্ত।

গ) এ ছাড়া ক্ত প্রত্যয় পরে থাকলে ধাতুর মধ্যে বিভিন্ন রকমের পরিবর্তন হয়। এখানে এরূপ কয়েকটি প্রকৃতি-প্রত্যয়ের উদাহরণ দেওয়া হলো। যেমন :

গম্+ক্ত=গত      গ্রন্থ+ক্ত=গ্রথিত     র্চু+ক্ত=চূর্ণ        ছিদ্+ক্ত=ছিন্ন     জন্+ক্ত=জাত      

দা+ক্ত=দত্ত

দহ্+ক্ত=দগ্ধ      বচ্+ক্ত+উক্ত        বপ্+ক্ত=উপ্ত      মুহ্+ক্ত=মুগ্ধ      যুধ্+ক্ত=যুদ্ধ        লভ্+ক্ত=লব্ধ

স্বপ্+ক্ত=সুপ্ত     সূজ্+ক্ত=সৃষ্ট       হন্+ক্ত=হত

৩. ক্তি-প্রত্যয় (‘ক’ ইং ‘তি’ থাকে) : গম্+ক্তি/তি=গতি (এখানে ‘ম’ লোপ হয়েছে)।

ক) ক্তি-প্রত্যয় যোগ করলে কোনো কোনো ধাতুর অন্ত ব্যঞ্জনের লোপ হয়। যেমন :

মন্+ক্তি=মতি       রম্+ ক্তি= রতি

খ) কোনো কোনো ধাতুর উপধা অ-কারের বৃদ্ধি হয় অর্থাৎ আ-কার হয়। যেমন :

শ্রম্+ক্তি=শ্রান্তি (সন্ধিসূত্রে ম>না, শম্+ক্তি=শান্তি

গ) ‘চ’ এবং ‘জ’ স্থলে ‘ক’ হয়। যেমন :   বচ্+ক্তি=উক্তি     মুছ+ক্তি =মুক্তি    ভজ্+ক্তি=ভক্তি

ঘ) নিপাতনে সিদ্ধ :   গৈদ+ক্তি=গীতি    সিধ্+ক্তি=সিদ্ধি    বুধ্+ক্তি=বুদ্ধি    শক্+ক্তি=শক্তি

৪. তব্য ও অনীয় প্রত্যয় : কর্ম ও ভাববাচ্যের ধাতুর পরে ক) তথ্য ও খ) অনীয় প্রত্যয় হয়।

ক) তব্য:   কৃ+তব্য=কর্তব্য     দা+তব্য=দাতব্য     পঠ্+তব্য=পঠিতব্য

খ) অনীয় : কৃ+অনীয়=করণীয়   রক্+অনীয়=রক্ষণীয়

এরূপ : দর্শনীয়, পানীয়, শ্রবণীয়, পালনীয় ইত্যাদি।

৫. তৃচ্-প্রত্যয় (‘চ’ ইৎ ‘তৃ’ থাকে) : প্রথমা একবচনে ‘তৃ’ স্থলে ‘তা’ হয়।

যেমন : দা+তৃচ্/তৃ/তা=দাতা   মা+তৃচ্=মাতা  ক্রী+তৃচ্=ক্রেতা

বিশেষ নিয়মে : যুধ্+তৃচ/তা=যোদ্ধা

৬. ণক-প্রত্যয় (‘ণ’ ইৎ ‘অক’ থাকে) : পঠ্+ণক/অক=পাঠক

মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়ে ‘অ’ স্থানে ‘আ’ হয়েছে। যেমন : নী=ণক=(নৈ+অক=প্রথম স্বরের বৃদ্ধি) নায়ক

গৈ+ণক=গায়ক, লিখ্+ণক=লেখক ইত্যাদি

বিশেষ নিয়ম :

ক) ণক-প্রত্যয় পরে থাকলে নিজন্ত ধাতুর ‘ই’ কারের লোপ হয়। যেমন: পুঁজি+ণক=পুজক

এরূপ : জনক, চালক, স্তাবক

খ) আ-কারান্ত ধাতুর পরে ণক প্রত্যয় হলে ধাতুর শেষে ‘য়’ আসে। যেমন : দা+ণক=দায়ক   বি-ধা+ণক=বিধায়ক

৭. ঘ্যণ-প্রত্যয় [ঘ, ণ-ইৎ, য (য-ফলা) থাকে] : কর্ম ও ভাববাচ্যে ঘ্যণ্ হয়। যেমন : কৃ+ঘ্যণ্=কায্য>কার্য, ধৃ+ঘ্যণ্=ধায্য।

এরূপ : পরিহার্য, বাচ্য, ভোজা, যোগ্য, হাস্য ইত্যাদি।

(দ্রষ্টব্য : আধুনিক বাংলা বানানে রেফ+য+য=র্য্য হয় না, র্য হয়।)

৮. য-প্রত্যয় : কর্ম ও ভাববাচ্যে যোগ্যতা ও ঔচিত্য অর্থে ‘ষ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। ‘ষ’ যুক্ত হলে আ-কারান্ত ধাতুর আ-কার স্থলে এ- কারান্ত হয় এবং ‘ষ’ ‘য়’ হয়। যেমন : দা+য=দা>দে+ষ>য়=দেয়। হা+ষ=হেয়।

এরূপ : বিধেয়, অজেয়, পরিমেয়, অনুমেয় ইত্যাদি।

৯. ণিন-প্রত্যয় (ণ ইৎ, ইণ্ থাকে, ইন্ ‘ঈ’- কার হয়) : পা+ণিন=পায়ী। এরূপ : কারী, দ্রোহী, সত্যবাদী, ভাবী, স্থায়ী গামী। কিন্তু ‘দিন’ যুক্ত হলে ‘হন’ ধাতুর স্থলে ‘ঘাত’ হয়। যেমন : আত্ম-Öগ্রহ+ণিন=গ্রাহী, হণ্+ণিন=আত্মবাতী

১০. ইন্ প্রত্যয় (ইন্) =ঈ=কার হয়) : শ্রম্+ইন্=শ্রমী।

১১. অল্-প্রত্যয় (ল ইৎ, অ থাকে) : জি+অল্=জয়      ক্ষি+অল্=ক্ষয়

এরূপ : ভয়, নিচয়, বিনয়, ভেদ, বিলয়।

ব্যতিক্রম: হণ্+অল্=বধ।

কৃদন্ত বিশেষণ গঠনে কতিপয় কৃৎপ্রত্যয়

১. ইষ্ণু-প্রত্যয় : চল্+ইষ্ণু=চলিষ্ণু। এরূপ : ক্ষয়িষ্ণু, বর্ধিষ্ণু।

২. বর-প্রত্যয় : ঈশ।+বর=ঈশ্বর তাস্+বর=ভাস্বর

এরূপ : নশ্বর, স্বাবর।

৩. র-প্রত্যয় : হিন+স। +র=হিংস্র     নম্+র=নম্র

৪. উক/উক-প্রত্যয় : ভু+উক=(ভৌ+উক)=ভাবুক জাগৃ+উক=(জাগর+ঊক) জাগরূক

৫. শানচ্ - প্রত্যয় (‘শ’ ও ‘চ’ ইৎ ‘আন’ বিকল্পে ‘মান’ থাকে) : দীপ্+শানচ্=দীপ্যমান।

এরূপ : চল্+শানচ্= চলমান, বৃধ্+শানচ্=বর্ধমান।

৬. ঘঞ- প্রত্যয় [(কৃদন্ত বিশেষ্য গঠনে), ঘৃ ও ঞ ইৎ, ‘অ’ থাকে] :

বস্+ঘঞ্=বাস       যুজ্+ঘঞ=যোগ        ক্রুধ্+ ঘঞ্=ক্রোধ      খুদ্+ঘঞ্=খেদ        ভিদ্+ঘঞ্=ভেদ

বিশেষ নিয়ম : ত্যজ্+ঘঞ্=ত্যাগ  পচ্+ঘঞ্=পাক  শুচ্+ ঘঞ্= শোক    

কিন্তু নন্দি+অন=নন্দন। এক্ষেত্রে আ যোগে ‘নন্দনা’ হয় না।

তদ্ধিত প্রত্যয়ের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

শব্দের পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : বাঘ+আ=বাঘা সোনা+আলি =সোনালি সপ্তাহ+ইক=সাপ্তাহিক ইত্যাদি।

শব্দের সঙ্গে (শেষে) যেসব প্রত্যয় যোগে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের তদ্ধিত প্রত্যয় বলা হয়। যেমন :

১. ছেলেটি বড় লাজুক

২. বড়াই করা ভালো না

৩. ঘরামি ডেকে ঘর ছেয়ে নে

ওপরের ‘লাজুক’, ‘বড়াই’ শব্দগুলো গঠিত হয়েছে এভাবে : লাজুক=লাজ+উক; বড়াই=বড়+আই, ঘরামি=ঘর+আমি। ‘লাজ’ ‘বড়’ ও ‘ঘর’ শব্দগুলোর পরে যথাক্রমে ‘উক’, ‘আই’ ও ‘আমি’ (প্রত্যয়) যোগ করে নতুন শব্দ গঠিত হয়েছে। এখানে ‘লাজ’ ‘বড়’ ও ‘ঘর’ শব্দগুলোর সাথে কোনো শব্দ/ বিভক্তি যুক্ত হয়নি। বিভক্তিহীন নাম শব্দকে বলা হয় প্রাতিপদিক। প্রাতিপদিক তদ্ধিত প্রত্যয়ের প্রকৃতি বলে প্রাতিপদিককে নামপ্রকৃতিও বলা হয়। ধাতু যেমন কৃৎপ্রত্যয়ের প্রকৃতি তেমনি প্রাতিপদিকও তদ্ধিত প্রত্যয়ের প্রকৃতি। প্রত্যয় যুক্ত হলে ধাতুকে বলা হয় ক্রিয়াপ্রকৃতি এবং প্রাতিপদিককে বলা হয় নামপ্রকৃতি। তদ্ধিত প্রত্যয়গুলো বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

বাংলা ভাষায় তদ্ধিত প্রত্যয় তিন প্রকার। যেমন :

ক. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় : যে তদ্ধিত প্রত্যয় সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : মনু+ষ্ণ=মানব; লোক+ষ্ণিক=লৌকিক ইত্যাদি।

খ. বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় : বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সংস্কৃত ও বিদেশি প্রত্যয় ছাড়া বাকি সব প্রত্যয়কে বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : বাঘ+আ=বাঘা; ঘর+আমি=ঘরামি ইত্যাদি।

গ. বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় : শব্দের শেষে যেসব বিদেশি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাদের বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : ডাক্তার+খানা=ডাক্তারখানা, ধড়ি+বাজ= ধড়িবাজ ইত্যাদি।

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়

ষ্ণ, ষ্ণি, ষ্ণ্য, ষ্ণিক, ইত, ইমন, ইল, ইষ্ট, ঈন, তর, তম, তা, ত্ব, নীন, নীয়, বতুপ্, বিন, র, ল প্রভৃতি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়যোগে যে সমস্ত শব্দ গঠিত হয় সেগুলো বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এখানে কতগুলো সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের উদাহরণ দেয়া হলো।

যে শব্দের সঙ্গে ষ্ণ (অ)-প্রত্যয় যুক্ত হয়, তার মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন : নগর+ষ্ণ=নাগর, মধুর+ষ্ণ/য=মাধুর্য।

বৃদ্ধি :

১. ‘অ’ স্থানে আ হয়     

২. ‘ই বা ঈ’ স্থানে ঐ হয়   

৩. ‘উ বা ঊ’ স্থানে ঔ হয়    

৪. ‘ঋ’ স্থানে আর হয়

-এসব হওয়াকে বৃদ্ধি বলে

যে শব্দের সঙ্গে ষ্ণ (অ) প্রত্যয় যুক্ত হয়, তার প্রাতিপদিকের অন্ত্যস্বরের উ-কারও ও-কারে পরিণত হয়। ও+অ সন্ধিতে ‘অব’ হয়। যেমন :

গুরু+ষ্ণ=গৌরব       লঘু+ষ্ণ=লাঘব      শিশু+ ষ্ণ+ শৈশব       মধু+ষ্ণ=মাধব        মনু+ষ্ণ=মানব

দুটি শব্দের দ্বারা গঠিত সমাসবদ্ধ শব্দের অথবা উপসর্গযুক্ত শব্দের সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে উপসর্গসহ শব্দের বা শব্দ দুটির মূলস্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন :

পরলোক +ষ্ণিক= পারলৌকিক     সুভগ+ষ্ণ্য=সৌভাগ্য     পঞ্চভূত+ষ্ণিক= পাঞ্চভৌতিক     সর্বভূমি+ষ্ণ=সার্বভৌম

ব্যতিক্রম : ‘বর্ষ’ শব্দ পরপদ হলে পূর্বপদের সংখ্যাবাচক শব্দের মূল স্বরের বৃদ্ধি হয় না। যেমন : দ্বিবর্ষ+ ষ্ণিক=দ্বিবার্ষিক। সংখ্যাবাচক শব্দ না থাকলেও নিয়মমতো মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন : বর্ষ+ষ্ণিক=বার্ষিক

৪. ‘য’ প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রাতিপদিকের অস্তে স্থিত অ, আ, ই এবং ঈ-এর লোপ হয়। যেমন :

সম্+য=সাম্য কবি+ য= কাব্য          মধুর+য=মাধুর্য         প্রাচী+য=প্রাচ্য

ব্যতিক্রম : সভা+য=সভ্য (‘সাভ্য’ নয়)।

কয়েকটি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের নিয়ম

১. ইত- প্রত্যয় : উপকরণজাত বিশেষণ গঠনে : কুসুম+ইত= কুসুমিত, তরঙ্গ+ইত=তরঙ্গিত, কণ্টক+ইত=কণ্টকিত

২. ইমন্ - প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : নীল+ইমন=নীলিমা, মহৎ+ইমন=মহিমা

৩. ইল্ -প্রত্যয় : উপকরণজাত বিশেষণ গঠনে : পঙ্ক+ইল্=পঙ্কিল, উর্মি+ইল্=উর্মিল, ফেন+ইল্=ফেনিল

৪. ইষ্ঠ- প্রত্যয় : অভিশায়নে : গুরু+ইষ্ঠ=গরিষ্ঠ, লঘু+ইষ্ঠ=লঘিষ্ঠ

৫. ইন্ (ঈ) -প্রত্যয় : সাধারণ বিশেষণ গঠনে : জ্ঞান+ ইন্=জ্ঞানিন্, সুখ+ইন্=সুখিন্, গুণ+ইন্=গুণিন্,

     মান+ইন্= মানিন্। সমাসে ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের পরে তৎসম শব্দ থাকলে ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের ন্ লোপ পায়।

      যেমন : গুণিগণ, সুখিগণ, মানিজন

      কর্তৃকারকের একবচনে ইন্ প্রত্যয় ঈ রূপ গ্রহণ করে। যেমন : জ্ঞান+ইন্ (ঈ) -জ্ঞানী, গুণ+ইন্(ঈ) গুণী

৬. তা ও ত্ব-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : বন্ধু+তা=বন্ধুতা, শত্র“+তা=শত্র“তা, বন্ধু+ত্ব=বন্ধুত্ব, গুরু+ত্ব=গুরুত্ব,

      ঘন+ত্ব=ঘনত্ব, মহৎ+ত্ব=মহত্ব

৭. তর ও তম-প্রত্যয় : অতিশায়নে : মধুর-মধুরতর, মধুরতম। প্রিয়-প্রিয়তর, প্রিয়তম

৮. নীন (ঈন্) - প্রত্যয় : তৎসম্পর্কিত অর্থে বিশেষণ গঠনে : সর্বজন+নীন=সর্বজনীন,

     কুল+নীন=কুলীন, নব+নীন= নবীন

৯. নীয় (ঈয়) -প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : জল+নীয়=জলীয়, বায়ু+নীয় - বায়বীয়, বর্ষ+নীয়=বর্ষীয়

    বিশেষ নিয়মে : পর-পরকীয়, রাজা-রাজকীয়

১০. বতুপ্ (বৎ) এবং মতুপ্ (মৎ) -প্রত্যয় [প্রথমার এক বচনে যথাক্রমে ‘বান্ এবং ‘মান্’ হয়] :

     বিশেষণ গঠনে : গুণ+বতুপ্=গুণবান, দয়া+বতুপ্=দয়াবান। শ্রী+মতুপ্= শ্রীমান,

      বুদ্ধি+মতুপ=বুদ্ধিমান

১১. বিন (বী) প্রত্যয় : আছে অর্থে বিশেষণ গঠনে : মেধা+বিন্=মেধাবী, মায়া+বিন্=মায়াবী,

      তেজঃ+বিন্=তেজস্বী,  যশঃ+বিন্=যশস্বী

১২. র-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : মধু+র=মধুর, মুখ+র= মুখর

১৩. ল-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : শীত+ল=শীতল, বৎস+ল= বৎসল

১৪. ষ্ণ (অ) প্রত্যয়

ক) অপত্য অর্থে : মনু+ষ্ণ=মানব, যদু+ষ্ণ=যাদব।

খ) উপাসক অর্থে : শিব+ষ্ণ=শৈব, জিন+ষ্ণ=জৈন। এরূপ : শক্তি - শাক্ত, বৃদ্ধ -বৌদ্ধ, বিষ্ণু -বৈষ্ণব

গ) ভাব অর্থে: শিশু+ষ্ণ=শৈশব, গুরু+ষ্ণ=গৌরব, কিশোর+ ষ্ণ=কৈশোর

ঘ) সম্পর্ক বোঝাতে : পৃথিবী+ষ্ণ=পার্থিব, দেব+ষ্ণ=দৈব, চিত্র (একটি নক্ষত্রের নাম) +ষ্ণ=চৈত্র

নিপাতনে সিদ্ধ : সূর্য+ষ্ণ=সৌর (সাধারণ নিয়মে সুর+ষ্ণ (অ) =সৌর

১৫. ষ্ণ্য

ক) অপত্যার্থে : মনুঃ+ষ্ণ্য=মনুষ্য, জমদগ্নি+ষ্ণ্য=জামদগ্ন্য।

খ) ভাবার্থে : সুন্দর+ষ্ণ্য=সৌন্দর্য, শূর+ষ্ণ্য=শৌর্ষ। ধীর+ষ্ণ্য=ধৈর্য, কুমার+ষ্ণ্য=কৌমার্য

গ) বিশেষণ গঠনে : পর্বত+ষ্ণ্য=পার্বত্য, বেদ+ষ্ণ্য=বৈদ্য।

১৬. ষ্ণি (ই) -প্রত্যয় : অপত্য অর্থে : রাবণ+ষ্ণি=রাবণি (রাবণের পুত্র), দশরথ+ষ্ণি=দাশরথি

১৭. ষ্ণিক (ইক) -প্রত্যয়

ক) দক্ষ বা বেত্তা অর্থে : সাহিত্য+ষ্ণিক=সাহিতিক, বেদ+ ষ্ণিক=বৈদিক, বিজ্ঞান+ষ্ণিক=বৈজ্ঞানিক

খ) বিষয়ক অর্থে : সমুদ্র+ষ্ণিক=সামুদ্রিক, নগর-নাগরিক, মাস-মাসিক, ধর্ম-ধার্মিক, সমর-সামরিক, সমাজ-সামাজিক

গ) বিশেষণ গঠনে : হেমন্ত+ষ্ণিক=হৈমন্তিক, অকস্মাৎ +ষ্ণিক=আকস্মিক

১৮. ষ্ণেয় (এর)-প্রত্যয় : ভগিনী+ষ্ণেয়=বাগিনেয়, অগ্নি+ ষ্ণেয়=আগ্নেয়, বিমাতৃ (বিমাতা) +ষ্ণেয়=বৈমাত্রেয়

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়

১. আ- প্রত্যয়

ক) অবজ্ঞার্থে : চোর+আ=চোরা, কেষ্ট+আ=কেষ্টা

খ) বৃহদার্থে : ডিঙি+আ=ডিঙা (সপ্তডিঙা মধুকর)

গ) সদৃশ্য অর্থে : বাঘ+আ=বাঘা, হাত+আ=হাতা। এরূপ : কাল-কালা (চিকন কালা), কান-কানা

ঘ) ‘তাতে আছে’ বা ‘তার আছে’ অর্থে : জল+আ=জলা, গোদ +আ=গোদা। এরূপ : রোগ-রোগা, চাল-চালা, লুন- লুনা>লোনা

ঙ) সমষ্টি অর্থে : বিশ-বিশা, বাইশ-বাইশা (মাসের বাইশা> বাইশে)

চ) স্বার্থে : জট+আ=জটা, চোখ-চোখা, চাক- চাকা

ছ) ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে : হাজির- হাজিরা, চাষ-চাষা

জ) জাত ও আগত অর্থে : মহিষ, ভইস-ভয়সা (ঘি), দখিন-দখিনা>দখনে (হাওয়া)

২. আই-প্রত্যয়

ক) ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে : বড়+আই=বড়াই, চড়া+আই= চড়াই

খ) আদরার্থে : কানু+আই=কানাই, নিম+আই=নিমাই

গ) স্ত্রী বা পুরুষবাচক শব্দের বিপরীত বোঝাতে : বোন+আই =বোনাই, ননদ - নন্দাই, জেঠা-জেঠাই (মা)

ঘ) সমগুণবাচক বিশেষ্য গঠনে : মিঠা+আই=মিঠাই

ঙ) জাত অর্থে : ঢাকা+আই=ঢাকাই (জামদানি), পাবনা-পাবনাই (শাড়ি)

চ) বিশেষণ গঠনে : চোর-চোরাই (মাল), মোগল-মোগলাই (পরোটা)

৩. আমি/আম/আমো/মি-প্রত্যয়

ক) ভাব অর্থে : ইতর+আমি=ইতরামি, পাগল+আমি=পাগলামি, চোর+আমি=চোরামি, বাঁদর+আমি=বাঁদরামি, ফাজিল+আমো= ফাজলামো।

খ) বৃত্তি (জীবিকা) অর্থে : ঠক+আমো =ঠকামো (ঠেকের বৃত্তি বা ভাব), ঘর+আমি=ঘরামি

গ) নিন্দা জ্ঞাপন : জেঠা+আমি=জেঠামি, ছেলে+আমি =ছেলেমি

৪. ই / ঈ- প্রত্যয়

ক) ভাব অর্থে : বাহাদুর+ই=বাহাদুরি, উমেদার- উমেদারি

খ) বৃত্তি বা ব্যবসায় অর্থে : ডাক্তার-ডাক্তারি, মোক্তার-মোক্তারি, পোদ্দার-পোদ্দারি, ব্যাপার-ব্যাপারি, চাষ-চাষি

গ) মালিক অর্থে : জমিদার-জমিদারি, দোকান-দোকানি।

ঘ) জাত, আগত বা সম্বন্ধ বোঝাতে : ভাগলপুর- ভাগলপুরি, মাদ্রাজ- মাদ্রাজি, রেশম-রেশমি, সরকার-সরকারি (সম্বন্ধ বাচক)

৫. ইয়া>এ-প্রত্যয়

ক) তৎকালীনতা বোঝাতে : সেকাল+এ=সেকেলে, একাল+এ=একেলে,ভাদর+ইয়া=ভাদরিয়া>ভাদুরে (কইমাছ)

খ) উপকরণ বোঝাতে : পাথর-পাথরিয়া>পাথুরে, মাটি- মেটে, বালি-বেলে

গ) উপজীবিকা অর্থে : জাল-জালিয়া>জেলে, মোট- মুটে

ঘ) নৈপুণ্য বোঝাতে : খুন-খুনিয়া>খুনে, দেমাক-দেমাকে, না (নৌকা)-নাইয়া>নেয়ে

ঙ) অব্যয়জাত বিশেষণ গঠনে : টনটন-টনটনে (জ্ঞান), কনকন-কনকনে (শীত), গনগন-গনগনে (আগুন), চকচক-চকচকে (জুতা)

৬. উয়া>ও- প্রত্যয়

ক) রোগগ্রস্ত অর্থে : জ্বর+উয়া=জ্বরুয়া>জ্বরো। বাত+উয়া =বাতুয়া>বেতো (ঘোড়া)

খ) যুক্ত অর্থে : টাক -টেকো

গ) সেই উপকরণে নির্মিত অর্থে : খড়-খড়ো (খড়োঘর)

ঘ) জাত অর্থে : ধান-ধেনো।

ঙ) সংশ্লিষ্ট অর্থে : মাঠ-মেঠো, গাঁ-গাঁইয়া>গেঁয়ো

চ) উপজীবিকা অর্থে : দাঁত-দেঁতো (হাসি), ছাঁদ-ছেঁদো (কথা), তেল-তেলো>তেলা (মাথা), কুঁজ- কুঁজো (লোক)

৭. উ-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : ঢাল+উ=ঢালু, কল+উ=কল্

৮. উক-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : লাজ-লাজুক, মিশ-মিশুক, মিথ্যা-মিথ্যুক

৯. আরি/আরী/আরু-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : ভিখ-ভিখারি, শাঁখ-শাঁখারি, বোমা-বোমারু

১০. আলি/আলো/আলি/আলী>এল-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে : দাঁত-দাঁতাল, লাঠি-লাঠিয়াল>লেঠেল, চতুর-চতুরালি

      ঘটক-ঘটকালি, সিঁদ-সিঁদেল, গাঁজা-গেঁজেল

১১. উরিয়া >উড়িয়া/উড়ে/রে-প্রত্যয় : হাট-হাটুরিয়া>হাটুরে, সাপ-সাপুড়িয়া>সাপুড়ে, কাঠ-কাঠুরিয়া>কাঠুরে

১২. উড়-প্রত্যয় : অর্থহীনভাবে : লেজ-লেজুড়।

১৩. উয়া/ওয়া>ও-প্রত্যয় : সম্পর্কিত অর্থে : ঘর+ওয়া = ঘরোয়া, জল উয়া=জলুয়া>জলো (দুধ)

১৪. আটিয়া / টে-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : তামা-তামাটিয়া>তামাটে, ঝগড়া-ঝগড়াটে, ভাড়া-ভাড়াটে, রোগা-রোগাটে

১৫. অট>ট-প্রত্যয় : স্বার্থে : ভরা- ভরাট, জমা-জমাট

১৬. লা-প্রত্যয় :

ক) বিশেষণ গঠনে : মেঘ-মেঘলা          

খ) স্বার্থে : এক-একলা, আধ-আধলা

বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়

১. ওয়ালা>আলা (হিন্দি) : বাড়ি-বাড়িওয়ালা (মালিক অর্থে), দিল্লি-দিল্লিওয়ালা (অধিকারী অর্থে), মাছ-মাছওয়ালা (বৃত্তি অর্থে)

    দুধ-দুধওয়ালা (বৃত্তি অর্থে)

২. ওয়ান>আন (হিন্দি) : গাড়ি-গাড়োয়ান, দার-দারোয়ান

৩. আনা>আনি (হিন্দি) : মুনশি-মুনশিয়ানা, বিবি-বিবিআনা, হিন্দু-হিন্দুয়ানি

৪. পনা (হিন্দি) : পানি-পানসা>পানসে, এক-একসা, কাল (কাল)-কালসা>কালসে

৫. গর>কর (ফারসি) : কারিগর, বাজিকর, সওদাগর

৬. দার (ফারসি) : তাঁবেদার, খবরদার, বুটিদার, দেনাদার, চৌকিদার, পাহারাদার

৭. বাজ (দক্ষ অর্থে-ফারসি) : কলমবাজ, ধড়িবাজ, ধোঁকাবাজ, গলাবাজ+ই=গলাবাজি (বিশেষ্য)

৮. বন্দি (বন্দ্-ফারসি) : জবানবন্দি, সারিবন্দি, নজরবন্দি, কোমরবন্দি

৯. সই (মতো অর্থে): জুতসই, মানানসই, চলনসই, টেকসই

    দ্রষ্টব্য : ‘টিপসই’ ও ‘নামসই’ শব্দ দুটোর ‘সই’ প্রত্যয় নয়। এটি ‘সহি’ (অর্থ-স্বাক্ষর) শব্দ থেকে উৎপন্ন

শব্দের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে শব্দের শ্রেণিবিভাগ হতে পারে।

১. গঠনমূলক শ্রেণিবিভাগ : ক) মৌলিক      খ) সাধিত

২. অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ :  ক) যৌগিক      খ) রুঢ়ি              গ) যোগরুঢ়

৩. উৎসমূলক শ্রেণিবিভাগ : ক) তৎসম      খ) অর্ধ-তৎসম     গ) তদ্ভব       

                                  ঘ) দেশি         ঙ) বিদেশি

           * উৎসমূলক শ্রেণিবিভাগ প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে

মৌলিক শব্দ (গঠনগত)

যেসব শব্দ বিশ্লেষণ করা যায় না বা ভেঙে আলাদা করা যায় না তাদের মৌলিক শব্দ বলে। মৌলিক শব্দগুলোই হলো ভাষার মূল উপকরণ। যেমন : গোলাপ, নাক, লাল, তিন।

সাধিত শব্দ (গঠনগত)

যেসব শব্দ বিশ্লেষণ করা হলে আলাদা অর্থবোধক শব্দ পাওয়া যায় তাদের সাধিত শব্দ বলে। সাধারণত একাধিক শব্দের সমাস হয়ে কিংবা প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগ হয়ে সাধিত শব্দ গঠিত হয়ে থাকে। যেমন :

 চাঁদমুখ (চাঁদের মতো মুখ)      নীলাকাশ (নীল যে আকাশ)        ডুবুরি (ডুব্+উরি)     

চলন্ত (চল্+অন্ত)                   প্রশাসন (প্র+শাসন)                  গরমিল (গর+মিল)

যৌগিক শব্দ (অর্থগত)

যেসব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ব্যবহারিক অর্থ একই রকম তাদের যৌগিক শব্দ বলে। যেমন :

গায়ক=গৈ+ণক (অক)-অর্থ : গান করে যে         কর্তব্য =কৃ+তব্য-অর্থ : যা করা উচিত

বাবুয়ানা=বাবু+আনা-অর্থ : বাবুর ভাব              মধুর=মধু+র- অর্থ : মধুর মতো মিষ্টি গুণযুক্ত

দৌহিত্র=দুহিতা+ষ্ণ্য-অর্থ : কন্যার পুত্র, নাতি      চিকামারা= চিকা+মারা-অর্থ দেওয়ালের লিখন

রূঢ়ি শব্দ (অর্থগত)

যে শব্দ প্রত্যয় বা উপসর্গযোগে মূল শব্দের অর্থের অনুগামী না হয়ে অন্য কোনো বিশিষ্ট অর্থ জ্ঞাপন করে তাকে রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন :

হস্তী=হস্ত+ইন, অর্থ-হস্ত আছে যার কিন্তু হস্তী বলতে একটি পশুকে বোঝায়।

গবেষণা (গো+এষণা) অর্থ-গরু খোঁজা কিন্তু বর্তমান অর্থ ব্যাপক অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা।

এরূপ :

বাঁশি-বাঁশ দিয়ে তৈরি যে কোনো বস্তু নয়, শব্দটি সুরের বিশেষ বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত হয়।

তৈল-শুধু তিলজাত স্নেহ পদার্থ নয়, শব্দটি যে কোনো উদ্ভিজ্জ পদার্থজাত স্নেহ পদার্থকে বোঝায়। যেমন : বাদাম-তেল।

প্রবীণ-শব্দটির অর্থ হওয়া উচিত ছিল প্রকৃষ্ট রূপে বীণা বাজাতে পারেন যিনি। কিন্তু শব্দটি ‘অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়স্ক ব্যক্তি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

সন্দেশ-শব্দ ও প্রত্যয়গত অর্থে ‘সংবাদ’। কিন্তু রূঢ়ি অর্থে ‘মিষ্টান্ন বিশেষ’।

যোগরূঢ় শব্দ (অর্থগত)

সমাস নিষ্পন্ন যে সকল শব্দ সম্পূর্ণভাবে সমস্যমান পদসমূহের অনুগামী না হয়ে কোনো বিশিষ্ট অর্থ গ্রহণ করে, তাদের যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন :

পঙ্কজ-পঙ্কে জন্মে যা (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)। শৈবাল, শালুক, পদ্মফুল প্রভৃতি নানাবিধ উদ্ভিদ পঙ্কে জন্মে থাকে। কিন্তু ‘পঙ্কজ’ শব্দটি একমাত্র ‘পদ্মফুল’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তাই পঙ্কজ একটি যোগরূঢ় শব্দ।

রাজপুত-‘রাজার পুত্র’ অর্থ পরিত্যাগ করে যোগরূঢ় শব্দ হিসেবে অর্থ হয়েছে ‘জাতিবিশেষ’।

মহাযাত্রা-মহাসমারোহে যাত্রা অর্থ পরিত্যাগ করে যোগরূঢ় শব্দরূপে অর্থ ‘মৃত্যু’।

জলধি-‘জল ধারণ করে এমন’ অর্থ পরিত্যাগ করে একমাত্র ‘সমুদ্র’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

 

 

মন্তব্য করুন