সহকারী শিক্ষক
২৭ মে, ২০২১ ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ প্রাক প্রাথমিক
বিষয়ঃ আমার বই
অধ্যায়ঃ প্রথম অধ্যায়
শিশুর বিকাশ ও আমাদের করণীয়
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষৎ। শুক্রানু ও ডিম্বানুর মিলনে মায়ের জরায়ুতে জাইগোট সৃষ্টির মাধ্যমে যে জীবনের সূত্রপাত হয় তাই পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিকাশের মাধ্যমে পরিণত মানব শিশু হিসেবে পৃথিবীতে জন্ম নেয়। বংশগতি ও পরিবেশের প্রভাবে শিশুর সম্ভাবনাগুলো পরবর্তীতে প্রস্ফুটিত হতে থাকে।
বিকাশ বলতে জীবন ব্যাপী এক সামগ্রিক ও ধারাবাহিক পরিবর্তন বোঝায়। এ পরিবর্তন তার শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক, আধ্মাতিক ও ব্যক্তিত্বের যা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এটি একটি ধীর গতি সম্পন্ন প্রক্রিয়া এবং একটি স্তরের সম্পূর্ণ সক্ষমতা অর্জিত হলেই পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে সীমাহীন সম্ভাবনার আধার। সময়ের পরিক্রমায় সেই সম্ভাবনাগুলো পরিপক্কতার দিকে অগ্রসর হয়। জন্মের পরেই শিশু হাটঁতে পারে না কিন্তু হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় অংগসমূহ জন্মমূহূর্ত থেকেই শিশুর মধ্যে বিদ্যমান। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ ঘটতে থাকে। বিকাশের প্রতিটি স্তরে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা থাকে। বয়স্কজন হিসেবে আমাদের উচিত সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
মনোবিজ্ঞানী হারলক মানুষের জীবনকালকে ১০টি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। (১) গর্ভাবস্থা (২) নবজাতককাল (জন্মলাভ থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত) (৩) প্রাক শৈশবকাল (২সপ্তাহ থেকে ২ বৎসর পর্যন্ত) (৪) শৈশবকাল (২ বৎসর থেকে ৫ বৎসর পর্যন্ত) (৫) শৈশবোত্তর কাল (৫ বৎসর থেকে ১০ বৎসর পর্যন্ত) (৬) কৈশরকাল (১০ বৎসর থেকে ১৩/১৪ বৎসর পর্যন্ত) (৭) কৈশোরোত্তর কাল (১৩/১৪ বৎসর থেকে ১৯/২০ বৎসর পর্যন্ত) (৮) যৌবন কাল ( ১৮ বৎসর থেকে ৩৬ বৎসর পর্যন্ত) (৯) মধ্যবয়স কাল (৩৭ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর পর্যন্ত) (১০) বৃদ্ধকাল (৫০বৎসর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত)
শিশু বিকাশে সহায়ক কিছু তথ্যঃ
১। জন্মের পর থেকেই শিশু দ্রুত শিখতে শুরু করে। মানুষের মস্তিস্কের বিকাশ এ সময়ের খুব দ্রুত সংগঠিত হয়। তাই শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের জন্য বড়দের ভালবাসা ও মনোযোগ এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। মানুষের পঞ্চ-ইন্দিয় জন্ম মূহুর্ত থেকেই কাজ করতে থাকে। জন্মের পর শিশুকে কোলে বা বুকে তুলে আদর সোহাগ করা দরকার। সে পরিচিত মুখ ও মুখের অভিব্যক্তি দেখতে চায় এবং পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে চায়। সে চায় অন্যরা তার প্রতি সাড়া দিক। এ সময়ে শিশু নতুন নতুন আকর্ষণীয় বস্তু ধরতে চায় এবং তা নিয়ে খেলতে চায়। শিশুকে দীর্ঘক্ষণ একা থাকতে দেয়া ঠিক নয়। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শিশুর দিকে তাকিয়ে থাকা দরকার যা শিশুর মানসিক তৃপ্তির জন্য খুবই প্রয়োজন। এ সময়ে প্রয়োজনীয় আদর, সোহাগ, সমর্থন ও পরিচর্যা না পেলে শিশুর বিকাশ মারাত্বক ভাবে ব্যহত হয়।
২। খেলাধূলা শিশুর বিকাশে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । খেলার মাধ্যমে শিশুর দেহ ও মনের অনুশীলন হয় এবং সে পৃথিবী সম্পর্কে মৌলিক ধারনা লাভ করে। মা-বাবা কিংবা শিক্ষকগণ খেলায় সাহায্য করতে পারেন। বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের খেলা-ধূলার সুযোগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা উচিত। কৌতুহল, আত্ম-বিশ্বাস ও সংযমের শিক্ষাও খেলার মাধ্যমে লাভ করে। বড়রা যদি শিশুদের ইচ্ছামত চালাতে চান তবে শিশু নিজ চেষ্টায় শেখার সুযোগ পাবে না। কিছু করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে সফল হওয়ার উপায় নিজে নিজে খুঁজে বের করে শিশু সবচেয়ে ভাল শেখে।
৩। শিশুরা বড়দের অনুসরণ করে। কাজেই নিকট জনের আচার-আচরণ যেমন হয় শিশুরা তেমনি আচরণ করতে শেখে। কথা বা আদেশ পালনের পরিবর্তে বড়দের কাজের বাস্তব দৃষ্টান্ত শিশুরা বেশি অনুসরণ করে।
৪। শিশুরা অল্পতে রেগে যায়, ভয় পায় কিংবা কান্নাকাটি করে। ধৈর্য্য ও সহানুভূতি নিয়ে তার আবেগ-অনুভুতির প্রতি সাড়া দিলে তারা সুস্থ মন ও মানসিক ভারসাম্য নিয়ে বেড়ে ওঠে। শিশুরা যদি কখনো ভুল বা অনাকাংখিত আচরণ করে তবে বড়দের উচিত সেগুলো শান্তভাবে বুঝিয়ে দেয়া। এ ভাবেই শিশুর বিবেক তৈরি হয় এবং সে ভাল মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। শিশুর কান্না কখনো উপেক্ষা করা উচিত নয়।
৫। শিশু ঘন ঘন সম্মতি ও উৎসাহ পেতে চায়। শারীরিক নির্যাতন বা শাস্তি শিশুর বিকাশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মা- বাবা যদি শিশুর আচরণ মেনে নেন তবে তা শিশুকে ভাল হতে প্রেরণা যোগায়। এ কারণে শিশু ভাল কিছু করলে সকলের উচিত সন্তুষ্টি ও সম্মতি প্রকাশ করা।
৫। মা-বাবাই হচ্ছে শিশুর আদর্শ শিক্ষক। জন্ম থেকেই শিশু যদি ভালবাসা, নিরাপত্তা ও কাজের স্বীকৃতি পায় তবে তার দ্রুত শেখার ইচ্ছা ও অবস্থা তৈরি হয়। শিশুর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। লেখা-পড়া এবং স্কুলে ভালো ফল করার জন্য বেশি চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে সময় নিয়ে শিখালে শিশুরা ভাল শেখে। ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর দৈহিক, মানসিক ও আবেগ-অনুভূতিগত কোন পার্থক্য নেই।
৬। শিশুর বিকাশ মূল্যায়নে মা-বাবাই শ্রেষ্ঠ বিচারক। শিশুর বিকাশে অর্থের জোগান ব্যয় নয় বরং বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগ শুধু তার মানসিক উন্নয়ন ঘটায় না, সে হয়ে ওঠে সমাজের উৎপাদনক্ষম মানব যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
লেখক: বিপুল চন্দ্র মজুমদার, ইন্সট্রাক্টর, ইউআরসি,মেহেন্দিগঞ্জ,বরিশাল (সংগৃহীত)