সহকারী শিক্ষক
৩০ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৬:০৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সকলের দায়িত্ব । বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। বর্তমান বিশ্ব একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে । আর এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে। প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করবে যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহারই প্রমিত কার্যধারা। শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার-
• শিক্ষার্থীদের যে কোনো উন্নয়নের জন্য,
• শিক্ষকদের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ পরিবেশ গঠনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করবে।
• বিদ্যালয় পাশ শিক্ষার্থীদের এমন বুনিয়াদি দক্ষতা ও কার্যকারিতা তৈরি করতে সহায়তা করবে যাতে তারা চাকরির বাজারে সফলতার সাথে উৎরে যায়।
কেবল এইগুলোই নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার একুশ শতকের শিক্ষার্থীদের শিখন চাহিদা পুরণের সাথে সাথে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে লড়াই করতে শেখাবে। আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে টেকসই উন্নয়নের কথা বলি, সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একুশ শতকের বিদ্যালয়, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কারিকুলাম ও মূল্যায়নের এ ধারণা আমাদের দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকসহ সকল শিক্ষা ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ২০১১ সালে কম্পিউটার বিষয়টির প্রবর্তন একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হলেও কেবল কম্পিউটারকে পাঠ্য হিসেবে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করলেই শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারে পটু হয়ে উঠবে না। নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ পদক্ষেপ হলেও তা কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রদানে ব্যর্থ। প্রথমত, কেবল বিষয়ের অন্তর্ভুক্তিকরণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ হবার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবে কি? দ্বিতীয়ত, পুঁথিগত বিদ্যাকে তারা ঠিক কতখানি বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে শিখবে? তৃতীয়ত, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এবং ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সমর্থ হবে কি?
উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর প্রদানের জন্য এ মুহূর্তে পর্যাপ্ত সুযোগ বা ব্যবস্থা আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। এখনও পর্যন্ত আমরা বুঝি বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কম্পিউটারকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের পরিবরতে হোয়াইট বোর্ডের সংযোজন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে এখনও পর্যন্ত শিক্ষকদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার শুরু হয়নি। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে বেরিয়ে প্রজেক্টভিত্তিক কাজের সুযোগ-সুবিধা পায় না। স্ব-শিখনকে আমলে এনে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে ‘ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী’ হবার সম্ভাবনাকে আমলে এনে শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
এখন যেটা কাজের কথা সেটা হল, কী করে নিজেদের আমরা এই শতকের উপযুক্ত করে তুলতে পারি? আমাদের শিক্ষার শুরুটা হল বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে। কাজেই প্রথম যে পদক্ষেপটি নিতে হবে সেটা হলো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষণের জন্য একুশ শতকের উপযোগী ডিজিটাল ক্লাসরুম নিশ্চিতকরণ। ক্যারিবিয় অঞ্চলে এক সময় শ্রেণীকক্ষের চিত্র ছিল একটি টিপিক্যাল ক্লাসরুমের মতো। বসবার জন্য সারিবদ্ধ টেবিল-চেয়ার, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে চক হাতে বিষয় শিক্ষকের টানা বক্তৃতা দিয়ে যাওয়া, হিপনোটাইজড শিক্ষার্থীদের চোখ চুম্বকের মতো শিক্ষকের প্রতিটি শব্দের ওপরে আটকে যাওয়া, বোর্ডে লিখে যাওয়া পাখির বুলি- এমনটিই ছিল শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। এখন সে পরিবেশ বদলে এখন সেখানে শ্রেণীকক্ষে কম্পিউটার টেকনোলজি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। পূর্বে তাদের শ্রেণীকক্ষে টেলিভিশন, রেডিও, ভিসিআর, ওভারহেড প্রজেক্টার টেকনোলজির ব্যবহার ছিল। পরবর্তীতে কম্পিউটার টেকনোলজি ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। ব্যক্তিগত কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের আবির্ভাব তাদের শিক্ষন-শিখনের মান উন্নয়ন ঘটিয়েছে। যুক্তরাজ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি ছয় জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি নয় জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি কম্পিউটার বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে শতকরা ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। যেখানে শিক্ষকরা আইসিটির ওপরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যা কিনা ১৯৯৮ থেকে ২০০২ এসে শতকরা ৬৩ ভাগ থেকে ৭৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে। আমরা যদি একই বিচারে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রয়োগ এর কথা চিন্তা করি তাহলে কী দেখতে পাই? নিঃসন্দেহে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এই পিছিয়ে থাকাটা যে ঠিক কতখানি তা আমদের ধারণার বাইরে। আমাদের হাতে হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে টিভি, কম্পিউটারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এ প্রযুক্তিগুলোকে যে কেবল বিনোদনের জন্য নয়, শিক্ষার কাজেও লাগানো সম্ভব এটা আমরা কজনই বা মানি। শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হওয়া যায়, টেলিভিশনের মাধ্যমে দূর শিক্ষণকে জনপ্রিয় করা সম্ভব, কম্পিউটারের মাধ্যমে করা যায় না এমন কী আছে? এগুলো সব কাজের কথা, প্রয়োজনের কথা। কিন্তু এ প্রয়োজনটা শিক্ষকদের বোঝানো দরকার আর সেটা করতে হবে হাতেকলমে। শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্যোগটা নিতে হবে নিজেকেই। কারণ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সরকারের পক্ষে দেশ চালানোর ঠেলা সামলে এককভাবে শিক্ষার উন্নয়নের কথা চিন্তা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগকে তাই প্রাধান্য দিতে হবে। চিন্তা চেতনায় স্বকীয়তা তৈরি করতে না পারলে কে কখন শেখাবে আর সাহায্য করবে এ আশাতেই তীর্থের কাকের মতন সময়টা গড়িয়ে যাবে বিনা উন্নয়নে। মোদ্দা কথা হল, উন্নয়ন চাই এবং সেটা টেকসই হতে হবে। এই উন্নয়নকে তরান্বিত করতে সাহায্য করবে শ্রেণীকক্ষে ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। প্রকৃতপক্ষে এই ব্যবহার বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ থেকে শুরু না করলে দেশের উন্নয়নকে সামনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; কারণ একটা জাতি তখনই উন্নতির দিকে এগিয়ে যায় যখন সে জাতি তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতকে মজবুত করে।বর্তমানে মুজিব বর্ষ চলছে। মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার হোক প্রতিটি ক্লাসরুম হক ডিজিটাল। শুভ হোক সকলের প্রতিটা দিন।