Loading..

০৬ মে, ২০২০ ০৫:০২ অপরাহ্ণ

সাপ আমাদের শত্রু নয়
<?xml encoding="utf-8" ?>

রাজশাহীতে কয়েক দিনে অনেকগুলো গোখরা সাপ মারা পড়েছে। ডিম নষ্ট করা হয়েছে। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একটি দোকান থেকে বিষাক্ত পদ্মগোখরা সাপ মারা হয়েছে। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় একটি বাড়ির শোবার ঘরে পাওয়া গেছে অনেকগুলো গোখরা সাপ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাপ ধরা পড়ছে। অধিকাংশ সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। কেননা সাপ কামড়ালে মানুষ বাঁচবে না। তাই নিরাপদে থাকতে মানুষ একের পর এক সাপ হত্যা করে চলেছে।

সাপ পরিবেশের বন্ধু, আমাদেরও বন্ধু। সাপের উপকারিতা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুক পাতায় লেখেন, ‘এসব জায়গার কোথাওই সাপেড় কামড়ে সম্প্রতি কেউ মারা গেছেন তাও শোনা যায়নি। কিন্তু তবুও চলছে সাপ মারা। আপনারা জানেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সাপের অবদান? পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ সাপের প্রধান খাবার। সাপ এগুলো না খেলে আমরা হয়তো টিকতে পারতাম না।’ সাপ নিধনের ক্ষতির দিকটিও ফেসবুকে তুলে ধরেন শাহরিয়ার আলম। লেখেন, ‘ইঁদুরের গর্তে সাপ ঢোকে ইঁদুর ধরার জন্য। যেসব জায়গায় সাপ ধরে ধরে মারা হচ্ছে সেসব জায়গায় আগেও সাপ ছিল, বাচ্চা হতো। সেই সাপগুলো ইঁদুর নিধন করত। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে এ জায়গাগুলো ইঁদুরের দখলে চলে যাবে। আর ইঁদুর যে কি ক্ষতি করতে পারে তা আমরা সবাই জানি এবং বুঝি।’

সাপ খুব নিরীহ প্রাণী। নিজেকে বিপদগ্রস্ত মনে না করলে কাউকে কামড়ায় না। সাপ সাধারণত পাহাড় কিংবা বন-জঙ্গলে থাকতে পছন্দ করে। তাহলে প্রশ্ন জাগে- মানুষের রান্নাঘরে সাপ কেন? ঘরের মধ্যে সাপ কেন? উত্তর একটি- সাপের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কাটা চলছে। বন-জঙ্গল উজাড় হচ্ছে। তাছাড়া বর্ষাকালে চারদিকে পানিতে থৈ থৈ করার কারণে সাপেরা আশ্রয় নিয়েছে উঁচু জায়গাতে, মানুষের মাটির ঘরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে সাপের নিরাপদ আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। সেচের কারণে মাটি ভেজা এবং বৃক্ষরোপণের কারণে পরিবেশ ছায়াসুশীতল থাকছে। ভূ-প্রকৃতির এ পরিবর্তনে সাপ খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য আবাসিক এলাকায় ঢুকছে। এরা কাঁচা ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। বাড়ির ইঁদুরের গর্তে ডিম ফোটাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যাপক ও পরিচালক বহিরাঙ্গন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান বলেন, ‘রাজশাহীতে যে সাপগুলো সম্প্রতি রান্নাঘরের গর্ত থেকে মারা হয়েছে, এগুলো ‘খইয়া গোখরা’। বাংলাদেশে তিন ধরনের গোখরার মধ্যে এই গোখরাই সবচেয়ে বেশি। অপর দুই ধরনের গোখরার মধ্যে ‘পদ্ম গোখরা’ বা ‘রাজ গোখরা’ সাধারণত সুন্দরবন, সিলেট, চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে বেশি পাওয়া যায়। অন্যটিকে বলে ‘গোক্ষুরা’, এটিও প্রায় সারা দেশে পাওয়া যায়। সাধারণত মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কোবরার প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে এদের বেশি দেখা যায়। মাটির ঘরে, বিশেষ করে চুলার পাশে একটু উষ্ণ থাকে বলে রান্নাঘরের আশপাশে থাকতে পছন্দ করে। তাছাড়া রান্নাঘর বা মাটির ঘরে ইঁদুরের গর্ত থাকে। এ গর্তগুলোয় সাপের প্রিয় খাদ্য ইঁদুর শিকার করতে আসে। পরে এসব গর্তেই তারা বাসা করে ডিম দেয়। তিনি বলেন, ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘রাসেল ভাইপার’ও এখন রাজশাহী অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এ সাপ অত্যন্ত বিষধর এবং মহাবিপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।’

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ কোবরা বা গোখরার রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান পটাশিয়াম সায়ানাইড। বিদেশে পটাশিয়াম সায়ানাইডের বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য গোখরার বিষ ব্যবহার করা হয়, যা দিয়ে তৈরি হয় ক্যান্সার, বাত, আলসারসহ জীবনরক্ষাকারী অনেক ওষুধ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, অস্ট্রিয়াসহ যেসব দেশ রাসায়নিক মৌল বা যৌগ উপাদান তৈরি করে তাদের কাছে গোখরার বিষ খুবই মূল্যবান। বিশেষ করে হার্টের বা স্ট্রোকের মতো রোগের ওষুধ তৈরিতে এ বিষ খুবই কার্যকর। এছাড়া সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় যে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দরকার সেটিও বানাতে দরকার ওই বিষ। তাই দেশের চাহিদা অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন তৈরি ও বিদেশের বাজারে তা রফতানিতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক বিষধর সাপ উৎপাদন। এ জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাপের খামার গড়ে উঠেছে। সেসব দেশে আপনা-আপনি প্রকৃতি থেকে সাপ ধরা বন্ধ হয়ে গেছে।

বাড়ির গোলাঘরে বা শোবার ঘরে ইঁদুর বেশি থাকলে সাপ আসতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে যখন সাপের প্রজনন সময় তখন সাপের সংখ্যাও বেড়ে যায়। বর্ষার সময় চারদিক পানিতে ভরে যাওয়ায় সাপ বাড়ির আশপাশে আশ্রয় নেয়। এ সময় গোলাঘরের আশপাশে বিছানা করে ঘুমানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গ্রামগঞ্জে প্রায়ই খোলা আকাশের নিচে মশারিবিহীন বিছানায় ঘুমাতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে মশারি টাঙানো জরুরি। বেশিরভাগ সাপ সাধারণত সন্ধ্যা থেকে রাতে বিচরণ বাড়ে। এ সময় সাপ ক্ষুধার্থও থাকে এবং বিষ থলিতে বিষের পরিমাণ বেশি থাকে। সুতরাং এ সময় অবশ্যই পা ঢাকা জুতা পরে বের হওয়া প্রয়োজন। বাড়ির লাকড়ির ঘরে রাতে কাজ না করাই ভালো। কেননা এসব জায়গায় সাপ আশ্রয় নিতে পারে। সাপ যাতে বাড়িতে না আসে সে জন্য কার্বলিক এসিড ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে রুমের চারপাশে কাঁচা রসুন মিশ্রিত পানি বা পেস্ট রাখলে এর কয়েক ফুট স্কয়ারে সাপ আসে না। বিড়াল কুকুর পুষে সাপের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। সাপ দেখলে স্থানীয় বন অধিদফতরের লোকজনদের খরব দিলে তারা সাপ ধরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সাপে কামড়ালে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। রোগীকে সাহস জোগাতে হবে। বেশি নড়াচড়া করতে দেয়া যাবে না। অনেক সময় নির্বিষ সাপে কামড়ালেও আতঙ্কিত হয়ে মানুষ হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। আজকাল অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন প্রায় হাসপাতালেই পাওয়া যায়। সময় মতো অ্যান্টিভেনম দিলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।

প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এ ধারণাগুলো এতটাই বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরা হয় যে, তা মানুষের মনে একেবারে গেঁথে গেছে। তাই সাপ দেখলেই আমরা মেরে ফেলি। তা সাপ ক্ষতি করুক বা নাই করুক। বিষ থাকুক বা না থাকুক। সাপ মানেই বিষধর নয়। পৃথিবীতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার প্রজাতির সাপ রয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৫০০ প্রজাতির সাপ বিষধর। আমাদের দেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ থাকলেও বিষধর সাপ রয়েছে মাত্র ২০ প্রজাতির।

মন্তব্য করুন