সহকারী অধ্যাপক
২৫ এপ্রিল, ২০২০ ০৪:২২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারিতে বৈশ্বিক মৃত্যু দুই লাখ ছুঁই ছুঁই। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ২৭ লাখ। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছে সাত লাখ ৭১ হাজারের বেশি। এর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রেই ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে; আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৯ লাখ। চীনের উহান শহরে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাস শনাক্তের চার মাস পূর্ণ হওয়ার কাছাকাছি এসে বিশ্বের এই পরিস্থিতি দাঁড়াল।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহেই বিশ্বে করোনায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে সাড়ে ১০ লাখের মতো। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সপ্তাহখানেক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া প্রায় সব দেশেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমছে।
গত ৩১ ডিসেম্বর উহানে নতুন করোনাভাইরাস শনাক্তের কথা জানায় চীন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেখানকার একটি বন্য প্রাণীর বাজার থেকে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তবে এখনো ভাইরাসটির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মেলেনি কোনো কার্যকর প্রতিষেধক বা ওষুধ। এরই মধ্যে বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি নাস্তানাবুদ। আর লকডাউনের মতো বিধি-নিষেধে খাদ্যসংকটে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যের অভাবে বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) প্রধান ডেভিড বিসলি সম্প্রতি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়কে বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই একাধিক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারি আমরা। সত্য হচ্ছে, আমাদের হাতে আর সময় নেই।’
ডাব্লিউএফপির হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বে সাড়ে ১৩ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে আছে। এসব মানুষের বেশির ভাগই সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাসিন্দা। করোনার কারণে সাড়ে ২৬ কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগতে পারে।
চলতি মহামারিতে পর্যটন থেকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেমিট্যান্স ধস, নিষেধাজ্ঞাসহ নানা কারণে বিশ্বে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
মহামারিতে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসে শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি কম হলেও এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্বের সব পরিবার ও সব পর্যায়ের নেতাদের প্রতি শিশুদের সুরক্ষার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। বৈশ্বিক মন্দা এগিয়ে আসছে; এতে ২০২০ সালে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে।’
মৃত্যুতে শীর্ষ ১০ দেশ
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, করোনা মহামারিতে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে। সেখানে অন্তত ২০ হাজার ৮৬১ জন মারা গেছে করোনায়। আক্রান্তের বিচারে ইউরোপের দেশ ইতালি তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও মৃত্যুতে দেশটি দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। সেখানে মারা গেছে সাড়ে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা স্পেনে মারা গেছে সাড়ে ২২ হাজার মানুষ। প্রায় ২২ হাজার প্রাণহানি নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে আছে ফ্রান্স। যুক্তরাজ্যে মারা গেছে সাড়ে ১৯ হাজারের বেশি মানুষ। বেলজিয়ামে মারা গেছে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি মানুষ। পাঁচ সহস্রাধিক করে মানুষ মারা গেছে ইরান ও জার্মানিতে। চীনের মূল ভূখণ্ডে মৃতের সংখ্যা চার হাজার ৬৩২ জন। নেদারল্যান্ডসে মারা গেছে চার হাজার ২৮৯ জন। এ ছাড়া মৃত্যুতে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ব্রাজিলে মারা গেছে তিন হাজার ৪০৭ জন এবং তুরস্কে মারা গেছে দুই হাজার ৬০০ জন।
ইউরোপের অর্ধেক মৃত্যু বৃদ্ধনিবাসে
এদিকে করোনায় ইউরোপে মারা যাওয়াদের অর্ধেকই বৃদ্ধনিবাসে ছিলেন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)। গত বৃহস্পতিবার ডাব্লিউএইচওর ইউরোপীয় কার্যালয়ের পরিচালক হ্যান্স ক্লুগ বলেছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বৃদ্ধনিবাসগুলোর ভয়াবহ চিত্র উঠে আসছে। এমন মানবিক বিপর্যয়ের কথা ভাবা যায় না।
করোনাভাইরাসে বয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় ক্লুগ করোনাভাইরাস পরীক্ষার ক্ষেত্রে বৃদ্ধনিবাসগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্লুগ বলেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত-মৃত্যু স্থিতিশীল এবং কমে আসতে থাকলেও এ মহামারি শেষ হওয়া এখনো অনেক দূরের পথ।
ডাব্লিউএইচওকে আরো তিন কোটি ডলার দেবে চীন
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডাব্লিউএইচও) আরো তিন কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। জাতিসংঘের এ সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহায়তা স্থগিতের ঘোষণার কয়েক দিন পর বৃহস্পতিবার বেইজিং এ ঘোষণা দিল।
এর আগে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ডাব্লিউএইচওকে দুই কোটি ডলার দিয়ে সহায়তা করে চীন। মূলত কভিড-১৯ মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র।
টানা আট দিন করোনায় মৃত্যু নেই চীনে
করোনার প্রথম কেন্দ্রস্থল চীনে টানা অষ্টম দিনের মতো কভিড-১৯ রোগী কারো মৃত্যু হয়নি। তবে বৃহস্পতিবার চীনের মূল ভূখণ্ডে ছয়জন নতুন রোগী ধরা পড়েছে, যার মধ্যে দুজন বিদেশফেরত, বাকি চারজন স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, বর্তমানে চীনে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৭৬৯ জন, যার মধ্যে ৩২ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন।
স্পেনে এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মৃত্যু
স্পেন গতকাল জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৩৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে গত ২২ মার্চ দেশটিতে করোনায় ৩৯৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। সব মিলিয়ে স্পেনে করোনাভাইরাসজনিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৫২৪ জনে। এই সংখ্যা মৃতের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ প্রাণহানির সংখ্যা।
আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ায় দ্বিগুণ মৃত্যুর শঙ্কা
করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ম্যালেরিয়া মোকাবেলা প্রচেষ্টা ব্যাহত হওয়ায় চলতি বছর আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে দ্বিগুণ মানুষ মারা যেতে পারে বলে বৃহস্পতিবার আশঙ্কা প্রকাশ করছে ডাব্লিউএইচও। এবার ওই অঞ্চলে ম্যালেরিয়ায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে সাত লাখ ৬৯ হাজার।
ইতিমধ্যে আফ্রিকায় প্রায় ২৭ হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছে এক হাজার ৩০০ মানুষ। এ কারণে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর সরকার ও ডাব্লিউএইচওর পুরো নজর রয়েছে করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ওপর।
ডাব্লিউএইচওর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক ড. মাতশিদিসো মোয়েতি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি মশারি বিতরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় তবে সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২০১৮ সালের তুলনায় দ্বিগুণ লোক ম্যালেরিয়ায় মারা যেতে পারে। ২০০০ সালের পর থেকে এটিই হবে ম্যালেরিয়ায় সর্বোচ্চ মৃত্যু।
২০১৮ সালে আফ্রিকা অঞ্চলে ২১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, যা বিশ্বের মোট ম্যালেরিয়া আক্রান্তের ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। সূত্র : এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স।