Loading..

০৪ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

শিক্ষক দিবস-২০২০

                                                                                 “শিক্ষক দিবস 

শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস যা বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হয়। এদিন শিক্ষকদেরকে তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মাননা দেয়া হয়। ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হলেও সেপ্টম্বরের ৫ তারিখ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব শিক্ষক দিবসএক জন সফল মানুষের পেছনে শিক্ষকের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। সেই শিক্ষক যে পড়াশোনার ক্ষেত্রেই হতে হবে, তানয়। তিনি থাকতে পারেন জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রেই। তিনি যে পড়ুয়াকে শেখাবেন , তাই নয়। তিনি তাকে জীবনে চলার পথে পরামর্শ দেবেন, ব্যর্থতায় পাশা দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেবেন, সাফল্যের দিনে নতুন লক্ষ্য স্থির করে দেবেন। তিনি তাকে শুধু সফল নয়, একজন ভাল মানুষ হতে শেখাবেন।

আমাদের শিক্ষানবিশী চলতেই থাকে। জীবনভর। আমরা প্রতিদিন শিখি। যাপন ও জীবনের রোজনামচা আমাদের প্রায় প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় কত কিছু যে শিখতে বা শিখে নিতে বাধ্য করে। আমরা ঠেকে শিখি। ঠকে শিখি। ভুল করি বিস্তর। আবারও ঠিক করে ফেলি। পরবর্তী অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনে ছাত্রাবস্থায় শেখা অনেক ভাল জিনিস কাজে লাগে। অনেক কিছু কিন্তু আবার লাগেও না। আমাদের ছাত্রাবস্থায় সেই শেখাটা কিন্তু ঠিক ছিলকিন্তু নানা প্রতিকুলতা ও চাপের কাছে হয়তো সে আদর্শের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছে। দেওয়ালে কখনও পিঠ ঠেকে গেলে এও মনে হয়েছে, ধ্যুস জীবনে কিছুই শেখা হল না আজও।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বরশিক্ষক দিবস
শিক্ষকদিবস নিয়ে আগামী প্রতিবেদনের মকসো করতে করতে ভাবি, সে ভাবে বলতে গেলে নার্সারি বা স্কুলে ভর্তি জীবনের আগে পর্যন্ত তো আমরা বাড়িতেই অ আ ক খ বা ইংরাজি বর্ণমালা, ১ থেকে ১০০, ছড়া, রং চেনা, পশুপাখিদের ছবি দেখে চিনতে শেখা, রামায়ণের গল্প আরও কত কি বাড়িতেই শিখে যাই বাবা মায়ের কাছ থেকেই। হামাগুড়ি বয়স থেকেই হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা সবই তাদের কাছেই। এক্কেবারে কচি বয়স থেকে আমাদের শিক্ষার হাতেখড়ি তাদের হাত ধরেই। আমাদের বাবা ও মা-ই আমাদের প্রথম ও পরম গুরু। জীবনযাপনের অন্যতম শিক্ষক।
পরবর্তীতেও প্রিয় শিক্ষক তাঁরাই। তাঁদের স্নেহে, প্রশ্রয়ে, শিক্ষায়, সহমর্মিতায়, মরমী সমালোচনায়, চরিত্র গঠনের দৃঢ় শিক্ষায় আমরা ঋদ্ধ হতে থাকি ক্রমশ। আমাদের প্রতিটি আচরণের বহির্প্রকাশ ঠিক কী হবে, শিশুবয়স থেকেই উচিত-অনুচিতের বোধ আমরা শিখতে থাকি তাদের কাছেই। আমাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, আমাদের দায়বদ্ধতা বিশ্বাস, অন্যকে মাণ্যতা দেওয়া, গুরুজনকে সম্মান জানানো, নিজেদের পারিবারিক রীতিকে মর্যাদা দেওয়া, রক্ষণশীলতাকে টিকিয়ে রাখা এই সমস্ত কিছুই শিখি বাড়ির গুরুজন অভিভাবকদের থেকেই। আমাদের আদর্শ আমাদের চরিত্রগঠন সব কিছুর প্রাপ্তি তাঁদের থেকেই। শিক্ষকদিবসের প্রাক্কালে বাবা-মা-কেই অন্যতম প্রারম্ভিক শিক্ষক তথা গুরু হিসেবে স্মরণ করে সালাম জানাতেই পারি

 ফিরে আসি শিক্ষকদিবস প্রসঙ্গে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষকদিবসদেশের অগণিত শিক্ষকদের আদর্শগত মহান কর্মকাণ্ডের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের পেশাগত অবদানকে স্মরণে-বরণে শ্রদ্ধায় পালন করার জন্য সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মহান শিক্ষক দিবস পালন করার রীতি রয়েছে। নির্দৃষ্ট দিনটি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালন করা হয়ে থাকে। যেমন বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ৫ অক্টোবর, ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবসহিসেবে পালিত হয়। UNICEF থেকেও, ৫ অক্টোবর দিনটিই বিশ্ব শিক্ষক দিবসেরস্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সর্বমোট ১৯টি দেশে অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ টিচার্স ডেপালিত হয়। দেশগুলি হলকানাডা, জার্মানি, বুলগেরিয়া, আর্জেবাইজান, ইস্তোনিয়া, লিথোনিয়া, ম্যাকেডোনিয়া, মলদ্বীপ, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কুয়েত, কাতার, রাশিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়া, ইংল্যান্ড, মাউরেটিয়াস, মলদোভা। আবার বিশ্বের অন্য ১১টি দেশে ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটিতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস চালু। দেশগুলি হল মরক্কো, আলজেরিয়া, টিউনেশিয়া, লিবিয়া, ইজিপ্ট, জর্ডন, সৌদিআরব, ইয়েমেন, বাহরেইন, ইউ এ ই, ওমান। ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব শিক্ষক দিবসদিনটি সূচিত হয়। এটি সারা দেশ-বিদেশে শিক্ষকপেশাজীবীদের জন্য সেরা সম্মান। পরবর্তী প্রজন্মও যাতে কার্যকরী ও যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি পালন করে সেটাও উদ্দেশ্যা। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, জাতীয় স্তরে সমগ্র বিশ্বেই একটি বিশেষ দিনকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরিযেটি সমাজ-সংস্কার-শিক্ষায় শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মান দান করার যোগ্য দিন।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ এর জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে শিক্ষক দিবসহিসাবে পালিত হয়। ভারতরত্নউপাধি বিভূষিত প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ। মহান দার্শনিক, আদর্শবান বিচারক ছিলেন ডঃ রাধাকৃষ্ণণ। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন বাগ্মী, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ এবং অদ্বৈত বেদান্ত বাদ রচয়িতা দার্শনিক।

শোনা যায়, তাঁর কিছু প্রিয় ছাত্র ও অধ্যাপক বন্ধুবান্ধব, তাঁর জন্মদিন পালন করতে আগ্রহান্বিত হলেরাধাকৃষ্ণণ তাঁদের বলেছিলেন, ‘‘আমার জন্মদিন পৃথক ভাবে পালন না করে আমি গর্বিত হব, দিনটি যদি দেশের সমস্ত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।’’

পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘‘He has served his nation in many capacities. but above all he is a great teacher from whom all of us have learnt much and will continue to learn.’’

সমাজে শিক্ষকদের সম্মান ও অবদানের জন্য ১৯৬২ সাল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের পঞ্চম দিনটি নির্দৃষ্ট করে, স্কুল-কলেজে নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয়। প্রধানত ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাকে উপহার দেয়। শিক্ষকরাও তাদের আশীর্বাদ স্বরূপ মিষ্টিমুখ করান। বস্তুত একজন ছাত্রছাত্রীর জীবনে যোগ্য শিক্ষকের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রকে নিশ্চিত রূপে আদর্শগত ভাবে রূপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তাঁর ছাত্রের মধ্যে যথাযথ মনন বুদ্ধি চিন্তাকে বাস্তব রূপে প্রতিফলিত করতে। এবং আগামী জীবনযাত্রায় প্রতিটি উপযুক্ত জীবিকা ও সৎ নাগরিক তথা মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরাই।

  বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের নিজস্ব গণ্ডিটাও তো ক্রমশ পরিধি ব্যপ্ত হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টির প্রায় প্রতিটি স্যার,ম্যামদের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের কাছে তখন বাধ্য কুশীলব। তবে এখন যা অভ্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা ও কলেজ ছাত্রছাত্রীদের বচসা, তাণ্ডব মারদাঙ্গার পরিবেশ প্রতিদিন প্রায় কাগজে পড়ি বা টেলিভিশনের লাইভ টেলিকাস্ট বা ব্রেকিং নিউজে প্রায় দেখি। নির্বিঘ্নে পঠনপাঠনের সুস্থ পরিবেশ কলুষিত। ছাত্রানং অধ্যয়ন্দং তপঃএই প্রবাদটি আজ যেন অতীত। আবার কলেজে ছাত্র নিরাপত্তাহীনতা অসন্তোষ এ সবও লেজর হয়ে জুড়ে আছে। আমরা অধ্যাপক অধ্যাপকদের যে সমীহ ও সম্মানের নজরে দেখতামসে আজ কোথায়?

যতদূর চোখ যায় এ গল্প থেকে সে গল্প। আমরা বার বার পেছন ফিরি। শিক্ষকদিবস নিয়ে লিখতে বসে ধুলো ঝাড়পোঁচ করে পেছনে ফিরে তাকানো। কখনও পুরনো স্মৃতিকাতরতা উথলে উঠে। ফেলে আসা স্কুলজীবনের জন্য মন কেমন জানি করেকিশোর বেলায় ছায়া ও বিষাদের ঘ্রাণ মাখা মনকেমনের বারান্দায় খানিক হেলান দিয়ে বসি। মন খারাপের বাতাস বইলেই চোখ ছলছল। পুরতন গান যেন সুর ভাঙে মনে। কিছুই যেন বিম্বিত হয় না এ চোখে।

জাপানের একটা প্রচলিত প্রবাদ হল‘‘Better than a thousand days of dilligent study is one day with a great teacher’’.

এ কথা বহুলাংশে সত্যি যে শিক্ষকতা এমনই এক পেশা যাকে একসময় বলা হত সব পেশার চেয়ে অন্যতম। তবে দিনকাল বদলেছে। অতীতের গুরুকুলে শিক্ষা, ব্রহ্মচর্য পালন এ সব বহু পুরাতন অতীত। সেই সুচারু শিক্ষাব্যবস্থার প্রচণ্ড অবনতি হতে দেখেছি এখন। সমালোচনাপ্রবণ দুর্মুখরা এও বলে থাকেন, শিক্ষকরা বছরে পাঁচ মাস প্রায় সবেতন ছুটি ভোগ করেন। বেতনও প্রচুর। প্রাইভেট টিউশনেও দ্বিগুণ আয়। এখন নাকি অতিরিক্ত সরকারি খবরদারির ফলে শিক্ষকরা তাঁদের পেশাকে আর পাঁচটা চাকরির মতোই পেশাগত দৃষ্টিতে দেখেন।

সে যাই হোক। শিক্ষকদিবস আমাদের কাছে আজও একটা মহান দিবস হিসেবেই সূচিত হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সেই কারণেই কবেই বলে গেছিলেন‘‘যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মাননীয়। পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।

মন্তব্য করুন