একটা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানে, অনেকগুলো স্বপ্নের অপমৃত্যু ঃ
একটা পরিবারের অকাল মৃত্যু। এই ভেঙে যাওয়া পরিবারের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য হচ্ছে শিশুরা।এমন সন্তানের মতো অভাগা খুব কমই হয়।ওদের না থাকে পরিবার, না থাকে সান্ত্বনা। ওরা না পায় বাবা না পায় মা। আদর সোহাগ যেন ওদের কপালে থাকে না। ওদের নিয়ে না থাকে কারো স্বপ্ন না থাকে কারো আশা!
শুধু সামাজিক বক্রদৃষ্টি। পারিবারিক/সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি আড়ষ্টতার সাথে হয়, থাকে কিছু জড়তাও। অনেকেই আলগা দরদ দেখাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, মা/বাবা’কে মিস করো না? কেউ আবার আরেককাঠি সরেস, আহারে বাচ্চাটা বাবা/মা’য়ের আদর পাচ্ছে না বলে। এসব বলা মানে শিশু টা হেয় করা
সহপাঠীদের মধ্যেও কানাঘুষা চলে। অমুকের মা/বাবা আলাদা থাকে। অনেক অভিভাবক তো ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের সাথে নিজের বাচ্চাকে মিশতেও মানা করে দেন। এইসব পারিপার্শ্বিকতা প্রভাব ফেলে বাচ্চাদের মনোজগতে, প্রভাব ফেলে তাদের পড়াশোনায়, তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে। খুব স্ট্রং মাইন্ডের বাচ্চা না হলে খুব ভালো সম্ভাবনা আছে তার অকালে নষ্ট হবার।
স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হয়, সন্তানের সাথে তো নয়! একটা সময় যে যার মতো হয়তো নতুন করে সংসার পায়, কিন্তু এই বাচ্চাগুলো আর কখনোই তার আপন পরিবার পায় না। তাদের ক্ষতটাতে সময়ের সাথে প্রলেপ পড়লেও কিন্তু আজন্মের দাগ হয়ে থাকে। জীবনের শুরুতে ওরা বড় হয অনাদর আর অবহেলায়। কারো কাছে নিজের চাহিদা ও প্রকাশ করতে ভয পায়। তার বয়সী কোন শিশু যে বাবা মায়ের সান্নিধ্যে বড় হচ্ছে এ যেন ওর জন্য নতুন পৃথিবী। ফেল ফেল চাহনিতে তাকিয়ে অশ্রু ঝরানো ছাড়া যে আর কোন পথ থাকে না।
ভেঙ্গে যাওয়া পরিবারের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই দেখে ফেলে দুনিয়ার কঠিন চেহারা। স্বার্থপর পৃথিবীতে মানুষের নোংরা মানসিকতার সাথেও পরিচয় ঘটে তাদের। যেহেতু সমাজের বেঁধে দেয়া মাপকাঠিতে স্বাভাবিক একটা জীবন হয় না, তাই তাদের কষ্টগুলোও অস্বাভাবিক রকম ভারী। এদের নিদ্রাহীন রাতের হিসেব কেউ রাখে না, অলক্ষ্যে ফেলা চোখের জল কেউ দেখে না।
এমন ভগ্ন পরিবারের কোন শিশু অপরাধী না। তাদের আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই। অতি আহ্লাদ কিংবা অহেতুক ছোট চোখে দেখাটা সে চায় না, শুধু স্বাভাবিক আচরণটাই প্রত্যাশা করে সমাজের কাছে। আর যারা বাবা-মা, একটা বিষয় তাদের মনে রাখা দরকার, আপনারা স্বামী বা স্ত্রী নন ঠিকই, কিন্তু সন্তানটা আপনার। সে যার কাছেই থাকুক, দায়িত্ব কিন্তু দু’জনেরই। যে জীবন পৃথিবীতে এনেছেন তার চোখের জলের কারণ হবার মধ্যে সার্থকতা নেই কোন, আছে কাপুরুষতা।
ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর মুহূর্ত তার বাবা বা মায়ের নতুন বিয়ের মুহূর্তে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্পৃশ্য ভাবনার অদৃশ্য হতে চায় ওই সময়টায়।
আমাদের সমাজে বিয়ের পর পরই বাচ্চা নেবার খুব তারাহুড়ো থাকে। পারিপার্শ্বিক প্রেসারও থাকে একরকম। আবার সংসারে বনিবনা হচ্ছে না, অশান্তি হচ্ছে, কিংবা স্বামী নেশাগ্রস্ত, সবার উপদেশ বাচ্চা নাও, ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চা নিয়ে কোনকিছু ঠিক হয় না, বরং আরও অনেক বিপদের শুরু হয়। একটা সম্পর্ককে সময় দিতে হবে। বাচ্চার দায়িত্ব নেবার মতো নিজেরা তৈরি কিনা এ বিষয়ে ভেবেচিন্তেই দুজনকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বাচ্চা কখনোই কাউকে ঠিক করার হাতিয়ার না, কাউকে ভালো করার মেডিসিন না, কাউকে সংসারে বেঁধে রাখার শিকল না। সে একটা নতুন প্রাণ যাকে আমরা আনি পৃথিবীতে। সে অসহায় থাকে, আমাদের তার সহায় হতে হবে। শক্তি দিয়ে সামর্থ্য মতো গড়তে হবে আমাদের পরের প্রজন্ম। আনলাম, ছেড়ে দিলাম, এই অবস্থা কখনোই কাম্য না।