Loading..

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:০২ পূর্বাহ্ণ

মুজিব শতবর্ষের ভাস্কর্য ।

শিল্পকলা বলতে বিশ্বের বিভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিদ্যমান বহুবিধ মানব কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যেগুলিতে দেখা, শোনা বা পড়ার যোগ্য কিংবা পরিবেশন করার মতো এমন বিশেষ কিছু (বস্তু, পরিবেশ বা অভিজ্ঞতা), যার মাধ্যমে সৃষ্টিকারীর কল্পনাশক্তি বা কারিগরি দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং দর্শক, শ্রোতা বা পাঠক বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ও বুদ্ধি দিয়ে মানসিকভাবে যার সৌন্দর্য ও আবেগ উদ্রেককারী ক্ষমতার তারিফ করে। 

শিল্পকলায় সৃষ্ট বস্তুকে শিল্পকর্ম বলে এবং যে ব্যক্তি শিল্পকলার চর্চা করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন, তাকে শিল্পী বলে। কোনও মানব কর্মকাণ্ড ও তার সৃষ্টিকে শিল্প বলে গ্রহণ করা হবে কি না, তা প্রায়শই স্থান, কাল, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় এমনকি ব্যক্তিগত সৌন্দর্যবোধ ও আবেগ-অনুভূতির উপরে নির্ভর করে। আবার স্থান, কাল, সংস্কৃতির সীমানা ছাড়িয়ে সিংহভাগ মানুষের সৌন্দর্যবোধ ও আবেগকে নাড়া দেয়, এমন শিল্পকর্মও রয়েছে। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে আবেগ ও সৌন্দর্যের চিরায়ত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক শিল্পীসমাজ, শিল্পের সমালোচক ও বোদ্ধাসমাজ এবং শিল্পকর্ম ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দ্বারা সমাদৃত যেকোনও কিছুকেই শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হতে পারে, যা সাধারণ জনগণের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে।

শিল্পকলার বিভিন্ন দিকগুলি:

ক) দৃশ্যকলা:
১) ললিতকলা (চারুকলা)
যেসমস্ত শিল্পকলা নান্দনিক বা সৌন্দর্যমূলক কারণে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা হয়, তাদেরকে ললিতকলা বা চারুকলা বলে। এগুলির মধ্যে আছে রংচিত্র অঙ্কন, রেখাঙ্কন, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, ইত্যাদি।

২) চিত্রাঙ্কন (রংচিত্র অঙ্কন)
কোনও ধারণা বা অনুভূতি নান্দনিকভাবে প্রকাশের জন্য কোনও সমতল পৃষ্ঠতলে তুলি, আঙুল বা অন্য কোনও সরঞ্জামের সাহায্যে এক বা একাধিক রঙ পাতলা স্তরের মতো প্রয়োগ করে বা লেপন করে শুকিয়ে চিত্র অঙ্কন করাকে রংচিত্র অঙ্কন বা সংক্ষেপে চিত্রাঙ্কন (Painting) বলে। রংচিত্র অঙ্কন এক ধরনের দ্বিমাত্রিক দৃশ্যকলা।

রেখাঙ্কন:
রেখাঙ্কন বলতে শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের লক্ষ্যে কোনও পৃষ্ঠের উপরে, সাধারণত কোনও সমতল পৃষ্ঠের উপরে (যেমন কাগজ) রেখা জাতীয় দাগ কাটার মাধ্যমে কোনও কিছুর আকৃতি ফুটিয়ে তোলাকে বোঝায়। সাধারণত পেনসিল (গ্রাফাইট), কলম (কালি), কাঠ-কয়লা কিংবা চকখড়ি দিয়ে রেখাঙ্কন করা হয় এবং একাধিক রঙ ব্যবহার করা হয় না।

ভাস্কর্য:
ভাস্কর্য নির্মাণ দৃশ্যকলার একটি শাখা যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত বা নমনীয় উপাদান-পদার্থকে নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী আকার, আকৃতি ও আয়তন প্রদান করে ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করা হয়। ভাস্কর্য নির্মাণকারী শিল্পীকে ভাস্কর বলে এবং উৎপাদিত শিল্পকর্মটিকে ভাস্কর্য বলে।

ভাস্কর্য থেকে চিত্রকর্মের পার্থক্য হল ভাস্কর্য অনেক বেশি বাস্তব ও জীবন্ত। চিত্রকর্মে আলো-ছায়া অঙ্কনের কৌশল ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক স্থানের যে দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করা হয়, তা ভাস্কর্যশিল্পে সম্ভব নয়। কেননা ভাস্কর্যশিল্প সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই ত্রিমাত্রিক। ভাস্কর্য একটি দৃশ্যকলাই শুধু নয়, অর্থাৎ এটি কেবল দর্শনেন্দ্রিয় নয়, বরং স্পর্শেন্দ্রিয় তথা ত্বকের দ্বারা স্পর্শ করেও উপভোগ করা সম্ভব। একজন অন্ধ ব্যক্তিও বিশেষ ধরনের ভাস্কর্য সৃষ্টি ও উপভোগ করতে পারেন। কেউ কেউ ভাস্কর্যকে মূলত স্পর্শনীয় কলা হিসেবেই গণ্য করা উচিত বলে মত দেন, কেন না ভাস্কর্য নির্মাণের সাথে স্পর্শের সরাসরি সম্পর্ক আছে। প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকেই ত্রিমাত্রিক বিশ্বের বাসিন্দা বিধায় ত্রিমাত্রিক বিশ্বের বিভিন্ন কাঠামো ও এগুলিতে অন্তর্নিহিত অভিব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারে ও প্রতিক্রিয়ামূলক আবেগ অনুভব করার ক্ষমতা রাখে। ভাস্কর্য শিল্পের উদ্দেশ্য মানুষের আবেগের এই জায়গাতে নাড়া দেওয়া ও একে পরিশীলিত করা। ভাস্কর্য প্রকৃতিতে বিদ্যমান কিংবা মানবনির্মিত অসংখ্য আকৃতিকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, কিংবা সম্পূর্ণ উদ্ভাবনীমূলক কিছু হতে পারে। 

ছাপচিত্র:

ছাপচিত্র নির্মাণ বলতে এমন এক ধরনের চারুকলাকে বোঝায় সাধারণত কাগজের উপরে ও কদাচিৎ কাপড়, পার্চমেন্ট (পশুচর্মের) কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অবলম্বনে বিভিন্ন পুনরুৎপাদনমূলক কৌশল ব্যবহার করে চিত্র ছাপানো হয়। 

চারুলিপি:

চারুলিপি এক ধরনের দৃশ্যকলা যেখানে বিশেষ তুলি, কলম ও কালির সাহায্যে কাগজের বা অন্য অবলম্বনের (যেমন রেশমের কাপড়, পাথর, পোড়ামাটি, মোম, কাঠ, ইত্যাদি) উপরে সুন্দর ও সুচারুরূপে কোনও ভাবপ্রকাশমূলক বা যোগাযোগমূলক বিষয়বস্তু হাতে লেখা হয়। যিনি চারুলিপি সৃষ্টি করেন, সেই শিল্পীকে চারুলিপিকর বলে। লিখিত যোগাযোগের পাশাপাশি শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশ ও শোভাবর্ধনের পদ্ধতি হিসেবে চারুকলা ব্যবহৃত হয়। একে "লিপিকলা"-ও বলা হয়। চারুলিপিতে প্রত্যেকটি অক্ষর বা বর্ণের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নথির উপরেও প্রযুক্ত হতে পারে। 

অন্যান্য দৃশ্যকলা

আলোকচিত্রকলা

বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কোনও দৃশ্যকে আলোক-সংবেদী ঝিল্লিতে ধারণ করে পরবর্তীতে সেটিকে চিত্ররূপে বিশেষ কাগজে মুদ্রণ করার প্রক্রিয়াকে আলোকচিত্রগ্রহণ বলা হয়। 

চলচ্চিত্র গ্রহণ

চলচ্চিত্রগ্রহণ হল বাস্তব বিশ্বের ঘটনা ক্যামেরা নামক যন্ত্রে ধারণ করে চলমান চিত্র রচনা করার কারিগরি শিল্পকলা। চলচ্চিত্রগ্রহণ ছাড়া চলচ্চিত্র তৈরি অসম্ভব। 

সচল চিত্রনির্মাণ (অ্যানিমেশন)
সংস্থাপন (ইনস্টলেশন)
সাঁটা (কোলাজ)
ঝুড়ি বয়ন
ঝুড়ি বয়ন বা ঝুড়িশিল্প বলতে শুকানো নমনীয় উদ্ভিজ্জ তন্তু যেমন দূর্বা, শর, ছোট কচি ডাল, বাঁশ, বেত, ইত্যাদির তন্তুকে জালের মতো পরস্পর-বিজড়িত করে বয়ন করে ধারণপাত্র (যাকে ঝুড়ি বলে) এবং অন্যান্য সদৃশ বস্তু প্রস্তুত করার ব্যবহারিক ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডটিকে বোঝায়। ঝুড়ির উপাদান হিসেবে কখনও কখনও কৃত্রিম তন্তুও ব্যবহৃত হতে পারে। ঝুড়ি বয়ন একাধারে শোভাবর্ধক ও ব্যবহারিক শিল্পকলা।

কাদামাটি

মৃৎশিল্প

মৃৎশিল্প হল এক ধরনের শোভাবর্ধক কলা যাতে বিশেষ ধরনের কাদামাটিকে (কুমারের মাটি) বিভিন্ন ধরনের শৈল্পিক আকৃতি দান করে ও পরে ভাঁটি বা চুল্লীতে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার পুড়িয়ে ভঙ্গুর কিন্তু শক্ত, অনমনীয়, রন্ধ্রহীন ও পানিনিরোধী একটি রূপে রূপান্তরিত করে নির্মাণ করা হয়। শৈল্পিক অভিব্যক্তির পাশাপাশি এই বস্তুগুলি দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহৃত হয়।
কাঠ
আসবাব
ধাতু
জহুরির কাজ
মূল্যবান ধাতুকর্ম
স্বর্ণকর্ম
কাচ
কাচের তৈজসপত্র
রঙিন কাচ
অন্যান্য
চিত্রোপল শিল্প (মোজাইক শিল্প)
ব্যবহারিক কলা:
স্থাপত্য:
স্থাপত্যকলা বলতে ভবন নকশা করার শিল্পকলা ও কারিগরি দক্ষতাকে বোঝায়। এটি ভবন নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট দক্ষতাগুলি থেকে স্বতন্ত্র। যারা স্থাপত্যকলা চর্চা করেন, তাদেরকে স্থপতি বলে। স্থপতিরা ভবনের বিভিন্ন গাঠনিক উপাদানের আকার, আকৃতি, রঙ, নির্মাণ সামগ্রী, শৈলী, উচ্চতা, শূন্যস্থান, আলো-ছায়ার খেলা, ইত্যাদির মাধ্যমে এক ধরনের শৈল্পিক দর্শন প্রকাশ করেন।
পোশাক নকশাকরণ:
পোশাক নকশাকরণ (ইংরেজিতে ফ্যাশন ডিজাইন) বলতে নান্দনিকতা, রুচি, স্বাভাবিক সৌন্দর্য ইত্যাদি ব্যাপারগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন রঙ, উপাদান, বিন্যাস বা সজ্জা ও শৈলীর সমন্বয়ে পোশাক ও অন্যান্য পরিধেয় অনুষঙ্গের নকশা করার ব্যবহারিক, শৈল্পিক ও পেশাদারী কর্মকাণ্ডটিকে বোঝানো হয়। স্থানভেদে ও কালভেদে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মনোভাব পোশাক নকশাকরণ প্রক্রিয়ার উপরে প্রভাব ফেলে থাকে। যারা পোশাক নকশা করেন, তাদেরকে পোশাক নকশাকার বা পোশাক নকশাবিদ (ইংরেজিতে ফ্যাশন ডিজাইনার) বলা হয়। 
গৃহাভ্যন্তর নকশাকরণ:
চিত্রলৈখিক নকশা প্রণয়ন (ইংরেজিতে গ্রাফিক ডিজাইন) বলতে এমন একটি পেশাদারী কলাকে বোঝায় যেখানে কোনও একটি পৃষ্ঠতলে মুদ্রাক্ষরসজ্জা, আলোকচিত্রকলা ও চিত্রাঙ্কনকলার দক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণত একাধিক সুনির্বাচিত প্রতীক, চিত্র ও পাঠ্যবস্তুর (অক্ষর, শব্দ, ইত্যাদি) পরিকল্পিত মিলন ঘটিয়ে একটি সুসজ্জিত সমাহার সৃষ্টি করে কোনও ধারণা বা বার্তাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ দান করা হয়, যার অন্তিম লক্ষ্য নকশাটিকে যান্ত্রিকভাবে পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে সাধারণত বহুসংখ্যক পাঠক-দর্শকের কাছে সেই বার্তাটিকে জ্ঞাপন করা (অর্থাৎ দৃষ্টিনির্ভর গণযোগাযোগ স্থাপন করা)।
কম্পিউটার চিত্রলিখন
আলোকিত পুঁথি
গ্রন্থ চিত্রণ
সাহিত্যকলা
শিল্পকলার দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য হল সামাজিক, দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে আগ্রহজনক কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুর উপরে লিখিত সেইসব সৃষ্টিশীল রচনাবলি, যেগুলির লিখনশৈলী ও অভিব্যক্তিকে কালোত্তীর্ণ উৎকৃষ্ট শৈল্পিক মানের অধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়।
পরিবেশন কলা:
সঙ্গীত
সঙ্গীতকলা বলতে সুর, ছন্দ, সুরসঙ্গতি ও কাঠামোর বিদ্যমান সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মেনে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা উৎপন্ন ধ্বনির সম্মিলন ঘটানো একটি পরিবেশন কলাকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য কানে শুনে উপভোগ্য নান্দনিক, শ্রুতিমধুর কোনও কিছু সৃষ্টি করা, যাতে অর্থবহ কোনও কিছু ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে। সঙ্গীতকলায় উৎপাদিত শিল্পকর্মকে সঙ্গীত বলে। 
নৃত্য
নৃত্য হল পটভূমিতে অবস্থিত সঙ্গীতের সাথে সাথে নির্দিষ্ট বিন্যাসে ছন্দে ছন্দে দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঞ্চালন করার পরিবেশন কলা। নৃত্য মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশের প্রাচীনতম রূপগুলির একটি। সারা বিশ্ব জুড়ে সব সংস্কৃতিতে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। 
নাট্যকলা
নাট্যকলা বলতে এক ধরনের পরিবেশন কলাকে বোঝায় যেখানে একাধিক অভিনেতা ও অভিনেত্রী উপস্থিত প্রত্যক্ষ দর্শক-শ্রোতার সম্মুখে সাধারণত একটি মঞ্চের উপরে কোনও একটি বাস্তবঘনিষ্ঠ বা কাল্পনিক ঘটনাপরম্পরা (সাধারণত পূর্বরচিত নাট্যকর্ম থেকে গৃহীত ও পরিমার্জিত পাণ্ডুলিপির উপর ভিত্তি করে) অঙ্গভঙ্গি, কথোপকথন, গান, সঙ্গীত, নাচ, ইত্যাদির সমন্বয়ে পরিবেশন করেন।
গীতিনাট্য ও যাত্রা
মূকাভিনয় ও ভাঁড়ামি
পুতুল নাচ।

শিল্পকলার প্রয়োজনীয়তা:

শিল্পী তাঁর কল্পনা ও প্রতিভার সাথে দক্ষতা ও রুচির সমন্বয়ে শিল্প সৃষ্টি করেন। শিল্পী তাঁর সৃষ্টির আনন্দ থেকে শিল্প সৃষ্টি করেন বলে কোনো বাঁধাধরা নিয়মের অধীনে শিল্পকে ফেলা যায় না। শিল্পীর কাজ হচ্ছে শিল্পকলার মাধ্যমে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করা, আমাদের কল্পনার পরিধি বাড়িয়ে তোলা।
শিল্পকলার নানা দিকশিল্পের প্রধান দুটি ধারা:
চারুশিল্প (Fine Arts) ও
কারুশিল্প (Crafts)
চারুশিল্প শিল্পীর সৃষ্টিশীল মনের একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। সৃষ্টির আনন্দে মনের তাগিদ থেকেই তার উৎপত্তি। এটি আমাদের মনে আনন্দ যোগায়, দৃষ্টিকে আনন্দ দেয়। যেমন ধরো একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দেখে বা কোনো একটি শিল্পকর্ম দেখে তোমার মন ভরে গেল। মন ভালো হলে পড়াশোনাও ভালো লাগবে। মনে আনন্দ নিয়ে পড়তে পারবে।এভাবে চারুশিল্প আমাদের মানসিক প্রয়োজনে কাজে লাগে। আর কারুশিল্প যদিও শিল্প, তবে অনেক ক্ষেত্রেই এর উৎপত্তি জীবিকা অর্জনের তাগিদে এবং মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে। সুতরাং বলা যায়, আমাদের মানসিক প্রয়োজন মেটায় যে-শিল্প তা হলো চারুশিল্প বা চারুকলা এবং যে-শিল্প দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োজনে কাজে লাগে, পাশাপাশি মনের আনন্দ জোগায় তা হলো কারুশিল্প বা কারুকলা। সমগ্র শিল্পকলা এই দুটি প্রধান ধারার অন্তর্ভুক্ত। মানুষের সৃষ্টি সমস্ত শ্রেষ্ঠ শিল্পই চারুশিল্পের অন্তর্গত।
চারুশিল্পের মধ্যে আছে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, খোদাই শিল্প, নৃত্যনাট্য, নাটক, কাব্য, গদ্যসাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ইত্যাদি।

কারুশিল্পের মধ্যে আছে মৃৎশিল্প, বুনন, তাঁত, চর্ম, বাঁশ, বেত, কাঠ ও নানারকম ধাতুর তৈরি ব্যবহারিক শিল্প।

আবার নকশিকাঁথা, নকশি পাখা, খেলনা পুতুল এজাতীয় শিল্পকে আমরা লোকশিল্পের পর্যায়ে ফেললেও এগুলো কারুশিল্পের ধারায় সৃষ্টি।

সাধারণ মানুষ মনের আনন্দ নিয়েই এ- সমস্ত শিল্প তৈরি করে। চারুশিল্পের অন্তর্গত প্রতিটি শিল্পই আবার একটি অন্যটির সাথে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পর্কিত।

নান্দনিক শিল্প

নান্দনিক শিল্প আসলে চারুশিল্পেরই অন্য নাম।
চারুশিল্প আমাদের মনকে আনন্দ দেয়, দৃষ্টিকে আনন্দ দেয়। যে শিল্প আনন্দদায়ক ও দৃষ্টিনন্দন, যা আমাদের মনের খোরাক যোগায় তাকেই আমরা নান্দনিক শিল্প বলতে পারি। নন্দন শব্দ থেকে নান্দনিক শব্দের উৎপত্তি। স্বর্গের উদ্যানকে বলা হয় নন্দনকানন। নন্দন শব্দটি সুন্দর অর্থে ব্যবহৃত হয়। শিল্পী যখন কোনোকিছু সৃষ্টি করেন তখন তাঁর সৃষ্টির সাথে মিশে থাকে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, তাঁর রুচি, চিন্তা-চেতনা, শিল্পবোধ, তার পরিবেশ ও সমাজ ইত্যাদি নানা কিছু। শিল্পী তাঁর আবেগ, আনন্দ, দুঃখ, ক্ষোভ এসব অনুভূতিকেই শিল্পরূপ দেন। দুঃখ-বেদনা থেকেও শিল্পসৃষ্টি হতে পারে।

তবে তাতে মিশে থাকে সৃষ্টির আনন্দ। দুঃখকে শিল্পে প্রকাশ করার আনন্দ। এসব শিল্পসৃষ্টির মূলে থাকে শিল্পীর নিজেকে প্রকাশ করার অদম্য ইচ্ছা। শিল্পী চান দর্শক তাঁর শিল্পকর্ম দেখে আনন্দ পাক, শিল্পীর চিন্তাভাবনার সাথে দর্শক নিজের চিন্তার মিল খুঁজে পাক অথবা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকের হৃদয়কে আলোড়িত করুক। দর্শক তাতে চিন্তার কিছু খোরাক পাক। শিল্পী নিজেকে প্রকাশ করার জন্য যে-কোনো মাধ্যম বেছে নিতে পারেন। সেটা হতে পারে চিত্রকলা, ভাস্কর্য বা অন্য কোনো মাধ্যম। চিত্রকলার মতো ভাস্কর্য, কাঠখোদাই বা রিলিফ ওয়ার্ক-এর মাধ্যমেও নান্দনিক শিল্প হতে পারে। মাধ্যম যা-ই হোক এ-ধরনের শিল্পকে আমরা নান্দনিক শিল্প বলতে পারি।
চিত্রকলার মাধ্যমে যেমন নান্দনিক শিল্প হয় তেমনি ভাস্কর্যের মাধ্যমেও হতে পারে। আমাদের দেশে ও বিদেশে প্রচুর ভাস্কর্য রয়েছে যা কোনো বিষয়কে নিয়ে শিল্পীর মনের অনুভূতিকে মানুষের মাঝে তুলে ধরেছে। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে অবস্থিত ‘অপরাজেয় বাংলা’। এই ভাস্কর্যটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে অবস্থিত ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ-এর তৈরি ‘অপরাজেয় বাংলা’ যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে। একইভাবে কাঠখোদাই বা রিলিফ করা কাজের মাধ্যমেও হতে পারে নান্দনিক শিল্প।

কারুশিল্প:

ইতঃপূর্বে আমরা চারুশিল্প ও কারুশিল্পের পার্থক্য সম্পর্কে জেনেছি। ব্যবহারিক বস্তুতে সৌন্দর্য আরোপ করার মধ্য দিয়ে কারুশিল্পের সূচনা আমরা তাও জেনেছি।
সকল ব্যবহারিক বস্তুই কারুশিল্প নয়।শুধুমাত্র যেসকল ব্যবহার্য সামগ্রী শিল্পগুণসম্পন্ন অর্থাৎ যা কারুকার্যখচিত অথবা নির্মাণশৈলীর কারণেই মনোমুগ্ধকর তাকেই আমরা কারুশিল্প বলতে পারি। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ যা সৃষ্টি করে তার প্রাথমিক রূপটি হয় খুব সরল।

যেমন আমরা যদি আদিমকালের বিভিন্ন হাতিয়ার বা বাসনপত্রের ছবি দেখি, দেখা যাবে সেগুলো খুব সহজ ও সরলভাবে তৈরি। কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজনের কারণেই সেটা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে সৌন্দর্যবোধ ও রুচিবোধের প্রয়োজনে সেসকল হাতিয়ার বা বাসনপত্রই মানুষ অনেক সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর ভাবে তৈরি করে তাকে শিল্পরূপ দিয়েছে। তখনই সেটা হয়েছে কারুশিল্প।
মানুষ তার জীবনযাপনকে সুন্দর করার জন্য, সুখে ও আনন্দে বসবাস করার জন্য শিল্পকর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে। গ্রামের সাধারণ গরিব কৃষক বা শ্রমিকও তাঁর কুঁড়েঘরটি বাঁশ, খড় ও ছন দিয়ে যথাসম্ভব সুন্দর করে তৈরি করার চেষ্টা করে। দরজা, জানালায় বাঁশ ও বেতের বাঁধন দিয়ে নানারকম নকশা করার চেষ্টা করে। এর কারণ সব মানুষের মনেই সৌন্দর্যবোধ থাকে আর সে তার জীবনযাপনে ঐ সৌন্দর্যবোধের প্রয়োগ করতে চায়।

আবার গাঁয়ে যারা অর্থশালী, তাদের বাড়িঘর পরিপাটি করে সাজানো থাকে। কাঠের দরজা, জানালায় থাকে কাঠ খোদাই করা, উঁচু উঁচু হয়ে থাকা নানারকম নকশা, ফুল, পাখি ও লতাপাতার ছবি। তাদের বাড়িতে ব্যবহৃত খাট, পালং, চেয়ার, টেবিল, নানারকম আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীতে নানারকম কারুকাজ করে সেগুলোকে সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়। শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরাও কারুশিল্পকে নানাভাবে ব্যবহার করেন তাঁদের জীবনযাপনে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীর প্রায় সবই কারুশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কারুশিল্প আমাদের সবার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে।

লোকশিল্প
লোকশিল্প মূলত কারুশিল্পের ধারাতেই তৈরি শিল্পকর্ম, যেমন কুমার যখন মাটির হাঁড়ি, কলসি ইত্যাদি বানায়, তখন তা কারুশিল্প। এই হাঁড়ি-পাতিলে রং করে তাতে নকশা বা ছবি এঁকে যখন একে শখের হাঁড়ি বানানো হয়, তখন হয় লোকশিল্প। তবে লোকশিল্পের সাথে কারুশিল্পের পার্থক্য হলো, কারুশিল্প দক্ষ কারিগরের তৈরি এবং তা ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটায়। অন্যদিকে লোকশিল্প সাধারণ মানুষের তৈরি শিল্পসামগ্রী। যেমন গ্রামের সাধারণ মেয়েদের তৈরি নকশিকাঁথা। কাঁথায় সুতার ফোঁড়ে অত্যন্ত যত্ন ও আবেগ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় ছবিগুলো। নকশিকাঁথার ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা আছে। আবার মাটি টিপে টিপে যেসব হাতি, ঘোড়া পুতুল ইত্যাদি বানানো হয় বা কাঠের তৈরি ছোটবড় হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি লোকশিল্পের কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই বলা যায়
গাঁয়ের মেয়েদের তৈরি রঙিন সুতা, পাট বা পাটের রশি দিয়ে বোনা বিভিন্ন শতরঞ্জি, জায়নামাজ, শিকা ইত্যাদি লোকশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। লোকশিল্পীদের আঁকা বিভিন্ন পট, সরা, ইত্যাদি ছাড়াও নকশি পিঠা, নকশি পাখাসহ বহু লোকশিল্প আমাদের সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পকলার ভূমিকা :

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পকলার ভূমিকা অপরিশীম। মুক্তিযুদ্ধে শিল্পকলার ভূমিকার অনেক প্রমানও মেলে। আলোচনার সাপেক্ষে এসকল প্রমানও নিম্নে উল্লেখিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশের তথা বাংলার শিল্পকলার প্রাপ্ত প্রাচীনতম নিদর্শন মাত্র হাজার দেড়েক বছরের পুরাতন। আর তাও মূলতঃ বাংলায় প্রতিবাদী শিল্পকলার সৃষ্টি। যার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এদেশের মুক্তি সংগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব স্বাধীনতা উত্তর কালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বা মুক্তি আন্দোলন ভিত্তিক শিল্পকর্মের ‍অসংখ্য নজীর রয়েছে।

৫২র ভাষা আন্দোলন হতে শুরু করে ৭১ এর দীর্ঘ মাস যুদ্ধকেও তরান্বিত করেছে আমাদের এই সব বরেন্য শিল্পীদের আঁকা শিল্পকলা। যুদ্ধকে প্রতিহত করে বিজয় এনে দিয়েছে এই শিল্পকলা। তাইতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পকলার ভূমিকা জানতে হলে প্রথমেই আলোচনার প্রয়োজন, শিল্পকলা কি ? এবং মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে কি কি ভূমিকা রেখেছে।

শিল্পকলা :

শিল্প হচ্ছে নন্দন তত্ত্ব বা আর্ট যার দ্বারা সুন্দরকেই বুঝানো হয়ে থাকে। এখানে সমাজের অনুভূতি ভাবগাম্ভির্যতা বা ভাবার্থ প্রকাশ করা হয়। নে তা সবার কাছে গ্রহন যোগ্যতা পায় এবং তা আনন্দদায়ক ও হয়ে থাকে। আর কলা হচ্ছে কৌশল যে কৌশল অবলম্বন করে আমরা শিল্পকে শিল্পের সঠিক ভাবার্থ প্রকাশের মাধ্যমে একে অর্থবহ করতে পারি। সমাজে শিল্পকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে এই কৌশল অবলম্বন করা হয়। আর শিল্পকলা মূলত একটি অনুভূতিজাত বিষয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানেই ১৯৭১ সাল আর তার সাথে জড়িত ৫২’র ভাষা আন্দোলন; ৬৯’র গণ অভ্যুথান; ও ১১ দফা আন্দোলন; আর এইসব আন্দোলনক সামনে রেখে প্রতিবাদী মিছিল এসব মিলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। দেশ বিভাগের পর হতেই ধরা যাক, ১৯৪৭ সালে এ দেশের শিল্পীদের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিল্পচর্চা করতে হয়েছে। শুরুতে কলকাতা আর্ট স্কুলে শিক্ষা লাভ করা শিল্পীরা পূর্ব পাকিস্তানে এসে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হয়। এই বাধা ছিলো ধর্মযি কারনে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়। তথাপি এদেশের শিল্পীরা তাদের শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখেন ও এদেশে শিল্পকলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। শিল্পকলা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে অধিকার বাঙ্গালীর মেলেনি। আর তাই বাঙগালীর ভাষা আন্দোলনে আমরা লক্ষ্য করি শিল্পীদের প্রতিবাদী হতে। ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুথান প্রভৃতি সকল রাজনৈতিক আন্দোলনেই পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ও ব্যঙ্গ-চিত্র এঁকেছেন সেকালের প্রতিবাদী শিল্পীরা। আাঁকতেন যেসব ছবি সেগুলোর শিরোনাম হতো ‘মিছিল’ ‘াসহযোগ’ ‘প্রতিবাদ’ ‘আমাকে চিৎকার করতে দাও’ প্রবৃতি। এ ক্ষেত্রে ব্যপক সাড়া জাগায় শিল্পী কামরুল হাসানের পোস্টার ”এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে”। তখন ইয়াহিয়া খানের প্রতিকৃতি এঁকেই শিল্পী কামরুল হাসান বিদ্রোহে যান সরাসরি। ৫২ সালেপূর্ব বাংলা পরিষদের সভায় রাষ্ট্র উর্দূ ভাষা করার পায়তারা হয়। সভা শেষে প্রায় ৫০০০ ছাত্রছাত্রী ‍বিশাল মিছিল করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে। সামনে প্রচারের ভূমিকায় কার্টুন সম্বলিত পোস্টার ও ফেস্টুন। তৎকালীন সরকারের ব্যঙ্গ প্রতিকৃতি তখন স্বাধীনতা হরন নিয়ন্ত্রন আইন করা হয়। সেই কালো কানুনের বিরুদ্ধে অনেক পোস্টার হয়। ১টি পোস্টারে একজন মানুষের মুখ বাধা তাকে কথা বলতে বাধা দেয়া হচ্ছে এবং অন্যটি খাজা নাজিম উদ্দিনের ব্যঙ্গ প্রতিকৃতি এই পোস্টার দুটি মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

২১শের পূর্বে রাষ্ট্রভাষা জোরদারের জন্য কামরুল হাসানের নেতৃত্বে কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর আরো অনেকেই চিত্র প্রদর্শনীর জন্য ছবি আঁকেন। ঢাকাসহ সারাদেশে সবধরনের মিছিল সভা শোভযাত্রা সহায়ক একমাত্র পোস্টার।

শিল্পকলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব ‍:

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সমকালীন বাংলাদেশী শিল্পীদের এক যৌথচিত্র প্রদর্মনী সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার বিড়লা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত চলার পর এই চিত্রগুলি ভারতের রাজধানী দিল্লীতে প্রদর্শীত হয়। এই প্রদর্শনীটির আয়োজক ছিলেন “বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবি সমিতি”। ।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী শিল্পকলা :
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্পকলাকে প্রধানতঃ দুই ভাগে ভাগ করা যায়, একটি মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ও অপরটি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী শিল্পকলা। প্রথম ভাগের শিল্পকর্ম মূলত‍ঃ পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যঙ্গচিত্র। আর পরবর্তী ভাগের শিল্পকর্ম শিল্পকলার প্রায় সকল মাধ্যমেই কম বেশী সৃষ্টি হয়েছে।

নিম্নে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিছু শিল্পকর্মের কথা উল্লেখ করা হলো :
মুক্তিযোদ্ধা - শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন
এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে - কামরুল হাসান, বিজয় - রফিকুন নবী, প্রতিবাদ - কাইয়ুম চৌধুরী, স্বাধীনতা - কাইয়ুম চৌধুরী, বাংলাদেশ ৭১ - কাইয়ুম চৌধুরী, বাংলার বিদ্রোহ - রশিদ চৌধুরী, অপরাজেয় বাংলা - সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, স্মৃতি-৭১ - সুলতানুল ইসলাম, ২৬শে মার্চ ১৯৭১ - কালিদাস কর্মকার ইত্যাদি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহনের প্রেক্ষিতে আব্দুর রাজ্জাক, মুর্তজা বশির, রশিদ চৌধুরী, ইমদাদ হোসেন প্রমুখের অঙ্কিত পোস্টার ভাষা আন্দোলনের শৈল্পিক দলিল। ভাষা আন্দোলনকে বিষয় করে মর্তুজা বশিরের ড্রইং ও লিনোকাট বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের ম্যুরাল উজ্জ্বল ও অসাধারণ শিল্পকর্ম। হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের নকশাকৃত শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের অমর শিল্পকৃতি।

বাংলাদেশে কোনো আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভাস্তর্য নির্মাণ সম্ভবতঃ প্রথম ঘটে ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৫ এ নেত্রকোনায় কমিউনিস্ট পার্টি আয়োজিত সারা ভারত কৃষক সম্মেলনে কৃষ্ণ নগরের কারিগর লক্ষীপাল, হাজং কমরেড হৃদয়কে মডেল করে ৮ ফুট উঁচু একটি খড়-মাটির ভাস্কর্য নির্মাণ করেন যা এক যুবার প্রতিকৃতি, মুক্তি প্রয়াসী, হাতের শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলেছে, পায়ের শৃঙ্খল ভাঙ্গতে উদ্যত। এখানে বিদ্রোহের ভাষা প্রকাশ পায়।

মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর্য “মুক্তিযোদ্ধা”। শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক ১৯৭২ সালে এটি নির্মান করেন এবং জয়দেবপুর চৌরাস্তায় স্থাপন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক ভাস্কর্যের পথিকৃত আনোয়ার জাহান। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে মুক্তি সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তিনি নির্মাণ করেন “স্ট্রাগল“ নামক ভাস্কর্য।

আব্দুল্লাহ খালিদ নির্মিত “অপরাজেয় বাংলা” নামক ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার উত্তর বাংলাদেশে কয়েকটি ভাস্কর্য-
অপরাজেয় বাংলা - আব্দুল্লাহ খালিদ
অঙ্গীকার - আব্দুল্লাহ খালিদ
দরজা - হামিদুজ্জামান খান
হামলা - হামিদুজ্জামান খান
সংশপ্তক - হামিদুজ্জামান খান
জাগ্রত বাংলা - হামিদুজ্জামান খান
অনুশীলন - আব্দুর রাজ্জাক
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা - শামীম সিকদার
রিলিফ ভাস্কর্য - রাসা সিদ্দীকি
সাবাস বাংলাদেশ - নিতুন কুন্ডু
এছাড়া ১৯৭৬ সালে প্রথম জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে আনোয়ার জাহানের ভাস্কর্য ‘টর্চার’ উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য ভাস্করদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আধুনিকতা ও নিজস্বতার সমন্বয়ে ভাস্কর্য নির্মানের প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। পোড়া মাটির ব্যবহারের অনন্যতায় অলক রায়ের ভাস্কর্য বাংলাদেশের ভাস্কর্য চর্চায় এক ভিন্ন মাত্রা। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র তাড়িত ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের শিকার একটি দেশে সংগ্রাম ও সংগ্রামী জনতার বাংলার মুক্তি সংগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষনের শৈল্পিক রুপ, যা উপস্থাপনা, শৈলী এবং মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ভাস্কর্যে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে।

অন্যান্য ভাস্কর্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য :
নারী দশক, স্বাধীনতা তুমি আসবে বলে, বায়ান্ন-একাত্তর - মৃণাল হক
স্মৃতি-৭১, জীবন বৃত্ত - সুলতানুল ইসলাম
৭১, ৫২ ও রথযাত্রা - মাহবুবুর রহমান
বুদ্ধিজীবি হত্যা - মেহরাব আলী
ব্যর্থ স্রষ্টার উল্লাস - রেজাউজ্জামান রেজা
৭১ এর নারী ধর্ষণ, মিছিল - শহীদুজ্জামান
কম্পোজিশন, মানুষ ও কুকুর - তৌফিকুর রহমান
প্রত্যাখানের আন্দোলন - আ.র.ম আজাদ।
মূলত মুক্তিযুদ্ধের চিত্রকে মনে রাখতেই যুদ্ধ পরবর্তী শিল্পকলাকে তৈরী করা হয়েছে। যেন কালের স্রোতে হারিয়ে না যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের এই বার্তা।

পরিশেষে বলা যায় যে, বিদ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে সহায়কের ভূমিকা পালন করে শিল্পকলা। এর ফলশ্রুতিতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করে দেশ এবং পরিশেষে বিজয় অর্জন করে। ফলে আমরা পাই স্বাধীন দেশ, পাই নিজস্ব ভাষার স্বীকৃতি। এটাইতো শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর এই ‍অর্জনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হাতিয়ার হিসেবে শিল্পকলা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও যেন যেকোন সংগ্রামের সিড়িতে হোচট না খেয়ে বিদ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহন করে শিল্পকলাকে। তবেই সার্থক হবে মুক্তিযুদ্ধে শিল্পকলার ভূমিকা।
মন্তব্য:

আর শিল্পকলাকে বাদ দিলে কি থাকবে?? 
মন্তব্য করুন