Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

১৫ অক্টোবর, ২০১৩ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

ঈদ শুভেচ্ছা
শিক্ষাক্রম বিস্তরণ ও আমাদের প্রচার মাধ্যম মোঃ ফেরদৌস হোসেন সহকারী অধ্যাপক ঘোড়ার আগে গাড়ী ছাড়া প্রবাদটি আমাদের দেশে অনেক আগে থেকে চলে আসছে। প্রবাদটি অনুচিৎ কোন কাজের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তার পরেও যে সব কাজের জন্য এ প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে সে সব কাজ আমাদের দেশে খুব কম হচ্ছে তা বলা যাবে না। ব্যক্তি, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রিয় পর্যায় পর্যন্ত সচরাচর এমন অনেক কাজই হচ্ছে যার জন্য এ প্রবাদটি ব্যবহারযোগ্য। এ ধরনের কাজের পিছনে যে বিষয়গুলি কাজ করে তার মধ্যে তাড়া-হুড়া, কাজের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে সঠিক ধারণা না থাকা, নিজ টেনিউর এর মধ্যে কাজ শেষ করতেই হবে এমন প্রবণতা, পরবর্তী দায়ীত্বশীল ব্যক্তির উপর অনাস্থা ইত্যাদি কারণ হিসেবে উল্লেখ করার মত। টেনিউর ভেদে রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে দায়ীত্বশীল ব্যক্তিবর্গের মতাদর্শগত পার্থক্য থাকার কারণে এবং নিজ নিজ মতাদর্শ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রচন্ড প্রবণতা থেকেও এ ধরনের কাজ আমরা হতে দেখি। বর্তমান সরকারের অনেকগুলি সফল কার্যক্রমের অন্যতম হচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০১২ প্রণয়ন। দীর্ঘদিনের চেষ্টা-প্রচেষ্টা, অনেক মেধা আর শ্রমের ফসল এটি, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষাক্রম শুধু প্রণয়ন করাই লক্ষ্য নয়; বরং এর যথাযথ বাস্তবায়নই মূখ্য উদ্দেশ্য। প্রণয়নকৃত শিক্ষাক্রমের লক্ষ ও উদ্দেশ্য অর্জন এবং সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন শিক্ষাক্রম বিস্তরণ। শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়ন বহুলাংশে নির্ভর করে কার্যকরভাবে এর বিস্তরণের উপর। বিস্তরণ প্রক্রিয়ার মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। পরিবর্তিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং প্রণয়নকৃত এসব পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করবেন এ ব্যাপারে সেই শিক্ষক সমাজকে সম্যক ধারণা প্রদান অতিব জরুরী। আর এ কারণেই বিস্তরণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় কাজ শিক্ষক প্রশিক্ষণ। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির নতুন শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে দেশের মাধ্যমিক স্তরের সকল প্রতিষ্ঠানে ২০১৩ সালের পঠন পাঠনের কাজ শুরু করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। নির্দেশ মোতাবেক কাজও হয়েছে। শেষ হয়ে গিয়েছে এ পাঠ্যসূচির উপর ভিত্তি করে একটি বছরের শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম। বার্ষিক পরীক্ষাও শেষ। বার্ষিক পরীক্ষা বলা ঠিক না হলেও বললাম। ঠিক নয় এজন্যে যে, নতুন শিক্ষাক্রমে বার্ষিক পরীক্ষা বলে কিছু নেই। বছরে দুটি পরীক্ষা। একটি হল প্রথম সাময়িক পরীক্ষা এবং অন্যটি দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। আর বার্ষিক পরীক্ষা বললাম এ কারণে যে, খুলনা বিভাগের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই এটি বার্ষিক পরীক্ষা নামেই হয়েছে। পরীক্ষার নাম কী হবে, মূল্যায়ন পদ্ধতিই বা কী হবে এ বিষয়গুলি শুধুমাত্র মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপকদেরই অজানা তা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপকদেরও কারো কারো মধ্যে এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণার অভাব রয়েছে।শিক্ষাক্রম বিস্তরণের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণে NCTB তে কর্মরত জনৈক শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে একটি বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা দিলেন। তার বর্ণনা মতে NCTB এর অজান্তে বছরের শুরুতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারী করে প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রতিবছর তিনটির পরিবর্তে দুইটি পরীক্ষা নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ দুটি পরীক্ষার নাম হিসেবে ‘অর্ধ-বার্ষিক’ ও ‘বার্ষিক’ পরীক্ষা উল্লেখ করা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত আদেশটি শুধুমাত্র ৩১৭টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তিতে NCTB এটির ব্যাপারে সংশোধনী দেয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে এটি প্রেরণ করা হয়নি। কিন্তু আদেশটি নাকি এখনও পর্যন্ত কোন কোন ওয়েব পেজে আছে বলে কিছু শিক্ষক জানালেন। ঘটনাটি এ বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, NCTB এবং শিক্ষাক্রমের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কিছু ব্যক্তি ছাড়া উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপকদের অনেকের কাছেই নতুন শিক্ষাক্রমের স্পষ্ট ধারণা নেই। এ কারণেই তারা বছরে দুটি পরীক্ষা হবে এটি জানেন কিন্তু পরীক্ষার নাম কী হবে তা জানেন না। ‘অর্ধ-বার্ষিক’ এবং ‘বার্ষিক’ পরীক্ষা না হয়ে ‘প্রথম সাময়িক’ এবং ‘দ্বিতীয় সাময়িক’ নামকরণের যৌক্তিকতা কী, এটা পাঠকদের কাছে স্পষ্ট করা দরকার। নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাবলিক পরীক্ষা ব্যতিরেকে অন্যান্য শ্রেণিতে অর্থাৎ ষষ্ঠ, সপ্তম ও নবম শ্রেণিতে প্রতি বছর দুইটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে যার প্রত্যেকটি প্রান্তিক মূল্যায়ন বা Summative Evaluation হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় যেসব বিষয়বস্তুর উপর মূল্যায়ন করা হবে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় সেসব বিষয়বস্তুর উপর কোন মূল্যায়ন করা হবে না। বার্ষিক পরীক্ষার অর্থই হচ্ছে বছরব্যাপী পাঠদান করা সমস্ত বিষয়বস্তুর উপর পরীক্ষা। এক্ষেত্রে এটিই হবে প্রান্তিক মূল্যায়ন আর বছরের অন্যান্য সময়ে নেয়া পরীক্ষা হবে গঠনকালীন মূল্যায়ন বা Formative Evaluation. বস্তুত:পক্ষে বর্তমান শিক্ষাক্রমে প্রবর্তিত দুইটি সাময়িক পরীক্ষার প্রত্যেকটি প্রান্তিক মূল্যায়ন এবং প্রতিটি প্রান্তিকে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত GPA এর যোগফল থেকে গড় বের করে CGPA(Cumulative Grade Point Average) হিসেবে ফলাফল প্রদান করতে হবে। এখানে যে বিষয়ট্টি তুলে ধরা হল এটি নতুন শিক্ষাক্রমের অনেকগুলি পরিবর্তনের একটি ক্ষুদ্রতম দিক। কোর বিষয়, বিষয় কাঠামো, নম্বর বন্টন, সময়বন্টন, পিরিয়ড সংখ্যা, ধারাবাহিক মূল্যায়ন ইত্যাদি অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলি শিক্ষকদের কাছে স্পষ্ট না হলে এ শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়ন একেবারেই সম্ভব নয়। শুধু শিক্ষকদের কথাই বা কেন বলছি? শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকগণ সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন একথা সত্য কিন্তু শুধুমাত্র শিক্ষকগণের মধ্যে শিক্ষাক্রমের বিস্তরণ ঘটালেই শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; বরং উচ্চতর পর্যায় অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সকল স্তরে এমনকি অভিভাবক ও শিক্ষার্থী পর্যন্ত সকলের মধ্যে শিক্ষাক্রমের যথাযথ ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়। সকল পর্যায়ে শিক্ষাক্রমের বিস্তরণ ঘটাতে শুধু স্তরভিত্তিক প্রশিক্ষণ একমাত্র মাধ্যম নয়। বরং সংশ্লিষ্ট সর্বমহলে শিক্ষাক্রম বিস্তরণের জন্য আমাদের সুযোগের মধ্যে থাকা সকল মাধ্যম ব্যবহার করা দরকার। গণমাধ্যম এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশের প্রেস এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সংখ্যা-বিবেচনায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ৩টি সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসহ বর্তমানে আমাদের চলমান টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ২৭। এছাড়া আরোও ১৩টি অনুমোদনপ্রাপ্ত চ্যানেল সম্প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে বর্তমানে সম্প্রচারিত ২৭টি চ্যানেলের মধ্যে একটিও শিক্ষা চ্যানেল নেই। নতুন ১৩টি অনুমোদনপ্রাপ্ত চ্যানেলের মধ্যে একটি শিক্ষা চ্যানেল রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এ চ্যানেলটির সম্প্রচার শুরু হলে সরকার কর্তৃক গৃহীত শিক্ষা বিষয়ক নানা কর্মসূচির পাশাপাশি চলমান শিক্ষাক্রমের বিস্তরণ হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু একটি মাত্র চ্যানেল এ কার্যক্রমে অংশ নিবে তা কেন? যে কোন উন্নয়ন কার্যক্রমে গণ অংশায়নের জন্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা থাকা দরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, উন্নয়ন, পরিমার্জন সবকিছু সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমেরই অংশ। এ কার্যক্রমের প্রচার প্রসারের জন্যে অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে এসব চ্যানেলগুলি অনুমোদনের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত থাকা দরকার। শুধু টেলিভিশন চ্যানেল নয়, আমাদের রয়েছে এক সমৃদ্ধ প্রেস মিডিয়া। জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে আমাদের দেশে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা তিন শতাধিক। এছাড়া সাপ্তাহিক পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকার সংখ্যাও কম নয়। প্রচার মাধ্যম হিসেবে আধুনিকতম সংযোজন অন-লাইন পত্রিকা, ফেসবুক ইত্যাদি। এসব মাধ্যমেও শিক্ষাক্রম বিস্তরণ সম্ভব। প্রচারের এ বিশাল আয়োজন আমাদের সুযোগের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও এ সময়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের পূর্বে বিস্তরণের দায়িত্বে এসব মাধ্যমগুলিকে কাজে লাগানোর কোন উদ্যোগ আমরা লক্ষ করিনি। যথাসময়ে এসব মাধ্যম কাজে লাগাতে পারলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পূর্বেই শিক্ষাক্রমের পরিপূর্ণ বিস্তরণ সম্ভব হত। আর বিস্তরণ যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে তবেই এর বাস্তবায়নে আমরা সফল হতে পারতাম। এক বছর কেটে গেল। এই এক বছরে চলমান অবস্থায়ও যদি শিক্ষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এ মাধ্যমগুলিকে কাজে লাগানো যেত তাহলে শিক্ষকরা এতদিনেও এ ব্যাপারে অন্ধকারে থাকত না। আর ঘোড়ার আগে গাড়ী ছাড়ার যে প্রবাদটি দিয়ে শুরু করেছিলাম তা এ প্রসঙ্গে মনে করার দরকার হত না।
মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট