সহকারী শিক্ষক
১৮ জুলাই, ২০২০ ১০:০৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
পৃথিবীতে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধি আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মানুষের মেধা ও বুদ্ধির বিকাশকে উৎসাহিত করেছেন। এই ক্ষেত্রে জ্ঞান-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ধারক বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন—‘আফালা তাকিলুন’ (তোমরা কি বুঝবে না?), ‘আফালা তুবসিরুন’ (তোমরা কি ভেবে দেখবে না?), ‘আফালা তাতাফাক্কারুন’ (তোমরা কি চিন্তা করবে না?) ও ‘আফালা তাজাক্কারুন’ (তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?)—এভাবেই মহান আল্লাহ তাঁর দেওয়া জ্ঞান-বুদ্ধির কল্যাণকর ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
কোরআনে বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা
কোরআনে বুদ্ধিমান ও সূক্ষ্ম বিচারশক্তিসম্পন্ন মানুষের প্রশংসা করা হয়েছে। সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্মরণ করো দাউদ ও সুলাইমানের কথা। যখন তারা বিচার করছিল শস্যক্ষেত সম্পর্কে; রাতের বেলা তাতে প্রবেশ করেছিল কোনো সম্প্রদায়ের মেষ। আমি দেখছিলাম তাদের বিচার। আমি সুলাইমানকে এই বিষয়ে মীমাংসা বুঝিয়ে দিলেছিলাম। তাদের প্রত্যেককে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান।...’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৭৮-৭৯)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ এখানে সুলাইমান (আ.)-এর বিচক্ষণতার প্রশংসা করেছেন। তবে দাউদ (আ.)-এর নিন্দা করেননি। তা না হলে বিচারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেত। সুলাইমান (আ.)-এর কাজের প্রশংসা করা হয়েছে, দাউদ (আ.)-এর ইজতিহাদকে অপারগতা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।’
বুদ্ধিমত্তা পছন্দ করতেন নবী-রাসুলরা
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইসমাঈল (আ.) যৌবনে পদার্পণ করার পর বনি জুরহামের এক নারীকে বিয়ে করেন। ইবরাহিম (আ.) মক্কায় আসেন, কিন্তু কিন্তু ইসমাঈল (আ.)-এর দেখা পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে বের হয়েছেন। ইবরাহিম (আ.) তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভালো নেই। অনেক কষ্ট ও অভাবের মধ্যে আছি। স্বামীর ব্যাপারেও সে অভিযোগ করল। ইবরাহিম (আ.) বললেন, তোমার স্বামী ফিরে এলে আমার সালাম জানাবে এবং দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করতে বলবে। ইসমাঈল (আ.) ফিরে এলে স্ত্রী ঘটনা খুলে বলেন। তিনি বলেন, তিনি আমার বাবা। আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তোমার সঙ্গে বিচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি তোমার বাড়ি যাও। ইসমাঈল (আ.) জুরহাম গোত্রের অপর এক এক নারীকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর ইবরাহিম (আ.) আবার আসেন। এই স্ত্রীর জীবন কিভাবে কাটছে জানতে চাইলে সে বলে, আলহামদু লিল্লাহ! আমরা ভালো আছি। ইবরাহিম (আ.) তাদের বরকতের জন্য দোয়া করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৬৪)
হাদিস বিশারদরা বলেন, উভয় স্ত্রী একই সংসারে থাকলেও উত্তরের ক্ষেত্রে উভয়ে সমান বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় না করা এবং সংসারের অভাব-অভিযোগ অপরিচিত কাউকে জানানো নির্বুদ্ধিতা। ইবরাহিম (আ.) যা পছন্দ করেননি।
বদর যুদ্ধে রাসুল (সা.)-এর বিচক্ষণতা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ অসাধারণ বিচক্ষণতা দান করেন। যা তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে যুদ্ধের ময়দানে পর্যন্ত প্রকাশ পেত। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, বদর যুদ্ধের আগে কুরাইশের এক লোক আটক হলে রাসুল (সা.) তার কাছে কুরাইশ বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা জানতে চান। বারবার জিজ্ঞেস করার পরও সে তা বলতে অস্বীকার করে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করেন, প্রতিদিন কয়টি উট জবাই করা হয়। সে বলল, ১০টি। উত্তর শুনে রাসুল (সা.) বললেন, তাদের সংখ্যা এক হাজার। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯৪৮)
বিবেকবুদ্ধি দ্বিন বুঝতে সহায়ক
মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও বিবেচনা আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য, ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধানের অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে সহায়ক। যা মানুষের ভেতর আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর প্রতি আস্থা ও শাস্তির ভয় জাগ্রত করে। আলী (রা.) বলেন, ‘বিশ্বাসের চার স্তর : সূক্ষ্মদর্শিতা, প্রজ্ঞার বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা লাভ ও পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি। যে সূক্ষ্মভাবে কিছু বিশ্লেষণ করল সে প্রজ্ঞার ব্যাখ্যা জানতে পারল। যার প্রজ্ঞা লাভ হলো যাচাই-বাছাই ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেল। অভিজ্ঞতাই পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেয়।’ (তারিখু মদিনায় দামেস্ক : ৪২/৫১৫)
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) বলেন, ‘বিবেকবুদ্ধি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে আর প্রবৃত্তি শয়তানের দিকে। (সুস্থ) পার্থিব জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে বের করে আর প্রবৃত্তি পৃথিবীর ভোগ-বিলাসে মত্ত হতে বলে।’ (তাফসিরু গারায়িবিল কোরআন ওয়া রাগায়িবিল ফোরকান : ৪/৫৩৪)
মেধা শাণিত হয় যেসব কাজে
প্রখ্যাত আরব চিন্তাবিদ ইবরাহিম শামসুদ্দিন বলেন, মেধা দুই প্রকার। প্রথম প্রকার মেধা বাড়েও না, কমেও না। এটা আল্লাহ প্রদত্ত। দ্বিতীয় প্রকার মেধা কিছু কাজ ও চর্চার মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়, আবার কিছু কাজের কারণে তা লোপ পায়। (কাসাসুল আরব : ২/৫)
মেধা শাণিত হয় এমন কয়েকটি কাজ হলো
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান : তাহের ইবনে আসুর বলেন, ‘ঈমান মানুষের বিচক্ষণতা বৃদ্ধি করে। কেননা বিশ্বাসের মূল কথাই হলো, বিভ্রান্তিকর মতবাদ ও অস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা।’ (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির)
২. চিন্তা ও গবেষণা : চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান শাণিত হয়। পবিত্র কোরআনে অসংখ্য স্থানে মানুষকে চিন্তা ও গবেষণায় উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি নিজেদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করো না?’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ২১)
৩. অতি নিদ্রা ত্যাগ : অতিরিক্ত পানাহার ও নিদ্রা মানুষের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা কমিয়ে দেয়। প্রখ্যাত তাবেয়ি আবু আবদুল্লাহ মাকহুল বলেন, ‘তিনটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহ পছন্দ করেন এবং তিনটি বৈশিষ্ট্য আল্লাহ অপছন্দ করেন। পছন্দনীয় তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো, অল্প খাওয়া, অল্প ঘুমানো, অল্প কথা বলা। অপছন্দনীয় তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো, বেশি খাওয়া, বেশি কথা বলা ও বেশি ঘুমানো। বেশি ঘুমালে আলস্য বাড়ে, বুদ্ধি কমে যায়, বিচক্ষণতা লোপ পায় এবং অন্তরে উদাসীনতা তৈরি হয়।’ (কুওয়াতুল কুলুব ফি মুআমালাতিল মাহবুব, পৃষ্ঠা ১৭৫)
৪. পরিমিত খাবার গ্রহণ : ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ শরীর ভারী করে, অন্তর কঠোর করে, বুদ্ধিমত্তা নষ্ট করে, ঘুম বাড়িয়ে দেয় এবং মানুষের ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।’ (আদাবুশ শাফেয়ি, পৃষ্ঠা ১০৬)
৫. আত্মজিজ্ঞাসা : নিজের কাজের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ ও তা থেকে আত্মসংশোধনকে মুহাসাবা বা আত্মজিজ্ঞাসা বলে। হারেস ইবনে আসাদ বলেন, ‘আত্মজিজ্ঞাসা দূরদৃষ্টি, বুদ্ধিমত্তা, যুক্তিগ্রহণ ও সত্যের সন্ধান লাভে সহায়ক।’ (আল আকলু ওয়া ফাহমুল কোরআন, পৃষ্ঠা ১৮১)
বুদ্ধিমত্তার অন্যায় ব্যবহার নিষিদ্ধ
বুদ্ধিমত্তা আল্লাহর বিশেষ দান। মানুষ তার বিচারবুদ্ধি ও বিচক্ষণতা কল্যাণের কাজে ব্যবহার করবে এটাই ইসলামের নির্দেশনা। আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও বুদ্ধির অন্যায় ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ। উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মতো মানুষ। তোমরা আমার কাছে বিচার নিয়ে আসো। তোমাদের কেউ কেউ প্রতিপক্ষের তুলনায় প্রমাণ উপস্থাপনে বেশি পটু। ফলে আমি যদি কারো পক্ষে তার ভাইয়ের অধিকারের রায় দিই, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা প্রকৃতপক্ষে আমি তার জন্য জাহান্নামের অংশ নির্ধারণ করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস; ৭১৬৯)