Loading..

প্রেজেন্টেশন

রিসেট

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১১:২১ অপরাহ্ণ

মাটির নিচে যে শহর,বাংলা,পঞ্চম শ্রেণি,

বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে। সে সব স্থানের নাম তোমরা হয়তো জানো, যেমন ময়নামতি, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর। এগুলোর কোনোটি হয়তো তুমি দেখেও থাকবে। সেগুলো সবই মাটির উপরে, ঢিবির আকারে, তাই সহজে দূর থেকেই দেখা যায়। কিন্তু এদেশে মাটির নিচে রয়ে গিয়েছিল এক প্রাচীন নগর সভ্যতা। আজকে সেটার কথাই বলব। 
কুমিল্লার লালমাই আর বরেন্দ্র অঞ্চল, দিনাজপুর-নওগাঁ-বগুড়ার পাহাড়পুর এবং মহাস্থানগড়ের মতো মধুপুরগড় টাঙ্গাইল-গাজীপুর-নরসিংদীর অধিকাংশ ভূমির গঠন একই রকম যা মধুপুরগড় নামে পরিচিত। মৃত্তিকা বৈজ্ঞানিকগণ বলেন, এই অঞ্চলের মাটি হাজার-হাজার বছরের পুরানো। তুমি ধরেই নিতে পার যে, আজ থেকে বহু-বহু বছর আগে আমাদের এই দেশের ভূপৃষ্ঠ ঠিক এই রকম ছিল না। আসলে, খ্রিস্টপূর্ব সাত থেকে ছয় শতকে বর্তমানের গঙ্গা নদীর তীরে সুসভ্য জন-মানুষের বসতি ছিল। এখানে ছিল সুন্দর নগরী। মানচিত্রে দেখতে পার। এখনকার নরসিংদী দিয়ে বয়ে গেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ। ১৭৭০ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র প্রবাহ ময়মনসিংহ পেরিয়ে বেলাবর কাছে দক্ষিণ দিকে গিয়ে প্রাচীন সোনারগাঁ নগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছিল।

সম্ভবত বড় ভূমিকম্প, বন্যা-প্লাবন আর নদীভাঙনের কারণে কোনো সময়ে এসব অঞ্চলে ভূপ্রকৃতির বড় রকমের ওলট পালট ঘটে। ১৮৯৭ সালের প্রচণ্ড ভূমিকম্পের কথা অনেকেই জানেন। আজকের যত মাঠ-ঘাট, নদী-নালা আর জনবসতি তার সবই প্রাকৃতিক কারণে বদলে গেছে। এখনো তোমরা দেখবে পাড়ের জমি, ঘরবাড়ি, গ্রাম আর রাস্তা-ঘাট ভাঙছে। আবার বিশাল নদীর অন্য দিকে বিস্তীর্ণ চর পড়ছে। শত শত বছর আগে থেকেই এইভাবে চলে আসা ভাঙা-গড়ায় মাটিচাপা পড়ে যায় একটি নগর-জনপদ। মাটি খুঁড়ে এমনি এক সুপ্রাচীন নগর-জনপদের দেখা পাওয়া গেছে বাংলাদেশে। সেই স্থানের নাম উয়ারী-বটেশ্বর।

উয়ারী-বটেশ্বর ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদীর বেলাব ও শিবপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। আসলে উয়ারী ও বটেশ্বর পাশাপাশি দুটি গ্রাম। এই দুই গ্রামে প্রায়ই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যেত। ১৯৩৩ সালে উয়ারী গ্রামে শ্রমিকরা মাটি খনন করার সময় একটা পাত্রে জমানো কিছু মুদ্রা পায়। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ পাঠান সেখান থেকে ২০-৩০ টি মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এগুলো ছিল বঙ্গদেশের এবং ভারতের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা। সেটাই ছিল উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের প্রথম চেষ্টা। তিনি তাঁর ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠানকে এ সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। ১৯৫৫ সালে বটেশ্বর গ্রামের শ্রমিকরা দুটি লৌহপিণ্ড ফেলে যায়। ত্রিকোণাকার ও একমুখ চোখা ভারী লোহার পিণ্ডগুলো হাবিবুল্লাহ বাবাকে নিয়ে দেখালে তিনি অভিভূত হন। ১৯৫৬ সালে উয়ারী গ্রামের মাটি খননকালে ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রার একটি ভাণ্ডার পান। তাতে চার হাজারের মতো মুদ্রা ছিল। ১৯৭৪-৭৫ সালের পর থেকে হাবিবুল্লাহ উয়ারী-বটেশ্বরের প্রচুর প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ করে জাদুঘরে জমা দেন। অনেক পরে ২০০০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় খনন কাজ। খনন করে পাওয়া যায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগর, ইটের স্থাপত্য, বন্দর, রাস্তা, গলি, পোড়ামাটির ফলক, মূল্যবান পাথর, পাথরের বাটখারা, কাচের পুঁতি, মুদ্রাভাণ্ডার। মুদ্রাগুলো ভারত উপমহাদেশের মধ্যে প্রাচীনতম। এ থেকে বিশেষজ্ঞদের ধারণা মাটির নিচে থাকা এই স্থানটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো

আজকের উত্তরে মনোহরদি ও বেলাব, পূর্বে রায়পুরা, দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী-এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছিল সুসভ্য মানুষজনের বসবাস, ছিল নগর সভ্যতা। পূর্ব-দক্ষিণ দিক দিয়ে ভৈরবের মেঘনা হয়ে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য সুদূর জনপদ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল বলে মনে হয়। ঐতিহাসিকদের ধারণা, ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে, বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের অঞ্চলের সুদূর রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ রাজ্যের যোগাযোগ হয়তো ছিল। 
উয়ারী-বটেশ্বরের আশেপাশে প্রায় ৫০টি পুরানো জায়গা পাওয়া গেছে। আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম, যেমন : রাঙ্গারটেক, সোনারুতলা, কেন্দুয়া, মরজাল, টঙ্গীবাজার বাড়ি, মন্দিরভিটা, জানখাঁরটেক, টঙ্গীরটেকে প্রাচীন বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। দুর্গ-প্রাচীর, ইটের স্থাপত্য, মুদ্রা, গহনা, ধাতব বস্তু, অস্ত্র থেকে শুরু করে জীবনধারনের যত প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তা থেকে সহজেই বলা যায়, এখানকার মানুষ যথেষ্ট সভ্য ছিল। এই স্থানের বসতি এলাকাটি সম্ভবত রাজ্যের রাজধানী ছিল। 

অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের ধারণা, অত্যন্ত সমৃদ্ধশীল আর সঠিক পরিকল্পনায় গড়া এই সভ্যতা প্রাচীন কালে ‘সোনাগড়া’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। 
উয়ারী-বটেশ্বর এলাকার মাটির নিচটিকে একটি নগরী হিসেবে ধরা যেতে পারে। এটি দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল যাকে আবার রাজধানী হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। প্রায় ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্য-প্রস্থের আয়তনের এই দুর্গ-নগরটি ছিল নানা দিক থেকে বিশিষ্ট। খুব পাকা প্রকৌশলীগণ এটি গড়ে থাকবেন। বাইরের কেউ যেন আক্রমণ করে দখল করতে না পারে সে রকম শক্ত ব্যবস্থা দেখা যায়। এখানে প্রাপ্ত লোহা ও ধাতু, মূল্যবান পাথর এবং অন্যান্য ব্যবহারের জিনিসপত্র থেকে বোঝা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ছিল যথেষ্ট উন্নত। 
উয়ারী-বটেশ্বর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শিবপুর উপজেলার মন্দিরভিটায় এক বৌদ্ধ পদ্মমন্দিরও আবি®কৃত হয়েছে। জানখাঁরটেকে একটি বৌদ্ধবিহারের সন্ধান পাওয়া গেছে। ক্রমে ক্রমে আরও অনেক আশ্চর্য সব নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে এই এলাকা থেকে। 






মন্তব্য করুন