উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
SDG-4 অর্জনে অন্তরায় হতে পারে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি
মোহাম্মদ ইকবাল হাসান
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
রাজবাড়ী সদর। রাজবাড়ী ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতা-ভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি একটা বড় অন্তরায় হতে পারে । শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে জরিপ চালিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এতে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের ভিত্তিতে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ। জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতির হার ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনুপস্থিত থাকছে।মেয়েদের থেকে ছেলেদের অনুপস্থিতির হার আরও বেশী ।অনেকে আবার স্কুলে এসেও টিফিনের পর পালিয়ে যায় । শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রথম ধাপই হলো বিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি। এখনই এ সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্দ্যোগ না নিলে এস ডি জি 4 অর্জন অসম্ভব হয়ে যাবে । কেন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে যেয়ে নিন্ম লিখিত কারণ সমূহ চিহ্নিত করা হয় ।
১। পরিকল্পিত ও আকর্ষণীয় শ্রেণী কার্যক্রম না হওয়া ।
২। শিক্ষকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব ।
৩। অভিভাবকের অসচেতনতা ।
৪। ক্লাস না করলেও পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ পায় ।
৫। পাঠ দান পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার জন্য শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসতে মজা পায়না ।
৬। দারিদ্রতা
৭। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ আকর্ষনীয় নয় ।
৮। পর্যাপ্ত খেলার সামগ্রীর অভাব ।
৯। কিছু প্রতিষ্ঠানে ক্লাস সাইজ বড় হওয়া ।
১০। দুপুরে স্কুলে খাবারের ব্যবস্থা না থাকা ।
১১। বাল্যবিবাহ
১২। ভৌগলিক কারণ যেমনঃপাহাড়, হাওড়, উপকূল ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের জেলাগুলোয় শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার সবচেয়ে কম।
১৩। প্রতিষ্ঠান ও অভিবাবকদের মধ্যে কোন কোড অফ কন্ডাক্ট না থাকা ।
১৪। ছাত্রীদের জন্য হাইজিন কর্নার না থাকা ।
১৫। উপস্থিতির বিষয়টি মনিটর করার জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার না থাকা ।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতির কারন বিবিধ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় ও পরিবার এজন্য দায়ী। এর পরে বলা যায় শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি এজন্য দায়ী। একজন শিক্ষকের ক্লাস যখন আকর্ষণীয় হয় তখন ঐ ক্লাস শিক্ষার্থীদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে, অন্য কোন কিছু আর তাদের ধরে রাখতে পারেনা। তারা ঐ ক্লাসে যাবেই। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার অন্যকোন মন্ত্র নেই, মন্ত্র একটাই আর তা হচেছ শ্রেণিকক্ষে আকর্ষণীয় , সুখময় ও আনন্দঘন শিখণ-শেখানোর পরিবেশ সৃষ্টি করা। কোন শিক্ষক যখন পূর্ব প্রস্থুতি নিয়ে শিক্ষক ডাইরি অনুযায়ী পাঠ টিকা তৈরী করে উপকরণ সহ ক্লাস গ্রহণ করে তখন শিখণ-শেখানোর প্রকৃত পরিবেশ সৃষ্টি হয় । যে শিক্ষক এই কাজটি ফলপ্রসূভাবে করতে পারেন, তিনিই স্বার্থক, শিক্ষার্থীরা তাঁর ক্লাস করার জন্য উদগ্রীব থাকে। মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে মজা পায়না। এখন যে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস হয় তাঁর মানও সন্তোষজনক নয় । অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টরও নষ্ট, ফলে ক্লাসও ঠিকমত হয় না । আবার ক্লাস না করলেও পরীক্ষায় অংশগ্রহন করা যায়, পরীক্ষায় ভাল করা যায় তাই তারা ক্লাসে আসেনা। এটা শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এ দুটোর দুর্বলতার জন্য শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসতে মজা পায়না, তাই আসেনা। শিক্ষকের মধ্যে যদি আন্তরিকতার অভাব থাকে পেশাদারিত্বের অভাব থাকে তাকে দিয়ে কোন ভাবেই সফল ক্লাস করানো সম্ভব নয় । শিক্ষকদের আন্তরিকতা বৃদ্ধির জন্য ২/৩ মাস পর পর উপজেলা পর্যায়ে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ওয়ার্কশস করার বিষয়টি উর্দ্ধোতন কর্তৃপক্ষ সক্রিয় বিবেচনা করতে পারেন ।
কোন শিক্ষার্থী ৮০% ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে কোন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না এই রকম একটা বিধান করতে পারলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে আশা করা যায় । তাঁর আগে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা চালু করা জরুরী ।
শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন অভিভাবকের অসচেতনতা । গ্রামের তুলনায় শহরের স্কুল গুলিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অনেক বেশী । সচেতন অভিভাবকই তাঁর অন্যতম কারণ । গুণগত শিক্ষার অন্যতম ষ্টেকহোল্ডার অভিভাবক । অভিভাবকের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছাড়া গুণগত শিক্ষা সম্ভব নয় । প্রত্যেকটা অভিভাবকই তাঁর সন্তানকে প্রাণাধিক ভালোবাসে । প্রত্যেকেই চায় তাঁর সন্তানটি মানুষের মত মানুষ হোক, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক । কিন্তু সন্তানকে মানুষ করতে হলে তাঁর যে দায়িত্ব কর্তব্য আছে সে সম্পর্কে সচেতন নয় । বিশেষ করে সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে অনেক শিক্ষিত অভিভাবকও সচেতন নয় । অভিভাবকদের সচেতন করা না গেলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো যাবে না, ফলে গুনগত শিক্ষা অর্জন প্রায় অসম্ভব । অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য বর্তমানে অভিভাবক সমাবেশ চালু আছে । এটা খুব বেশী কার্যকর নয় । কৃষি বিভাগের একটা নতুন জাতের বীজ আসলে সে সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় । অথচ সন্তান হলো একজন অভিভাবকের তথা দেশের অমুল্য সম্পদ । এই সন্তানকে সম্পদে রুপান্তর করতে হলে অভিভাবকের দায়িত্ব কর্তব্য সর্ম্পকে প্রশিক্ষণ হওয়া জরুরী । সকলের সম্ভব না হলে শুধু মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে । আমার বিশ্বাস শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বৃদ্ধি সহ গুনগত শিক্ষা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে ।
আমাদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন, গুছানো, আকর্ষণীয় নয় । আমাদের যতটুকু অবকাঠামো বা খেলার মাঠ আছে তা গুছানো নয় । মোট কথা প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের কাছে কোন আকর্ষণীয় স্থান নয় । যতটুকু সম্পদ আছে সেটুকুই সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে আশা করা যায় ।
প্রতিষ্ঠানগুলিতে যদি পর্যাপ্ত খেলার সামগ্রী থাকে, লাইব্রেরীতে যদি পর্যাপ্ত গল্পের বই থাকে, বিজ্ঞান ক্লাব, সাংস্কৃতিক ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, আই সি টি ক্লাব,স্কাউটিং ইত্যাদি সংগঠন সক্রিয় থাকে তবে দেখা যাবে খেলার আকর্ষণে ১০০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসবে, বিজ্ঞান ক্লাবের ৫০ জন সদস্য, নাচ গান কবিতা আবৃতির আকর্ষণে আর৫০ জন বিতর্ক ক্লাবের আরও ২৫ জন এই ভাবে শিক্ষার্থীদের যদি বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত করা যায় তবে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায় ।
বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা এত বেশী এ শিক্ষকের পক্ষে সকল ছাত্রের সঠিক ভাবে সুপারভিশন করা সম্ভয় হয় না । সেই সকল প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থি অনুপস্থিত থাকে । যেহেতু শিক্ষকদের সকল শিক্ষার্থীদের উপর নজর রাখা সম্ভব হয় না ফলে তারা স্কুলে আসলেও পালিয়ে যায় । কিছু প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংখ্য অনেক কম আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে এত ছাত্র যে বসার জায়গা দিতে পারে না । এই কারনে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি নীতিমালা এমন ভাবে করা প্রয়োজন যাতে সকল প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি সমান শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে । এর ফলে শিক্ষার্থির উপস্থিতি যেমন বৃদ্ধি পাবে অন্য দিকে শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি পাবে । অনেক শিক্ষার্থী আছে ভোর বেলা প্রাইভেট পড়তে যায় এর পর না খেয়েই স্কুলে আসে মিড ডে মিল চালু না থাকায় তারা টিফিনে স্কুল থেকে চলে যায় । মিড ডে মিল চালু করতে পারলে শিক্ষার্থী উপাস্থিতি বৃদ্ধি সহ স্কুল পালানোর সংখ্যা হ্রাস পাবে । টিফিন বাদ দিয়ে সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত স্কুল সময় সূচী করলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে বলে অনেকে মত দিয়ে থাকেন । সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুপুর ২ টা ৩০ থেকে ৫ টা পর্যন্ত অন লাইনে টেলিভিশন বা ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে খ্যাতিমান শিক্ষকদের দিয়ে গণিত, ইংরেজী, বিজ্ঞানের মত কিছু ক্লাস সারা বছর চালু রাখলে প্রাইভেট নির্ভরতা কমবে এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায় ।
বাল্যবিবাহ শিক্ষার্থীর ক্লাসে অনুপস্থিতির আর একটি কারন । এ ক্ষেত্রে আমার মত হলো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য আমাদের সর্বাত্বক চেষ্টা চালাতে হবে । তাঁর পরেও যাদের বিয়ে হয়ে যাবে তারা যাতে নিয়মিত স্কুল করতে না পারে তা নশ্চিত করা প্রয়োজন । একজন বিবাহিত মেয়ে একশো অবিবাহিত মেয়ে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ঠ । যদি বিয়ে হয়েই যায় তবে সে বাড়ীতে বসে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে । কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পারেন ।
একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুলে ভর্তি হয় তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা সমযোতা চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে । সেখানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, বেতন, আচরন ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকতে পারে । এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে ।
এখন প্রতিটি স্কুলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশী । ছেলেদের থেকে মেয়েদের উপস্থিতিও বেশী । কিন্তু পিরিয়ডের কারণে অনেক সময় অনেক মেয়েদের উপস্থিতিতি কমে যায় । প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে হাইজিন কর্ণার গড়ে তুলতে পারলে এই সমস্যা অনেক খানি সমাধান হবে আশা করা যায় ।
সকল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল হাজিরা এখন সময়ের দাবী । ডিজিটাল হাজিরা সংযোযন করা গেলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জবাবদিহিতা সঠিক ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে । ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বৃদ্ধি পাবে । সেই সাথে শিক্ষকদের হোম ভিজিট অব্যাহত রাখা যেতে পারে । সর্বোপরি শিক্ষকদের আন্তরিকতা বৃদ্ধি ছাড়া কোন কার্যক্রমই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় । শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে এস ডি জি ৪ অর্জন সহজ হবে ।